ভ্রমণকথা

সিংগাইরে কিরণের মাঠা ঘর

তেষ্টা মেটাতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে যায় কিরণের মাঠা ঘরে

জ্যৈষ্ঠ মাস। কাঁঠালপাকা গরম। চারদিকে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এর মধ্যেই এসেছি মানিকগঞ্জের সিংগাইরে। সবজি চাষে এ উপজেলার খ্যাতি রয়েছে। তাপ উপেক্ষা করেই এখানকার কৃষকরা ছুটছেন মাঠে। কেউ কেউ আবার নানা ধরনের সবজির ঝুড়ি নিয়ে ছুটছেন সিংগাইরের হাটে।

ঘামগোসল দিয়ে আমরাও ঘুরে দেখি হাটটি। রোদে ঘুরে ক্লান্ত সবাই। তৃষ্ণা মেটাতে কী খাওয়া যায়? তখনই স্থানীয় বন্ধু আমিনুল জানালেন নামকরা এক মাঠার খবর।

বাজারে কয়েকটি দোকানে মাঠা মিললেও সবচেয়ে ভালোমানের মাঠা খেতে নাকি যেতে হবে গ্রামের দিকে। মাঠার প্রকৃত স্বাদ পরখ করতেই খেতে হবে ‘কিরণ মাঠা’। শুনেই আগ্রহী হই। মাঠার টানে রোদের ভেতরই গ্রামের পথ ধরি।

সিংগাইর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে কাংশা গ্রাম। তালেবপুর ইউনিয়নের এ গ্রামেই কেরামত আলী ফকির কিরণের বাড়ি। তার হাতে তৈরি বিশেষ ধরনের মাঠা খ্যাতি পেয়েছে ‘কিরণ মাঠা’ নামে।

রাস্তার পাশেই বাড়ি তার। পাকা একটি ঘরে কয়েকটি সাধারণ টেবিল ও চেয়ার পাতা। সেখানে বসে তৃপ্তি নিয়ে মাঠা খাচ্ছে আগতরা। সবার সামনে একটি করে কাচের গ্লাস। এক যুবক কাচের জগে মাঠা এনে ভরে দিচ্ছে গ্লাসগুলো। দেখতেই আমাদের তেষ্টা যায় আরও বেড়ে।

একটি টেবিল খালি হতেই চেয়ার টেনে বসে পড়ি। ঠান্ডা ও বেশ ঘন মাঠা ঢেলে দেওয়া হয় সামনে রাখা গ্লাসগুলোতে। সেটিতে চুমুক দিতেই গলা থেকে পেট অবধি অন্যরকম শীতল অনুভূতি হয়। সত্যি, অন্যরকম স্বাদ কিরণ মাঠার।

কিরণের খোঁজ করতেই ছিপছিপে গড়নের এক লোক এসে হাজির। মুচকি হাসিতে মাঠা কেমন হয়েছে জানতে চান প্রথমে। আমরাও তৃপ্তি নিয়ে তার জবাব দিই। তারপর তার সঙ্গে গল্প জমাই। কিরণ মাঠার শুরুর কথা জানতে চাই।

তিনি বললেন পঁচিশ বছর আগের কথা, ঠিক এভাবে, “দুধ নিয়ে ঢাকায় বিক্রি করতাম তখন। পরিশ্রম ছিল খুব। কিন্তু তেমন লাভ হতো না। কারণ দুধে কখনও পানি মিশিয়ে মানুষকে ঠকাতাম না। অনেকেই তাই করত। দুধ নিয়ে নানা জায়গায় যেতাম। মাঠা তৈরিটাও অনেক জায়গায় দেখেছি। দেখতে দেখতেই শেখাটা হয়। একসময় দুধ বিক্রি বন্ধ করে মাঠার ব্যবসার কথা ভাবি। কিন্তু তখনও এখানকার মানুষ মাঠা খেতে তেমন অভ্যস্ত ছিল না।”

মাঠা শরীর ঠান্ডা রাখে। কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্যও ভালো। একদিন গোবিন্দল গ্রামের কাশেম কমিশনার ডেকে বললেন, “কিরণ তুই রোজায় মাঠা বানা। ভালো করে বানালে আমি নিমু। মানুষও খাবে।”

সেই থেকে শুরু। কাংশা বাজারের মোড়ে ১০-১২ লিটার মাঠা নিয়ে রাস্তায় বসে বিক্রি করতাম। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন তো দূরদূরান্ত থেকে এসে মানুষ মাঠা খেয়ে যায়, নিয়েও যায়। দেশের বাইরেও আমার মাঠা যায়। ‘কিরণ মাঠা ঘর’ বললেই সবাই চিনিয়ে দেয় আমার বাড়িটি।

রমজান মাসে কিরণ প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৮০০ লিটার মাঠা বিক্রি করেন, যার দাম দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ টাকা। এখন দিনে বিক্রি হচ্ছে ২০০-৪০০ লিটার। ২০ লিটার মাঠার জন্য ১৪ কেজি দুধ কিনেন কিরণ। সেই দুধ বিশেষভাবে জ্বাল দিয়ে দই করা হয়। তারপর মথন দিয়ে দইকে ঘণ্টাখানেক ঘোঁটা দিয়ে দিয়ে তৈরি করা হয় মাঠা। ঘোঁটার ওপর নির্ভর করে মাঠার ভালো-মন্দ।

কিরণ মাঠার বিশেষত্ব কী? কিরণের অকপট উত্তর, “আমার মাঠাতে ভেজাল নাই। একুরেট বানাই। ঘন না বানাইয়া পানি দিলেই মাঠা পাতলা হইব। লাভও হইব বেশি। অনেকেই মাঠার ভেতর ময়দা আর সুজি মিশায়া ঘন করে। এটা তো ক্ষতিকর। এগুলো করি না আমি। কাজে সৎ থাকি।”

উৎসাহ পাওয়া একটি ঘটনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষায়, “গ্রামের চেয়ারম্যান সাহেব একদিন আমারে কইছিল, ভালো মাঠা বেচেক। ভালো জিনিস দাম বেশি হলেও মানুষ খাইব। আস্তে আস্তে ভালোটা খাইতে খাইতে যার ভালো লাগব সেই খুঁজব তোরে।

“তার কথাডা মনে ধরছিল। ভালো মাঠা বানাইতে বানাইতে ধীরে ধীরে মার্কেট পাইল। মাঠা বেইচাই এহন পাকা ঘর দিছি। চুরি করলে তো এত মানুষ মাঠা খাইতে আসত না ভাই। এত সম্মানও পাইতাম না।”

কিরণ জানায়, “প্লাস্টিকের বোতলে মাঠা দিলে গন্ধ হয়ে যায় তাড়াতাড়ি। তাই এখানে মাঠা পরিবেশন করা হয় জগে করে গ্লাসে গ্লাসে। ফলে খাদ্যগুণও বজায় থাকে।”

কিরণের ইচ্ছে, ভালো মানের মাঠা খাইয়ে মাঠার ঐতিহ্যকে ধরে রাখা। তার ভাবনা, “সঠিক রাস্তায় থাকা কষ্ট হলেও একসময় মানুষের সম্মান পাওয়া যায়। বেঠিক রাস্তায় গেলে কিছুদিন ভালো থাকলেও একসময় সম্মান হারাতে হয়।”

এই বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করেই কিরণ লাখো মানুষকে মাঠা খাইয়ে তাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে চান। কিরণের চিন্তা ও চেতনায় আমরা মুগ্ধ হই। মানুষকে ঠকানো ও ভেজালের এই যুগে ‘কিরণের মাঠা ঘর’ সত্যি সততার এক অনন্য নজির।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজ বিভাগে, প্রকাশকাল: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

© 2025, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button