বই-আলোচনা

একাত্তরের অবিনাশী আখ্যান

অনুরুদ্ধ গোস্বামী

মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর আক্রমণের মধ্য দিয়ে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। ৩০ লাখ শহীদ, বীরাঙ্গনা ও অগণিত মুক্তিযোদ্ধার মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মূলত রাজনৈতিক বয়ানের ভেতরেই অনেকটা সীমাবদ্ধ থেকেছে।

ফলে আড়ালেই থেকে গেছে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ, ছোট ছোট ঘটনা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সম্মুখ লড়াইয়ের অজানা ইতিহাস। ‘মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী ঘটনামালা’ গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সালেক খোকন সেই অনালোচিত ও অপ্রকাশিত ঘটনাগুলোই সামনে এনেছেন।

সালেক খোকন তাঁর এই গ্রন্থে ৫০টি শিরোনামে তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের ঘটনামালা। বইটিতে তিনি ৪০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার সংকলন করেছেন।

সূচির শুরুতেই স্থান পেয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ ফাতেমা আলীর এক করুণ ও বীরত্বগাঁথা ইতিহাস। ১৯৭১ সালে ফাতেমা আলী ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। তাঁর স্বামী পাকিস্তানপন্থী হলেও বাবা ছিলেন নৌকার মহাজন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের একনিষ্ঠ সহযোগী। সেই অপরাধে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী তাঁদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।

ফাতেমা আলী সেদিন প্রাণে বাঁচলেও তাঁর চোখের সামনেই পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে হত্যা করে তাঁর তিন ভাই ও ছোট বোনকে।

কালের কণ্ঠ, ৩ এপ্রিল ২০২৬

পরবর্তীকালে তাঁকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যাম্পে। সেখানে পানির বদলে তাঁকে প্রস্রাব খাওয়ানো হতো, সারা শরীরে সিগারেটের আগুনের ছেঁকা দিয়ে চলত পৈশাচিক মধ্যযুগীয় বর্বরতা। পাকিস্তানি সেনাদের সেই বর্বরোচিত নির্যাতনেই ফাতেমা আলীর অনাগত সন্তানটি গর্ভেই মারা যায়। পাকিস্তানি সেনাদের হাত থেকে এই মুক্তিযোদ্ধা কিভাবে মুক্ত হলেন এবং পরবর্তীকালে স্বাধীনতার জন্য কিভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন, তা-ও তুলে ধরা হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী ঘটনামালা’ গ্রন্থে।

বইটির দ্বিতীয় আখ্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা অমল কৃষ্ণ গোস্বামীর (দিলীপ) স্মৃতি নিয়ে। তাঁর বাড়ি পাবনা শহরে। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের ছাত্র। ২৫ মার্চের সেই বিভীষিকাময় কালরাতে মারণাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পাবনা শহরে ঢুকে পড়ে বিসিক শিল্পনগরীতে ঘাঁটি স্থাপন করে এবং তৎকালীন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনটি দখলে নেয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের খানের নেতৃত্বে মুক্তিকামী জনতা তখন গড়ে তোলে ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ। ২৮ মার্চ ভোরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে হাজার হাজার মানুষ লাঠি, ফালা, সড়কি আর বন্দুক নিয়ে ঘিরে ফেলে হানাদারদের ঘাঁটি। পুলিশ ও ছাত্র-জনতার সেই সম্মিলিত প্রতিরোধে কয়েক ঘণ্টার সম্মুখযুদ্ধে বিসিক ঘাঁটির সব পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। অমল কৃষ্ণ গোস্বামী সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এর মাধ্যমে জনযুদ্ধের ইতিহাসও আমরা জানতে পারি।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সব সময় অবিনাশী হয়েই থাকবে। লেখকও হয়তো তা-ই বিশ্বাস করেন। বইটির প্রতিটি লেখা অবচেতনভাবেই আমাকে নিয়ে গেছে ঐতিহাসিক একাত্তরের গভীরে। পাঠকও বইয়ের লেখাগুলো পড়তে পড়তেই একাত্তরকে উপলব্ধি করতে পারবেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের মহিমান্বিত লড়াইয়ের ইতিহাস নির্মোহভাবে তুলে ধরতে সালেক খোকন এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিরলস গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই নতুন গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী ঘটনামালা’ বর্তমান ও আগামী প্রজন্মকে আমাদের শিকড় ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে গভীরভাবে উৎসাহিত করবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক কালের কণ্ঠে, প্রকাশকাল: ৩ এপ্রিল ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button