আদিবাসী

চাকমা বিদ্রোহ: ইংরেজদের বিরুদ্ধে তুলা-যুদ্ধের ইতিহাস

চাকমারা তখন তীর-ধনুক ও বর্শা নিয়ে গেরিলা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। ইংরেজ সেনাদল যখন আক্রমণ করতে আসত, তারা তখন গভীর পার্বত্য অঞ্চলে লুকিয়ে থাকত।

আদি থেকেই চাকমারা জুম চাষ করত। গ্রামের চারপাশের সব উর্বর জমি চাষ করা শেষ হয়ে গেলে তারা বসতি গড়ত অন্য জায়গায়। তবে জুম প্রথায় জমির ওপর তাদের স্থায়ী মালিকানা ছিল না। ফলে ওইসব জমির কর নির্ধারণেরও উপায় ছিল না তখন।

জুমের মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়ে অনুর্বর পার্বত্য জমিতে চাকমারা কার্পাস বা তুলা চাষ করত। ওই তুলা সমতলে এনে তার বিনিময়ে সংগ্রহ করত প্রয়োজনীয় চাল, লবণ ও অন্যান্য জিনিসপত্র। উৎপাদিত শস্যের সামান্য অংশ তারা কর হিসেবে দিতো মুঘল সম্রাটকে।

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দের কথা। এক চুক্তির মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মীর কাশিমের কাছে বাংলা-বিহার উড়িষ্যার নবাবি দান করে এবং প্রতিদান হিসেবে বর্ধমান, চট্টগ্রাম ও মেদিনীপুর অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা লাভ করে। এর ফলে চাকমাদের পার্বত্য অঞ্চল ও পাশের স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যটিও ইংরেজ বণিকদের হাতে চলে যায়।
কিন্তু এই পার্বত্য অঞ্চলের কোন অংশেই তখন তারা শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেনি। বরং সেসময় ইংরেজরা মাত্র দুইজন দলপতির সন্ধান পেয়েছিল। একজন ‘ফ্রু’ নামক আদিম জাতির নায়ক আর অপরজন চাকমা জাতির নায়ক। এই দলপতিরা প্রথমে ব্রিটিশ শাসকদের কর হিসেবে কার্পাস বা তুলা দিত।

কিন্তু একেক বছর করের পরিমাণ ছিল একেক রকম। ফলে বুদ্ধি আটে লোভী ইংরেজরা। বেশি কর আদায়ের উপায় হিসেবে ওইসময় তারা ‘ফড়িয়া’ নামে একটি শ্রেণির আবির্ভাব ঘটায়।

ফড়িয়ারা কী করত? তারা ইংরেজদের কাছ থেকে ওই অঞ্চলের কার্পাস বা তুলা-কর আদায়ের ইজারা নিতো। নির্দিষ্ট পরিমাণ তুলা কর হিসেবে আদায়ের কথা থাকলেও ফড়িয়ারা নানা ছলচাতুরীর মাধ্যমে কয়েকগুণ বেশি তুলা চাকমাদের কাছ থেকে আদায় করত। নির্দিষ্ট পরিমাণ কর ইংরেজদের হাতে তুলে দিয়ে বাকিটা নিজেদের লাভ হিসেবেই রেখে দিতো। এই কাজে ইংরেজদেরও সম্মতি ছিল। লাভের ওই তুলা বাজারে বিক্রি করেও ফড়িয়ারা প্রচুর মুনাফা পেত।

আবার ইংরেজরা কর হিসেবে যে তুলা পেত তা বিক্রি করে তারা মুদ্রায় পরিণত করত। এর জন্য চুক্তি করত অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে। চুক্তিতে মুদ্রার পরিমাণ নির্দিষ্ট করা থাকত। ফলে এ দ্বিতীয় ব্যক্তি ইংরেজ শাসকদের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ মুদ্রা জমা দিয়ে করের তুলা সংগ্রহ করে প্রচুর মুনাফা হাতিয়ে নিতে থাকে।

এছাড়া বিনিময় প্রথায় চাকমা আদিবাসীরা সমান ওজনের দ্রব্যের বিনিময়ে সমমানের পণ্য গ্রহণ করত। এটা ছিল তাদের আদি রেওয়াজ। কিন্তু এ সুযোগটিই নেয় তুলা ব্যবসায়ী, ধূর্ত মুনাফাখোর ও ইজারাদাররা। তারা চাকমাদের আট টাকা মূল্যের এক মণ তুলার বিনিময়ে দুই টাকা মূল্যের এক মণ লবণ প্রদান করে। ফলে একটি বা দুটি জিনিস নিলেই চাকমাদের সব তুলা শেষ হয়ে যেত।

এভাবে পরিবারে নেমে আসতো অভাব। নানা শোষণ ও নিপীড়নে তাদের জীবন কাটত অনাহার ও অর্ধাহারে। একসময় বেঁচে থাকার তাগিদেই বিদ্রোহী হয়ে ওঠে চাকমা আদিবাসীরা।

বিভিন্ন সময়ে ওই অঞ্চলের শাসনকর্তা হিসেবে দায়িত্বপালন করেন উচ্চপদস্থ ইংরেজরা। চাকমাদের বিদ্রোহ সম্পর্কে তারা বহু তথ্য উদঘাটন করলেও তার মধ্যে ক্যাপ্টেন লুইন-এর বিবরণটিতে চাকমা বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে ‘প্রকৃত সত্য’ তুলে ধরা হয়েছে বলে মনে করা হয়।

লুইন তার ‘দ্য হিল ট্যাক্স অব চিটাগং’ বইয়ে লিখেছেন, “১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগে চাকমারা প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহের নায়ক ছিলেন চাকমা দলপতি রাজা শের দৌলত ও তার সেনাপতি রামু খাঁ। তারা উভয়েই পরস্পরের আত্মীয় ছিলেন। রামু খাঁ ছিলেন সবার কাছে সেনাপতি হিসেবে বেশি পরিচিতি। চাকমাদের ওপর ছিল তার অসাধারণ প্রভাব-প্রতিপত্তি। ইংরেজ শাসকদের নিযুক্ত ইজারাদারদের শোষণ-উৎপীড়ন সহ্যের সীমা অতিক্রম করলে রামু ও শের দৌলত চাকমা জাতির সব লোককে ঐক্যবদ্ধ করেন।

“অতঃপর ইজারাদারি ও ইংরেজ শাসনের সব অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্য তারা সোচ্চার হয়। প্রথমে তারা তুলা-কর দেওয়া বন্ধ করে এবং ইজারাদারদের তুলার গোলা লুট করে। রামু খাঁর নেতৃত্বে ওইসময় চাকমারা ইজারাদারদের তুলার বড় বড় ঘাঁটিগুলো আক্রমণ করে ধ্বংস করে। রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন স্থানের গোলা লুট করে সব তুলা নিয়ে যায়। ফলে ইংরেজদের অনুগত ইজারাদারদের বহু কর্মচারী এসময় চাকমাদের হাতে নিহত হয়।”

বিদ্রোহের ঘটনা জানার পর ইংরেজ শাসকরা ওই অঞ্চলে সামরিক কর্মকর্তাসহ একদল সেনা পাঠায়। চাকমারা তখন তীর-ধনুক ও বর্শা নিয়ে গেরিলা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। ইংরেজ সেনাদল যখন আক্রমণ করতে আসত, তারা তখন গভীর পার্বত্য অঞ্চলে লুকিয়ে থাকত। আর সুযোগ বুঝে সমতলে নেমে এসে ইজারাদারদের ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ চালিয়েই সরে পড়ত। ফলে বহুদিন সেনারা তাদের কোনো নাগাল পায়নি।

ইংরেজ শাসকরা তখন নতুন কৌশল আটে। তারা জানত, তুলার বিনিময়ে চাল-লবণ ইত্যাদি সংগ্রহ করতে পাহাড় থেকে সমতলের বাজারে চাকমাদের আসতে হবে। ইংরেজরা তখন সমতলের বিভিন্ন বাজারে সেনাদের পাহারা বসায়। ফলে বহুদিন চাকমারা সমতলে আসতে পারেনি। কিন্তু খাদ্য ও লবণ ছাড়া তাদের পক্ষে তো বেশিদিন লুকিয়ে থাকাও সম্ভব ছিল না।

ফলে একসময় তারা ইংরেজদের কাছে ধরা দেয়। চাকমা নেতা রামু খাঁ বছরে ৫০১ মণ তুলা ইংরেজ শাসকদের কর হিসেবে দিতে রাজি হন। পুরোপুরি বিজয় না ঘটলেও চাকমাদের প্রথম বিদ্রোহ এবং তার প্রধান নায়ক রামু খাঁর নাম এখনও গর্বের সাথে চাকমারা স্মরণ করে।

১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে চাকমা দলপতি শের দৌলত খাঁর মৃত্যুর পর তার ছেলে চাকমাদের দলপতি বা রাজা হন তার পুত্র জানবক্স খাঁ। তার নেতৃত্বে চাকমারা আবার বিদ্রোহ করে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে। তারপর ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে একই কারণে তিনিও বশ্যতা স্বীকার করেন।

কিন্তু ইংরেজ শাসকরা অস্ত্রের জোরে বিদ্রোহী চাকমাদের কখনও পরাজিত করতে পারেনি। পার্বত্য অঞ্চলে খাদ্যের অভাব থাকায় সমতলে এসে খাদ্য ও লবণ সংগ্রহ এবং অর্থনৈতিক অবরোধের জন্যই তারা ইংরেজদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল।

একসময় ইংরেজ শাসকরা বুঝতে পারে যে, পার্বত্য অঞ্চলে ইজারাদারদের অত্যাচার ও শোষণ ও বর্বর উৎপীড়নই চাকমা বিদ্রোহের মূল কারণ। তাই ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইজারা প্রথা বাতিল করে। তারপর তুলা-কর অপরিবর্তিত রেখে তা সরাসরি চাকমা দলপতির মাধ্যমে সংগ্রহের ঘোষণা দেয়।

চাকমাদের বিদ্রোহ ও সংগ্রামে কেটে যায় প্রায় চৌদ্দ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে ইংরেজ সেনাদের ওপর তারা যে গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করেছিল তা ইতিহাসে বিরল। তাদের ওই লড়াই-সংগ্রামই পরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রেরণা জুগিয়েছিল।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ২০ জুলাই ২০২৫

© 2025, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button