
“রাতে জাইগা উঠি শহীদদের গোঙানি আর কান্নার শব্দে।”
একাত্তর সালের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, তা জীবন্ত হয়ে আছে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার ক্ষতবিক্ষত শরীরে আর বিনিদ্র রজনীর যন্ত্রণায়। গভীর রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিনাইর গ্রামের এক বীর যোদ্ধার কানে ভেসে আসে কামানের গর্জন আর সহযোদ্ধাদের অন্তিম আর্তনাদ।
তিনি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোহন মিয়া। তার শরীরজুড়ে একাত্তরের মানচিত্র, আর মনে গেঁথে আছে অমোচনীয় এক ঋণের ভার। ২৫ মার্চের সেই কালরাত্রির আগেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল জয়দেবপুর। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের পরই মোহন মিয়া পাড়ি জমান তেলিয়াপাড়া হয়ে ৩ নম্বর সেক্টরের হেজামারা হেডকোয়ার্টারে।
সাহসিকতার কারণে তিনি আলফা কোম্পানির কলাগাইছা ক্যাম্পের এক নম্বর প্লাটুনের কমান্ডার নিযুক্ত হন। তার অধীনে ছিল ৪০ জন অকুতোভয় যোদ্ধা। গেরিলা কায়দায় একের পর এক অপারেশন চালিয়েছেন আখাউড়া ইপিআর হেডকোয়ার্টার, আজমপুর রেল কলোনি ও সিংগাইরবিল এলাকায়। রাতের আঁধারে শত্রুর ভবন, ব্রিজ আর বিদ্যুৎকেন্দ্র উড়িয়ে দিয়ে ভোরের আগেই ফিরে আসতেন ক্যাম্পে।
সে সময়ের বাস্তবচিত্র ছিল ভয়াবহ। মোহন মিয়া স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, কোনো সাধারণ মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের এক গ্লাস পানি খাওয়ালে পরের দিনই রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা সেই ঘর পুড়িয়ে দিত। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার অপরাধে পুরো পরিবারকে হত্যার ঘটনাও ছিল নিত্যদিনের। প্রচণ্ড দেশপ্রেম না থাকলে এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকা ছিল দুঃসাধ্য।
মোহন মিয়ার যুদ্ধযাত্রা কেবল ৩ নম্বর সেক্টরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মাঝপথে তাকে পাঠানো হয় ভারতের লোহারবন ট্রেনিং সেন্টারে, যেখানে তিনি ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে নতুন যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেন। জুলাইয়ের শেষে ৪ নম্বর সেক্টরের অধীনে কানাইঘাট, জুড়ি, ভাঙা, বড়লেখা, লাতু, জকিগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকায় বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন তিনি। মাসখানেক পর নিজ এলাকায় অপারেশনের নির্দেশ এলে পুনরায় ৩ নম্বর সেক্টরে ফিরে আসেন এই নির্ভীক যোদ্ধা।
মোহন মিয়ার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর। লক্ষ্য ছিল আখাউড়া থেকে ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়া। মুক্তিযোদ্ধাদের ঠিক পেছনেই ছিল ভারতীয় মিত্রবাহিনী। পাকিস্তানিরা তখন উজানিশা, কোড্ডা, সুলতানপুর আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শক্ত প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছে। আখাউড়া থেকে মুকুন্দপুর পর্যন্ত তারা বড় একটি খাল খনন করেছিল যাতে মুক্তিযোদ্ধারা ট্যাংক নিয়ে এগোতে না পারেন।
সেদিন সকালে পাকিস্তানি বাহিনী চারটি যুদ্ধবিমান নিয়ে আক্রমণ চালায়। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে কুমিল্লা ও নবীনগরের আকাশে তিনটি বিমানই ধ্বংস হয়। মোহন মিয়ার পজিশন ছিল একটি পেয়ারা ও কাঁঠাল বাগানের বাংকারে। চারদিকে তখন মুহুর্মুহু আর্টিলারি শেল আর গুলির শব্দ।
মোহন মিয়া বলেন, “পাশের বাংকারেই ছিল আমার সহযোদ্ধা শফিক। হঠাৎ একটা আর্টিলারি এসে পড়ল ওর ওপর। তাকিয়ে দেখি শফিকের পা দুটো বাংকারে পড়ে আছে, আর দেহটা ঝুলে আছে গাছের ডালে। কয়েক মিনিট পর একইভাবে শহীদ হলো আরেক সহযোদ্ধা মাহবুব। তাদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও ছিল না।”
“বিকেল তখন প্রায় পাঁচটা, আকাশটা সূর্যের রক্তিম আভায় লাল। হঠাৎ অনুভব করলাম আমার শরীর ঠিকমতো কাজ করছে না। বুঝতে পারিনি পাকিস্তানি সেনার বুলেট আমার বুক, ডান হাত, পেট আর পা ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। এরপর সব অন্ধকার হয়ে এলো।”
আহত মোহন মিয়াকে প্রথমে আগরতলা এবং পরে গৌহাটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পাকিস্তানি বুলেটে তার ডান হাতের প্রধান রগটি ছিঁড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকরা হাতটি কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর সরকারি সহায়তায় তাকে পাঠানো হয় জার্মানিতে। সেখানকার চিকিৎসকদের নিপুণ অস্ত্রোপচারে তার হাতে কৃত্রিম রগ লাগানো হয়, যা দিয়ে আজও তিনি হাতটি সচল রেখেছেন।
তবে সেই ক্ষত আজও শুকায়নি। শরীরে বুলেটের ‘পয়জন’ বা বিষক্রিয়া রয়ে গেছে। আজও দিনের মধ্যে ২০ থেকে ২৫ বার বমি করতে হয় তাকে। মোহন মিয়ার যুদ্ধ যেন একাত্তরেই শেষ হয়ে যায়নি, বরং প্রতিদিন তিলে তিলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়ে যাচ্ছেন তিনি।
শারীরিক কষ্টের চেয়েও মানসিক যন্ত্রণা মোহন মিয়াকে বেশি দগ্ধ করে। তিনি ডুকরে কেঁদে ওঠেন যখন স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠে শফিক আর মাহবুবের রক্তাক্ত দেহ। তিনি বলেন, “আমি আজও ঘুমাতে পারি না। চোখ বুজলেই দেখি শফিক আর মাহবুবের নিথর শরীর। রাতে শহীদদের গোঙানি আর কান্নার শব্দে জেগে উঠি। মনে হয় এখনই বুঝি আর্টিলারি ফাটছে। শরীর ঘামতে থাকে। একাত্তরের সেই শহীদরা আমায় আজও ঘুমাতে দেয় না।”
মোহন মিয়ার চোখের পানি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই স্বাধীনতার লাল সূর্যটা কত রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত। তার মতো অগণিত বীরের ত্যাগের ঋণ শোধ করার সাধ্য আমাদের নেই, তবে তাদের এই বীরত্বগাথা পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়ে চিরস্থায়ী করে রাখাই হতে পারে আমাদের ক্ষুদ্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ৩০ মার্চ ২০২৬
© 2026, https:.




