মুক্তিযুদ্ধ

দুর্নীতি থাকলে জাতি দাঁড়াতে পারে না: মুক্তিযোদ্ধা ওহিদুল

ক্ষতচিহ্নের গদ্য: পর্ব ১৯

গলগল করে রক্ত ঝরছিল, তবু অ্যারোলের বিলে থামেনি ওহিদুলের মরণপণ লড়াই।

সালটা ১৯৭১। বাংলার আকাশ-বাতাস তখন বারুদের গন্ধে উত্তাল হতে শুরু করেছে। যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর গ্রামের একদল সাধারণ তরুণ তখনো জানত না যুদ্ধ আসলে কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তারা জানত না গোলাগুলির শব্দ কিংবা কামানের গর্জন।

সেই তরুণদের একজন ওহিদুল ইসলাম খান। তখন তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী। দেশজুড়ে অস্থিরতা, চারদিকে পাঞ্জাবি সেনাদের তাণ্ডব। এরই মধ্যে একদিন ওয়াদুদ, জায়েদ ও কাশেমসহ কয়েকজন বন্ধু মিলে ওহিদুলকে এক রোমাঞ্চকর খবর দিলেন, “ইন্ডিয়া থেকে নাকি পাঞ্জাবিদের মারার জন্য বোমা দিচ্ছে!”

বোমার নেশায় মেতে ওঠে একদল স্বপ্নাতুর তরুণ। সেই উন্মাদনায় মার্চের শেষ দিকে এক রাতে ঘর ছাড়লেন ওহিদুল ও তার বন্ধুরা। খলশি বাজার হয়ে কপোতাক্ষ নদ পার হয়ে ভোরের আলো ফুটতেই তারা পৌঁছে যান ভারতের বয়রায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে স্থানীয়দের কাছে বোমার খোঁজ করতেই এক বৃদ্ধ মুচকি হেসে বললেন, “বোমা পেতে হলে তো ট্রেনিং নিতে হয়!”

এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেও পরক্ষণেই তারা রাজি হয়ে গেলেন। শুরু হলো এক অন্যরকম যুদ্ধের যাত্রা। বনগাঁ হয়ে পাঁচ নম্বর টালিখোলা ক্যাম্পে ১৫ দিনের কঠোর ‘লেফট-রাইট’ প্রশিক্ষণ। দিন কেটেছে অনাহারে, কেবল জল খেয়ে। কষ্টের সেই দিনগুলো পেরিয়ে তারা পৌঁছালেন রানাঘাটে। সেখান থেকে রিক্রুট হয়ে প্রথমে কল্যাণী এবং পরে বিহারের চাকুলিয়ায় টানা ২৮ দিনের অস্ত্র প্রশিক্ষণ। বোমার খোঁজে যাওয়া সেই সাধারণ তরুণরা ফিরে এলেন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা হয়ে।

৮ নম্বর সেক্টরের বয়রা সাব-সেক্টরের কমান্ডার তখন মেজর হুদা। তার অধীনে ওহিদুল ইসলাম, জাফর, হেলাল, গোলাম জারিয়া, ওয়াদুদ ও জাহিদসহ ১০ জনের একটি ‘স্পেশাল ফোর্স’ গঠিত হয়। স্থানীয় পথঘাট চেনা থাকায় তাদের মূল দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানি সেনাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ‘হ্যারাসমেন্ট ফায়ার’ করা। এভাবেই তারা সফল অপারেশন পরিচালনা করেন চৌগাছা, উচিতপুর আর অ্যারোলের বিল এলাকায়।

তবে মে মাসের মাঝামাঝিতে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা ওহিদুল ইসলামের জীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছিল। শৈলোবাজারের একটি ব্রিজ ওড়ানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের। পাকিস্তানি সেনারা ওই পথ দিয়েই চৌগাছা থেকে যশোরে যাতায়াত করত। ওহিদুলরা তখন অবস্থান করছিলেন মুক্ত এলাকা মুক্তারপুরে। দুপুরবেলা হঠাৎ এক গ্রামবাসী হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এসে খবর দিলেন, পাশের গ্রাম গরীবপুরে পাকিস্তানি সেনারা ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে এবং বাঙালি তরুণীদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

বিপদ আসন্ন জেনেও ওহিদুলরা পিছু হঠলেন না। ২২ জনের দলটি বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় পৌঁছালেন সেই গ্রামে। আশ্রয় নিলেন ওই লোকের বাড়িতেই। লোকটি তাদের সম্মানে খাসি জবাই করে রান্নার আয়োজন শুরু করলেন। কিন্তু তারা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি, পরম মমতায় আপ্যায়ন করা সেই মানুষটিই গোপনে পাকিস্তানি ক্যাম্পে খবর দিয়ে এসেছেন।

তাদের বসানো হয়েছিল ঘাস কাটার এক ঘরে, যার পাশেই দিগন্তজোড়া অ্যারোলের বিল। ওহিদুল তার এলএমজি নিয়ে দরজায় পজিশন নিলেন, আর জানালা দিয়ে এসএলআর তাক করতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। দেখলেন, চারপাশ থেকে পিঁপড়ের মতো পাকিস্তানি সেনারা তাদের ঘিরে ফেলেছে। দ্রুত তারা অ্যারোলের বিলে নেমে পড়লেন।

চারদিকে পানির মধ্যে শুরু হলো জীবন-মৃত্যুর লড়াই। ওহিদুলের হাতে স্টেনগান। পাঁচশ গজ সামনে পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছুড়ছে। ধানগাছের আড়ালে মাথা ডুবিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছেন তিনি। পানির ভেতর দিয়ে ‘চু চু’ শব্দে বুলেট বয়ে যাচ্ছে। ওহিদুল স্থির হয়ে পজিশন নিলেন। ট্রিগার টিপতেই চিৎকার শোনা গেল, “ইয়া আলী!” তার নিখুঁত নিশানায় লুটিয়ে পড়ল কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা।

কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না বেশিক্ষণ। পেছন ফিরে সাঁতার দিয়ে পালানোর সময় একটি গুলি এসে বিঁধল ওহিদুলের ডান ঊরুতে। গলগল করে রক্ত বেরোতে লাগল, বিলের জল লেগে ক্ষতে হচ্ছিল তীব্র জ্বালা। কিন্তু মৃত্যুভয় আর ধরা পড়ার আতঙ্ক তখন যন্ত্রণার চেয়েও বড়। আল্লাহর নাম জপতে জপতে অস্ত্রটা কাদার নিচে লুকিয়ে তিনি গা ভাসালেন বিলের পানিতে। সেই অবস্থাতেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাতে পৌঁছালেন মুক্তারপুরে। দু-তিন দিনের বিশ্রামে একটু ধাতস্থ হয়েই আবার ফিরে গেলেন রণাঙ্গনে।

যুদ্ধের শেষের দিকে ভারতীয় সেনারা যোগ দিলে শুরু হয় সম্মিলিত আক্রমণ। হারকাণ্ডি নামক স্থানে পাকিস্তানি সেনাদের তীব্র বাধার সম্মুখীন হন তারা। ওহিদুলরা যেখানে আর্টিলারি থেকে গোলা নিক্ষেপ করছিলেন, পাকিস্তানি সেনারা পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছিল ঠিক সেখানেই। হঠাৎ একটি সেলের স্প্লিন্টার এসে ওহিদুলের ডান পায়ের হাঁটুর নিচে আঘাত হানে। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল পা। তাৎক্ষণিক কোনো চিকিৎসা না থাকায় মাঠের ঘাস চিবিয়ে জখমের জায়গায় চেপে ধরে রক্তপাত বন্ধ করেন তিনি।

আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ওহিদুল ইসলাম খানের লড়াই এখনো শেষ হয়নি। তবে এই লড়াই এখন আদর্শের। নতুন প্রজন্মের কাছে তার প্রত্যাশা অনেক। আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমরা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছি। তোমরা লেখাপড়া শিখে যোগ্য মানুষ হও এবং ভালোবাসা দিয়ে দেশটাকে এগিয়ে নাও। মনে রেখো, দুর্নীতি থাকলে কোনো জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। স্বার্থচিন্তা মানুষের বিবেককে ধ্বংস করে দেয়।”

ক্ষতচিহ্ন শরীরে বয়ে বেড়ানো এই যোদ্ধা স্বপ্ন দেখেন এমন এক বাংলাদেশের, যেখানে থাকবে না কোনো দুর্নীতি আর মানুষের বিবেক হবে কলুষমুক্ত। ওহিদুল ইসলাম খানের মতো বীরদের আত্মত্যাগের গল্পগুলোই আজ আমাদের এগিয়ে চলার প্রেরণা।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ২৬ মার্চ ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button