আদিবাসী

চন্দ্র কেন কম আলো দেয়

আদিকালের কথা। সূর্য তার সন্তানসন্ততি নিয়ে আকাশে বিচরণ করত। সূর্যের ছিল প্রখর তাপ। তার সন্তানদের তাপও কম ছিল না। একেকজন ছিল সূর্যের মতোই তেজোদ্দীপ্ত। পিতা ও পুত্ররা এক হয়ে আকাশে উঠত। ফলে দিনের বেলায় প্রখর তাপে পৃথিবীর সবাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠল।

এত তাপে মানুষ চলাফেরা করতে পারত না। অন্যান্য প্রাণী ও গাছপালাদের জীবনও যায় যায়।

সূর্যের তাপ থেকে নিজেদের বাঁচাতে সবাই ছুটে গেল সূর্যের বোন চন্দ্রের কাছে। সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল সে। এরপর চন্দ্র এক বুদ্ধি আঁটল।

কী সেই বুদ্ধি?

চন্দ্র জানত তার ভাই সূর্য কী কী খেতে পছন্দ করে। একদিন সে খরগোশের মাংস রান্না করে সূর্যকে দাওয়াত করে।

সূর্য আদরের বোন চন্দ্রের বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়।

ছোট বোন ভাইকে যত্ন করে খরগোশের মাংস খাওয়াল।

তা খেয়ে সূর্য তো আত্মহারা।

এমন সুস্বাদু মাংস সে আর কখনোই খায়নি। সূর্য ভাবতে থাকল, এটা কিসের মাংস? কিন্তু বোন থেকে কীভাবে সে জানবে এর উত্তর!

বোনকে সে আড়ালে ডেকে নিল। এরপর জিজ্ঞাসা করল, ‘চন্দ্র, তোমার রান্নার তুলনা হয় না। কিন্তু এমন মজাদার মাংস আমি কখনো খাইনি। এটা কিসের মাংস?’

চন্দ্র ভাই সূর্যকে উত্তরে বলে, ‘তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না, এ আমারই সন্তানদের মাংস।’

খানিক গম্ভীর হয়ে সে সূর্যকে আরও বলে, ‘তোমার সন্তানদের মাংস এর চেয়েও সুস্বাদু হবে। তুমিও আমার মতো তাদের মাংস খেয়ে দেখতে পারো।’

প্রিয় বোন চন্দ্রের কথাগুলো সূর্যের মনে গেঁথে গেল। সূর্য বাড়ি ফিরেই বোনের কথায় একে একে সব সন্তানকে রান্না করে খেয়ে ফেলল।

সূর্যের সন্তানেরা না থাকায় পৃথিবীতে তাপ গেল কমে।

এভাবে চন্দ্রের বুদ্ধিতে রক্ষা পেল গোটা পৃথিবী।

আনন্দে কাটতে থাকল মানুষ ও অন্য প্রাণীদের জীবন।

কিন্তু পালিয়ে গিয়ে বেঁচে রইল একটি তারা। তার নাম—‘শুকতারা’।

আজও সে আকাশে জ্বলজ্বল করে।

গারো বা মান্দি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরা মনে করে, চন্দ্র ও সূর্য ভাই-বোন।

কিন্তু চন্দ্র কেন কম আলো দেয়?

চন্দ্র ছিল খুবই সুন্দরী। ভাই সূর্য থেকে অনেক বেশি উজ্জ্বলও। তার দিকে কেউ তাকাতেও পারত না। কে বেশি সুন্দর, এ নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হতো। একজন আরেকজনের পেছনে লেগেই থাকত।

সূর্য বোন চন্দ্রের রূপ–লাবণ্যে হিংসা করতে থাকে। ফলে দুই ভাই–বোনে ঝগড়া চলত নিত্যদিন।

তাদের মা দুজনকেই থামাতেন। রাগ হতেন। ঝগড়া নয়, ভাই-বোনকে মিলেমিশে থাকতে বলতেন।

একদিন ঘটল এক ঘটনা।

চন্দ্র-সূর্যকে বাড়িতে রেখে জরুরি কাজে মা গেলেন বাইরে। সে সুযোগে ভাই–বোনে শুরু হয় তুমুল ঝগড়া। সে ঝগড়া এক সময় রূপ নেয় হাতাহাতিতে। প্রচণ্ড ক্ষেপে যায় সূর্য। মুঠিভরা কাদা নিয়ে সে বোন চন্দ্রের মুখে তা লেপ্টে দেয়।

বোনও হয় উত্তেজিত।

ভাই সূর্যকে শায়েস্তা করতে হবে।

তাই মুখের কাদা না ধুয়ে মাকে দেখাতে হবে। সে ওই অবস্থাতেই মায়ের অপেক্ষায় থাকে। বাড়িতে পা রেখেই মা বুঝে যান সবকিছু।

চন্দ্রের কাদামাখা মুখ দেখে তিনি অবাকও হন।

চন্দ্র মুখ দেখিয়ে ভাই সূর্যের বিরুদ্ধে মায়ের কাছে নালিশ দেয়।

কিন্তু মা চন্দ্রের মনোভাব বুঝতে পারেন।

সব শুনে মা চন্দ্রের প্রতি সদয় হন না।

বরং তার এমন আচরণে রাগান্বিত হন। মিলেমিশে না থাকায় মা ক্ষেপে যান।

তিনি মেয়ে চন্দ্রকে বলেন, চিরদিনই তোমার মুখ যেন এমনি কর্দমাক্ত থাকে।

মান্দি বা গারোরা বিশ্বাস করে, সে থেকেই চন্দ্রের মুখে কলঙ্ক লাগে এবং সূর্যের চেয়ে কম আলোর অধিকারিণী হয়।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে প্রথমআলোর অন্যআলোতে, প্রকাশকাল: ২৯ নভেম্বর ২০২৫

© 2025, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button