কলাম

‘৭১-এর আকরগ্রন্থ’-ইতিহাসের অজানা গল্প

বই আলোচনা

শেরিফ আল সায়ার

বাঙালির ইতিহাস গৌরবের, তবে লেখা হয়েছে রক্ত দিয়ে। বাংলাদেশ নামটা হুট করে পাওয়া কোনো নাম নয়। ভাষা আন্দোলন দিয়ে, তার অধিকার আদায়ের যাত্রা শুরু করে ১৯৭১-এর মোহনায় নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছে বাংলার জনতা। তারা মুক্তি চেয়েছিল।

তাই নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে পিছপা হয়নি। তবে দুঃখের বিষয় হলো, বাঙালির তথা বাংলাদেশের বীরত্বের এই ইতিহাস বারবার কলুষিত হয়েছে, ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে। সাধারণের বীরত্বের গল্পগুলো হারিয়ে গেছে প্রভাবশালীদের ভিড়ে। লেখক, গবেষক সালেক খোকন দীর্ঘদিন ধরে সেই সাধারণের বীরত্বের গল্পই তুলে আনার কাজ করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে কাজ করে ১১টি সেক্টরের ১১১ জন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধার গল্প সংগ্রহ করেন লেখক। সেসব নিয়েই তাঁর গ্রন্থ ‘৭১-এর আকরগ্রন্থ’।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেভাবে রাজনীতি কিংবা রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে কলুষিত হয়েছে, তাতে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃত বীরদের গল্প। এই যে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে বহু বীর নিজের শরীরে ক্ষত করেছেন, দীর্ঘ ৫০ বছরে তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলায় এখন হৃদয়ও ক্ষতবিক্ষত। তবু তাঁরা একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ দেশের স্বপ্ন দেখে চলেন।

তাঁদের গল্পগুলো পড়লে তরুণ প্রজন্মের সামনে উন্মুুক্ত হতে শুরু করবে নানা অজানা অধ্যায়। যেমন—যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা কনস্টেবল মো. শাহজাহান মিয়া তাঁর ভাষ্যে উল্লেখ করেছেন কিভাবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পুলিশ বাহিনী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে হালকা অস্ত্র নিয়েই সাহসের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

শুধু তা-ই নয়, মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামের পর গ্রাম হেঁটেছেন, কষ্ট করে থেকেছেন, যুদ্ধ করেছেন। তাঁদের এই যুদ্ধে শরিক হয়েছেন গ্রামবাংলার অনেক সাধারণ মানুষ। যেমন—যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আহম্মদ বাবু তাঁর যুদ্ধের গল্প বলতে গিয়ে এমনই এক তথ্য সামনে হাজির করেন। তাঁর গল্পে জানা যায়, একবার নদী পার হওয়ার জন্য নৌকা পাচ্ছিলেন না তাঁরা। কারণ গ্রামের মানুষ নৌকা পানিতে ডুবিয়ে রাখত ভয়ে। নদী পার হতে না পেরে যখন মুক্তিযোদ্ধারা বিপদে পড়েছিলেন, ঠিক তখন পাশের ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসেন এক নারী। সেই নারী জীবনের ঝুঁঁকি নিয়ে নদীর যেখানে নৌকাগুলো আছে, সেগুলো তুলে নিতে বলেন। এর পরই মেয়েটি অন্ধকারে হারিয়ে যান। রুহুল আহম্মদ বাবুর কাছে সেই মেয়েটিও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

এমনই সব অজানা অধ্যায় উঠে আসে সালেক খোকনের গ্রন্থে। ঝরঝরে গদ্যে গল্পের মতো করে তুলে ধরেছেন একের পর এক যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প। প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্যও তুলে ধরেছেন।

৭১-এর আকরগ্রন্থ : সালেক খোকন। প্রকাশক : কথাপ্রকাশ। প্রচ্ছদ : আনিসুজ্জামান সোহেল। মূল্য : ১৫০০ টাকা।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক কালেরকণ্ঠের শিলালিপিতে, প্রকাশকাল:১৫ জুলাই ২০২২

© 2022, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button