মুক্তিযুদ্ধ

বিবস্ত্র মেয়েদের শরীর আমাদের কাপড়ে জড়িয়ে দিই: মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ

ক্ষতচিহ্নের গদ্য: পর্ব ২০

পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়ার ফলে ফরিদ মিয়ার ডান পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়।

শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন পাক হানাদারদের ছোড়া ২৮টি বুলেটের ক্ষতচিহ্ন। দীর্ঘ ৫৩ বছর ধরে একটি হুইলচেয়ারই তার নিত্যসঙ্গী। বর্তমানে জীবন কাটে অন্যের কাঁধে চড়ে কিংবা হুইলচেয়ারের চাকায় ভর করে।

এই বীরের নাম মো. ফরিদ মিয়া। তিনি ১৯৭১ সালে ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে সরাসরি রণাঙ্গনে লড়াই করেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় এক সম্মুখযুদ্ধে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। মাথার খুলি থেকে শুরু করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে আঘাত হানে পাকিস্তানি সেনাদের ২৮টি বুলেট। গোলার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় তার বাঁ পা, যা পরবর্তীকালে হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়।

দীর্ঘ আড়াই বছর সারা শরীর প্লাস্টারে মোড়ানো ছিল তার, বসানো হয়েছিল কৃত্রিম পাত। এক নিভৃত সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার রামপুর গ্রামে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার মুখোমুখি হয়ে শোনা গেল একাত্তরের সেই অবিনাশী উপাখ্যান।

কথোপকথনের শুরুতেই যখন সৌজন্যবশত তার কুশলাদি জানতে চাওয়া হয়, তখন দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে ফুটে ওঠে এক যুদ্ধাহত যোদ্ধার করুণ বাস্তব। ফরিদ মিয়া বলেন, “এতো বছর ধরে এই একভাবে বসা। প্রস্রাব করি গ্যালনে। বাথরুমে যেতে হলেও আমাকে অন্যের কোলে চড়তে হয়। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারি না। সবখানে অন্যের সাহায্য নিয়ে বসতে হয়। এভাবেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে জীবন।”

তার এই স্বীকারোক্তি মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দেয় চারপাশ। মুখপানে তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায়, স্বাধীনতার মূল্য তিনি কতখানি চড়া দামে চুকিয়েছেন। ১৯৭১ সালে ফরিদ মিয়া ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন তরুণ সিপাহি। যুদ্ধের প্রাক্কালে তার পোস্টিং ছিল চট্টগ্রাম সেনানিবাসে।

সেই দিনগুলোর কথা মনে করে তিনি জানান, ব্যারাকের ভেতরে তখন বাঙালির জন্য পরিবেশ ছিল গুমোট। পাকিস্তানি সৈন্যরা সবসময় বাঙালিদের আক্রোশের চোখে দেখত। উচ্চতায় বাঙালিরা তাদের চেয়ে কিছুটা ‘খাটো’ ছিল বলে প্রায়ই তারা তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও কটূক্তি করত। তবে বাঙালি সৈন্যরা সব অপমান মুখ বুজে সহ্য করতেন এবং নিজেরা সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকার চেষ্টা করতেন।

২৫ মার্চ রাতে যখন ঢাকা শহর রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পরিস্থিতিও হয়ে ওঠে বিভীষিকাময়। ফরিদ মিয়ার স্মৃতিতে সেই রাতটি আজও উজ্জ্বল। তিনি বলেন, “২৪ মার্চ ১৯৭১। সন্ধ্যা ৭টা। আমরা তখন ব্যারাকে ছিলাম। হঠাৎ আমাদের রুল কল করা হলো এবং নির্দেশ দেওয়া হলো সব অস্ত্র জমা দেওয়ার। তখনই মনে একটা খটকা লেগেছিল। কিন্তু কী ভয়াবহতা অপেক্ষা করছে, তা বুঝতে পারিনি। মধ্যরাতে শুনতে পাই চারপাশ থেকে ফিসফিস শব্দ। ব্যারাকের বাইরে অসংখ্য মানুষের গলার স্বর। হঠাৎ বিকট এক শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল এবং মুহূর্তেই বিদ্যুৎ চলে গেল। শুরু হলো নারকীয় গোলাগুলি। ঘুমন্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়লেন বহু বাঙালি সৈন্য। আমার পাশেই ছিলেন প্লাটুন কমান্ডার ফজলুল হক, যার বাড়ি ছিল চট্টগ্রামে। তিনি ওই এলাকার সব পথঘাট চিনতেন। আমরা কয়েকজন তার পিছু নিলাম। জানালার গ্রিল ভেঙে ব্যারাকের পাশের ড্রেন দিয়ে কোনোমতে বাইরে বেরিয়ে আসি। এর মাধ্যমেই শুরু হয় আমার রণাঙ্গনের যাত্রা।”

স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে কথা উঠলে তিনি জানান, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাটি তারা রেডিওর মাধ্যমে শুনতে পান। সেনা বাহিনীর সদস্য হিসেবে সেই মুহূর্তে ওই ঘোষণাটি তাদের কাছে ছিল গুরুত্বপূর্ণ এবং এতেই তাদের লড়াই করার মনোবল বেড়ে যায়।

কিন্তু কোন সেই অপারেশন, যা ফরিদ মিয়ার জীবনকে চিরতরে হুইলচেয়ারে বন্দি করে দিল? প্রশ্নটি শুনেই তিনি খানিকটা আনমনা হয়ে পড়েন। একটি সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে ধীরস্থিরভাবে ফিরে যান একাত্তরের সেই রক্তঝরা ২০ ও ২১ অক্টোবরে। ফরিদ মিয়ার ভাষায়, “আমরা তখন বেনুপুর ক্যাম্পে অবস্থান করছি। আমাদের কমান্ডে ছিলেন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হুমায়ুন কবির। ১৭ অক্টোবর ১৯৭১। আমরা কসবার তারাপুর রেললাইনের পাশে শক্তিশালী ডিফেন্স গড়ে তুলি। আশপাশের কয়েকটি গ্রামেও আমাদের অবস্থান ছিল। সব মিলিয়ে আমরা ছিলাম ২৫০ জন যোদ্ধা।”

“২০ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নির্দেশ আসে পুরান বাজার ও নতুন বাজারসহ পুরো কসবা এলাকায় একযোগে অ্যাটাক করার। আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় ভারতীয় সেনারা। পরদিন ২১ অক্টোবর রাত ২টা। তখন পবিত্র রমজান মাস। সেহরি খেয়ে আমরা সামনে এগোতে শুরু করি। আমাদের পেছনের বাংকারগুলোতে পজিশন নেয় ইন্ডিয়ান আর্মি। ওই সময় আমার প্রচণ্ড জ্বর ছিল, তাই আমাকে দেওয়া হয়েছিল ওয়্যারলেস অপারেটরের দায়িত্ব। বড় বড় ঘাস মাড়িয়ে আমরা কৌশলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের একদম কাছাকাছি পৌঁছে যাই।”

পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোরের দিকে ভারতীয় সেনাদের আর্টিলারি শেলিং করার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ফরিদ মিয়ারা জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি সেনাদের বাংকারগুলো দখল করে নেন। সেই বাংকারগুলোতে প্রবেশ করতেই তারা এক ভয়াবহ দৃশ্যের সম্মুখীন হন। ফরিদ মিয়া সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শিউরে ওঠেন, “প্রায় প্রতিটি বাংকারেই আমরা দেখতে পাই বাঙালি তরুণীদের। তারা যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন, সেজন্য তাদের সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে রাখা হয়েছিল। প্রত্যেকের শরীর ছিল ক্ষতবিক্ষত আর পাশবিক নির্যাতনের চিহ্ন। আমাদের সঙ্গে থাকা সাদা কাপড় দিয়ে পরম মমতায় আমরা সেই বোনদের শরীর জড়িয়ে দেই।”

ততক্ষণে পাকিস্তানি সেনারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে পাল্টা প্রতিরোধ শুরু করেছে। মুক্তিযোদ্ধারাও প্রায় ৫০০ গজ সামনে এগিয়ে যান। এরই মধ্যে ভারতীয় সেনাদের আর্টিলারি শেলিং থেমে যায়। সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ শুরু করে। পেছনের বাংকারে থাকা মিত্রবাহিনীর শত শত সৈন্য তখন সেই গোলার আঘাতে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।

“চারপাশ থেকে বৃষ্টির মতো গুলি আসছিল। আমাদের নিজস্ব আর্টিলারি ছিল কোনাবনে। ওয়্যারলেসে সেখান থেকে সাহায্যের জন্য বারবার অনুরোধ জানাচ্ছিলাম। কিন্তু সাহায্য আসার আগেই চোখের সামনে আমার ২৬ জন সহযোদ্ধা শহীদ হন।”

ফরিদ মিয়া তখন শোক ভুলে সহযোদ্ধাদের রক্তাক্ত লাশগুলো সরিয়ে নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই দূর থেকে আসা একটি ব্রাশফায়ার তার শরীর ঝাঁঝরা করে দেয়। তিনি বলেন, “হঠাৎ আমি ছিটকে পড়লাম। শরীর নাড়ানোর শক্তি ছিল না, তবে জ্ঞান হারাইনি। সহযোদ্ধারা তুলা ভিজিয়ে আমার মুখে জল দিচ্ছিলেন। এরপর একটি দরজার পাল্লাকে স্ট্রেচার বানিয়ে তারা আমাকে ধরাধরি করে কমলাসাগরের কাছে নিয়ে যান।”

“সেখানে আমাদের সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ উপস্থিত ছিলেন। তিনি নির্দেশ দিলেন, ফরিদকে দ্রুত আমার গাড়িতে উঠাও। ঠিক তখনই একটি শত্রুশেল এসে আমাদের সামনেই বিস্ফোরিত হয়। বিকট শব্দে স্প্লিন্টার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একটি স্প্লিন্টার সরাসরি খালেদ মোশাররফ স্যারের মাথায় আঘাত করে। এরপর আমি আর কিছুই মনে করতে পারি না।”

দেশ যখন স্বাধীন হলো, ফরিদ মিয়া তখন ভারতের পুনা সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন। তার সারা শরীর ছিল প্লাস্টারে মোড়ানো। যন্ত্রণায় কাতর হয়ে দিনরাত ‘মা মা’ বলে চিৎকার করতেন। তার মনে তখন একটাই হাহাকার- কবে ফিরবেন স্বাধীন স্বদেশে!

আজ যুদ্ধাহত এই বীরের চোখে আগামীর স্বপ্ন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, নতুন প্রজন্ম এই দেশকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাবে। তার শেষ আকুতি কেবল এটুকুই, “দেশের প্রতি ভালোবাসার বোধটুকু থাকলেই এই জাতি সমৃদ্ধ হবে। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি দেশ স্বাধীন করে, এখন পরবর্তী প্রজন্মের দায়িত্ব এই স্বাধীন দেশটাকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করা। তবেই আমাদের এই ত্যাগ আর স্বাধীনতা সার্থক হবে।”

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ২৭ মার্চ ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button