
সেই গ্রামে ২০০ বছরের পুরনো বটতলায় বসে কোটি টাকার সোনার হাট।
শ্রাবণ মাসের এক মেঘলা সকাল। আকাশের নীল ক্যানভাসে তখন মেঘ আর বৃষ্টির লুকোচুরি খেলা চলছে। চারপাশের সবুজ প্রকৃতি আর গ্রামীণ স্নিগ্ধতার স্বাদ নিতে নিতে আমি পা রাখি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায়।
এখানে আসার পেছনে কাজ করছিল এক অদ্ভুত কৌতূহল। লোকমুখে শুনেছিলাম এমন এক গ্রামের গল্প, যেখানে খনি ছাড়াই সোনা ফলে! গ্রামের সাধারণ ধুলোবালি আর ছাইয়ের ভেতরেই নাকি লুকিয়ে থাকে মূল্যবান এই ধাতু।
চারিগ্রাম নামের সেই জনপদে প্রতি সপ্তাহে সোনা কেনার জন্য দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন জহুরি আর ব্যবসায়ীরা। মূলত আমিনুল নামের এক স্থানীয় উদ্যোগী যুবকের কাছেই আমি প্রথম এই আশ্চর্য গ্রামের সন্ধান পাই।
দিনটি ছিল সোমবার, আর এই সোম ও শুক্রবারেই চারিগ্রাম বাজারে বসে সোনার বিশাল এক হাট। সেই হাটের রহস্যভেদে আমি যখন বাজারে পৌঁছাই, তখন সেখানে চোখে পড়ে প্রাচীন এক বটগাছ। এই গাছটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে জুয়েলারির শতাধিক ছোট ছোট দোকান।
বর্তমানে দোকানগুলো পাকা দালানে রূপ নিলেও বটের ছায়ায় এই বিকিকিনি চলছে প্রায় ২০০ বছর আগে থেকে। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই ব্যবসা এখন মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
এই গ্রাম্য হাটে এত বিপুল পরিমাণ সোনা ঠিক কোথা থেকে আসে, তা জানতে আলাপ জমাই চারিগ্রাম জুয়েলারি মালিক সমিতির সভাপতি ফরিদ হোসেন দেওয়ানের সঙ্গে।
তিনি জানালেন, তাদের পরিবার এখানে পাঁচ পুরুষ ধরে সোনার ব্যবসায় জড়িত। এখানকার ব্যবসার ধরনটি সারা দেশের চেয়ে আলাদা এবং চমকপ্রদ। মূলত সারা দেশের সোনার গয়না তৈরির দোকানগুলোতে যেসব পরিত্যক্ত ছাই বা জুয়েলারি ওয়েস্ট জমে থাকে, সেগুলোই সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন এই উপজেলার চারিগ্রাম ও গোবিন্দল গ্রামের মানুষ।
এই ছাই থেকেই এক বিশেষ পদ্ধতিতে সোনা বের করা হয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘ছালি ব্যবসা’ নামে পরিচিত। এমন ক্ষুদ্র অথচ বিস্ময়কর শিল্পের ওপর নির্ভর করেই বেঁচে আছে এ অঞ্চলের প্রায় ৪ হাজার পরিবার।
শুধু সোনাই নয়, এই ছাই থেকে রুপা, তামা, সিসা ও ব্রোঞ্জও সংগ্রহ করা হয়, যা পরে চারিগ্রাম বাজারের দোকানগুলোতে কেনাবেচা হয়। এখানকার সোনার গুণগত মান যেমন নিখুঁত, তেমনি দামও তুলনামূলকভাবে কিছুটা সস্তা হওয়ায় সারা দেশে এর বেশ চাহিদা রয়েছে।
ছাই থেকে সোনা বের করার এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য এবং নিপুণ কারিগরি দক্ষতার দাবি রাখে। প্রথমে বিভিন্ন দোকান থেকে সংগ্রহ করা ছাই একটি সূক্ষ্ম চালনি দিয়ে খুব ভালো করে ছেঁকে নেওয়া হয়। এরপর সেই পরিষ্কার ছাই ঢেঁকিতে ছেঁটে পানির সঙ্গে মিশিয়ে ছোট ছোট পিণ্ড বা গোল গোল বল তৈরি করা হয়।
কারিগররা পরম মমতায় এই পিণ্ডগুলোকে রোদে শুকিয়ে নেন। শুকানো শেষ হলে শুরু হয় আগুনের পরীক্ষা। উচ্চমাত্রার তাপে যখন সেই পিণ্ডগুলোকে পোড়ানো হয়, তখন ছাইয়ের ভেতর থাকা ময়লাগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং ধাতব অংশগুলো একত্রিত হয়ে অবশিষ্ট থাকে।
এরপর সেই গলিত পদার্থকে মাটিতে গর্ত করে চুন ও ধানের তুষ দিয়ে পুড়িয়ে সিসা বের করে আনা হয়। সবশেষে অবশিষ্ট অংশ থেকে নাইট্রিক অ্যাসিড এবং বিশেষ কিছু রাসায়নিক মিশিয়ে আলাদা করা হয় ঝকঝকে সোনা ও রুপা। এভাবেই ধৈর্য ও দক্ষতার সমন্বয়ে ধুলোবালি থেকে মহার্ঘ ধাতু উদ্ধার করেন ছালি ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই শিল্পটি যেমন লাভজনক, তেমনি এতে ঝুঁকিও কম নয়। কারণ ছাই কেনার ওপর ভিত্তি করেই ভাগ্য নির্ধারিত হয়। অনেক সময় চড়া দামে ছাই কিনলেও তাতে আশানুরূপ সোনা মেলে না। অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের মতে, এটি একদিকে যেমন দক্ষতার কাজ, অন্যদিকে তেমনি ভাগ্যেরও ব্যাপার।
সাধারণ সময়ে এই বাজারে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকার সোনা লেনদেন হয়। তবে ভাদ্র ও চৈত্র মাসে যখন ব্যবসার ভরা মৌসুম থাকে, তখন দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ এক কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যায়।
এত বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি আজ নানামুখী সংকটের সম্মুখীন। মূলধনের স্বল্পতা এবং দূর-দূরান্ত থেকে ছাই বা ধাতু আনা-নেওয়ার পথে নিরাপত্তার অভাব ব্যবসায়ীদের ভাবিয়ে তোলে।
স্থানীয়দের মতে, যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা যায়, তবে এই ছাই থেকে সোনা সংগ্রহের শিল্পটি আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।
সিংগাইরের এই নিভৃত গ্রামের কারিগররা তাদের হাতের জাদুতে ছাইকে সোনায় রূপান্তর করছেন বছরের পর বছর ধরে। তাদের এই শ্রম আর ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন যথাযথ যতœ ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
ফেরার পথে মনে হলো, চারিগ্রামের এই মানুষগুলো কেবল সোনা বের করেন না, তারা তাদের পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া অনন্য এক ইতিহাসকেও পরম যত্নে আগলে রাখছেন।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১০ মে ২০২৬
© 2026, https:.




