মুক্তিযুদ্ধ

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে একাত্তরের রণাঙ্গনে

একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালিদের অর্ধেককেই বিশ্বাস করা যেত না অনেক বাঙালিই মনেপ্রাণে ছিল পাকিস্তানি মনোভাবাপন্ন

“নয় মাস ট্রেনিং শেষে আমার পোস্টিং হয় কুমিল্লা সেনানিবাসে। পাকিস্তানি কর্নেল ইয়াকুব মালেক ছিলেন কমান্ডিং অফিসার। ছিলাম ফিফটি থ্রি ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারির সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট।

আমাদের ইউনিটে সবাই ছিল পাকিস্তানি। মাত্র ৪ জন ছিলাম বাঙালি অফিসার— আমি, ক্যাপ্টেন জামান, ক্যাপ্টেন নুরুল ইসলাম আর ক্যাপ্টেন সিদ্দিকী।

একাত্তরের জানুয়ারি মাস। একদিন অফিসে বসে আছি। পাকিস্তান থেকে একটা ফ্যাক্স আসে। ফ্যাক্সের নির্দেশটি ছিল এমন— ‘আসন্ন সংঘর্ষে যেসকল পাকিস্তানি সৈন্য মারা যাবে তাদেরকে পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতেই দাফন করতে হবে।’

মনে একটা খটকা লাগল। এমন কি হতে যাচ্ছে যে পাকিস্তানি সৈন্যরা মারা যাবে। ভেবে নিই ওরা খারাপ কিছু ঘটাবে।

৭ মার্চের পর বাংলাদেশের একটি পতাকা উড়িয়ে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিল একটি ট্রাক। পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন ইফতেখার কুমিল্লা সেনানিবাসের রাস্তায় ট্রাকটি আটক করে। এর পর পতাকাটি ছিড়ে নিয়ে আসে।

ফ্ল্যাগটা এনে আমার টেবিলে ছুড়ে দিয়ে বলেন— ‘এই যে তোমার বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ। কত বড় সাহস ফ্ল্যাগ উড়িয়ে তারা ট্রাকে চট্টগ্রাম যাচ্ছে।’

ওই দিনই ফাস্ট মানচিত্রখচিত বাংলাদেশের পতাকাটা দেখি। ক্যাপ্টেন চলে গেলে পাতাকাটি খানিক হাত বুলিয়ে ভাজ করে যত্নের সঙ্গে রেখে দিই ড্রয়ারে।

সত্তরের নির্বাচনের পর সারাদেশে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলন জোরালো হতে থাকলে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে রসদ সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায়। বাঙালি হওয়ায় তখন ওরা আমাদেরকে নানা কথা বলে বিদ্রুপ করত। নানাভাবে হুমকিও দিত। সব কিছুই সহ্য করেছি তখন।

২৫ মার্চ ১৯৭১। রাত তখন দশটা। মিটিং ডাকলেন অধিনায়ক ইয়াকুব মালেক। খুব রেগে ছিলেন তিনি। মিটিংয়ে বললেন, ‘পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান দুই জায়গায়ই কার্ফু জারি করা হয়েছে। ভুট্টো ও মুজিব দুজনকেই অ্যারেস্ট করা হচ্ছে। তোমরা যাও কুমিল্লা শহরে। সেখানে যাদের বাইরে দেখবে তাদেরকেই গুলি করবে। কুমিল্লা শহর যেন লাশে ভরপুর হয়ে যায়। তা হলে আগামীকালই দেশটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।’

পাকিস্তানি প্রায় ২২ জন অফিসার অস্ত্র ও ফোর্স নিয়ে নির্দেশমতো বেড়িয়ে পড়ল। অধিনায়ক আমাদেরকে বললেন, ‘তোমরা পাশের রুমে গিয়ে বসো।’

গুলিবিদ্ধ হয়েও কীভাবে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালালেন ইমাম উজ-জামান

বলেই চারজনকে একটা রুমে আটকে রাখল। সঙ্গে বাঙালি ক্যাপ্টেন জামানও ছিলেন। তিনি বারবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন অধিনায়কের সঙ্গে কথা বলার। অধিনায়ক আসলে জামান বলেন, ‘স্যার, আমাকে বিশ্বাস করেন। এই এলাকার আওয়ামী লীগের লিডাররা কোন কোন জায়গায় লুকিয়ে আছে, কোন কোন জায়গায় হিন্দু লোকজন আছে— আমি আপনাদেরকে সঠিক গাইডেন্স দিয়ে নিয়ে যেতে পারব।’ তার কথায় অধিনায়ক আশ্বস্ত হন।

কুমিল্লা শহরে ক্যাপ্টেন ইফতেখার তখন পুলিশ লাইনে অ্যাটাক করেছে। অস্ত্র নিয়ে তিনি জামানকে তার সঙ্গে জয়েন করতে বললেন। বাঙালি হয়েও ক্যাপ্টেন জামান পুরো নয় মাস পাকিস্তানিদের সঙ্গে বাঙালি নিধনে কাজ করেছে। কসবাতে থাকাকালীন খালেদ মোশাররফ সাহেব তাকে একটা চিঠি লিখে পাঠান। লেখা ছিল— ‘তুমি মুক্তিবাহিনীতে আসো। আমরা তোমাকে গ্রহণ করব।’

জামান উল্টো চিঠি লিখে খালেদ মোশাররফকে ম্যাসেজ পাঠায়— ‘ইয়াহিয়া খান সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন আপনি এসে আমাদের এখানে আত্মসমর্পণ করেন।’

একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের অর্ধেককেই বিশ্বাস করা যেত না। অনেক বাঙালিই মনেপ্রাণে ছিল পাকিস্তানি মনোভাবাপন্ন।”

একাত্তরের নানা ঘটনার কথা এভাবেই তুলে ধরেন বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ইমাম উজ-জামান। এক সন্ধ্যায় তার বাড়িতে বসেই আলাপ চলে যুদ্ধদিনের নানা ঘটনা প্রসঙ্গে।

ডা. মোসাদ্দের আলী চৌধুরী ও মাহমুদুন্নেছা বেগমের ছোট সন্তান ইমাম উজ-জামান। তাদের বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার উজানঢাকি গ্রামে।

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ফিফটি থ্রি ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারির এই অফিসেই একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত আটকে রাখা হয় ইমাম উজ-জামানসহ বাঙালি অফিসারদের |ছবি: ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে সংগৃহীত

ইমামের লেখাপড়ায় হাতেখড়ি চট্টগ্রামের সেন্ট মেরী স্কুলে। দুবছর পড়ার পর তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের মারিতে এক বোডিং স্কুলে পাঠানো হয়। পরে এসে চট্টগ্রামে সেন্ট প্লাসিড স্কুলে ভর্তি হন, ক্লাস ফোরে। ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে চান্স পেয়ে ভর্তি হন ক্লাস সেভেনে। অতঃপর ১৯৬৭ সালে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর অনার্সে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেমিস্ট্রি বিভাগে। পরে যোগ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে।

সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কারণ কী ছিল?

এমন প্রশ্নের উত্তরে স্কুল জীবনের একটি ঘটনার কথা তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “পশ্চিম পাকিস্তানে বোডিং স্কুলটিতে আমি ছিলাম একমাত্র বাঙালি। প্রায় এক হাজার ছাত্র কিন্তু আমার কোনো বন্ধু ছিল না। তারা আমাকে বাঙাল বাঙাল বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত। একদিন এক পাঠান ছেলে খারাপ ভাষায় বাঙাল বলে গালি দেয়। ওটা সহ্য করতে পারি না। টিচারকে গিয়ে কমপ্লিন করলাম। শুনে তিনি হেসে বললেন, ‘তুমি তো বাঙালিই। তোমাকে তো ওটা বলেই ডাকবে।’

খুব কষ্ট পেলাম। মনে হলো বাঙালি হওয়াটাই যেন পাপ। ওই বয়সে পাকিস্তানিদের ওমন অবহেলা আর বঞ্চনাই মনে দাগ কেটে যায়। ওদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার স্বপ্নবীজটি তখনই হয়তো রোপিত হয়েছিল। বাঙালির অবস্থান শক্ত করতেই ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে যোগ দিয়েছিলাম পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে।’

বীর বিক্রম ইমাম উজ-জামানের ডান হাতের কবজিতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্ন, ছবি: সালেক খোকন

ট্রেনিং করতে গিয়ে কি কোনো বৈষম্য টের পেয়েছিলেন?

ইমাম উজ-জামান বলেন, “ট্রেনিং হয় পাকিস্তানি মিলিটারি একাডেমি কাকুলে। বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং রেজাল্ট ভালো করে উপরের দিকে যেতে হবে— এমন চিন্তা শুরু থেকেই ছিল। এ কারণেই ট্রেনিংয়ে ওরা বৈষম্য করার সুযোগ পায়নি। কারণ আমরা খুব ভালো রেজাল্ট করেছিলাম। ১৮০ জনের মধ্যে ফার্স্ট, সেকেন্ড ও ফোর্থ পজিশন বাঙালিরাই নিয়ে নিই। জেনারেল ইব্রাহীম হয় ফার্স্ট, জেনারেল হারুন সেকেন্ড আর আমি হই ফোর্থ। আমার আর্মি নম্বর ছিল- বিএ-৫৭০।”

আলাপচারিতায় ফিরে আসি একাত্তরে।

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ২৫ মার্চে আটকের পর কী ঘটেছিল বাঙালি অফিসারদের ভাগ্যে, কীভাবে পালিয়ে যান ইমাম উজ-জামান?

তিনি বললেন যেভাবে, “২৫ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত আমাদেরকে বন্দী করেই রাখা হয়। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ঢুকলেই রাস্তার পাশে একটা অফিস পড়ে, ছোট্ট পাহাড়ের ওপরে। ওটাই ছিল ফিফটি থ্রি ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারীর অফিস। কোয়ার্টার মাস্টার ক্যাপ্টেন বোখারীর রুমে আটকে রাখা হয় আমাদের। অধিনায়কের পাশে সুবেদার মেজরের একটা রুম ছিল। ২৬ মার্চ সকালে ডিসি (এসডিও) ও এসপিকে সেখানে এনে আটকে রাখা হয়।

৩০ মার্চ বিকেল ৪ টার দিকে হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ। ওরা বাঙালি সেনা সদস্যদের মারছিল। বিকেলের দিকে এক ক্যাপ্টেন অস্ত্র নিয়ে আটক ডিসি ও এসপির রুমের দিকে যায়। এর পরই দুটো গুলির আওয়াজ পেলাম।

আমাদেরকেও ওরা মারতে আসবে। কে কোথায় পজিশন নিবো ভাবছি। এমন সময় সুবেদার ফয়েজ সুলতান স্টেনগান নিয়ে দরজার কাছে এসে কাঁচ ভেঙে ব্যারেলটা ঢুকাল। ক্যাপ্টেন নুরুল ইসলাম হাত জোড় করে তার কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইলেন। কিন্তু তার মন গলাতে পারলেন না। আমি দৌড়ে দেওয়ালের পাশে গিয়ে দাড়াই। নুরুল ইসলাম ও সিদ্দিকীকে তৎক্ষনাৎ গুলি করে। তারা মেঝেতে পড়ে যান।

আমাকে তখনও মারতে পারেনি। খাটের নিচে গিয়ে লুকাই। সুবেদার চাবি নিয়ে এসে দরজা খুলে আমার দিকে কয়েকটা গুলি করে। তিনটি গুলি লেগেছিল। পিঠের ওপর গরম পানি পড়লে যেমন গরম লাগে তেমনটা অনুভব করলাম। তখনই বুঝে যাই পিঠে একটা গুলি লেগে বেরিয়ে গেছে। আরও একটি গুলি ডান হাতের কবজিতে লাগে। ডান চোখের পাশের হান্ডির মধ্যে স্লিপ করেও বেরিয়ে যায় একটি গুলি।

রক্তাক্ত অবস্থায় মরার ভান করে পড়ে থাকি তখন।

কেউ একজন এসে বলে, ‘এ লোক কো চেক করো।’

পায়ের মধ্যে লাথি মেরে একজন বলল—‘তিনো খতম হো গিয়া।’

এর পর আরেকজন আসে। গলার আওয়াজে বুঝতে পারি তিনি বিগ্রেড মেজর সুলতান।

বললেন— ‘কর্নেল ইয়াকুব মালেক এ দ্যাখা হ্যা।’

এরপর বলেন— ‘বাছ চলো সারা বাঙালি খতম হো গিয়া।’

নুরুল ইসলাম স্পটেই মারা যান। ক্যাপ্টেন সিদ্দিকী তখনও গোঙাচ্ছিলেন।

বীর বিক্রম ইমাম উজ-জামানের তৎকালীন ছবি
| ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে সংগৃহীত

রাত তখন ১২টা বা ১টা হবে। একটা টেবিল ছিল জানালার পাশে। টেবিলে উঠে জানালার হুকটা খুলে লাফ দিলাম। দূরে এক সেন্ট্রি ছিল। আমি ডান দিক দিয়ে নিচে নেমে পড়ি। বুঝতে পেরে সে গুলি করতে থাকে।

পাহাড় থেকে নেমে দৌড়ে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর উঠলাম। পেছনে পাকিস্তানি সেনাদের ছুটে আসার বুটের শব্দ পাই। এর পর গেঞ্জিটা খুলে কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রোড ক্রস করে টিপরাবাজার যাই। ম্যাপ রিডিংটা আগেই মাথায় ছিল। উত্তর পূর্ব দিকে ম্যাগসিমাম ৫ মাইল দূরে ইন্ডিয়া।

ওই চিন্তা থেকেই ধানক্ষেতে ক্রলিং করে এগোই। ওরা একটা পিকআপ ভ্যানে লাইট মেরে আমার খোঁজ করে। বহুকষ্টে গোমতী বাধ ক্রস করে ভেতরে চলে আসি। শরীর দিয়ে তখনও রক্ত পড়ছে। পালানোর চিন্তায় সে অনুভূতিটাও ভুলে যাই।

ফজরের আজানের পর এক গ্রামে এসে পৌঁছি। ওটা বুড়িচং থানার ভরাশাল গ্রাম। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে এসেছি শুনে মানুষজন এগিয়ে আসে। একজন পুকুরে নিয়ে গোসল করায়, বুটটাও খুলে দেয়। স্কুলঘরের একটা কামরায় থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। স্থানীয় এক গ্রাম্য ডাক্তার ইনজেকশন দিয়ে ক্ষত স্থানের প্রাথমিক চিকিৎসা করেন। পরদিন বুড়িচং হাসপাতালে হাতের কবজি থেকে বের করে আনা হয় গুলিটি।”

খবর পেয়ে ইমাম উজ-জামানের সঙ্গে দেখা করতে আসেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের এমপিএ ও এমএনএ— রশীদ ইঞ্জিনিয়ার ও প্রফেসার রউফ। তাদের সহযোগিতায় তিনি বর্ডার পার হয়ে চলে যান ভারতের মতিনগর বিএসএফ ক্যাম্পে। ওখানেই দেখা হয় মেজর খালেদ মোশাররফের সঙ্গে।

এপ্রিলে ইপিআর-এর দুটো প্লাটুন ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি প্লাটুন নিয়ে গঠন করা হয় আলফা কোম্পানি। এর অধিনায়ক করা হয় ইমাম উজ-জামানকে। অতঃপর তিনি কুমিল্লা, লাকসাম, চাঁদপুর প্রভৃতি জায়গায় অ্যাম্বুস করে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর অ্যাটাক করা শুরু করেন।

কীভাবে তার নেতৃত্বে একের পর এক সম্মুখযুদ্ধ হয়েছিল? সেই ইতিহাস তিনি বললেন যেভাবে— ‘১৭ এপ্রিল প্রথম অ্যাম্বাস করি কুমিল্লা-লাকসামের মাঝামাঝি বাগমারা নামক স্থানে। সকাল তখন ১০টা হবে। পাকিস্তানি সেনারা ওইপথে চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা যাচ্ছিল। অ্যাম্বুসের ভেতর আসতেই ওদের চারটি গাড়ি উড়িয়ে দিই। গোলাগুলিতে ওদের ৬০-৭০ জন হতাহত হয়। ওরা আর্টিলারি ছুড়লে আমরাও টিকতে পারি না। আমাদের ১৪ জন শহিদ হয়। তখন আমরা বাগামারা ছেড়ে আলিশ্বর নামক জায়গায় অবস্থান নিই।

ওখানেও বিমান থেকে হামলা করে পাকিস্তানিরা। তখন চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজার এলাকায় সরে যাই। ওখানেও ৪-৫দিন পর তুমুল গোলাগুলি চলে। ইপিআর প্লাটুনটা খুব সাহসী ছিল। ধানক্ষেত থেকে বেলুচ রেজিমেন্টের এক সেনার লাশও নিয়ে এসেছিল তারা। এপিলের শেষে পাকিস্তানিরা মিয়াবাজারে আবার হামলা করে। তখন চৌদ্দগ্রাম এসে চর্তুপাশে ডিফেন্স নিলাম। মে মাসের ৭-৮ তারিখ খালেদ মোশাররফ এসে বললেন যেভাবেই হোক দখল ধরে রাখতে হবে। উনি ৬ টা মর্টারসহ একটা মর্টার প্লাটুন সঙ্গে দিলেন।

১৪ মে শুক্রবার ছিল। কুমিল্লা, লাকসাম ও ফেনীর দিক থেকে চৌদ্দগ্রামে পাকিস্তানিরা ত্রিমুখী আক্রমণ করে। দুপুর একটায় আক্রমণ করে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে ওই যুদ্ধ। ঠেকিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু গোলাবারুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় পরে সরে যাই ভারতে।’

এর পর বিএসএফ-এর সহযোগিতায় ইমাম উজ-জামানরা রাংগামুড়ায় ফরেস্টের ভেতরে নতুন ক্যাম্প স্থাপন করেন। আগের তিনটি প্ল্যাটুন ছাড়াও সেখানে ছিল মর্টার প্ল্যাটুনের ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা। সাফায়াত ছিল মর্টার প্ল্যাটুনের কমান্ডার। পরবর্তীতে ওটাই আলফা কোম্পানির রাংগামুড়া সাবসেক্টর হয়।

ইমাম উজ-জামান আরও বলেন, ‘অক্টোবর মাসে আবারও বিলোনিয়ায় যাওয়ার নির্দেশ আসে। এবার সঙ্গে ছিলেন ইন্ডিয়ান আর্মি। নভেম্বর মাসেই আমরা বিলোনিয়া মুক্ত করি। ৩ ডিসেম্বরের পর সেখান থেকে ফেনীর দিকে অগ্রসর হই। ফেনী মুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর।

এরপর ফোর বেঙ্গল, টেন বেঙ্গল আর ইন্ডিয়ান আর্মির থার্টি ওয়ান জাট আর থার্টি টু মাহার— এই চারটি ব্যাটেলিয়ান মিলে আমরা চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হই।

টেন বেঙ্গলের কমান্ড করতেন মেজর জাফর ইমাম। টুয়াইসি ছিলেন ক্যাপ্টেন শহিদ। রাংগামুড়া সাবসেক্টর বিলুপ্ত করে ফেনীতে যখন আসি তখনই ওটা টেন বেঙ্গলের আলফা কোম্পানি হয়ে যায়।

পরিবারে সদস্যদের সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা ইমাম উজ-জামান বীর বিক্রম

মিরেরসরাই, সীতাকুণ্ড হয়ে আমরা কুমিরায় পৌঁছি। পথে পথে চলে যুদ্ধ। পরে টেন বেঙ্গল কুমিরা থেকে বাঁ দিকে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে হাটহাজারির চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটির দিকে অবস্থান নেয়।

১৬ ডিসেম্বরে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় চট্টগ্রাম হাটহাজারি ও চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটির মাঝখানের রাস্তাটা ব্লক করার। বিকালের দিকে রোড ব্লকের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তখনই অধিনায়ক জাফর ইমাম ওয়ারলেসে বললেন, ‘তোমার আর রোড ব্লক করতে হবে না। পাকিস্তান আর্মি আত্মসমর্পণ করেছে।’

শুনে কি যে আনন্দ লেগেছে ! ওই আনন্দের কথা এখন ঠিক বোঝাতে পারব না।’

বীরবিক্রম ইমাম উজ-জামান যুদ্ধকালীন সময়েই লেফটেন্যান্ট হন। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৩ সালে ক্যাপ্টেন এবং ১৯৭৪ সালে মেজর হয়েছেন। সর্বশেষ ২০০০ সালে বগুড়ার জিওসি থাকাকালীন মেজর জেনারেল হিসেবে অবসরে যান।

স্বাধীনতা লাভের পর সেনাবাহিনী গঠন প্রসঙ্গে তিনি বললেন এভাবে, ‘বঙ্গবন্ধু সুন্দরভাবেই সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীকে সংগঠিত করেছিলেন। মানবিক কারণে পাকিস্তান ফেরত অফিসারদেরও রেখেছিলেন। তবে তাদের সেনাবাহিনীতে না রেখে অন্য জায়গায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিলে ভালো হতো। কেননা তারা তো স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেননি। বরং পরোক্ষভাবে পাকিস্তানকেই সহযোগিতা করেছিল।

বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের দুবছরের সিনিয়রিটি দিয়েছিলেন। সেটা না দিলে পুরো সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ থাকত পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের হাতেই। পাকিস্তান ফেরত জেনারেল খাজা ওয়াসিউদ্দিন ছিলেন সবচেয়ে সিনিয়র। তাকে কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেনাপ্রধান বানাননি। বরং মুক্তিযোদ্ধা অফিসার হিসেবে কে এম শফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ, জিয়াউর রহমান— এদেরকেই সেনাবাহিনীর শীর্ষে রেখেছিলেন। ফলে এক ধরণের বিচক্ষণতার সঙ্গেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশের সামরিকবাহিনীকে সাজিয়েছিলেন।’

অবসরে যাওয়ার পর সামরিকবাহিনীর অনেক অফিসারই রাজনৈতিক দলে যোগ দেন। আপনি তা করেননি। কারণটি কি জানানো যাবে?

মুচকি হেসে মেজর জেনারেল (অবঃ) ইমাম উজ-জামান বলেন, ‘আমি মনে করি পলিটিক্স সামরিক বাহিনীর লোকের জন্য নয়। মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করেছি সেটাই বড় অর্জন। বঙ্গবন্ধু বীরবিক্রম খেতাব দিয়েছেন এটাও অনেক বড় সম্মানের। এখন সামান্য কিছু স্বার্থের জন্য পলিটিক্সে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করি না। রাজনীতি করলে তো অর্থ সংস্থানও লাগে। ওটা আসবে কোথা থেকে? পেনশনের টাকা দিয়ে তো রাজনীতি করা যায় না।’

কী করলে দেশ আরও এগোবে ?

‘প্রত্যেকটা লোকের যদি জীবিকার পথ থাকে এবং আয়ের পথ তৈরি হয়। তাহলেই অনেক এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। ইনকাম জেনারেটিং প্রজেক্ট বাড়াতে হবে। আর করাপশন বন্ধ করতে হবে পুরোপুরি।’

ভালো কাজের প্রতি ঐক্যবদ্ধতা আর পারস্পারিক সহনশীলতা থাকলেই দেশটা পাল্টে যাবে বলে মনে করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ইমাম উজ-জামান (বীরবিক্রম)।

আগামী প্রজন্মের উদ্দেশে এই বীরবক্রিম বললেন শেষ কথাগুলো, ঠিক এভাবে, ‘তোমার মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগের ইতিহাসটি জেনো রেখো। দেশের প্রশ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকো। তোমাদের হাত ধরেই তৈরি হবে সত্যিকারের উন্নত বাংলাদেশ।’

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩

© 2024, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button