কলাম

রঘু রাই: একাত্তরের আলোক-আখ্যানের জাদুকর

রঘু রাই এমন এক স্রষ্টাএকাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলো যার ক্যামেরায় ধরা দিয়েছিল মানবতার আর্তনাদ হয়ে।

একাত্তরে তার ক্যামেরার প্রতিটি ক্লিক যেন ছিল একেকটি দীর্ঘশ্বাস—একটি রক্তাক্ত ইতিহাসের জীবন্ত চিৎকার। যখন চারদিকে বারুদের গন্ধ আর লাঞ্ছিত মানবতার হাহাকার, তখন এক যুবক নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে, ঘাতকের বুলেট উপেক্ষা করে দাঁড়িয়েছিলেন; শুধু এই মাটির কান্নাকে বিশ্ববিবেকের কাছে পৌঁছে দেবেন বলে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই দুঃসময়ের এক অকৃত্রিম সারথি, যার লেন্সের ভেতর দিয়ে আমরা আজও খুঁজে পাই আমাদের শিকড় আর হার না মানা সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। তিনি রঘু রাই।

দেশজুড়ে তখন চলছে পাকিস্তানি বাহিনীর বিভীষিকা। মুক্তিকামী বাঙালি শত্রুর বিরুদ্ধে শুরু করে এক অসম লড়াই। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের দলিল হয়ে আছে সে সময়কার হাজারো আলোকচিত্র। দেশি আলোকচিত্রীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তজুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন ভিনদেশি বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা আলোকচিত্রীও। তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ভারতীয় আলোকচিত্রী রঘু রাই। তিনি এমন এক স্রষ্টা—একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলো যার ক্যামেরায় ধরা দিয়েছিল মানবতার আর্তনাদ হয়ে।

একাত্তরে রঘু রাইয়ের বয়স ছিল ২৮ বছর। কাজ করতেন ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায়। ডিসেম্বরে খুলনার সীমান্তপথে যখন ভারতীয় সেনারা বাংলাদেশে ঢুকছিল, তখন তাদের সঙ্গে ক্যামেরা হাতে বাংলাদেশে আসেন তিনি। পাকিস্তানি সেনাদের গুলির মুখেও পড়েন এই আলোকচিত্রী এবং অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। সে সময় ছবির কারিগরি দিকের চেয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন লাঞ্ছিত মানবতার চিত্র তুলে ধরার দিকে, যা তার আলোকচিত্রে মূর্ত হয়ে ওঠে।

একাত্তরের একটি ছবির পেছনের গল্প তিনি তুলে ধরেছিলেন এভাবে— ‘ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। কর্দমাক্ত যশোর রোড দিয়ে স্রোতের মতো রাত-দিন মানুষ আসছে। মাথায় একটি পুঁটলি। ছোট শিশুটিকে কাঁধে তুলে নিয়েছেন তার বাবা। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের শরীরে সামর্থ্য নেই, কিন্তু তারাও হাঁটছেন ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে কাঁদছিল খাবারের জন্য, দুধের জন্য। তারা যেন কিছুই দেখছিল না, শুধুই এগিয়ে চলছিল পায়ে পায়ে। তাদের চোখে-মুখে এমন এক গভীর বেদনার ছাপ, যা আমাকে খুবই বিচলিত করে তুলেছিল।’

একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে রঘু রাই এভাবেই ছবির মাধ্যমে তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় চিত্রটিকে। একাত্তরে তার প্রতিটি ছবির পেছনেই খুঁজে পাওয়া যায় গণহত্যা, নির্যাতন আর মানুষের আর্তনাদের আরেক গল্প, যা ওই সময় নিয়মিত ছাপা হতো ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায়। মুক্তিযুদ্ধে তার তোলা ছবিগুলোই স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করতে অনন্য ভূমিকা রেখেছিল।

কেমন ছিল তার কর্মজীবন? রঘু রাইয়ের জন্ম ১৯৪২ সালে, পাঞ্জাবের ঝাংয়ে (বর্তমানে পাকিস্তানে)। তিনি ১৯৬২ সালে তার বড় ভাই আলোকচিত্রী এস পলের কাছে সর্বপ্রথম আলোকচিত্রের শিক্ষা নেন। অতঃপর ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পেশাদার জীবন শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে নয়াদিল্লিতে ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় আলোকচিত্রী হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময় ‘ইন্ডিয়া টুডে’সহ অন্য পত্রিকায়ও কাজ করেছেন।

পেশাগত জীবনে এই আলোকচিত্রী অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ছবি তোলেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র ছাড়াও তিনি ইন্দিরা গান্ধী, মাদার তেরেসা, দালাই লামা, সত্যজিৎ রায়সহ অনেক আলোচিত ও খ্যাতিমান ব্যক্তির ছবি তুলেছেন তিনি।

১৯৭২ সালে ভারত সরকার রঘু রাইকে দেশটির চতুর্থ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ দেয়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, বাংলাদেশি শরণার্থীদের দুর্দশা ও পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ নিয়ে অনবদ্য কাজের জন্য তাকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। রঘু রাইয়ের কাজ টাইম, লাইফ, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, নিউজউইক, দ্য নিউ ইয়র্কার-এর মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।

আলোকচিত্রী হিসেবে রেঞ্জফাইন্ডার, এসএলআর থেকে ডিএসএলআর ক্যামেরার বিবর্তনের তিন যুগজুড়েই ছিল রঘু রাইয়ের কাজ। তার সহকর্মী হয়েছেন তিন যুগের ফটোগ্রাফাররাই। ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখার অভ্যাস লুপ্তপ্রায় হতে চলছে; তবুও এ যুগের ফটোগ্রাফারদের কাছে ‘একাগ্রতা’ ও ‘মনোযোগ’-এর জন্য অনুকরণীয় ছিলেন রঘু রাই। তিনি একটি ছবির পেছনে যতখানি সময় দেওয়া দরকার, সেটাই দিতেন। আল্টিমেট ছবিটা না পাওয়া অবধি সময়ের সঙ্গে লড়ে যেতেন। এমন একেকটা মুহূর্ত খুঁজে বার করতেন, যা আজকের দিনের ফটোগ্রাফারদের পক্ষে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

ভারতীয় আলোকচিত্রী হলেও রঘু রাই ছিলেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এই আলোকচিত্রীর ছবিই আমাদের হৃদয়ে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তোলে। তাই তাকে ‘ক্যামেরার কবি’ও বলেন কেউ কেউ। গণমানুষের যুদ্ধকে ইতিহাসে ধরে রাখতেই মুক্তিযুদ্ধে রঘু রাইয়ের মতো আলোকচিত্রী এ দেশে কাজ করেছেন ক্যামেরা হাতে। তার তোলা সে ছবিগুলোই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলিল হয়ে থাকবে। এসব ছবির পেছনে আলোকচিত্রীর ইতিহাসও মিশে আছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে।

একটি ছবি অনেক কথা বলে, সময়ের অনেক ঘটনাকেই তুলে ধরে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আলোকচিত্রী রঘু রাই জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে ক্যামেরায় তুলে এনেছিলেন ইতিহাসকে। তাই এ দেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ইতিহাসের পাতা হয়তো হলুদ হয়ে যায়, কিন্তু রঘু রাইয়ের ফ্রেমবন্দি সেই চোখগুলো কখনো পুরনো হবে না। তারা তাকিয়ে থাকবে আমাদের দিকে, মনে করিয়ে দেবে কতটা ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা। তিনি কেবল একজন আলোকচিত্রী ছিলেন না, ছিলেন সময়ের এক নির্মোহ সাক্ষী এবং আমাদের অমোঘ বন্ধু। শরীরী অস্তিত্বে তিনি আজ না থাকলেও, বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণা আর মুক্ত বাতাসের স্পন্দনে তার ক্যামেরার সেই অমর মুহূর্তগুলো বেঁচে থাকবে চিরকাল। বিদায়, হে আলোক-তীর্থের যাত্রী; আমাদের ইতিহাসের অ্যালবামে আপনি অক্ষয় হয়ে রইলেন।

প্রখ্যাত আলোকচিত্রী রঘু রাই ২৬ এপ্রিল ভোরে দিল্লিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এবং ওই দিনই বিকেলে দিল্লির লোধি রোড শ্মশানে তার শেষকৃত্য হয়।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ২৭ এপ্রিল ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button