মুক্তিযুদ্ধ

মে ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি

২৬ মার্চ ২০২১ থেকে ৩১ মার্চ ২০২২ পর্যন্ত স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করেছে বাংলাদেশ৷ এক বছর পর, অর্থাৎ, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ফিরে তাকানো শুরু করে ডয়চে ভেলে বাংলা৷ গৌরব ও বেদনার সেই নয় মাসে পর্যায়ক্রমে ফিরে তাকানোর এই পর্বে থাকছে মে ১৯৭১-এর কিছু ঘটনার কথা….

গ্রেপ্তারের পর বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো খবর ছিলনা কোথাও৷ ফলে সমগ্র বাঙালি জাতির প্রশ্ন ছিল- বঙ্গবন্ধু কেমন আছেন? পাকিস্তানি সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে থাকতে পারে- এমন শঙ্কাও ছিল তখন৷

৫ মে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য প্রকাশ করে পাকিস্তান সরকার৷ সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. আকবর খান করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত ও সুস্থ আছেন৷ সামরিক আইন অনুসারে তার বিচারকাজ শীঘ্রই শুরু হবে বলেও জানান তিনি৷

‘বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন’-এ খবর ওই সময় বাঙালি জাতির জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর৷ তবে প্রিয় নেতা ১১০০ মাইল দূরে বন্দি, যে কোনো সময় তাকে হত্যা করতে পারে পাকিস্তান সেনাবাহিনী- তাই তার মুক্তি নিশ্চিত করা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হয়ে গেল যুদ্ধ জয়ের সবচেয়ে বড় প্রেরণা৷

ওদিকে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে গ্রামে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে৷ তাদের সহযোগিতা করে স্বাধীনতাবিরোধী শান্তিকমিটির লোকেরা৷ তাদের অধিকাংশই ছিল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, ইসলামি ছাত্র সংঘের নেতা-সদস্য ও বিভিন্ন জেলায় বসবাসরত বিহারিরা৷ তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ, মুজিব অনুসারী ও মুক্তিকামী বাঙালি নর-নারীকে নিশ্চিহ্ন করা৷ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর নির্যাতন অনেক বেশি হলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো ধর্মের স্বাধীনতাকামী মানুষই তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি৷

পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনাটি ঘটে মে মাসেই, খুলনার ডুমুরিয়া থানার আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগরে৷ সাতক্ষীরা-খুলনার মধ্যবর্তী জায়গায় একটি বড় বাজার ছিল এটি৷ সড়ক ও নদীপথে অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল ভালো৷ পাকিস্তানি সেনাদের আনাগোনাও সেখানে শুরু হয়নি তখন৷

এ কারণে ওই পথেই খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, ফরিদপুর, রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, চালনার হাজার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যাচ্ছিল৷

চুকনগর বাজারে এসে মানুষ রান্নাবান্না, শেষ সদাইটুকু করে নেয়, কেউবা জিরিয়ে নেয়৷ এরপর তারা সীমান্তের দিকে যাত্রা শুরু করে৷ ১৯ মে পর্যন্ত ওখানে ছিল উপচেপড়া ভিড়৷

‘‘হিন্দুদের ঢল নেমেছে চুকনগরে-’’ এমন খবর পৌঁছে যায় সাতক্ষীরায় পাকিস্তান সেনাদের ক্যাম্পে৷ আটলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও শান্তি কমিটির সদস্য গোলাম হোসেন এবং ভদ্রা নদীর খেয়া ঘাটের ইজারাদার শামসুদ্দিন খাঁ নামের এক বিহারি গোপনে এমন খবর পৌঁছে দেয়৷

২০ মে তারিখ সকালে পাকিস্তানি আর্মিরা হানা দেয় চুকনগরে৷ দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার৷ সেনাবাহিনী ১টি ট্রাক ও ১টি জিপে প্রথমে মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় এসে থামে এবং মালতিয়া গ্রামের চিকন আলী মোড়ল ও সুরেন্দ্রনাথ কুন্ডুকে গুলি করে হত্যা করে৷ তারপর পাতখোলা বাজারে ঢুকে নিরীহ মানুষদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে গণহত্যা শুরু করে৷

পাক সেনাবাহিনীর একটি দল পাতখোলা বিল থেকে চাঁদনী, ফুটবল মাঠ, চুকনগর স্কুল, মালতিয়া, রায়পাড়া, দাসপাড়া, তাঁতিপাড়া, ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর পাড়ে আগত মানুষের উপর গুলি চালায়৷ ওইদিন মানুষের আর্তনাদে ভারি হয়ে ওঠে চুকনগরের আকাশ বাতাস৷ ভদ্রা নদীর জলও রক্তবর্ণ ধারণ করেছিল৷ লাশের কারণে নদীথও আটকে গিয়েছিল কোথাও কোথাও৷

সকাল থেকে শুরু হওয়া আর্মিদের গুলি থামে দুপুরে৷ চার মাইল এলাকা জুড়ে চলা এই নিষ্ঠুর গণহত্যায় শহিদদের প্রকৃত সংখ্যা আজও জানা যায়নি৷ তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও গবেষকদের অনেকেই মনে করেন, ওইদিন চুকনগরে প্রায় ১২ হাজারের মতো নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল পাক বাহিনী৷ (তথ্যসূত্র: চুকনগর গণহত্যা-মুনতাসীর মামুন, গণহত্যা ‘৭১- তপন কুমার দে, ৭১ এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ -ডা. এম এ হাসান)

এছাড়া ৫ মে নাটোরের লালপুর থানার গোপালপুর চিনিকলের ম্যানেজার আনোয়ারুল আজিমসহ ৪৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চিনিকলের ভেতরেই পুকুর পাড়ে গুলি করে হত্যা করা হয়৷ ওখানে এমন হত্যাযজ্ঞ চলে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত৷ স্বাধীনের পর ওই পুকুরে অসংখ্য কঙ্কাল পাওয়া যায়৷ এ কারণে ‘গোপাল সাগর’ নামের ওই পুকুরটির নামই হয়ে যায় ‘শহীদ সাগর’৷

মে মাসে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসররা বহু স্থানেই এমন হত্যাযজ্ঞ চালায়৷ তার মধ্যে বরগুনার পিডাব্লিউডি ডাকবাংলো, জেলখানা, বিষখালী নদী ও পাথরঘাটায়, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায়, নড়াইলের ইতনা গ্রাম, রাজশাহীর জগীশ্বর গ্রাম, সিরাজগঞ্জের হরিণাগোপাল ও বাগবাটি গ্রাম, সিলেটের বালাগঞ্জের বুরুঙ্গা, নাটোরের রামপুরা খাল, সুনামগঞ্জের সাগরদীঘি উল্লেখযোগ্য৷ (তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, ৮ম খন্ড, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক স্বপ্ন ‘৭১–এর গণহত্যা’-সম্পাদিত আবু সাঈদ; একাত্তরের বধ্যভূমি ও গণকবর- সুকুমার বিশ্বাস)

একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পগুলোও ছিল একেকটি টর্চার সেল৷ সেখানে বাঙালি নারীদের ওপর কতটা অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় বীর মুক্তিযোদ্ধা (বীরাঙ্গণা) লাইলী বেগমের সঙ্গে কথা বলে৷ একাত্তরে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কাইয়ার গুদাম ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে৷ সে সময়ের কথা মনে হলে আজও আঁতকে ওঠেন লাইলী বেগম৷

পাক বাহিনীর জুলুম-নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমি তখন পিপিএম হাই স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ি৷ তখন যুদ্ধ চলছে৷ আর্মিরা ক্যাম্প বসায় কাইয়ার গুদামে৷ তাদের সহযোগিতায় ছিল শান্তি কমিটির লোকেরা৷ ওরা চিনিয়ে দিতো মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের৷ বাবা ফেঞ্চুগঞ্জে ফরিদপুর গ্রামের আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন৷ ওই সময় তিনি পালিয়ে বেড়ান৷ ফলে চাচা কালা মিয়াই দেখভাল করতেন আমাদের৷’’

‘‘একদিন সন্ধ্যায় বাবার খোঁজে বাড়িতে আসে পাঁচ-সাতজন৷ ফরিদপুর গ্রামের মঈন মিয়া, রশিদ মিয়া, মনাই মিয়া, তোতা মিয়া ছিল৷ ওরা চাচারে ধইরা নিতে চায়৷ তারে উঠানে নিলে সাহস করে সামনে যাই৷ তখন ওরা আমারেও তুইলা নিয়া যায় কাইয়ার গুদামে৷’’

‘‘ওটা ছিল খুবই অন্ধকার জায়গা৷ মানুষের গোঙানির শব্দ পেতাম৷ আরো নারীরা ছিল৷ মাঝেমধ্যে তাদের কান্না আর চিৎকার সহ্য করতে পারতাম না৷ সেখানে আমার ওপরও চলে শারীরিক নির্যাতন আর অত্যাচার৷ সে নির্যাতন কোনো নারীই মুখে বলে বুঝাতে পারবে না৷’’

লাইলী বেগম আরো জানান, ‘‘প্রথম পাঁচ-ছয়দিন একটা রুমে রাখে ওরা৷ পরে আরেকটা রুমে শিফট করে দেয়৷ ওখানে রাখে এক মাস৷ তখনও পালাক্রমে চলে নির্যাতন৷ খাবার দিতো না ওরা৷ দুই তিন-দিন পর মন চাইলে এক বেলায় দিতো রুটির সঙ্গে একটু ডাল৷ একদিন শারীরিক নির্যাতনে অজ্ঞান হয়ে যাই৷ ওরা তখন আমারে এনে ফেলে দেয় মাইজ গাঁও স্টেশনের পাশে৷ পরে দুই মাস চিকিৎসা চলে হাসপাতালে৷’’

‘‘কাইয়ার গুদামের বড় বড় বাঙ্কার ছিল৷ সেখানে শত শত নারীকে রাখা হতো ৷ স্বাধীনতার পর আড়াই থেকে তিন’শর মতো নারীকে বের করা হয়েছিল সেখান থেকে৷ পুরুষ কও আর নারী কও ওরা প্রথমে ঢুকাইতো কাইয়ার গুদামে৷’’

‘‘আমার মাথায় কাটার দাগ এখনো আছে৷ বাইশটা শিলাই পড়ছিল৷ দেখেন মুখে ক্ষত৷ বেওনেট দিয়া পাঞ্জাবিরা গুতা দিছে৷ ডান হাতটা ভাঙ্গা৷ পায়ের ক্ষতি করছে৷ রানের ভেতরও বেওনেটের খোচার দাগ আছে অগণিত৷

‘‘নতুন প্রজন্মের কাছে এখন তো টর্চারের কথা বলতে লজ্জা লাগে, ভয়ও লাগে৷ এখন তো কিছু মরা, কিছু জিন্দা হিসেবে বেঁচে আছি৷ সরকার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে, তাতে ভালো আছি৷ কিন্তু ওই কাইয়ার গুদামের পাশ দিয়ে গেলেই বুকের ভেতরটা ধুক করে ওঠে৷’’

গণহত্যা যখন চলছে তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরিরও দাবি উঠতে থাকে৷

একাত্তরের মে মাসেই জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংক্রান্ত হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘‘ভারতের রাজ্যগুলোতে অসংখ্য উদ্বাস্তু মানবেতর জীবন যাপন করছে৷ সেখানে তারা স্থায়ী উদ্বাস্তুতে পরিণত হোক, সেটা কারো প্রত্যাশা নয়৷ পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে আর কোনো শরণার্থী আর ভারতে না যায় এবং দেশত্যাগীরা যাতে স্বদেশে ফিরে যেতে পারে৷’’

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের চারজন সিনেটরের কাছে পররাষ্ট্র দপ্তরের সচিব ডেভিড অ্যাবশায়ারের লেখা একটি চিঠি ওয়াশিংটনে প্রকাশ করা হয়৷ ওই সিনেটরেরা পাকিস্তানকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক সাহায্য সম্পর্কে পররাষ্ট্র দপ্তরে চিঠিও লিখেছিলেন৷ অ্যাবশায়ার সিনেটরদের জানান, চীনা আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যেসব বিমান ও ট্যাংক পাকিস্তানকে দেওয়া হয়েছিল, পাকিস্তান সরকার সেসব অস্ত্র পূর্ব পাকিস্তানে ব্যবহার করছে৷ পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের এম ২৪ ট্যাংক ও এফ ৮৬ বিমান ব্যবহার করা হয়েছে৷ এসব অস্ত্র ব্যবহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে৷

আবার ২৭ মে মার্কিন সিনেটের উদ্বাস্তু সংক্রান্ত সাব-কমিটির চেয়ারম্যান প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ও ভারতে অবস্থানরত বাঙালি শরণার্থীদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন জানান৷ তিনি বলেন, ‘‘পূর্ব পাকিস্তানে উদ্বাস্তু সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে৷ এই সমস্যা সমাধানে বিশ্বের সকল দেশের এগিয়ে আসা উচিত৷’’ (তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, ১৩ম খণ্ড)

এমন বিবৃতি ও প্রতিবাদ উত্থাপিত হতে থাকে দেশে দেশে৷ এদিকে ভারতের সহযোগিতায় বিভিন্ন ট্রেনিং ক্যাম্পে তখন অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়াও শুরু হয়ে যায়৷

এ প্রসঙ্গে কথা হয় ভারতের বিহার চাকুলিয়া ক্যাম্পে ট্রেনিং নেওয়া মুক্তিযোদ্ধা শেখ সানোয়ার উদ্দিন রিন্টুর সঙ্গে৷

তার ভাষায়, ‘‘অনেকে বলেন একাত্তরে আওয়ামী লীগ নেতারা ইন্ডিয়ায় গিয়ে বসে ছিলেন৷ নেতারা ওখানে না গেলে কাদের সাথে যোগাযোগ করতাম, হাতিয়ার কীভাবে আসত, প্রশিক্ষণ কোথা থেকে নিতাম৷নেতাদের উদ্যোগেই করিমপুর ইয়ুথ ক্যাম্প চালু হয়৷ সেখানে আমাদের বাছাই করে ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভারতের বিহার চাকুলিয়া ক্যাম্পে৷

ট্রেনিং খুব সহজ ছিল না৷ আমাদের ছয়টা ছেলের কবর আছে ওখানে৷ সাপে কেটে মেরে ফেলেছিল ওদের৷ আমার উইংয়ের দায়িত্বে ছিলেন আহসানুল হক বাবলা, আব্দুর রহমান প্লাটুন কমান্ডার৷ পুরো চাকুলিয়া ক্যান্টনমেন্টের দায়িত্বে ছিলেন কর্নেল চ্যাটার্জি৷ ট্রেনার সুখদেব সিং ও মেজর ফাটকার কথা এখনও মনে আছে৷ আপন ভাইয়ের মতোই আন্তরিক ছিলেন তারা৷’’

শুধু স্থলযুদ্ধই নয়, একাত্তরের মে মাসেই শুরু হয় অপারেশন জ্যাকপটের নৌকমান্ডোদের ট্রেনিং৷ নৌকমান্ডো মো. শাহজাহান কবির বীরপ্রতীক এর মুখোমুখি হলে তিনি জানান তার আদ্যোপান্ত৷

‘‘আটজন বাঙালি সাবমেরিনার ফ্রান্স থেকে পালিয়ে চলে আসেন দিল্লিতে৷ প্রবাসী সরকার তাদের কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করে৷ বাংলাদেশ যেহেতু নদীমাতৃক দেশ৷ তাই নেভাল ইউনিট প্রয়োজন৷ এ কারণে নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়৷ সে উদ্দেশ্যেই ইন্ডিয়ান নেভির তিনজন অফিসারসহ মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আমাদের হাতিমারা ক্যাম্পে আসেন বাঙালি সাবমেরিনারদের একজন, রহমত উল্লাহ (বীরপ্রতীক)৷’’

 ‘‘নৌ কমান্ডো হিসেবে কারা যোগ দিতে প্রস্তুত?’ প্রশ্ন করতেই অনেকে হাত তুলে৷ কিন্তু তারা বেছে নিলো যাদের বাড়ি চট্টগ্রাম, মংলা, খুলনা, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জের মতো এলাকায়৷’’

মুক্তিযোদ্ধাদের যোগ্যতা সম্পর্কে  বলা হয়েছিল- সাঁতার জানতে হবে, বিদেশিরা ট্রেনিং দেবেন, তাই ইংরেজি জানা শিক্ষিত বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া হতে হবে৷

তিনি আরো বলেন, ‘‘প্রাথমিকভাবে ৭০-৮০ জনকে বাছাই করা হয়৷ এরপরই জানানো হয়, ‘‘এটা হবে সুইসাইডাল স্কোয়াড৷”

‘‘অনেকেই তখন সরে যান৷ তারপর ফিটনেস দেখে সিলেকশন করা হয় ৩০-৩২জনকে৷ এভাবে বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে সর্বমোট ৩০০জন সিলেক্ট করা হয়৷  ধর্মনগর হয়ে ট্রেনে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের মুর্শিদাবাদে৷’’

‘‘ট্রেনিং ক্যাম্পটি ছিল পলাশীতে, ভাগিরথী নদীর তীরে৷ ১৪ মে তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেনিং শুরু হয়৷ উল্টো বা চিত হয়ে সাঁতার কাটা, পায়ে ফিনস পড়ে শুধু চোখ-নাক ভাসিয়ে পানিতে মাছ বা সাপের মতো নিঃশব্দে চলা, অপারেশনে পাহারাদারদের মারতে জুডো-কেরাতে ট্রেনিং, দিক চেনার জন্য ম্যাপ রিডিং, মাইন বিস্ফোরণ প্রভৃতি৷ একেকটা মাইনের ওজন ছিল ৫ থেকে ৬ কেজি৷ অপারেশনে সেগুলোই জাহাজে ফিট করে উড়াতে হবে৷ বুকে দুই-তিনটা ইট বেঁধে সে কৌশলই শেখানো হয় ভাগিরথী নদীর জলে৷প্রতিদিন ১৮ঘন্টা ট্রেনিং হতো, তা চলে ৩১ জুলাই পর্যন্ত৷ ভারতীয় নৌ-বাহিনীর কমান্ডার এমএন সামন্ত, লে. কমান্ডার জিএম মার্টিস, লে. কপিল, কে সিং ও ক্যাপ্টেন সমীর কুমার দাশের তত্ত্বাবধানে ট্রেনিং হয় নৌ-কমান্ডোদের৷ ট্রেনিং করান কে এম দাস, ভট্টাচার্য, কফিল, সিসিং, নানাবুজ প্রমুখ৷’’

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্মানির ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগে, প্রকাশকাল: ২৬ মে ২০২৩

© 2023, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button