
“শরীরের ক্ষত মুছে যায়, কিন্তু স্বাধীনতার গর্ব চিরস্থায়ী।”
একাত্তর সালের এপ্রিল মাস। যশোরের দিগন্ত তখন পাকিস্তানি সেনাদের জ্বালিয়ে দেওয়া গ্রামের লেলিহান শিখায় রক্তাভ। চারদিকে হাহাকার আর ধ্বংসস্তূপ। শহরের কোলঘেঁষা গ্রামগুলো যখন একের পর এক ভস্মীভূত হচ্ছে, ঠিক তখন জীবন বাঁচাতে সপরিবারে মণিরামপুর থানার ভোজঘাটি গ্রামে আশ্রয় নেন তরুণ মোহাম্মদ আবদুল লতিফ।
কিন্তু ঘরকুনো হয়ে বসে থাকার পাত্র তিনি ছিলেন না। মা আর বোনকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেই একদিন ঘর ছাড়লেন তিনি। মনে তখন একটাই পণ- “মরতে যদি হয়, তবে লড়াই করেই মরব।”
শুরু হলো এক অনিশ্চিত কিন্তু সাহসী যাত্রা। পায়ে হেঁটে হাসনাবাগ আর কালিগঞ্জ পেরিয়ে ভারতের হিঙ্গলগঞ্জ। সেখান থেকে বশিরহাট হয়ে বনগাঁর চাপাবাড়িয়া ইয়ুথ ক্যাম্প। ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন শাহ হাদিউজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মুখার্জি। সেখান থেকে সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় বিহারের সিংভূম জেলার চাকুলিয়া ক্যান্টনমেন্টে।
পাহাড়ের ওপর তাঁবু খাটিয়ে চলত পাঁচ সপ্তাহের সেই হাড়ভাঙা খাটুনি। প্রতিকূল পরিবেশে বুনো সাপের কামড়ে প্রাণ হারান দুই সহযোদ্ধা। মৃত্যুভয় গ্রাস করতে চাইলেও দেশের মুক্তির নেশা ছিল প্রবল। রাইফেল, এসএলআর, এলএমজি আর টুইনস মর্টারের গর্জন তখন তাদের নিত্যসঙ্গী। সাত দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিলেন শুধু এক্সপ্লোসিভ বা বিস্ফোরকের ওপর।
সেই কঠোর দিনগুলোতে তাদের মনোবল জোগাতে ক্যাম্পে হাজির হয়েছিলেন প্রধান সেনাপতি আতাউল গনি ওসমানী ও অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ। প্রশিক্ষণ শেষে বীর যোদ্ধাদের আনা হয় কল্যাণীতে। সেখান থেকে বাছাই করা ২০০ জনকে পাঠানো হয় অ্যাকশন ক্যাম্পে। লতিফদের ঠাঁই হলো আট নম্বর সেক্টরের বয়রা সাব-সেক্টরে, যার নেতৃত্বে ছিলেন কমান্ডার কাজী নাজমুল হুদা।
একদিন কমান্ডার ঘোষণা করলেন, “ছাত্রদের মধ্য থেকে যারা দক্ষ, তারা গেরিলা অপারেশন করবে।” আলাউদ্দিন, কোরবান ও লতিফসহ দশজন সাহসী তরুণকে নিয়ে গঠিত হলো গেরিলা দল। কমান্ডারের দায়িত্ব বর্তালো লতিফের কাঁধে। শুরু হলো যমদূতের মতো অপারেশন। চুরামনকাঠি রেলস্টেশন (বর্তমান মুন্সি মেহেরউল্লাহ স্টেশন), হালশা, ছুটিপুর, কায়েমখোলা কি শাহবাজপুর- সবখানেই লতিফদের গেরিলা হামলায় দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী।
গেরিলাদের কাজ ছিল বিচিত্র ও ঝুঁকিপূর্ণ। দিনের আলোয় তারা সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে থাকতেন, আর রাতের অন্ধকারে হয়ে উঠতেন কালবৈশাখী। রেললাইন উপড়ে ফেলা, কালভার্ট ধ্বংস করা কিংবা গ্রিডলাইনের পিলার উড়িয়ে দিয়ে শত্রু সেনাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। লতিফ ছিলেন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ, তাই বড় কোনো ধ্বংসাত্মক অভিযানের ডাক পড়লেই ডাক আসত তার।
কিন্তু ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১- দিনটি লতিফের জীবনে চিরস্থায়ী এক ট্র্যাজেডি আর বীরত্বের সাক্ষী হয়ে থাকল। সকাল ১১টার দিকে যশোর শহর শত্রু মুক্ত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী একযোগে আক্রমণ শুরু করে। আকাশ থেকে ভারতীয় বিমানের গোলাবর্ষণ আর স্থলভাগে পাকিস্তানি সেনাদের পালটা শেলিং, সব মিলিয়ে রণক্ষেত্র তখন আগুনের নরক।
শংকরপুর এলাকা দিয়ে লতিফরা এগোচ্ছিলেন রাজারহাটের দিকে। হঠাৎ আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো শেল পড়তে শুরু করে। আত্মরক্ষার জন্য পাঁচ সহযোদ্ধাসহ দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন লতিফ। চোখের সামনেই শেলের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে লুটিয়ে পড়লেন বঙ্কিম আর কাউসার।
মৃত্যু যখন হাতছানি দিচ্ছে, লতিফ তখন জীবন বাঁচাতে এক বাংকারের ভেতর লাফিয়ে পড়েন। শরীরের উপরের অংশ ভেতরে ঢুকলেও দুটি পা রয়ে যায় বাঙ্কারের বাইরে। ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি শেলের শত শত স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয় তার দুই পায়ে।
সেদিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা মনে পড়লে আজও আনমনা হয়ে যান লতিফ। চোখ ভিজে আসে নোনা জলে। তিনি স্মৃতিচারণ করেন, “সারা শরীর জ্বলছিল। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছিল। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল মায়ের মুখ। পাশে ছিল কচুরিপানা ভরা পুকুর, এক চুমুক পানি খাওয়ার চেষ্টায় উপুড় হতেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ি।”
পরদিন সকালে যখন তার জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি যশোরের ফাতেমা ক্যাথলিক হাসপাতালে। স্প্লিন্টারের আঘাতে তার বাঁ পায়ের হাড় গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকদের আর কোনো উপায় ছিল না। জীবন বাঁচাতে হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয় সেই পা। অন্য পা থেকেও মাংস খুবলে নিয়েছিল ঘাতক স্প্লিন্টার।
লতিফ যখন হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বাইরে উড়ছিল বিজয়ের পতাকা। যশোর শহর তখন হানাদারমুক্ত। নিজের হারানো পায়ের দিকে তাকিয়ে আজও ব্যথিত হন না তিনি, বরং বুক চিরে আসে দীর্ঘশ্বাস মিশ্রিত এক তৃপ্তির হাসি। তার ভাষ্যমতে, “আফসোস নেই, বরং স্বাধীনতার জন্য পা হারিয়ে আমি গর্বিত। আমার এই ত্যাগ তো আগামী প্রজন্মের জন্য।”
যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া রেলগেট এলাকার এই বীর যোদ্ধা আজও স্বপ্ন দেখেন এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। তবে তার স্বপ্নপূরণের ভার তিনি তুলে দিতে চান উত্তরসূরিদের হাতে। তরুণদের উদ্দেশে তার আহ্বান- “মেধা, সততা আর দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হও। দুর্নীতি আর সাম্প্রদায়িকতার কোনো ঠাঁই যেন না হয় এ দেশে। মনে রেখ, সবার উপরে দেশ। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের সেই দেশ গড়ার কারিগর তোমরাই।”
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ৩১ মার্চ ২০২৬
© 2026, https:.




