অগাস্ট ১৯৭১: হ্যারিসনের গান ও সুইসাইডাল অপারেশনে পাকিস্তান কুপোকাত
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব বিবেককে শুধু জাগ্রতই করেনি বরং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংগীতের এক মেলবন্ধন তৈরি করেছিল ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। পাশাপাশি এর মাধ্যমে সারা বিশ্বে দাতব্য কনসার্টের ধারারও সূচনা হয়েছিল।
দেশে তখন পাকিস্তানি আর্মি ও তাদের এদেশীয় দোসরদের গণহত্যা চলছে। বাঙালিদের ওপর নেমে আসা অত্যাচার ও নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে বসবাসরত বাঙালিদেরও ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চালায় মুজিবনগর সরকার। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশ্বদূত। তিনি নিপীড়িত, মুক্তিকামী পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের দাবির সমর্থনে দেশে দেশে প্রচার অভিযান চালাতে থাকেন।
একাত্তরের ১ অগাস্ট তারিখে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে তার নেতৃত্বেই এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। বাঙালি ছাড়াও সেখানে প্রায় ১৫ হাজারের বেশি মানুষ হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগার থেকে শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে ১৩০ জন ব্রিটিশ এমপির স্বাক্ষরিত একটি আবেদন প্রথম পাঠ করে শোনানো হয় সমাবেশে।
এরপর একজন প্রস্তাব তোলেন, পুরো বিশ্ব যেন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসকে বয়কট করে। কারণ, তাদের যাত্রীবাহী বিমান বেআইনিভাবে অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বহন করে নিয়ে যাচ্ছে ঢাকায়। ওই সমাবেশেই লন্ডনের পাকিস্তান হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব মহিউদ্দিন আহমদ পদত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। এ ঘোষণা শোনার পর উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ চিৎকার করে বলে ওঠে, জয় বাংলা!
এছাড়া একাত্তরে তিনজন বাঙালি রাষ্ট্রদূত পাকিস্তান সরকারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ফ্রন্টে যোগ দিয়েছিলেন। তারা হলেন: ইরাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আবুল ফতেহ, ২১ অগাস্ট; ফিলিপাইনের কে কে পন্নী, ১৪ সেপ্টেম্বর; আর্জেন্টিনার আবদুল মোমেন, ১১ অক্টোবর। (তথ্যসূত্র: ‘লন্ডন ’৭১: মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক ফ্রন্ট’, মহিউদ্দিন আহমদ)
দেশের অভ্যন্তরে স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তখন প্রাণপণে লড়ছিল মুক্তিকামী বাঙালি। আর সীমান্তের ওপারে ভারতে মানবেতর জীবনযাপন করছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে যাওয়া এক কোটি শরণার্থী। তাদের জন্য কিছু করতে উদ্যোগী হন পণ্ডিত রবিশঙ্কর।

তিনি তখন ক্যালিফোর্নিয়াতে। একটি চ্যারিটি কনসার্টের পরিকল্পনার কথা জানান তার দীর্ঘদিনের বন্ধু বিটলস বিখ্যাত গায়ক জর্জ হ্যারিসনকে। শুনে তিনিও রাজি হয়ে যান। হ্যারিসনের আমন্ত্রণে কনসার্টে অংশ নিতে আগ্রহী হন বব ডিলান, রিঙ্গো স্টার, বিলি প্রেস্টন, লিওন রাসেল ও গিটারিস্ট এরিক ক্ল্যাপটনসহ আরও অনেকে। এভাবেই একাত্তরের ১ অগাস্ট নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ নামে একটি চ্যারিটি শো-এর আয়োজন করেন রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসন।
বব ডিলান, জর্জ হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টারদের পাশাপাশি ওই কনসার্টে মঞ্চে ছিলেন উপমহাদেশীয় ধ্রুপদি সংগীতের সব দিকপাল: রবিশঙ্কর, আল্লা রাখা খান, আকবর আলী খান। ছিলেন একমাত্র নারী সদস্য কমলা চক্রবর্তীও। ওইদিন প্রায় ৪০ হাজার দর্শকের সামনে জর্জ হ্যারিসন গেয়ে ওঠেন ‘বাংলাদেশ’ নামক গানটি।
ওই কনসার্টটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব বিবেককে শুধু জাগ্রতই করেনি বরং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংগীতের এক মেলবন্ধন তৈরি করেছিল। তাছাড়া সারা বিশ্বে দাতব্য কনসার্টের ধারারও সূচনা করেছিল ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। যা আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
বিশ্ব মানবতার সমর্থনের পাশাপাশি পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা যুদ্ধও চলছিল। অগাস্টে প্রথমবারের মতো মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘোরানোর মতো বড় একটি অপারেশন পরিচালনা করে নৌ-কমান্ডোরা। ১৬ অগাস্টের প্রথম প্রহরে দেশের দুটি সমুদ্রবন্দর—চট্টগ্রাম ও মোংলা, এবং দুটি নদী বন্দর—চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে (দাউদকান্দি ফেরিঘাটসহ) হামলা চালায় গেরিলারা। একযোগে একই সময়ে পরিচালিত আত্মঘাতী ওই অভিযানের নাম ‘অপারেশন জ্যাকপট’। ওই অপারেশনে পাকিস্তান বাহিনীর ২৬টি সমরাস্ত্র ও পণ্যবাহী জাহাজ এবং গানবোট ডুবিয়ে দেওয়া হয়। নদীমাতৃক বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রপথে পাকিস্তানের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।
অপারেশন জ্যাকপট কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল? ওই গল্প জানতে নৌ-কমান্ডো মো. শাহজাহান কবির (বীরপ্রতীক) এর মুখোমুখি হই। চাঁদপুর নদীবন্দর অপারেশনে অংশ নেওয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “এটি ছিল সুইসাইডাল অপারেশন। ট্রেনিংয়ের পর ৩০০ জনের মধ্য থেকে সিলেকশন করা হয় ১৬০ জনকে। চট্টগ্রামের জন্য ৬০ জন, মোংলার জন্য ৬০ জন, চাঁদপুরে ২০ জন ও নারায়ণগঞ্জের জন্য ২০ জন করে নৌ-কমান্ডো গ্রুপ তৈরি করা হয়। ফ্রান্স ফেরত সাবমেরিনার এ ডব্লিউ আব্দুল ওহেদ চৌধুরীকে (বীরউত্তম ও বীরবিক্রম) চট্টগ্রাম, আহসান উল্লাহকে (বীরবিক্রম) মোংলায়, বদিউল আলমকে (বীরউত্তম) চাঁদপুর এবং নারায়ণগঞ্জ অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয় আবেদুর রহমানকে।
৯ অগাস্ট চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ—এই তিনটি গ্রুপকে ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে সামরিক বিমানে আনা হয় আগরতলায়, শালবনের ভেতর নিউ ট্র্যানজিট ক্যাম্পে। ওখান থেকে বাংলাদেশে ঢুকে অপারেশন সেরে ওখানেই ফিরতে হবে। একদিন পরেই দেওয়া হয় আর্মস অ্যামুনেশন। প্রত্যেকের জন্য একটা লিমপেট মাইন, একটা কমান্ডো নাইফ, একজোড়া ফিনস, থ্রি নট থ্রিসহ কিছু অস্ত্র এবং প্রত্যেক গ্রুপের জন্য একটা টু ব্যান্ডের রেডিও।
রেডিও হলো যুদ্ধে সিগন্যাল পাঠানোর মাধ্যম। গানে গানে সিগন্যাল! শাহজাহান কবির বলেন, “আমরা চাঁদপুর আসি ১১ অগাস্টে, উঠি রঘুনাথপুরে এক মামার বাড়িতে। অতঃপর রেডিওতে নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকি।
বলা ছিল, ‘প্রত্যেকদিন তোমরা আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র ধইরা রাখবা। ওটার মাধ্যমে সিগন্যাল পাবা’। কেমন সিগন্যাল? আকাশবাণীতে সকাল ৭ বা সাড়ে ৭টায় বাজবে একটি গান, ‘আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান’। এ গান হলেই অপারেশনের যাবতীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। ২৪ ঘন্টা পর আরেকটা গান বাজবে, ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুর বাড়ি’। এ গানটি হলেই বুঝতে হবে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ওই দিন শেষে রাত বারোটার পর অবশ্যই অ্যাটাক করতে হবে।

১৩ অগাস্ট সকালে বাজল প্রথম গানটি। আমি, নুরুল্লাহ পাটওয়ারি, বদিউল আলম সঙ্গে সঙ্গে রেইকি করতে বের হই। ২৪ ঘন্টা পর অর্থাৎ ১৪ অগাস্ট চূড়ান্ত নির্দেশনার গানটি বাজার কথা ছিল। কিন্তু ওইদিন সেটি না বেজে বাজল ১৫ অগাস্ট সকালে। ফলে আমরা অ্যাটাকের প্রস্তুতি নিই।
লঞ্চ টার্মিনাল ও স্টিমার ঘাটসহ ছয়টি টার্গেট প্লেস ঠিক করি। আমার টার্গেট প্লেস ছিল লন্ডনঘাট জেটি। রাত সাড়ে এগারটার দিকে ডাকাতিয়া নদী দিয়ে নামি। পায়ে ফিনস, পরনে শুধু জাঙ্গিয়া। বুকে গামছা দিয়ে মাইন পেচিয়ে চিত সাঁতারে এগোই। এভাবে লন্ডনঘাটে এসেই জেটিতে মাইন সেট করে দিই। ৪৫ মিনিট পরই সেটার বিস্ফোরণ ঘটে।”
অপারেশন জ্যাকপটের খবর বড় করে প্রকাশ পায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। ফলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কোনো যুদ্ধ হচ্ছে না বলে পাকিস্তান সরকার যে প্রচারণা চালাচ্ছিল তা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ অপারেশনগুলোর একটি হলো অপারেশন জ্যাকপট। স্বাধীনতা লাভের তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে সুইসাইডাল ওই অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন বাংলার দামাল ছেলেরা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যা ছিল নৌ-কমান্ডোদের এক মরণকামড়। ফলে তাদের সমন্বিত আক্রমণে মুষড়ে পড়ে পাকিস্তান বাহিনী।
শুধু জলপথেই নয়, তখন ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের ওপর গেরিলারাও দুর্ধর্ষ সব আক্রমণ করছিলেন। সবচেয়ে বড় অপারেশনটি হয় গ্রিন রোডে। যার খবর ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে। ওই খবরে উদ্দীপ্ত হন সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধারাও।
গ্রিন রোড অপারেশনটির পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে ছিলেন গেরিলা শেখ আবদুল মান্নান (বীরপ্রতীক)। কীভাবে ঘটালেন ওই অপারেশনটি? আদ্যোপান্ত শুনি তার মুখেই, “ঘরভাড়া নিয়ে আমরা থাকতাম সেন্ট্রাল রোডে, ভূতের গলি মসজিদের পাশে। কোথায় অপারেশন করব? খুঁজে বের করি নূর হোটেলের সামনের রাস্তাটিকে। ওই হোটেল বিল্ডিংয়ের নির্মাণকাজ তখন চলছিল। আমরা পাঁচজন—আমি, মনসুর আলম দুলাল, আলমগীর, আবদুল্লাহ এবং বজলুল মাহমুদ বাবলু। কমান্ডে আমি নিজেই। অস্ত্র ছিল দুটি স্টেনগান, দুটি এসএলআর আর আমার কাছে একটা চাইনিজ এসএমজি। মাইন, দুই ব্যাগ হ্যান্ড গ্রেনেড আর দুই ব্যাগ ফসফরাস গ্রেনেডও ছিল। আগুন লাগানোর কাজে ব্যবহার করতাম ফসফরাস গ্রেনেড।
২১ অগাস্ট ১৯৭১। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মূল রাস্তায় মাইনগুলো ডব্লিউ প্যাটার্ন করে সেট করে ক্যামোফ্লেজ করি ময়লা ফেলে। ওয়ানলি সিক্স সেকেন্ড সাইড প্রেশার সেট করে নূর হোটেলের বিল্ডিংয়ে পজিশন নিয়ে অপেক্ষায় থাকি। রাত তখন সোয়া ২টা থেকে আড়াইটা হবে। দেখলাম, সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে তিনটা হলুদ লাইট পরপর আসছে। বুঝে যাই আর্মির গাড়ি। একটা সামনে এসেই বমবম করে উল্টে ওয়ালের পাশে ধাক্কা খায়। পেছনের গাড়ি দুটি তখন ব্রেক করেনি। বরং স্পিড বাড়িয়ে পাশ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ফলে উল্টে যায়। ওরা ফায়ার শুরু করে প্রথম। গাড়ির তলায় পড়ে গিয়েও ফায়ার করতে থাকে। আমি তখন বিল্ডিংয়ের ওপর থেকে সমানে গুলি করি। গর্জে ওঠে বাকিদের এসএলআরগুলোও।
ওই অপারেশনে তিন ট্রাকে স্পট ডেড হয় ৬০-৭০ জন পাকিস্তানি আর্মি। পরে হাসপাতালে মারা যায় আরও ১৫-২০ জন। এ কারণেই রাজধানীতে এটাকেই বিগেস্ট অপারেশন বলা হয়। অপারেশনের পর আর্মিরাও ক্ষিপ্ত হয়ে হাতিরপুল ও গ্রিন রোড থেকে অনেক যুবককে ধরে নিয়ে টর্চার করে, মেরেও ফেলে অনেককেই।”
একাত্তরে ঢাকার গেরিলারা পাকিস্তানি সেনাদের মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টির জন্যেও অভিনব একটি অপারেশন পরিচালনা করেন। যার নাম ছিল, ‘অপারেশন ফ্লাইং ফ্ল্যাগস’।
১৪ অগাস্ট ছিল পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। ওইদিনই এই অপারেশনের পরিকল্পনা করেন ঢাকার গেরিলা হাবিবুল আলম (বীরপ্রতীক) এবং মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত চৌধুরী। কেননা অবরুদ্ধ ঢাকায় তখন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের কোনো সুযোগ ছিল না। ঢাকায় অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টিও ছিল এই অপারেশনের অন্যতম লক্ষ্য।
এ অপারেশন নিয়ে গেরিলা হাবিবুল আলম বললেন যেভাবে, “অগাস্টের প্রথম সপ্তাহে নেয়া পরিকল্পনা অনুসারে সদরঘাট ও নিউমার্কেট থেকে সবুজ লুঙ্গি, লাল রঙের সালু কাপড় এবং হলুদ রঙের কাপড় কিনে আনি। এরপর আমার তিন বোন আসমা, রেশমা ও শাহনাজ আমাদের দিলু রোডের বাড়িতে রাত জেগে শুরু করেন বাংলাদেশের পতাকা বানানোর কাজ। অন্যদিকে শাহাদাৎ চৌধুরীও তার বোন মরিয়ম, ডানা ও ঝিমলিকেও অনুরোধ করেছিলেন পতাকা বানাবার জন্য।

তারা সবাই দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে সব মিলিয়ে সেলাই করেছিলেন প্রায় আড়াই শতাধিক পতাকা। একটি হাত মেশিন যথেষ্ট ছিল না। মায়ের প্যাডেল মেশিনটিতেও কাজ করেছিল। বানানো বেশিরভাগ পতাকার দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ ইঞ্চির মতো।
ধোলাইখাল থেকে গেরিলা মাসুদ সাদেক চুল্লু যোগাড় করে আনেন গ্যাস সিলিন্ডার। আর পুরনো ঢাকা থেকে বেলুন কিনে আনেন। এগুলো রাখা হয় ধানমন্ডি ২৮ সড়কের ১ নম্বর টেনেমেন্ট হাউজের গোপন আস্তানায়। ১৩ অগাস্ট সন্ধ্যা ও ১৪ অগাস্ট সকালের ভেতর ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পতাকা ও গ্যাস বেলুনগুলো পৌঁছে দেয়া হয়।
১৪ অগাস্ট ১৯৭১ শনিবার। ঢাকায় পাকিস্তানি সেনারা ব্যস্ত ছিল স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে। ঠিক তখনই, আনুমানিক সকাল নয়টা থেকে সাড়ে নয়টার ভেতর বিভিন্ন জায়গা থেকে বেলুনের সঙ্গে উড়িয়ে দেয়া হয় সব পতাকা।
অবরুদ্ধ ঢাকাবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল অভূতপূর্ব এক দৃশ্য। ওইদিন বাংলাদেশের শত শত পতাকা উড়েছে আকাশে। বিভিন্ন স্থাপনায় পাকিস্তানি পতাকা থাকলেও আকাশ ভরে গিয়েছিল বাংলাদেশের পতাকায়।”
ঢাকায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী নাগরিকদের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত গৌরবের এক মুহূর্ত। প্রচলিত যুদ্ধ কৌশলের বাইরেও গেরিলা যোদ্ধারা শত্রুর মনোবল দুর্বল করতে অভিনব যেসব পথ বেছে নিয়েছিলেন, অপারেশন ফ্লাইং ফ্ল্যাগস ছিল তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।
এভাবেই জল-স্থলে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে কুপোকাত হতে থাকে পাকিস্তানি সেনারা। আর দেশকে শত্রু মুক্ত করতে রক্তভেজা পথেই সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যায় বাঙলার দামাল ছেলেরা।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ১৮ আগস্ট ২০২৫
© 2025, https:.




