মুক্তিযুদ্ধ

মোংলা বন্দরে হামলা

আমরা তখন ভারতের টাকিতে, ত্বকীপুর ইয়ুথ ক্যাম্পে। আটজন বাঙালি সাবমেরিনার ফ্রান্স থেকে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে চলে আসেন ভারতে। ভারতীয় নৌবাহিনীর সহযোগিতায় তারা সমন্বিত একটি দল গঠন করার উদ্যোগ নেন। ১২ মে, ১৯৭১। ক্যাম্পে তখন পাঁচ হাজারের মতো যুবক। সবাইকে ফল-ইন করিয়ে তারা ১২০ জনকে সিলেক্ট করে। শারীরিক গঠন আর সাঁতার জানা ছিল মাপকাঠি। বাড়ির একমাত্র ছেলে হলেই আনফিট করে দেওয়া হতো। নদীর পাড়ের ছেলেরা টিকে যায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যায়। সে হিসেবে আমাকেও তারা নিয়ে নেয়।

টাকি থেকে প্রথমে কল্যাণী এবং পরে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় পলাশীতে। ভাগীরতি নদীর তীরে জঙ্গল পরিষ্কার করে আমরা ক্যাম্প করি। এরপর শুরু হয় ট্রেনিং। প্রথমে শপথ নিই ‘দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করে আমি স্বেচ্ছায় এ আত্মঘাতী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি।’ ট্রেনিংয়ে ভারতীয় নৌবাহিনী আমাদের শেখায় বিশেষ ধরনের সাঁতার। পানির নিচে শরীর এবং ওপরে নাক-চোখ ভাসিয়ে সাঁতার দিতে হতো। এ পদ্ধতিতে সাঁতার কেটে নিঃশব্দে যেকোনো মানুষের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া যেত। সবচেয়ে কঠিন ছিল পানির নিচ দিয়ে সাঁতরে গিয়ে জাহাজে মাইন-অ্যাসেম্বল সেট করা। নৌবাহিনীর তিন বছরের ট্রেনিং আমরা নিই তিন মাসে। আমার নৌ-কমান্ডো নম্বর ছিল ০০৬০। ট্রেনিং চলাকালে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান, বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও কর্নেল এমএজি ওসমানী সাহেব এসেছিলেন।

প্রশিক্ষণ শেষে পরিকল্পনা হয় চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে একই দিনে একই সময়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর। সমন্বিত এ আক্রমণের নাম অপারেশন জ্যাকপট।

একাত্তরের কথা এভাবেই তুলে ধরেন বীর মুক্তিযোদ্ধা নৌ-কমান্ডো মো. খলিলুর রহমান। আয়জুদ্দিন ও ওয়ালিউর নেছার সপ্তম সন্তান খলিলুর রহমান। বাড়ি সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার ভাতশালা গ্রামে। তার মুখেই শুনি মোংলা অপারেশনের কথা।

তিনি বলেন আমরা নৌ-কমান্ডো। যোদ্ধা ছিলাম ১৬০ জন। চট্টগ্রামের জন্য ৬০, মোংলার জন্য ৬০, চাঁদপুরের জন্য ২০ ও নারায়ণগঞ্জের জন্য ২০ জন করে চারটি গ্রুপ গঠন করা হয়। আমি ছিলাম মোংলা বন্দরের গ্রুপে। কমান্ডার ছিলেন প্রয়াত আহসান উল্লাহ বীরপ্রতীক।

৭ আগস্ট, ১৯৭১। ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে আমাদের নেওয়া হয় ব্যারাকপুর ক্যাম্পে। গঙ্গায় নামিয়ে একটি জাহাজ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। পরে ক্যানিং থেকে দেশি নৌকায় রায়মঙ্গল নদী পার হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনের ভেতর কৈখালি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পৌঁছি। ক্যাম্প কমান্ডার ছিলেন জর্জ মার্টিস, লেফটেন্যান্ট কফিল। প্র্যাকটিসের জন্যই স্থলপথে না নিয়ে ভয়াল নদী পথে আমাদের নিয়ে আসা হয়।

সমুদ্রের পাশ দিয়ে হেঁটে সুন্দরবনের ভেতর প্রথমে উঠি কালাবগি নামের গ্রামে। পরে ক্যাম্প গড়ি সুতারখালিতে। অপারেশনের জন্য ২০ জনের তিনটি দলে ভাগ হই। দল তিনটির নেতা মজিবর রহমান, আফতাব উদ্দিন এবং আমি। আমাদের সাপোর্টের জন্য আসে ২০ জন গেরিলা। তাদের কমান্ডার ছিলেন খিজির আলী বীরবিক্রম। আমরা নির্দেশের অপেক্ষায় থাকি।

বলা ছিল, চারটি বন্দরে আক্রমণের জন্য সবকটি গ্রুপকে একসঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হবে। কীভাবে? এর জন্য প্রত্যেক গ্রুপকে দেওয়া হয় একটি করে রেডিও। বলা হয় তোমরা ১৩ আগস্ট থেকে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে আকাশবাণী ‘খ’ কেন্দ্র শুনবে। যেকোনো দিন পঙ্কজ মল্লিকের কণ্ঠে তোমাদের একটা গান শোনানো হবে ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান…।’ এ গান শুনলেই বুঝতে হবে প্রস্তুতির নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এর ২৪ ঘণ্টা বা তারও পরে শোনানো হবে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে একটি গান ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ^শুর বাড়ি…।’ এ গান শুনলে ওইদিনই টার্গেটে হিট করতে হবে।

১৩ আগস্ট রেডিওতে আমরা প্রথম গানটি শুনলাম। কিন্তু দ্বিতীয় গানটি শোনানো হলো ৪৮ ঘণ্টা পর অর্থাৎ ১৫ আগস্ট সকালে। টিম লিডার আহসান উল্লাহ সাহেব সবাইকে ডেকে নির্দেশ দিলেন হিট করার। প্রস্তুত হয়ে নিলাম। সাঁতার কাটার জন্য পায়ে শুধু ফিনস এবং গায়ে সুইমিং কস্টিউম। গামছা দিয়ে শরীরে পেঁচিয়ে নিলাম মাইনটি। জাহাজের গায়ে মাইন লাগানোর জন্য সঙ্গে ছিল একটি ড্যাগার।

গেরিলারা রেকি করে আসে দিনের বেলায়। ওইদিন সন্ধ্যার পরই আমাদের শপথ করানো হলো ‘আমরা সবাই ভাই ভাই। দেশের জন্য জীবন দিতেও দ্বিধা করব না। কাউকে বিপদে ফেলব না এবং বিপদ দেখে সরে পরব না।’

রাতে নৌকায় করে রওনা হলাম। স্রোত ছিল প্রতিকূলে। ফলে ভোরের দিকে পৌঁছলাম মোংলা বন্দরের অন্য তীরে, বানিয়াশান্তা গ্রামে। আমরা অবস্থান নিই বেড়িবাঁধের নিচে। কথা ছিল মধ্যরাতে অপারেশন করার। কিন্তু তা হলো না। তখন সূর্য উঠছে। শরীরে সরিষার তেল মেখে কস্টিউম পরে নিই। বুকে মাইন বেঁধে পানিতে নেমে দিবালোকেই অপারেশন করি। মোংলা বন্দরের জাহাজগুলোতে মাইন লাগিয়ে যে যার মতো সরে পড়ি। পানির ওপরে তখন পাকিস্তানিদের গানবোট। সকাল তখন ৯টার মতো। একে একে বিস্ফোরিত হতে থাকে মাইনগুলো। এটাই ছিল অপারেশন জ্যাকপট। এ অপারেশনে চারটি বন্দরের ২৬টি জাহাজ আমরা ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলাম।

অপারেশনের পর সরে যেতে গিয়ে ধরা পড়েন নৌ-কমান্ডো খলিলুর রহমান। সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘১৮ আগস্ট ১৯৭১। অপারেশন জ্যাকপট শেষে ফেরার পথে সাতক্ষীরার বুদহাটাতে আমরা সাতজন পাকিস্তানি সেনাদের অ্যামবুশের মুখে পড়ি। নদীপথে নৌকা দিয়ে যাচ্ছিলাম। সবাই খুব ক্লান্ত। একজন পাহারা দিলে বাকিরা ঘুমাত। রাত ১টা। পাহারার দায়িত্ব ছিল মোহসিনের। হঠাৎ চারদিকে গুলির শব্দ। নৌকার ওপর লাইট মেরে পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছুড়ছে। আমাদের না জাগিয়েই মোহসিন প্রাণ বাঁচাতে সাঁতরে পালিয়ে গেল। চোখ খুলে দেখি, চারপাশ থেকে শুধু গুলি আসছে। প্রত্যেকের হাতেই একটা করে এসএমজি আর দুটো করে ম্যাগাজিন। এসএমজি দিয়ে মাত্র ২৫ গজ দূরে আঘাত করা যায়। আমরা পেরে উঠলাম না। ওখানেই আফতাব উদ্দিন ও সাতক্ষীরার কাটিয়া গ্রামের সিরাজুল ইসলাম মারা যায়। ডাঙ্গায় ওঠার আগেই আমরা অস্ত্র ফেলে দিই। বন্দি হই আমিসহ মুজিবর রহমান, ইমাম বারি ও ইমদাদুল হক। ওরা বুঝে যায় আমরা মুক্তিযোদ্ধা। ধরে নিয়ে শুরু করে নির্মম টর্চার।

তিনি বলেন, চোখ বেঁধে, সারা শরীরে রড দিয়ে পেটাত ওরা। প্রচন্ড যন্ত্রণায় কোমর পর্যন্ত অবশ হয়ে যায়। ওদের আঘাতে আমার সামনের সব দাঁত ভাঙা। একদিন ইটের খোয়ার রাস্তায় জিপ গাড়ির সঙ্গে পা বেঁধে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। পেটের চামড়া উঠে গিয়ে রক্ত পড়ছিল। মা-গো, বাবা-গো বলে চিৎকার করছিলাম। উত্তেজিত হয়ে তারা প্রায়ই বেয়নেট দিয়ে শরীরে খোঁচা দিত।

এরপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় সাতক্ষীরায়, ডায়মন্ড হোটেলে। সেখানে প্রতিরাতে শুনতাম মেয়েদের আর্তচিৎকার। একদিন কবর খুঁড়ে সেখানে নিয়ে গিয়ে ওরা বলে, মুখ খোল, না হলে এখনই মেরে ফেলব। আমরা তবু মুখ খুলিনি। পরে নিয়ে যাওয়া হয় যশোর ক্যান্টনমেন্টে। সেখান থেকেই কৌশলে ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে আসি।

নৌ-কমান্ডো খলিলুর রহমান এখন প্রয়াত। কিন্তু তার বলা কথা বর্তমান প্রজন্মের কাছে ইতিহাস হয়ে থাকবে। প্রজন্মের প্রতি আশা নিয়ে তিনি বললেন আমরা একটা ভৌগোলিক কাঠামো, পতাকা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশটাকে অর্থনৈতিকভাবে তোমাদেরই সমৃদ্ধ করতে হবে। তোমরা ত্যাগী, সাহসী আর প্রতিবাদী হইও। শুধু নিজের চিন্তা করে দেশ ত্যাগ করো না। ভালোবেসে নিজের দেশের পাশে থেকো।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক দেশ রূপান্তরে, প্রকাশকাল: ৯ ডিসেম্বর ২০২২

© 2022, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button