
নূর ইসলাম তখন নীলফামারী সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। দেশের মানুষের ওপর এমন অত্যাচার দেখে স্থির থাকতে পারেননি তিনি।
সময়টা ১৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১। হাড়কাঁপানো শীতের এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর। দিনাজপুরের খানসামা এলাকায় আত্রাই নদীর পাড় ধরে সন্তর্পণে এগোচ্ছিলেন একদল মুক্তিযোদ্ধা। লক্ষ্য- পাকিস্তানি সেনাদের হটিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া।
দলের সবার আগে ক্ষিপ্র চিতা আর পেছনে সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে এগোচ্ছেন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা এস এম নূর ইসলাম। পানি পেরিয়ে বালুচরে পা রাখতেই হঠাৎ এক বিকট শব্দে থমকে গেল চারপাশ। বারুদের কটু গন্ধ আর ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতর নূর ইসলাম নিজেকে আবিষ্কার করলেন ছিটকে পড়া অবস্থায়। দাঁড়াতে চাইলেন তিনি, কিন্তু পারলেন না।
সারা শরীর প্রবল কম্পনে থরথর করে কাঁপছে। নিজের বাঁ পায়ের দিকে চোখ পড়তেই তার হৃৎস্পন্দন যেন থেমে গেল- হাঁটুর নিচ থেকে পা-টা উড়ে গেছে, কেবল কয়েকটা রগ আর মাংসের দলা সেখানে কুৎসিতভাবে ঝুলছে।
এটি কেবল একাত্তরের কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়, বরং এক বীর যোদ্ধার জীবন বদলে যাওয়ার মুহূর্ত। এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধের শুরুটা হয়েছিল আরও মাস আটেক আগে।
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার পশ্চিম সোনা রায় গ্রামে তখন পাকিস্তানি সেনাদের তাণ্ডব তুঙ্গে। তাদের মদদ দিচ্ছে স্থানীয় মুসলিম লীগাররা। নূর ইসলামের পরিবারের দেড় বিঘা জমির ওপর ছিল বাঁশবাগান। পাকিস্তানি সেনারা সেই বাগান উজাড় করে ডোমারে তৈরি করল তাদের ‘বাঁশের কেল্লা’।
নূর ইসলাম তখন নীলফামারী সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। চোখের সামনে নিজের সম্পদ ও দেশের মানুষের ওপর এমন অত্যাচার দেখে স্থির থাকতে পারেননি তিনি। ভাবলেন, “দেশে থাকলে তো এমনিতেই মরব, তবে মার দিয়ে কেন মরব না?” মা-বোনদের রক্ষা করার জেদ নিয়ে তিনি ট্রেনিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন। বাবা নিজেই উদ্যোগী হয়ে ছেলের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।
ধাপরা ও বাকডোকরা হয়ে নূর ইসলামরা পৌঁছান শিলিগুড়ির মূর্তি ক্যাম্পে। সেখানে গুরখা রেজিমেন্টের মেজর বিবি সারকির অধীনে শুরু হয় প্রশিক্ষণ। নূর ইসলাম ছিলেন ৪ নম্বর ‘চার্লি’ উইংসে (এফএফ নম্বর ৪/২৮)। প্রশিক্ষণের জন্য ১০ হাজার তরুণের মধ্য থেকে বাছাই করা হয় ৮৫ জনকে, নূর ইসলাম ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। সাধারণ প্রশিক্ষণের পর যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, তখন গভীর রাত পর্যন্ত চলত তাদের স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স ট্রেনিং। ডিনামাইট সেট করা, হাই এক্সপ্লোসিভ চার্জ, হাতবোমা তৈরি এবং ব্রিজ-কালভার্ট ধ্বংস করার মতো মরণঘাতী সব কৌশল রপ্ত করেন তিনি।
প্রশিক্ষণ শেষে ৬ নম্বর সেক্টরে যোগ দেন নূর ইসলাম। টাঙ্গি ব্রিজ, আটোয়ারি ও খানসামা এলাকায় অসংখ্য অপারেশনে অংশ নেন তিনি। ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সদস্য হিসেবে তার মূল কাজই ছিল শত্রুর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা।
তিনি স্মৃতিচারণ করেন, “ইন্টেলিজেন্সে আমরা ছিলাম মাত্র ২ জন। রাস্তাঘাট ও ব্রিজ ওড়ানোর দরকার পড়লেই আমাদের ডাক পড়ত। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের পাহারা দিত, আর আমরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় কাজ সেরে সটকে পড়তাম।”
তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল একটি স্টেনগান, দুটি গ্রেনেড এবং একটি ভেরি লাইট পিস্তল, যা দিয়ে বিপদের সময় লাল ও সবুজ সংকেত পাঠানো হতো।
ডিসেম্বরের শুরুর দিকে ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা মিলে যৌথ আক্রমণ শুরু করলে নূর ইসলামরা পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও মুক্ত করেন। ১৩ ডিসেম্বর খানসামায় ঢোকার মুখে আত্রাই নদীর পাড়ে পাকিস্তানি সেনাদের পুঁতে রাখা অ্যান্টি-পারসোনাল মাইনের ওপর পা পড়ে তার। সেই মুহূর্তের বর্ণনায় নূর ইসলাম বলেন, “পাটা উড়ে যাওয়ার পর দেখলাম নদীর স্রোত আমার রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট দারকিনা মাছগুলো এসে আমার শরীরের ছিন্নভিন্ন মাংসের টুকরোগুলো খুঁটে খাচ্ছে। আমি সব দেখছিলাম আর ব্যথায় গোঙাচ্ছিলাম।”

কিন্তু মৃত্যু পথযাত্রী এই যোদ্ধার তেজ তখনো নিভে যায়নি। ওই মুমূর্ষু অবস্থায় হামাগুড়ি দিয়ে তিনি নিজের ড্রেসিং কিট দিয়ে পা বাঁধেন এবং বালুর নিচে থাকা আরও কয়েকটি মাইন নিষ্ক্রিয় করেন। একসময় তার জ্ঞান ঝাপসা হয়ে আসে। এমন সময় মাইন ডিটেক্টর নিয়ে এগিয়ে আসে ভারতীয় একটি দল। নূর ইসলাম শেষবারের মতো মাথা তুলে বলেন, “হাম মুক্তি হ্যায়।” সেদিনকার পাসওয়ার্ড ‘চাঁদ-সুরুজ’ উচ্চারণ করতেই তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভারতের বাকডোকরা হাসপাতালে যখন নূর ইসলামের জ্ঞান ফেরে, তখন একজন নার্স এসে তাকে প্রথম সুসংবাদটি শোনান, “আপ কা দেশ তো আজাদ হো গ্যায়া।”
স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এলেও পঙ্গুত্বের বেদনা মায়ের কাছে গোপন করতে চেয়েছিলেন তিনি। কৃত্রিম পা লাগিয়ে বাড়িতে ঘোরাঘুরি করতেন বলে মা শুরুতে কিছুই বুঝতে পারেননি। নূর ইসলাম বলেন, “রাতে দরজা বন্ধ করে কৃত্রিম পা খুলে ঘুমাতাম। কিন্তু একদিন অসাবধানতাবশত দরজা খোলা ছিল। ভোরে মা ঘরে ঢুকে যখন দেখলেন আমার এক পা নেই, তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে যে কান্না কেঁদেছিলেন, তা পৃথিবীর সব কষ্টের ঊর্ধ্বে।”
যুদ্ধের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে নূর ইসলাম একটি অভিজ্ঞতার কথা জানান। আটোয়ারি থানার কিসমত রশেয়া নামক স্থানে শান্তি কমিটির প্রধান হাফিজ চেয়ারম্যানের বাড়িতে হামলা চালিয়েছিলেন তারা। বাড়ির গোডাউনে তারা ৭০ জন মেয়েকে বিবস্ত্র ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। পাকিস্তানি সেনারা তাদের দিনের পর দিন পাশবিক নির্যাতন চালাত এবং কাপড় দিত না, যাতে তারা লজ্জায় বা দুঃখে কাপড় দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করতে না পারেন। সেই দৃশ্য আজও নূর ইসলামের স্মৃতিতে এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে।
জীবন ও যৌবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করা এই বীরের এখন একটাই চাওয়া- নতুন প্রজন্ম যেন নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা নূর ইসলাম তার লড়াইয়ের গল্প শেষ করেন এক পাহাড়সম আশা নিয়ে, “তোমরা লেখাপড়া শিখে নিজেদের যোগ্য করে তোল। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা দেশটা স্বাধীন করেছি। মনে রেখো, মানবতা, সততা ও দেশপ্রেম থাকলেই তোমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারবে।”
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১ মার্চ ২০২৬
© 2026, https:.




