
দিনাজপুরের ঝিনুক চুন: চৌদ্দ পুরুষের আদি পেশার গল্প।
উত্তরের জনপদ দিনাজপুরে পানের বাটা ছাড়া অতিথি আপ্যায়ন যেন অপূর্ণ। এখানকার মানুষের সহজ-সরল জীবনে পান খেয়ে ঠোঁট ও জিহ্বা লাল করাটা এক চিরায়ত আনন্দের অংশ।
আর সেই পানকে সুস্বাদু করে তুলতে যে অনুষঙ্গটি জরুরি, তা হলো চুন। তবে যে সে চুন নয়, দিনাজপুরের মানুষের প্রথম পছন্দ ঝিনুকের চুন। লোকসংস্কৃতির প্রাচীন এই ঐতিহ্যকে আজও বুকে আগলে রেখেছেন একদল মানুষ, যাদের পরিচয় ‘চুনিয়া’।
ঝিনুক চুনের খোঁজে একদিন সকালে আমরা পা বাড়ালাম সেই গ্রামে। ভাদ্র মাসের তপ্ত দুপুর। তালপাকা গরমে চারদিকে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। ছায়াশীতল রাস্তার ক্লান্তি কাটিয়ে যখন দিনাজপুর শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরের ‘ভবাইনগর’ গ্রামে পৌঁছলাম, স্থানীয়রা পথ দেখিয়ে বললেন- ‘ওটা তো আসলে চুনিয়াপাড়া’।
গ্রামের একটি বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই দেখা গেল ঝিনুকের মেলা। সেখানে কাজ করছেন এক দম্পতি, মঙ্গল চন্দ্র দেবনাথ ও নেপালী রাণী। বাঁশের চালনে ঝিনুক ঝাড়ছেন নেপালী, আর স্বামী মঙ্গল বেছে নিচ্ছেন চুনের উপযোগী ঝিনুকগুলো।
এ দম্পতির কাছে চুন তৈরি কেবল জীবিকা নয়, পূর্বপুরুষের আমল থেকে বয়ে চলা এক রক্তগত উত্তরাধিকার। মঙ্গলের ভাষায়, “চৌদ্দ গুষ্টি ধরে আমরা এই চুনের কর্মই করে যাচ্ছি।”
চুন তৈরির কাঁচামাল আসে নদী থেকে। মোহনপুর, চিরিরবন্দর বা বনতারার মতো নদী এলাকা থেকে একদল মানুষ ডুব দিয়ে ঝিনুক সংগ্রহ করে। ঝিনুকের মাংস মানুষ বা হাঁস খেয়ে ফেলার পর সেই ফেলে দেওয়া খোলসগুলোই কিনে আনেন চুনিয়ারা। মঙ্গলের কাছ থেকে জানা গেল, এক ডালি (প্রায় ১০ কেজি) ঝিনুক কিনতে হয় একশ টাকারও বেশি দামে।
প্রক্রিয়াটি বেশ পরিশ্রমের। প্রথমে ঝিনুকগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর ‘কুটি’ নামের এক প্রকার চুলায় খড় ও কাঠের স্তরে স্তরে ঝিনুক সাজিয়ে আগুন জ্বালানো হয়। পোড়া ঝিনুকগুলো বের করে মাটির গর্তে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হয়।
তারপর তাতে পরিমাণমতো পানি মিশিয়ে তৈরি হয় ঘন মণ্ড বা চুন। এক মণ ঝিনুক থেকে মাত্র ১৩ কেজি কাঁচা চুন পাওয়া যায়, যা বিশেষ কৌশলে পানি মিশিয়ে বাজারজাত করার সময় ৫০ কেজিতে রূপ নেয়। এই চুন কলাপাতা ও বাঁশের ঝুড়িতে ভরে যখন চুনিয়ারা হাটে যান, তখন দোকানিরা খুশিতে হাঁক ছাড়েন- ‘চুনিয়া ভাই আইছে চুন ধরি!’
ঝিনুক চুন কেন সেরা? মঙ্গলের দাবি, “এই চুনে ক্যালসিয়াম বেশি, মুখ পুড়ে না। অন্য চুন খেলে অসুখ হতে পারে, কিন্তু ঝিনুক চুন নিরাপদ।” তবে এই নিরাপদ চুন তৈরিতে যারা জীবন বাজি রাখছেন, তাদের জীবনটা ততটা নিরাপদ নয়।
লাভের কথা জানতে চাইলে মঙ্গলের স্ত্রী নেপালী রাণী মলিন হাসেন। জানান, ৫০ টাকা কেজিতে চুন বিক্রি করে মাত্র ৫ টাকা লাভ থাকে। সেই লাভটুকুও ম্লান হয়ে যায় শরীরের কষ্টের কাছে।
পাশের বাড়ির রাণী বালার ভাষায়, “ঝিনুক পোড়ানোর সময় আগুনের তাপে মাথা চক মারে, সারা অঙ্গ চুনে সাদা হয়ে যায়। কাজ শেষে শরীরে জ্বর আসে, ব্যথা হয়। শীতে তো পুরো শরীর কাঁপতে থাকে।”
নেপালী রাণী তার ক্ষতের চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, “চুনের তীব্রতায় হাতের আঙুলের মাথাগুলো ফেটে যায়। হাতের তালুতে ক্ষত হয়ে যায়। তখন গরম ভাত পর্যন্ত হাত দিয়ে নাড়তে পারি না।”
ঝিনুক পুড়িয়ে চুন তৈরি কেবল পেশা নয়, আদি শিল্প। কিন্তু ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর স্বল্প পুঁজির কারণে এ শিল্পটি এখন হুমকির মুখে। চুনিয়াদের এই আদি পেশাটিকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ। তা না হলে একদিন হয়তো হারিয়ে যাবে ঝিনুক পোড়া গন্ধ আর টকটকে লাল ঠোঁটের সেই প্রাচীন ঐতিহ্য।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ২৫ মে ২০২৬
© 2026, https:.




