মুক্তিযোদ্ধার চোখে রাজাকারের স্বরূপ
মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিতে তৃণমূলে স্বাধীনতাবিরোধীদের অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞের ঘটনাগুলো এখনো হারিয়ে যায়নি; বরং তা সূর্যের মতোই জীবন্ত। মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে রাজাকারদের রূপটি কেমন? তা তুলে ধরতেই এই লেখার অবতারণা।
জুট মিলের লেবার সর্দার বাচ্চু রাজাকার
চাঁদপুরের মুক্তিযোদ্ধা নৌ কমান্ডো মো. শাহজাহান কবির (বীরপ্রতীক)। একাত্তরে রাজাকারদের কারণেই জীবন দিতে হয়েছে তাঁর বাবা ইব্রাহীম বিএবিটিকে।
সবার কাছে তিনি ‘বিটি সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন। চাঁদপুর মহকুমার সংগ্রাম কমিটিরও সদস্য ছিলেন। একাত্তরে তাঁর কাজ ছিল ছাত্র ও যুবকদের ট্রেনিংয়ের জন্য চিঠি লিখে ভারতে পাঠানো।
বাবার শহীদ হওয়ার ঘটনাটি শাহজাহান বললেন এভাবে : “জ্যাকপট অপারেশনের আগে পুরো গ্রুপ নিয়ে প্রথম উঠেছিলাম বাড়িতে। এ খবর রাজাকারদের মাধ্যমে পেয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। ওরা জানত বাবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের। তাই ওরা নৌ কমান্ডোদের খুঁজতে বাড়ি অ্যাটাক করে।
১৭ আগস্ট ১৯৭১, সকালবেলা। গোপনে চার-পাঁচটা নৌকায় বাড়ির চারপাশ ঘেরাও দেয়। এরপর ব্রাশফায়ার করতে থাকে। সেনাদের সঙ্গে ছিল রাজাকাররা। ওরা আমার সঙ্গে বাবাকেও বেঁধে পেটাতে থাকে।
বাবাকে ওরা জিজ্ঞেস করে, ‘নৌ কমান্ডোরা কোথায়?’
মার খেয়েও তিনি মুখ খোলেন না। বলেন, ‘এখানে কেউ আসে নাই।’ বাড়ি সার্চ করে ওরা কোনো অস্ত্র পায় না। ফলে আমাদের বেঁধে নৌকায় তুলে পেটাতে থাকে।
চার-পাঁচ শ গজ দূরে ছিল কামেলি সাহেবের লজ। বাড়িটি লুট করতে নামে ওরা। নৌকায় বাবাকে পাশেই ফেলে রেখেছে। জুট মিলের লেবার সর্দার ছিল বাচ্চু রাজাকার। সেও নৌকায়। বুড়ো মানুষ দেখে আরেক রাজাকারের দয়া হয়। সে বাবার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেয়।
কামেলি লজে কেউ নেই। বাড়ির পাশের পাটক্ষেতে লুকিয়ে ছিল তাঁর মেয়ে ঝরনা। সঙ্গে সোনা ও টাকার ৮-৯টা ট্রাংক। কিভাবে যেন ওরা টের পেয়ে যায়। পাটক্ষেত থেকে ধরে এনে নৌকায় তোলে। তখন পাক সেনাদের কুদৃষ্টি পড়ে মেয়েটির দিকে। রাজাকাররাও ব্যস্ত থাকে ট্রাংকের টাকা ও সোনা-রুপা আনলোড করায়।
এই সুযোগে বাবা কানে কানে বলেন, ‘তুই এখান থেকে পালা।’ বলি, আপনার অবস্থা কী হবে? বাবা বলেন, ‘আমার চিন্তা করিস না। তোকে ধরে নিয়ে গেলে যদি জানে তুই নৌ কমান্ডো, তাহলে মেরে ফেলবে। পুরো গ্রুপটাই ধরা পড়ে যাবে। তোদেরকে দেশটা স্বাধীন করতে হবে। তুই পালা।’ এটা বলেই কৌশলে আমার হাত ও পায়ের বাঁধন খুলে দেন। বাবার সঙ্গে ওইটাই শেষ স্মৃতি।
অস্ত্রহাতে নৌকার দুই পাশে দুজন দাঁড়ানো। এক সাইডে একটাকে পা ধরে পানিতে ফেলে দিই। এর পরই আমি ঝাঁপ দিই। আমার দিকে ওরা ব্রাশফায়ার করে। কিন্তু তার আগেই ডুব দিয়ে অনেক দূরে চলে যাই।
ওরা বাবাকে ভীষণ টর্চার করে। তাঁকে গুলি করে ওরা ওই বাড়ির পাশে অর্ধেক পানিতে ও অর্ধেক রাস্তায় ফেলে যায়। গ্রামবাসী পরে লাশ উদ্ধার করে। ১৮ আগস্ট বিকেলে বাবাকে দাফন করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে।”
ওরা না থাকলে পাকিস্তানিরা এত গণহত্যা চালাইতে পারত না
আরেক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. জমির আলী। তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন ৫ নম্বর সেক্টরে। তাঁর ভাষায়, “আর্মি আসে সুনামগঞ্জ, টেংরাটিলা আর ছাতকে। ওগো সাহায্য করে শান্তি কমিটির লোকেরা। অনেক মাওলানা কাজ করে শান্তি কমিটিতে। আমাগো ওইখানে শান্তি কমিটির নেতা ছিল আসকর আলী মাস্টার, মাওলানা আবদুস সাত্তার ও রউস মৌলভি। পরে তো রেজাকারে (রাজাকার) লোকজন ভর্তি হইতে থাকে। ওরা অত্যাচার করছে বেশি। আর্মি আসত মাঝে মাঝে। রেজাকাররা ওগো বাড়ি চিনাইত। যুবতি মেয়ে আর খাসি সাপ্লাই দিত। হিন্দু বাড়িতে আক্রমণ করছে বেশি, লুটতরাজও করছে অনেক। ওরা না থাকলে পাকিস্তানিরা এত গণহত্যা চালাইতে পারত না।
ওইখানে নামকরা রেজাকার ছিল বুধাই। তবে ফকির চেয়ারম্যান ছিল তার চেয়েও ভয়ংকর। সুরমা নদীর উত্তরের ঘটনা। একবার ট্রেনিংয়ের লাইগা ১৩ জন ছাত্র বর্ডার পার হইতেছে। এ খবর ফকির চেয়ারম্যান পাঞ্জাবিগো দিয়া আসে। ওরা আইসা সবাইরে গুলি কইরা মারছে।”
যুবক পেলেই বাধ্য করা হতো রাজাকারে যেতে
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মুক্তিযোদ্ধা মো. হাবিবুর রহমান। একটি ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন : “ট্রেনিংয়ে যখন যাই, তখন অনেকেই সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। তাদের বয়স ছিল কম। ফলে রেখে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। নবম শ্রেণিতে পড়ত আব্দুস সালাম ও বাবুল। ওদের বাড়ি পিপড়াছিটে। যুদ্ধে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা তাদের। যাওয়ার সময় বুঝিয়ে বলেছিলাম, ফিরে এসেই তোদের ট্রেনিং দিমু। গ্রামে থেকেও ওরা গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কাজ করেছে।
শান্তি কমিটির লোকেরা ওই সময় গ্রামে গ্রামে হানা দিত। পরে অনেকে মিলে কালিয়াকৈরে রাজাকার বাহিনীও গড়ে তোলে। এরপর তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যুবক ও তরুণদের রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিতে বলে। রাজাকারে যারা যায়নি, তাদের ওরা তুলে দিত পাকিস্তানি আর্মির হাতে। মেরেও ফেলেছে অনেককে।
রাজাকার বাহিনীতে না যাওয়ায় সালাম ও বাবুলের ওপরও চড়াও হয় শান্তি কমিটির লোকেরা। চলাচলের জন্য তখন আর্মি ক্যাম্প থেকে কার্ড দেওয়া হতো। ওই কার্ড করতে একদিন তারা যায় কালিয়াকৈরে। ওখানে তাদের পেয়ে রাজাকাররা তুলে নেয়। নির্মমভাবে হত্যা করে। আমাদের সঙ্গে নিয়ে গেলে হয়তো তারা লাশ হতো না। এমন অপরাধবোধ আজও জাগে মনে।”
ওরা নিজের ছেলেমেয়েদের রাজাকার বানায় নাই!
মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন। সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়াসহ ২ নম্বর সেক্টরের নির্ভয়পুর সাব-সেক্টরে এফএফদের (ফ্রিডম ফাইটার) পরিচালনায় বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, “একাত্তরের জুনের শেষ দিকে আমাদের গ্রুপগুলোর চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তখন অস্ত্রহাতে পথে পথে থাকত রাজাকাররা। ওরা পাকিস্তানি সেনাদের রসদ সরবরাহ করত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা কাজ করত, তাদের ইনফরমেশনগুলো তারাই পাকিস্তানি সেনাদের দিয়ে আসত। শান্তি কমিটির নেতারা নিজের ছেলেমেয়েদের কিন্তু রাজাকার বানায় নাই! তারা এলাকার গরিব ছেলেদের বেশি রিক্রুট করত। ট্রেনিংয়ের লোভ দেখিয়ে বলত, ‘লুটের মাল জায়েজ। সেটা তোমরা পাবা।’ ওরা ব্রিজ পাহারা দিত। ফলে গেরিলাদের সঙ্গে রাজাকারদের যুদ্ধ হয়েছে বেশি। যদি শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর আর আলশামস না থাকত, তাহলে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনারা এত মানুষকে হত্যা করতে পারত না!”
নির্যাতনের বদলা নিতেই যুদ্ধে যাই
মুক্তিযোদ্ধা সেকেন্দার আলীর গ্রামের বাড়ি খুলনার নালিয়ার চরে। ট্রেনিংয়ে যাওয়ার আগেই তিনি রাজাকারদের নির্যাতনের শিকার হন। ওই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন : “যুদ্ধে যামু। ভেতরে ভেতরে খুঁজতেছি কারা যায়। এক গ্রুপের খবর পাই। কিন্তু ওরা আমারে নেয় না। কিছু খরচ তো সঙ্গে নিতে হইব। মারে বলছি, টাকা দাও। যুদ্ধে যামু। মা মানা করছে। বলে, ‘যাওয়ার দরকার নাই বাপ। একসঙ্গে থাকব। পাঞ্জাবিরা যদি আইসা মারে, সবাই একসঙ্গেই মরমু।’
আমার খুব রাগ হইল। বললাম, ওগো গুলি খাইয়া আমি মরমু না। তহনই ঘটল আরেক ঘটনা। আগস্ট মাস। বড় ভাই থাকত কালিয়া উপজেলা থেকে একটু দূরে, চাচরি কদমতলায়। একদিন ওখানে যাচ্ছিলাম। কালিয়াতে যে রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকেরা ক্যাম্প বসাইছে জানতাম না। ওরা আমারে আটকায়। কয়, ‘তুই মুক্তিবাহিনীর লোক। তুই জানস মুক্তিবাহিনী কোথায়। সত্য কথা বললে ছাড়ি দিমু। মিথ্যা কইলে গুলি করমু।’
আমি কই, সারা দিন কাজ করি মাঠে। আর সন্ধ্যা হলেই বাড়িত ঘুমাই। মুক্তিবাহিনী কখন আসে কখন যায় আমি তো দেহি নাই।
আমারে খুব মারে ওরা। মেজরের কাছে নিয়া যায়। সন্ধ্যায় আমারে একটা বাংকারের সামনে নিয়া বসায়। আমাকে শুনায়া ওরা প্রচণ্ড গালাগালি করে বঙ্গবন্ধুরে। সে গালির কোনো শেষ নাই। ওরা খেয়াল করে আমি উত্তেজিত হই কি না। উত্তেজিত হইলেই বুঝব মুক্তিযোদ্ধা।
সকালের দিকে কয়েকটা চড় মাইরা ছাইড়া দিল। আমার তহন জেদ চাইপা গেল। খালি খালি ওরা আমারে মারল। ওগো তো ছাড়া যাইব না। বাড়িত আইসাই যোগাযোগ হয় গ্রামের বুলু মোল্লার লগে। তাঁর নেতৃত্বেই এক সকালে ১৯ জনের লগে ট্রেনিংয়ে যাই। রাজাকারগো নির্যাতনের বদলা নিতেই যুদ্ধে যাই।”
একাত্তরে ৩০ লাখ শহীদ, আড়াই লাখ নির্যাতিত মা-বোন এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারসহ পাকিস্তানপন্থী সব বাহিনীর তালিকা চূড়ান্ত ও বিচার করা যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু সেটি করতে না পারার ব্যর্থতায় বাঙালি জাতিকে এখনো চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। তবু আমাদের শিকড়ের ইতিহাসে ‘রাজাকার’ শব্দটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঘৃণিত হয়েই থাকবে।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে কালের কণ্ঠে, প্রকাশকাল: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.




