পাকিস্তানি সেনাদের লাশে থুথু দিয়েছিল জনতা

পাবনায় স্রেফ লাঠি–সড়কি হাতেই যেভাবে পাকিস্তানিদের হটিয়েছিল জনতা।
মুক্তিযোদ্ধা অমল কৃষ্ণ গোস্বামী। পাবনায় ‘দীলিপ’ নামেই বেশি পরিচিত তিনি। বৃন্দাবন চন্দ্র গোস্বামী ও সুনীতি রাণী গোস্বামীর অষ্টম সন্তান দীলিপ। বাড়ি পাবনা সদর উপজেলার শালগাড়িয়া এলাকার জয়কালিবাড়ি পাড়ায়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় দীলিপ ছিলেন পাবনা অ্যাডওয়ার্ড কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্র। ২৫ মার্চ, ১৯৭১। সারা দেশে পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা শুরু করে। বিভীষিকাময় ওই রাত থেকে পাবনায় কী ঘটেছিল?
দীলিপ দেখেছিলেন যেমন, “রাতেই মারণাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি আর্মি ঢুকে পড়ে পাবনা শহরে। তারা বিসিক শিল্পনগরীতে ঘাঁটি স্থাপন করে। পুরাতন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনও দখলে নেয়। প্রথম দিকে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের বিন্দুমাত্র সহযোগিতা পায়নি ওরা। ফলে নিজেরাই মাইক ভাড়া করে ভোর থেকে পাবনা শহরে কারফিউ জারির ঘোষণা দেয়। এতে গোটা শহরের মানুষ ঘুম থেকে উঠেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।”
“আর্মি আসার খবর আগেই পায় আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীরা। তারা শহরের দক্ষিণে পদ্মার চরে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায় এবং প্রতিরোধের প্রস্তুতিও নেয়। পাবনার তৎকালীন এসডিও (জেলা প্রশাসক) নুরুল কাদের খান ছিলেন মুক্তিকামী বাঙালির পক্ষে। গোটা প্রশাসনকে অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখার, অফিস আদালত বন্ধ রাখার এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দেশ অমান্য করে নিজ বাংলো ত্যাগ করে প্রথমে তিনি গোপন স্থানে এবং পরে ওই চর এলাকায় নেতাদের সঙ্গে প্রতিরোধ কাজে যুক্ত হন। ফলে পাবনায় পাকিস্তানি আর্মির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়।”
“শহরে তখন কারফিউ চলছে। রাস্তায় কেউ বেরোলেই তাকে বিসিক এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হতো। তাদের ওপর চলত অমানুষিক নির্যাতনও। অন্যদিকে বাঙালি তরুণরা দ্রুত সংগঠিত হতে থাকে। গোপনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা একনলা, দোনলা বন্দুক, পিস্তল, লাঠি, ফালা, সড়কি ইত্যাদি সংগ্রহ করে। অস্ত্রগুলো চর এলাকায় নিয়ে জমা করতে থাকে তারা। যা পরে প্রতিরোধ সংগ্রামে ব্যবহার করা হয়। হাজার হাজার কৃষকও সংগঠিত হতে থাকে।”
এরপর কী ঘটল? দীলিপের ভাষায়, “২৬ মার্চ ১৯৭১। সন্ধ্যা তখন। থমথমে পাবনা শহর। পাকিস্তানি সেনারা শহরে টহল দেয়। বাজার পাহারা দিত অবাঙালিরা। আর্মিদের সহযোগিতায় তারা এগিয়ে আসে। মুক্তিকামী বাঙালি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি চিনিয়ে দেয়। ফলে আর্মিরা তুলে নিয়ে যায় পাবনা মহকুমা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও পাবনা বারের সম্পাদক, পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান আমিনুদ্দিন এমপিএ, ভাসানী ন্যাপ নেতা দন্ত চিকিৎসক অমলেন্দু দাক্ষী, মোটর মালিক ও হোটেল ব্যবসায়ী আবু সাঈদ তালুকদার এবং রাজেনকে। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বিসিক এলাকায়, আর্মি ক্যাম্পে।”
“২৭ মার্চ সন্ধ্যার পরপরই পাকিস্তানিরা বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ও সৈন্য নিয়ে বিসিক এলাকা থেকে পাবনা পুলিশ লাইনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। উদ্দেশ্য পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র সরিয়ে নেয়া এবং পুলিশ বাহিনীকে নিরস্ত্র করা। কিন্তু পুলিশও প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেয়। রেজিস্ট্রি অফিস, জজকোর্ট, পুলিশ লাইন, প্রধান ডাকঘর, জেলখানা প্রভৃতি স্থানে ও ভবনের ছাদে সশস্ত্র অবস্থান নেয়।”
“পাবনা জজকোর্টের সামনে এলেই পাকিস্তানি আর্মি আক্রান্ত হয়। চতুর্দিক থেকে পুলিশবাহিনী তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। শুরু হয় ভয়াবহ যুদ্ধ। অস্ত্রের ভয়ঙ্কর শব্দে গোটা শহর তখন কেঁপে ওঠে। গোলাগুলি শেষ হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানি আর্মি একসময় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে এক অভূতপূর্ব বিজয় সূচিত হয়। যা ছিল পাবনা পুলিশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।”
এ খবর পৌঁছে যায় চর এলাকায়। ২৮ মার্চ ভোরে সমগ্র চর ও আশপাশের এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বিসিক শিল্পনগরীর আর্মির ঘাঁটিটি ঘেরাও করে রাখে। সবার হাতে হাতে ছিল লাঠি, ফালা, সড়কি ও বন্দুক। এছাড়া পাবনায় পুরাতন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনটি এবং লস্করপুরের একটি সাদা দালানেও ছিল পাকিস্তানি আর্মির একটি দল। নগরবাড়ী মহাসড়ক পাহারা দিচ্ছিল তারা। ছাত্র-যুবক, পুলিশ সম্মিলিতভাবে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনের চারপাশ ঘিরে ফেলে। ওখানে উপস্থিত ছিলেন দীলিপও।
কী ঘটেছিল সেখানে? তিনি বলেন, “আর্মিরা হতচকিত হয়ে পাল্টা গুলি চালায়। কয়েক ঘণ্টার যুদ্ধে টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবস্থানরত সৈন্যদলের সকলেই নিহত হয়। ওই লাশগুলি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে আসে বহু মানুষ। পাকিস্তানিদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের অংশ হিসেবে লাশগুলোতে লাথি ও থুথু দেয় তারা।”
“তখনও ঘেরাও ছিল বিসিক শিল্পনগরীর আর্মি হেডকোয়ার্টার। অপরদিকে লস্করপুরে আর্মিদের আরেকটি দল একটি দালানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা বেরিয়ে এসে মানুষের ওপর গুলি চালায়। ফলে শামসুল আলম বুলবুল, আমিরুল ইসলাম ফুনু, মুকুল ও ভাটা শ্রমিক আফসার এই চারজন ওখানেই শহীদ হন। সাধারণ মানুষ এতে আরও ক্ষিপ্ত হয়। বাঙালি জনতার রোষানলে পড়ে পাকিস্তানি আর্মি। ফলে প্রায় ৩২ জন সেনা ওখানে নিহত হয়।”
“অবস্থা বেগতিক দেখে বিসিক শিল্পনগরী থেকে আর্মিরা ১১টি ট্রাক যোগে রাজশাহীর দিকে সরে যায়। কিন্তু তার আগেই ক্যাম্পে আটকদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। ফলে ওইদিন শহীদ হন অ্যাডভোকেট আমিনুদ্দিন এমপিএ, ন্যাপ ভাসানী নেতা ডা. অমলেন্দু দাক্ষী, ব্যবসায়ী আবু সাঈদ তালুকদার ও রাজেন প্রমুখ। নেতাদের মৃতদেহগুলো আমাদের মনকেও রক্তাক্ত করে। অন্তরে জ্বলে প্রতিশোধের আগুন।”
এরপর পাবনা শহর হানাদারমুক্ত ছিল ১০ এপ্রিল পর্যন্ত। তখন নগরবাড়ি ঘাট ছিল সম্পূর্ণ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু ১১ এপ্রিল আর্মিরা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ভেঙে ঢাকা থেকে নদীর এপারে চলে আসে। তারা রাস্তার দুইপাশের বাড়িঘরগুলো পোড়াতে পোড়াতে ঢুকে পড়ে পাবনা শহরে। শহরজুড়ে তখন আতঙ্ক তৈরি হয়। পাকিস্তানিদের একটা মর্টারের শেলও এসে পড়ে দীলিপদের বাড়িতে। ফলে তাদের পক্ষে আর শহরে থাকা সম্ভব হয় না।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ৩ ডিসেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.




