কলাম

টেপরি রাণী : যুদ্ধ শেষেও যার যুদ্ধ থেমে থাকেনি

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন টেপরি রাণী বর্মণ। লাখো শহীদের রক্ত আর টেপরি রাণীর মতো নির্যাতিতার ত্যাগেই আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পরও একাত্তরে নির্যাতিত হওয়ার অপরাধে সমাজ তাকেই অপরাধী করে। ফলে তাঁর ওপর নেমে আসে সামাজিক চাপ। যা ছিল আরেক নির্যাতন।

কী সেই নির্যাতন? মুসলিম হওয়ায় একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাদের অপরাধের কোনো দোষ দেখে না সমাজের অনেকেই। ফলে পাকিস্তানিরা টেপরি রাণীকে ধর্ষণ করলেও তাদের সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় তাঁকেই। সেটি তুলে ধরতেই এই লেখার অবতারণা।

মুক্তিযোদ্ধা টেপরি রাণী বর্মণ ইহলোক ত্যাগ করেছেন গত ১৩ মে। জীবদ্দশায় স্বাধীন দেশের সমাজ তাঁকে এতটুকু সম্মানের চোখে দেখেনি। তবুও ভালো, মৃত্যুর পরে রাষ্ট্র অন্তত এই মুক্তিযোদ্ধার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানের মাধ্যমে। তাঁর মৃতদেহও আবৃত করা হয় লাল-সবুজের পতাকায়!

মুক্তিযোদ্ধা টেপরি রাণী বর্মণের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামে।

বিয়ে হলেও মুক্তিযুদ্ধের সময় টেপরি ছিলেন তাঁর বাবার বাড়িতেই। যুদ্ধ শুরু হলে পরিবার প্রস্তুতি নেয় সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যাওয়ার। ওই সময় স্থানীয় রাজাকার মকবুল হোসেন নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁর বাবা ও ভাইদের বুঝিয়ে তাঁদের নিয়ে যায় তাঁর বাড়িতে। সবাই ভাবল, আগে জান বাঁচাই, তারপর ধর্ম রক্ষা। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই রাজাকার মকবুলের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হতে থাকে।

ওই রাজাকার তাঁর দলবল পাঠিয়ে প্রথমে টেপরিদের গরু-ছাগলসহ জিনিসপত্র লুট করে বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। ফলে বাড়ি ফেরার সব পথই বন্ধ হয়ে যায়। একদিন মকবুল পাকিস্তানি সেনাদের ডেকে টেপরি রাণীকে তাঁদের হাতে তুলে দেয়।

বিভিন্ন ক্যাম্পে রেখে তাঁরা তাঁর ওপর চালাত পাশবিক নির্যাতন। অগণিত পাকিস্তানি সৈন্য তাঁকে দিনভর ধর্ষণ করত। প্রতিদিন সকালে তুলে নিত, আবার রাতে বাড়িতে রেখে যেত। পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে দীর্ঘ আট মাসের নরকবাসের পর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন টেপরি রাণী।

দেশ স্বাধীন হলে ক্যাম্প থেকে মুক্তি পান এই বীরাঙ্গনা। কিন্তু জীবনের কষ্ট থেকে মুক্তি মেলেনি তাঁর। শরীরে চলার মতো শক্তিও ছিল না। তাঁকে চিকিৎসা দিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তোলেন তাঁর বাবা। তবুও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শরীরের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধটি চলমানই ছিল।

এরপর স্বাধীন দেশে শুরু হয় তাঁর আরেক লড়াইয়ের জীবন। ভূমিষ্ঠ হয় এক পুত্রসন্তান। এই যুদ্ধশিশুর নাম রাখা হয় সুধীর বর্মণ। টেপরি রাণীর ভাষায়, “বাবা নেই, নেই তার পরিচয়; কিন্তু সে আমার গর্ভে এসেছে, দশটি মাস আমি পেটে রেখে তাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছি। কারণ, আমি যে মা।” মা হিসেবে এক যুদ্ধশিশুকে নিয়ে নতুন সংগ্রামে একাই পথ চলেছেন এই বীর নারী।

কিন্তু মায়ের সেই সম্মান দেয়নি স্বাধীন দেশের সমাজ। কটুক্তি করে মানুষ টেপরিকে ডাকত ‘জারজ সন্তানের মা’ বলে। সেই সন্তানের সঙ্গে মিশত না অন্য শিশুরা। পিতার পরিচয় না থাকায় স্কুলেও ভর্তি করানো যায়নি তাকে।

নতুন সংসারজীবনও শুরু করেছিলেন টেপরি। কিন্তু একাত্তরের পরিচয় জানাজানি হওয়ায় সেই সংসারও টেকেনি বেশিদিন। বরং শত মানুষের শত অপবাদ সহ্য করেই একাকীত্বের মাঝে জীবন কাটিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা টেপরি রাণী বর্মণ। হয়তো মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাঁর পরিপূর্ণ মুক্তি মিলল! কিন্তু স্বাধীন দেশের সমাজের প্রতি তিনি রেখে গেলেন অগণিত প্রশ্ন।

স্বাধীনতার জন্য, স্বাধীন দেশের জন্য টেপরি রাণীর মতো বীর নারীর ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে হবে প্রজন্মের মাঝে। এটি আমাদের দায়। আর এক কাজটি করতে হবে সবাই মিলেই।

আমরা বিশ্বাস করি, একাত্তরের বীরদের মৃত্যু নেই। তাঁরা বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আবার আজকের সবকিছু আগামীর বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হবে, তেমনটিও নয়। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে মুক্তিযোদ্ধা টেপরি রাণী বর্মণের ত্যাগের ইতিহাসটি জীবন্ত হয়েই থাকবে। একাত্তরের সেই ইতিহাস পাঠ করে প্রজন্ম হয়তো উপলব্ধি করতে পারবে, ‘কত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা।’

লেখাটি প্রকাশ করেছে রোকেয়া কালেকটিভ, প্রকাশকাল: ১৭ মে ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button