মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১: ‘জাগ্রত বাংলা’ পত্রিকাটি প্রকাশ করাই ছিল আমাদের যুদ্ধ

‘জাগ্রত বাংলা’য় প্রকাশিত যুদ্ধের খবর সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করত। পত্রিকাটি হাতবদল হয়ে জনমনে প্রভাব ফেলার পাশাপাশি গেরিলাদের মাধ্যমে ঢাকায় আমলাদের কাছেও পৌঁছে দেওয়া হতো, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান সরকারকে মুক্তিযুদ্ধের স্বরূপ জানানো।

“গ্রামে তখন মাঝেমধ্যেই আর্মি আসত। ‘আর্মি আসতাছে’ শুনলেই মানুষ যে যেভাবে পারছে গাট্টিবস্তা নিয়েই ছুটে পালিয়েছে। আর্মি চলে গেলে আবার ফিরে আসছে।

বড় রাস্তার পাশেই ছিল আমাদের বাড়ি। মানুষের এই ছুটেচলা দেখতাম বাড়ি থেকেই।

গ্রামে গ্রামে লুটপাট হচ্ছিল তখন। স্থানীয় শান্তিকমিটির লোকেরা এ কাজে যুক্ত ছিল। ঘোষণা দিয়েই ওরা একদিন উত্তর পাড়ায় আরেকদিন পাল পাড়ায় লুটপাট ও অত্যাচার করত।

এগুলো দেখে ঠিক থাকতে পারতাম না। বড় ভাই কামরুল ইসলাম তখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি বললেন, কিছু একটা করতে হবে! আমরা তখন একটা স্বেচ্ছাসেবক দল করি। কাজ ছিল রাতে গ্রামের বাড়িগুলো পাহাড়া দেয়া। বিশেষ করে হিন্দুদেরও রক্ষা করা। রাতে দলবেধে আমরা বের হতাম। নানাভাবে শব্দ করে সবাইকে জানিয়ে দিতামÑ ‘আমরা জেগে আছি’।

এসব কারণে শান্তিকমিটির লোকেরা আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। নানাভাবে চাপও দিত ওরা। বলতÑ‘তোমরা বড় বাড়ির মানুষ। আমরা চাই না তোমাদের আঘাত করতে। কিন্তু তোমরা যা চাচ্ছ আর করছো তা আমরা হতে দিবো না।’

ওদের কথায় ভয় পেতাম না। তবে নানা শন্কায় কাটছিল দিনগুলো।

মুক্তিযুদ্ধকালীন নানা ঘটনার কথা এভাবেই তুলে ধরেন মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শফিকুল ইসলাম।

তার বাড়ি ময়মনসিংহে, ভালুকা উপজেলার ধীতপুর গ্রামে। এক সকালে তার সঙ্গে আলাপ চলে যুদ্ধদিনের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে।

শফিকুলের বাবার নাম আব্দুর রউফ আর মা খোদেজা বেগম। ছয় ভাই ও চার বোনের সংসারে তিনি তৃতীয় সন্তান। লেখাপড়ায় হাতেখড়ি ধীতপুর প্রাইমারী স্কুলে। তিনি এসএসসি পাশ করেন ১৯৭০ সালে, কান্দিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। অতঃপর চলে যান ঢাকায়, চাচার বাড়িতে। ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। একাত্তরে ছিলেন ইন্টারমিডিয়েট ফাস্ট ইয়ারের ছাত্র।

আলাপচারিতায় ফিরে আসি একাত্তরে। শফিকুলও বলে যান ওইসময়ের নানা ঘটনার কথা।

তার ভাষায়, ‘অনেকেই তখন মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছে। স্বাধীনতার পক্ষে আমরা যারা দেশেই রয়ে গেলাম আমাদের এক ধরণের মানসিক পীড়ন তৈরি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কিছু করা উচিত। কিন্তু কি করব তখনও বুঝে উঠতে পারছি না।

জুলাইয়ের প্রথম দিকের ঘটনা। প্রথমবার দেখি মুক্তিযোদ্ধাদের। এক সকালে কিছু মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র হাতে দলবেধে যাচ্ছিল। রাস্তার পাশের বাড়িগুলো থেকে অবাক হয়ে মানুষ দেখছিল তাদের। মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আফসার উদ্দিন আহমেদ সাহেব ছিলেন ওই মুক্তিযোদ্ধা দলটির প্রধান। (আফসার উদ্দিন আহমেদের দৃঢ় নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছিল অসামান্য এক গেরিলা বাহিনী, যা পরিচিত ছিল ‘আফসার বাহিনী’ নামে। এই বাহিনী একাত্তরের ২৪২ দিনে ১৫০টি সম্মুখ সমরে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ, গাজীপুর, টাঙ্গাইলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা)।

এরপর পাকিস্তানবাহিনী ভালুকায় এলে আফসার বাহিনীর সঙ্গে একটা যুদ্ধ হয়। পরে গ্রামে হেলিকপ্টারে নামে পাকিস্তানি আর্মি। তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসে শান্তিকমিটি ও রাজাকারের লোকেরা। তাদের ভয়ে তখন তটস্থ থাকতাম আমরা।’

তবুও গ্রামের ভেতর স্বাধীনতার পক্ষে নানা ধরণের উদ্যোগ নিতে থাকেন শফিকুলরা। ছোট ছোট উদ্যোগের গুরুত্বও তখন অন্যরকম ছিল।

তিনি বললেন যেভাবেÑ ‘ভয় থাকলেও মুক্তিযোদ্ধের পক্ষে পোস্টার লাগাই আমরা। সঙ্গে ছিলেন আব্দুর রহমান নামে চাচা সম্পর্কের একজন। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে কলম বানিয়ে আর কালি তৈরি করে পোস্টার লিখেছি। কাচারি থেকে আনতাম কাগজ। পোস্টারে লিখতাম এমনÑ ‘রাজাকার ও মুসলিম লীগের লোকেরা সাবধান। পাকিস্তানি দালালেরা সাবধান। আমার কিন্তু আছি।’

পোস্টারগুলো গ্রামের বিভিন্ন গাছের গায়ে লাগিয়ে দিই। রাত জেগে করতাম কাজগুলো। দিনের বেলায় মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখতে যেতাম। দেখতাম, অনেকেই দাড়িয়ে পড়ছে আর বলছে  ‘মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামেও চলে আসছে’। তাদের চোখেমুখে কেমন যেন আনন্দ। তা দেখে খুব ভালো লাগত।’

একাত্তরে প্রকাশিত ‘জাগ্রত বাংলা’ পত্রিকার একাংশ।

শফিকুলদের মনে তখন দেশ স্বাধীনের চিন্তা। গোটা পরিবার ছিল আওয়ামী লীগের সমর্থক। ফলে পাকিস্তানের এদেশীয় দোসররা যেকোনো সময় বাড়ি পুড়িয়ে দিতে পারেÑএমন শংকাও ছিল।

ভালুকায় রাজাকার কমান্ডার ছিল ভেলাখা। তাকে সঙ্গে নিয়েই পাকিস্তানি সেনারা বাড়ি বাড়ি হানা দিত। আগস্ট মাসে টেলিফোনের খুঁটিগুলো মুক্তিযোদ্ধারা ভেঙে দেয়। এর দায় এসে পরে শফিকুল ও আব্দুর রহমানের ওপর। ফলে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা তাদের ধরার চেষ্টা করে।

এরপর কী ঘটল?

শফিকুল বলেনÑ ‘সম্পর্কে নানা হন এমন একজন এসে মাকে বলেনÑ ‘শফিকুলকে তাড়াতাড়ি ভাগতে বলো। আর্মি আর রাজাকাররা ওকে ধরতে আসছে। তারে মাইরা ফালাইবো।’

পুকুরের পশ্চিম ঘাটে কাজ করছিলাম। তিনি এসে চিৎকার দিয়ে বলেনÑ‘তাড়াতাড়ি ভাগ।’

বুঝে যাই পাকিস্তানিরা আসছে। দৌড়ে অনেক দূরে চলে যাই। এক বাড়িতে গিয়া আশ্রয় নিই। বাড়িতে ছিলেন এক মহিলা। আমাকে চিনতেন তিনি।

বললেনÑ কি হইছে বাবা?

বলিÑআর্মি আসছে আমারে খুঁজতাছে।

শুনেই তাড়াতাড়ি ধান রাখার বড় ডোলাঘরে নিয়ে একটা ডোলার ভেতর লুকিয়া থাকতে বললেন। ওখানেই বসেছিলাম। ফলে রাজাকার ও আর্মি এসেও খুঁজে পায়নি।

কিন্তু ওইদিন ধরা পড়লে ওই বাড়ির সবাইকেও ওরা মেরে ফেলত। একাত্তরে এমন ঝুঁকি নিয়েই মানুষ আশ্রয় দিয়েছে মানুষকে। আর এমন মুক্তিকামী বাঙালিরা ছিল বলেই দেশটা তাড়াতাড়ি স্বাধীন হয়েছে।”

এরপরই শফিকুল মশাখালি স্টেশন থেকে ট্রেনে চলে যান ঢাকায়। কলেজের ক্লাস তখনও চলছিল। কিন্তু তার মন পড়ে থাকে ভালুকাতে। আটদিন পরেই গ্রামে ফিরেন তিনি।

লেখালেখির প্রতি তার জোক ছিল ছোটবেলা থেকেই। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রেডিও শুনতেন। গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলোও লিখে রাখতেন একটা খাতায়। এই অভ্যেসটাই পরে কাজে লেগে যায়।

একাত্তরে প্রকাশিত ‘জাগ্রত বাংলা’ পত্রিকার একাংশ।

মেজর আফসার উদ্দিন আহমেদের বাহিনীতে কীভাবে এবং কোথায় যোগ দিলেন?

তার ভাষায়, ‘সেপ্টেম্বর মাস হবে। ভালুকায় ঢালুয়া ক্যাম্পে যাই প্রথমে। ওখানেই আফসার বাহিনীর হেড ক্যাম্প ছিল। বিভিন্ন জায়গায়ও ছিল দলটির ছোট ছোট ক্যাম্প।

তাঁকে গিয়েই বললামÑ মুক্তিযুদ্ধ করতে চাই।

শুনে তিনি বললেন, তুমি নাকি লেখালেখি করো। আমাদের পত্রিকা আছেÑ ‘জাগ্রত বাংলা’। তুমি সেখানে জয়েন করো।’

রাজি হতেই পরেরদিনই একটা চিঠি লিখে সেখানে পাঠিয়ে দেন।

মোজাম্মেল বেগ নামে এক মুক্তিযোদ্ধা আমাকে নিয়ে যান জাগ্রত বাংলার অফিসে। ভালুকার ডাকাতিয়ায় ছিল অফিসটি। ক্যাম্প থেকে তা তিন মাইল দূরে। জায়গাটিকে আমরা বলতাম আজাদ নগর।’

কেমন পত্রিকা ছিল এটি?

‘এটা ছিল হাতে লেখা ও সাইক্লোস্টাইল করা পত্রিকা। আমি গিয়ে পত্রিকাটিতে শামসুদ্দিন আবুল কালাম ( তিনি লেখালেখি করেন এস এ কালাম নামে), আব্দুল খালেক, মাসুদ আলী এই তিনজনকে। মাসুদ আলী লেখার কাজটা করতেন, স্টেনসিল কাটতেন, কার্টুন আঁকতেন ও আর্ট করতেন। তিনি ছিলেন ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্র। আব্দুল খালেক ছিলেন টাঙ্গাইলের করোটিয়া সা’দত কলেজের ছাত্র। উনার কাজ ছিল সাইক্লোস্টাইন মেশিনটা চালানো। তখন শামসুদ্দিন আবুল কালাম ভুয়াপুর কলেজের ছাত্র ছিলেন। তিনি পত্রিকার সকল কাজের সমন্বয় করতেন। রেডিও শুনে শুনে খবর লেখা, সেটা মাসুদের কাছে দেয়া, স্টেনসিল পেপার ও কাগজ সংগ্রহ করা এবং সবার থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা করাÑ এসব দায়িত্বও ছিল তার।

আমাকে প্রথম কাজ দেয়া হয় টেনসিল কাটা, রেডিও শুনে শুনে খবরও লিখতাম। সকাল থেকে শুরু হয়ে রাত ৩-৪ পর্যন্ত চলত কাজ। পদের নাম অ্যাসিস্টেন এডিটর। জাগ্রত বাংলার সম্পাদক ছিলেন হাফিজুদ্দিন আহমেদ। তার নেতৃত্বেই আমরা কাজগুলো করতাম। কিন্তু সবার ওপরে প্রকাশকের দায়িত্বে ছিলেন আফসার উদ্দিন আহমেদ। তিনি পত্রিকার সবটাই দেখতেন।’

তখন ‘জাগ্রত বাংলা’ পত্রিকাটির জন্য খবর সংগ্রহের মাধ্যম ছিল কয়েকটি। মুক্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে আসত খবর। আবার আফসার সাহেব নিজে সপ্তাহের একটা কার্যবিবরণী পাঠাতেন। এছাড়া কিছু এজেন্ট ছিলেন যারা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাদের কাছ থেকেও আসত নানা খবর।

আরেকটি বড় মাধ্যম ছিল রেডিও। একটা থ্রি ব্র্যান্ড রেডিও ছিল তাদের। সেখানে আকাশবাণী, বিবিসি বাংলা, ভয়েস অব আমেরিকা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনে শুনে নানা খবর লিপিবদ্ধ করা হতো। এভাবেই পত্রিকার খবর সংগ্রহ করতেন শফিকুলরা।

পত্রিকাটি ছাপা হতো ৫০০ কপি। আফসার সাহেবের ক্যাম্পের জন্য দেয়া হতো ৩০০টি। বাকি ২০০টি বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন জায়গায় বিলি করা হতো। মূলত জাগ্রত বাংলায় আফসার ও কাদেরীয়া বাহিনীর খবরই ছাপা হতো বেশি।

মুুক্তিযুদ্ধ তখন চলছে। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করছে মুক্তিযোদ্ধারা। ওই সময়টাকে ‘জাগ্রত বাংলা’ পত্রিকা প্রকাশের এ উদ্যোগকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শফিকুল ইসলাম তুলে ধরলেন নিজের মতটিÑ‘মুক্তিযোদ্ধারা যে দেশের জন্য যুদ্ধ করছেন। সেই খবরগুলোই তখন ছাপা হতো জাগ্রত বাংলায়। খবরগুলো সাধারণ মানুষের মনে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে প্রভাব সৃষ্টি করত। মুক্তিযোদ্ধাদেরও তা সাহসী করে তোলে। পত্রিকাটি একজনের হাত বেয়ে আরেকজনের কাছে চলে যেত। কিছু কপি পাঠানো হতো ঢাকায়। ডাক বিভাগের মাধ্যমে বড় বড় আমলাদের ঠিকানায় পাঠানো হতো। মূলত তাদের মাধ্যমে পাকিস্তান সরকারকে মুক্তিযুদ্ধটাকে জানানোই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।’

আফসার বাহিনী কেন পত্রিকা প্রকাশের মতো এমন উদ্যোগ নিয়েছিল?

‘যতটুকু জানি তখন ডাকাতিয়ায় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কিছু কর্মী প্রথমে হাতে লিখে পত্রিকা বের করা শুরু করে। তারাই মূল উদ্যোক্তা। পরে আফসার সাহেব তাদের সাথে যুক্ত হন এবং এটি প্রকাশের দায়িত্ব নেন। তার সময়েই টাইপ মেশিন, সাইক্লোস্টাইল মেশিন আনা হয়।’

একাত্তরে প্রকাশিত ‘জাগ্রত বাংলা’ পত্রিকার একাংশ।

শফিকুল আরও বলেন, ‘একাত্তরে আমাদের মূল যুদ্ধটা ছিল জাগ্রত বাংলা পত্রিকাটি প্রকাশ করা। কলমই ছিল আমার অস্ত্র। ওটাই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিবাহিনীর সাথে পুরোপুরি সম্পৃক্ত থেকেই কাজটি করেছি আমরা।

মুক্তিযুদ্ধকালীন জাগ্রত বাংলার ৯টা সংখ্যা বের হয়। নিয়মিত বের হতো না। নির্ভর করত কাগজ আর টেনসিলের ওপর। মূল্য ছিল ৩০ পয়সা। আজাদ নগর থেকে প্রকাশিত হতো। জাগ্রত বাংলায় যুক্ত ছিলাম ৫ম সংখ্যা থেকে শেষ সংখ্যা প্রকাশ পর্যন্ত।

পত্রিকা প্রকাশের ওইসময়কার স্মৃতিগুলো এখনও মনে ভাসে। মুক্তিযুদ্ধে স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত সংবাদপত্রেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাই সে ইতিহাসও তুলে ধরা প্রয়োজন। জাগ্রত বাংলার মতো পত্রিকাগুলোই একাত্তরকে সাক্ষ্য দেয়। এখন এটি মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিলও।’

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও মনবোল বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল জাগ্রত বাংলার মতো আঞ্চলিক পত্রিকাগুলো। পত্রিকাগুলোতে যুক্ত কলমযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা যোদ্ধার চেয়েও কম ছিলেন না। ফলে একাত্তরে তাদের অবদানকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

স্বাধীনতা লাভের পর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে এমবিবিএস-এ ভর্তি হন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। পাশ করার পর বিসিএস দিয়ে সরকারী চাকরি নেন। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের চক্ষু বিভাগের চেয়ারম্যান হন। বিশ^বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিষ্ট্রারও ছিলেন। অবসরে যান ২০১৯ এ।

কিছুদিন আগেও মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার, বিভ্রান্তি ও বির্তকিত করার চেষ্টা হয়েছে। একাত্তরে আপনি দেশের জন্য কলম ধরেছেন। আসলে কি মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে চিন্তা করা সম্ভব?

মুচকি হেসে এই মুক্তিযোদ্ধা বললেন যেভাবে, ‘হাস্যকর কথা। এটা কোনো মতেই সম্ভব না। যারা বলছে তারা তো ওইসময়ের প্রজন্ম না। যে কারণে তারা সেটা উপলব্ধিও করতে পারছে না। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য। তখন আমি ১৭ বছরের যুবক। দেশকে নিয়ে যেভাবে ভাবতাম, মানুষকেও ভালোবাসতাম। এখন এই বয়সী কাউকে তো তেমন দেখি না। সব তো চলছে উল্টা।’

অন্যের সমালোচনার আগে নিজেদের আত্ম সমালোচনাটাও প্রয়োজন। এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে এই বীর বলেন, ‘যারা বলি আমরা আলোকিত মানুষ, যারা বলি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ। বুকে হাত দিয়া তারা কি বলতে পারবেন যে, তাদের সন্তানরা দেশে আছেন। খোঁজ নিয়ে দেখেন তাদের অধিকাংশের সন্তানকেই তারা বিদেশ পাঠিয়ে দিয়েছেন। তাহলে এদেশের প্রতি ভালোবাসা থাকবে কীভাবে।’

এখনও যারা শোনেন আমি মুক্তিযোদ্ধা। অনেক শিশু-কিশোররা আমাকে স্পর্শ করতে চায়। এই যে তাদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার প্রতি এক ধরণের আকাঙ্খা আর প্রত্যাশা, এটা দিনকে দিন বাড়বেই। এটা নষ্ট হওয়ার নয়। এমন বিশ^াস বুকে নিয়ে দেশের জন্য আজও স্বপ্নের বীজ বুনেন মুক্তিযোদ্ধা ডা. মোঃ শফিফুল ইসলাম।

যদি দেশকে ভালোবাসি তাহলে এদেশে একদিন মুক্তির পতাকা হাতে নিয়েই নতুন প্রজন্ম তাদের পথটি চিনে নিবে। শেষে প্রজন্মের উদ্দেশ্যে এই মুক্তিযোদ্ধা শুধু বললেনÑ‘একাত্তরে আমরা দেশটা স্বাধীন করেছি। স্বাধীন এই দেশটা আমাদেরই। তোমরা দেশের জন্য কাজ করো। নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলো। মুক্তিযুদ্ধকে কখনও অসম্মান হতে দিও না। কেননা এটাই তোমার গৌরব, বেদনা আর শেকড়ের ইতিহাস।’

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ৮ মে ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button