মুক্তিযুদ্ধ

 দেশটা তোমার শেকড়, সেই শেকড়কে ভুলে যেও না

মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের সহযোগিতার কথা আমরা ভুলে গেছি বলে মনে করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল রশীদ

“ম্যাট্রিক পাসের পর ভর্তি হই জগন্নাথ কলেজে। একদিন খবর পাই এয়ারফোর্স পাইলট নিচ্ছে। রিক্রটিং অফিস ছিল মেডিকেল কলেজের পাশে। লিখিত ও ইন্টিলিজেন্স টেস্ট দিই। পাস করার পর ওরা বলে, এবার ‘ইন্টার সার্ভিস সিলেকশন বোর্ড’-এর পরীক্ষাতে আসো। ওই পরীক্ষা ছিল সবচেয়ে কঠিন। এক্সপার্টরা আসতেন পাকিস্তানের পেশোয়ার থেকে– কেউ সাইকোলজিক্যাল এক্সপার্ট, কেউ ইন্টিলিজেন্স এক্সপার্ট, কেউ আবার ছিলেন অন্যান্য বিষয়ে এক্সপার্ট। তিন থেকে চারদিন নানা বিষয়ে পরীক্ষা নেন তারা। সবগুলোতে উত্তীর্ণ হলে মেডিকেল পরীক্ষা হয়। অতঃপর টাঙানো হয় চূড়ান্ত তালিকা। টিকে যাই। প্রায় দশ হাজার বাঙালি ছেলে পরীক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু সিলেক্ট হই মাত্র ৬ জন।

বাবা প্রথম জানতেন না। টিকে যাওয়ার পর তাকে জানালাম। কিন্তু তিনি রাজি হন না। তার ইচ্ছে আমি ব্যারিস্টার হই। দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। এক আত্মীয় ছিলেন বাবার ক্লোজ। এয়ারফোর্সে আমার সিলেকশনের খবরে তিনি খুব খুশি হন। বাবা রাজি নন জেনে অবাক হলেন। অতঃপর বাবাকে বোঝালেন– দুই বছর ট্রেইনিং নেওয়ার পরই পাইলট হবো, ফার্স্টক্লাস গেজেটেড অফিসার, পাইলটদের বেতন তখন ছিল সিএসপি অফিসারদের বেতনের দ্বিগুণ। এছাড়া তখন এক পাকিস্তান থেকে অন্য পাকিস্তানে চাকরি করতে গেলে জোন অ্যালাউন্সও পাওয়া যেত। সবমিলিয়ে পাকিস্তান আর্মস ফোর্সের স্টান্ডার্ড ছিল অনেক উঁচুতে। এর চেয়ে ভাল চাকরি আর কী আছে!

সবশুনে বাবা রাজি হলেন। আমিও ফ্লাইট ক্যাডেট হিসেবে পাকিস্তান এয়ারফোর্সে জয়েন করি, ২৪ অগাস্ট ১৯৬৬ তারিখে। এয়ারফোর্স নম্বর ছিল ৫২৪৮।

দুই বছর ট্রেনিং হয় পিএফ অ্যাকাডেমি রিসালপুরে। ট্রেইনিং শেষে পাইলট অফিসার হিসেবে পোস্টিং হয় পিএ বেইজ বাদিনে। এটি ছিল সাউথ এয়ার ডিফেন্স হেডকোয়ার্টার। যত জাহাজ ফ্লাই করে সব মনিটর করা, ট্র্যাক করা, প্রয়োজনে তাদের ইন্টারসেভ করাই ছিল কাজ। ১৯৭১ পর্যন্ত ওখানেই কর্মরত ছিলাম।”

সেপ্টেম্বর ২০০২-এ দুই দফায় সাবসেক্টর কমান্ডার ইকবাল রশীদের মুখোমুখি হন লেখক, ছবি: সালেক খোকন

পাকিস্তান এয়ারফোর্সে যোগদান প্রসঙ্গে এভাবেই নানা ঘটনার কথা তুলে ধরেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ছয় নম্বর সেক্টরের চিলাহাটি সাবসেক্টরের কমান্ডার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ইকবাল রশীদ। বর্তমানে তিনি আমেরিকা প্রবাসী। এ বছর দেশে এসেছেন। খবর পেয়ে গত সেপ্টেম্বরে দুই দফায় তার মুখোমুখি হই।

কাজী সাইদুল হক ও আনোয়ারা বেগমের সন্তান ইকবাল রশীদ। পৈতৃক বাড়ি ফেনীর বিরুলী কাজী বাড়ি হলেও তার জন্ম লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার হাজিরপাড়া গ্রামে, মিয়াবাড়িতে। ৪ ভাই ২ বোনের সংসারে ইকবাল সবার বড়। বাবা ছিলেন আইজিআরএসএন নামক একটি স্টিমার কোম্পানির অডিট ইন্সপেক্টর।

ইকবালের লেখাপড়ায় হাতেখড়ি সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারস স্কুলে। এরপর ভর্তি হন সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলে। কিছুদিন তিনি লেখাপড়া করেন ফৌজদারহাট ক্যাডেটে। পরে শাহীন স্কুলে ভর্তি হন নবম শ্রেণিতে। ১৯৬৫ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে ইকবাল ইন্টারমিডিয়েটে পড়েন জগন্নাথ কলেজে। এরপর যোগ দেন এয়ারফোর্সে।

পাকিস্তানে থেকেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শোনেন ইকবাল রশিদ।

কীভাবে শুনলেন?

“এক আর্মি বন্ধু ছুটিতে গিয়েছিল দেশে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের রেকডিং করা একটা ক্যাসেট সংগ্রহ করে সে। ক্যাসেটের ভেতরের টেপটা পেন্সিলে রোল করে লুকিয়ে নিয়ে আসে এখানে। ওটা সেট করে সবাই মিলে শুনলাম। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশগুলো আমাদের প্রবলভাবে আন্দোলিত করে। তখনই বুঝে যাই– এটাই স্বাধীনতার ঘোষণা। যুদ্ধ অনিবার্য। এরপর আর কোনো নির্দেশনারও প্রয়োজন পড়েনি।”

এরপর তো ২৫ মার্চে ঢাকায় গণহত্যা শুরু হয়। ইকবাল দেশে ফিরেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবেন বলে ঠিক করেন। তিনি তখন ছুটির আবেদন করেন। কিন্তু তা মঞ্জুর হয় না। সেপ্টেম্বরে গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাঈদ আহমেদের বিশেষ সহযোগিতায় ছুটি পান ইকবাল।

এরপর কীভাবে তিনি দেশে ফিরলেন– ওই ইতিহাস শুনি তার মুখেই।

তার ভাষায়, “এর মধ্যেই ওরা সকল বাঙালি অফিসারকে বিভিন্ন জায়গা থেকে এনে করাচিতে ‘কোরাঙ্গি ক্রিক’ নামক জায়গায় রাখে। সেখানে আমি ছাড়াও ফকরুল আজম (এয়ার চিফ হয়েছিলেন), ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মিজান, উইং কমান্ডার রউফ, শামসুল ইসলাম, মুজাহিদ প্রমুখ ছিলেন। ওখান থেকে সবাইকে পরে একটি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তার আগেই আমি দেশে ফিরি। শুনেছি ওই ক্যাম্পে অফিসাররা অনেক কষ্ট করেছেন।”

সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে বিমানে ঢাকায় নামেন ইকবাল রশীদ। তার বাবা-মা তখন থাকতেন গোপীবাগ। কিন্তু তাদের কাছে না গিয়ে তিনি মতিঝিল কলোনিতে ওঠেন, মামার বাড়িতে। ওই রাত সেখানেই কাটান। সকালে উঠেই রওনা হন মুক্তিযুদ্ধের অজানা গন্তব্যে।

তিনি বলেন, “খুব ভোরে ধানমন্ডির জিগাতলার ১৩ নম্বর রোডে যাই, জগন্নাথ কলেজের বন্ধু শাখাওয়াতের বাড়িতে। তাকে বললাম, ‘আমাকে পার করাও।’ আমাকে সে নিয়ে যায় এলিফ্যান্ট রোডে, সাদেক ভাইয়ের (সাদেক হোসেন) দোকানে। প্রথমে নানা প্রশ্ন করে তিনি আমাকে যাচাই করলেন– কেন যাবেন, যুদ্ধ করে তো কিছুই হবে না, এমন সব প্রশ্ন। আমি সিদ্ধান্তে অটল থাকি। আধাঘণ্টা পর সেখানে আসেন এক গেরিলা, নাম শেখ মান্নান (বীরপ্রতীক)। তাকে দেখেই চমকে গেলাম। কারণ তিনি ছিলেন শাহীন স্কুলের ছাত্র, আমাদের বাস্কেটবল টিমেও খেলতেন। সাদেক ভাই মান্নানকে বলেন, ‘একে পার করো।’ আমাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার জন্য মান্নান একজন গাইড ঠিক করে দেন। ওই গাইড হলেন ঢাকার গেরিলা মনসুরুল আলম দুলাল (বীরপ্রতীক)।”

বর্ডার পার হয়েই ইকবাল যান মেজর রবের ক্যাম্পে। ওখানে ছিলেন উইং কমান্ডার রউফ আর স্কোয়াড্রন লিডার কাদেরও। তাদের পরামর্শে চলে যান কলকাতায়, এইট থিয়েটার রোডে। সেখানে এবি এম খন্দকার সাহেবের (পরে এয়ার চিফ হন) কাছে রিপোর্ট করেন তিনি। এভাবে ঢাকা থেকে বর্ডার পার হয়ে কলকাতা পর্যন্ত যেতে ইকবালের ১৫ দিন লেগেছিল।

এরপর কী ঘটল?

তিনি বলেন, “ফোর্ট উইলিয়াম কলকাতা ক্যান্টনমেন্টে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, ইন্টারোগেইট করার জন্য। পাকিস্তান থেকে কোনো সামরিক অফিসার ফেরত এলে ওখানে যাওয়াই ছিল নিয়ম। এরপর আমাকে দিল্লি পাঠিয়ে দেওয়া হয়, ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্স হেড কোয়ার্টারে। দিল্লি থেকে কলকাতায় গিয়ে দেখা করি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর সঙ্গে।

একদিন পরই ওসমানী সাহেব আমাকে পোস্টিং দেন ছয় নম্বর সেক্টরে। প্রথমে শিলিগুড়ি যাই। সেখান থেকে ইন্ডিয়ান ট্রাকে চলে যাই স্কোয়াড্রন লিডার সদর উদ্দীন (বীরপ্রতীক) সাহেবের ভজনপুর সাব-সেক্টরে। সেখানে দেখা হয় ফার্স্ট ব্যাচের অফিসার লেফটেন্যান্ট মাসুদ ও লেফটেন্যান্ট মতিন চৌধুরীর সঙ্গে। পরে সদর উদ্দীন সাহেব একটি জিপে করে নিয়ে যান বুড়িমারিতে, ছয় নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে। উইং কমান্ডার মোহাম্মদ খাদেমুল বাশার (বীরউত্তম) ছিলেন আমাদের সেক্টর কমান্ডার। সেখানেই দেখা হয় ক্যাপ্টেন মোশায়েদ ও ক্যাপ্টেন নজরুলসহ অন্যান্য বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে।

এয়ারফোর্সের অফিসার ছিলাম। আকাশ পথের যুদ্ধটা জানা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে সমতলে, আর্মিদের সঙ্গে। তাই আমাকে ১৫ দিনের ইনফ্র্যানট্রি (পদাতিক) ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হয় পাটগ্রাম সাবসেক্টরে, ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের কাছে। রাইফেলসহ বিভিন্ন অস্ত্র চালানো, কীভাবে অ্যাটাক, রিট্রিট, অ্যাম্বুশ ও প্ল্যানিং করতে হয়, ডিফেন্স ব্লক করা, ডিফেন্স অ্যাটাক করা– এসব শিখি সেখানে, ইপিআরের এক হাবিলদার মেজরের কাছে। সেকেন্ড লেফটেনেন্ট ফারুক শেখান টু-ইঞ্চ মর্টার ফায়ার।

ট্রেইনিং শেষে যুক্ত হই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কোম্পানিতে। তাদের সাথে থাকি সাতদিনের মতো। মুক্তিযোদ্ধারা কীভাবে থাকছেন, কীভাবে পরিকল্পনা করে অপারেশন করেন, সেই অভিজ্ঞতা নিই। গ্রামের ছেলেরা অল্প কয়েকদিনের ট্রেনিং নিয়েও যে সাহস আর কনফিডেন্ট তাদের ভেতর দেখেছি তা আমাকে খুব অবাক করেছে। তাদের সঙ্গেই একরাতে শঠিবাড়িতে একটি অপারেশন করে ফিরে আসি।

সস্ত্রীক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল রশীদ , ছবি: সালেক খোকন

এরপরই সেক্টর কমান্ডার একদিন এসে আমাকে নিয়ে যান ইন্ডিয়াতে, দেওয়ানগঞ্জে। ওটা ছিল চিলাহাটির দক্ষিণে। সেখানে ইন্ডিয়ান মেজর সাতওয়ালের কাছ থেকে চিলাহাটি সাবসেক্টরের দায়িত্ব বুঝে নিই।”

মুক্তিযুদ্ধকালীন এই সাবসেক্টরের দায়িত্ব ছিল ডিমলা ও নীলফামারী অঞ্চলের সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ, নীলফামারী, জলঢাকা, ডোমার, ডিমলা প্রভৃতি এলাকা।

সাব-সেক্টর কমান্ডারের ভাষায়, “আমাদের ছিল ৪টি কোম্পানি। একটি মুভ করে চিলাহাটি হতে ডোমার, ডিমলার দিকে। আরেকটা জলঢাকা হয়ে মুভ করে। এক কোম্পানিতে কিবরিয়া ছিল। আমার সঙ্গে থাকা দুটি কোম্পানিতে ছিল সমশের ও আমিনুল। প্ল্যান ছিল পুরো এলাকায় পাকিস্তানি আর্মিদের ওপর আক্রমণ করতে করতে একটি জায়গায় নিয়ে আসা। সঙ্গে জুনিয়র লিডার আর ট্রেইনারও ছিল। স্থানীয় যুবকদের তারা ট্রেইনিং দিয়ে কাজে লাগাতেন। এ দলে খুব কমই ছিল ১৮-১৯ বছরের বেশি। কিন্তু অসীম সাহস নিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন।

পেছনে আমাদের সার্পোটে বিএসএফ, ইন্ডিয়ান আর্মি তেমন ছিল না। নভেম্বরের শেষের দিকে দেওয়ানগঞ্জ থেকে আমরা মুভ করি। ১৬ ডিসেম্বরে নীলফামারীর নথখানায় একত্রিত হই। নথখানা জায়গাটা নীলফামারী শহর থেকে একটু দূরে। সেখানেই আমরা ক্যাম্প করেছিলাম।”

মুক্তিযুদ্ধে সাব-সেক্টর কমান্ডারদের দায়িত্বগুলো কেমন ছিল?

“প্রাইমারিলি অ্যাডমেনিস্ট্রেশন, ডিসিপ্লিন, প্ল্যানিং করা। কীভাবে যাবে এবং কী করবে ওই নির্দেশ দেওয়া, প্রয়োজনে সাব-সেক্টর কমান্ডাররাও সঙ্গে যাওয়া। আমি দেওয়ানগঞ্জ থেকে নীলফামারী পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথেই ছিলাম। সম্মুখযুদ্ধেও অংশ নিয়েছি।”

তারা প্রথম যুদ্ধ করেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে। এরপর ডোমারের বোড়াগাড়ি ও ডিমলাতে। শেষে তারা অবস্থান করেন নীলফামারী শহরের নিকটবর্তী নথখানায়।

যুদ্ধের প্রক্রিয়াটি কেমন ছিল?

তিনি বলেন, “পাকিস্তানিরা তখন পিঁছু হটছে। চিলাহাটি থেকে আমরা এগোতে থাকি। ওরা সৈয়দপুরের দিকে সরে আসে। কিছু কিছু জায়গায় ছোট ছোট গ্রুপ রেখে যায় পকেট হিসেবে। খোঁজ নিয়ে এগোতাম। সামনে কোথাও পাকিস্তানি পকেট থাকলেই সেখানে যুদ্ধ হতো। ওই এলাকার ছেলেদের আগেই পাঠিয়ে রেইকি করে এগোতাম। দিনে দুই দিক থেকে ফায়ারিং করলেই রাতে পাকিস্তানিরা পেছনে সরে যেত।”

কতজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন– এটার কি লিখিত হিসাব রাখা হতো?

সাব-সেক্টর কমান্ডার মুচকি হেসে বলেন, “একটা কথা মনে রাখবেন, লংগরের ডাল যে খায় তার নাম কোথাও লেখা থাকতেই হবে। প্রত্যেকের হিসাব ছিল। কাকে কয়টা কম্বল আর মোজা দেওয়া হলো সেটা রেকর্ড রাখা হতো। মুক্তিযোদ্ধাদের ৫০ টাকা করে বেতন ভাতা আর ৫০ টাকা খাওয়ার খরচ দেওয়া হতো। টাকা নিতে হতো সাইন করে। রাফলি ৭০০ জনের মতো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন আমার সাব-সেক্টরে। সাধারণ মানুষ ও ছাত্রসমাজ ছিল বেশি। ১৯৭২ সালের মার্চে যখন চলে আসি তখন সিও রেভিনিউ, নীলফামারীর কাছে তালিকা হ্যান্ডওভার করছিলাম। দুঃখের বিষয় ওই রেকর্ডটা পরে আর পাওয়া যায়নি।”

একাত্তরে রণাঙ্গনের ঘটনাগুলো আজও দাগ কেটে আছে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার হৃদয়ে। স্মৃতি হাতড়ে তিনি তুলে ধরেন একটি, ঠিক এভাবে, “কিশোরগঞ্জে অ্যাডভান্স হচ্ছি। টিএনও অফিসের দিকে ওরা বাঙ্কার করেছিল। সেখান থেকে হঠাৎ ফায়ার শুরু হয়। সবাই শুয়ে পড়ে। সারাদিন ফায়ার হচ্ছে। এগোতে পারছি না। তখন তাজুল ইসলাম নামে ছাত্রলীগের এক ছেলে ও রাজ্জাক একটা ট্রাকে করে থ্রি-ইঞ্চ মর্টার নিয়ে আসে। কিন্তু সেটা পরিচালনায় অভিজ্ঞ তিন-চারজন লাগবে। কোথায় পাবো তাদের? দুটি ছেলে এগিয়ে এসে বলে, আমরা একটা ছোট্ট কোর্স করেছি। পারব। তারা সেটাকে মাটিকে রেখে সেট করে নেয়। কিন্তু সাইড গেজ নেই, কোন দিকে মারতে হবে এটা কে ভলান্টিয়ার করবে? আরও দুজন এসে বলে, আমরা করব স্যার। খালের ওপারে পাকিস্তানিরা। এপারে আমরা। ছেলে দুটি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লুকিয়ে এপারেই খালের কিনারায় দাঁড়িয়ে ডান ও বাম হাত উঁচিয়ে সিগনাল দিলে আমরা থ্রি-ইঞ্চ মর্টার ছাড়ি। ১০-১২টা ফেলার পর ওইদিক থেকে ফায়ারিং পুরো বন্ধ হয়ে যায়। তখনই ক্যাম্প দখলে নিই।

অনেককেই বলতে শুনি বাঙালি ডিসিপ্লিন জানে না। এটা ঠিক কথা নয়। যদি বুঝিয়ে বলা হয় তবে সেটা তারা খুব ভালোভাবে পালন ও গ্রহণ করে। আবার অনেকেই বলে বাঙালি কথা শোনে না। আমি বলি– আরে মিয়া, ঠিকভাবে বলো না। শুনবে না কেন। বাঙালিই কথা শুনে। একাত্তরই তার প্রমাণ।”

মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের সহযোগিতার কথা আমরা ভুলে গেছি বলে মনে করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল রশীদ। তিনি অকপটে বলেন, “এই নয় মাসে যারা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছেন, তাদের কথাই কেউ বলি না। যারা সৈনিক বা মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। আমাদেরকে পাকিস্তানি সেনারা অ্যাটাক করলে ইন্ডিয়াতে সরে যেতে পারতাম। কিন্তু সাধারণ মানুষ যারা গ্রাম বা শহরে ছিলেন তারা কোথায় যাবে? তারাই সরাসরি ওদের অত্যাচার ফেইস করেছেন। গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আসছে এই অপরাধে গ্রামের বাড়িগুলো ওরা জ্বালিয়ে দিত। এভাবে নির্যাতিত হয়েছেন সাধারণ মানুষ।

চিলাহাটি থেকে যখন দুটো কোম্পানি নিয়ে মার্চ করি, রাস্তায় দেখি শত শত লোক মুড়ি আর গুড় হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেক জায়গায় অচেনা লোকেরাই রান্না করে খাবার দিয়েছেন। এটা যে কত বছর সাপোর্ট আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না। অ্যান্টি-ট্যাংক মাইন এবং অ্যামুনেশন ক্যারি করার জন্য লোক লাগত। গ্রামের মানুষই ভলান্টিয়ার করেছে। সৈয়দপুরে ধরে ধরে বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, রংপুরের অনেককেই মেরে ফেলা হয়েছে, বুড়িমারীতে রেইপ করে মেরে ফেলা হয় বহু নারীকে। কই তাদের কথা তো আমরা তুলে ধরেনি।”

তিনি আরও বলেন, “পাকিস্তানি আর্মিরা কোথায় লুকিয়ে আছে তা আগেই এসে আমাদের বলে যেত সাধারণ মানুষ। কারণ তারা আমাদের সাথে ছিলেন। পাকিস্তানি আর্মিই বলেছে- ‘যেদিকে দেখি সেদিকেই শত্রু। উই ক্যান নট ট্রাস্ট আ সিঙ্গেল বেঙ্গলি।’ তারা তো কোনো অংশেই কম ছিল না। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের সাথে ছিলেন না। বিজয়ের অন্যতম কারণ ছিল এটা। তাই একাত্তরে সবচেয়ে বড় কন্ট্রিবিউশন ছিল সাধারণ মানুষের। উই মাস্ট স্যালুট দেম। কিন্তু স্বাধীনতার একান্ন বছর চলছে। উই ডোন্ট স্যালুট দ্য পিপল।”

স্বাধীনতা লাভের পর ফ্লাইট লেফটেনেন্ট ইকবাল রশীদ বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে নিযুক্ত হন এপিএম (এসিস্টেন প্রভোস্ট মার্শাল) হিসেবে। তিনি উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহর কমান্ডে ছিলেন।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও
সাব-সেক্টর কমান্ডার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ইকবাল রশীদ, ছবি: সালেক খোকন

একাত্তরের প্রতি আমরা যথাযথ সম্মান দেখাতে পারছি না বলে মনে করেন এই সূর্যসন্তান। দুঃখের সঙ্গে তিনি বলেন, “এবার ডোমার ও ডিমলাতে গিয়ে বাস্তবতা দেখে খুব এনকারেজ হতে পারিনি। ডিমলাতে শহীদের তিনটা কবর বাঁধানো। কিন্তু সেটা জংলা হয়ে আছে। পাশেই মানুষ প্রস্রাব-পায়খানা করছে। শহীদদের অনেক কবরও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। খুবই লজ্জাজনক এটা। লেফটেনেন্ট সামাদ যেখানে গুলি খেয়েছেন সেখানে কোনো চিহ্ন পর্যন্ত নেই। ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের কবরস্থানগুলোও দেখে আসেন কেমন অযত্নে পড়ে আছে। দুঃখ লাগে দেখতে। প্রতিটি উপজেলায় শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা একটি কবরস্থান হতে পারত। যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ গ্রেভইয়ার্ডগুলো খুব সুন্দরভাবে সাজানো। চট্টগ্রামে সেকেন্ড ওয়ার্ল্ডওয়ারের কবরস্থান দেখেন খুবই পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন করে রাখা। কিন্তু আমরা কেন পারছি না? আমি তো মনে করি কোনো এক জায়গা থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ ব্যাপারটা আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে, চাপা পড়ে যাচ্ছে।”

প্রজন্মকে নিয়ে দারুণ আশাবাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ইকবাল রশীদ। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন শেষ কথাগুলো। তার ভাষায়, “তোমাদের অনেক বেশি পড়াশোনা ও খেলাধুলা করতে হবে। বড়দের ভুলগুলো থেকে তোমরা শিক্ষা নেবে। লোভী হয়ো না। লোভ তোমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে না। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তোমরা আত্মবিশ্বাসী ও ধৈর্যশীল থেকো। দেশটা তোমার শেকড়। সেই শেকড়কে ভুলে যেও না।”

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ১৭ ডিসেম্বর ২০২২

© 2022, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button