আদিবাসী

আদিবাসী উৎসবকথা চৈতবিসিমা, সিরুয়া-বিসুয়া ও চৈতাবালি

আদিবাসীদের উৎসব দেখব – সেই পরিকল্পনা নিয়েই এসেছি দিনাজপুরে। আমার এক বন্ধুর সঙ্গে যাত্রা শুরু করি।বৈশাখের প্রথম প্রহরে রাস্তার পাশে নানা সাজপোশাকে বাঙালিদের ভিড়। কোথাও কোথাও চলছে বৈশাখি মেলা। সবকিছু পেছনে ফেলে আমরা চলে আসি বহবলদিঘিতে, ভুনজারদের আদিবাসী পাড়ায়।

ভুনজার আদিবাসী জাতিটি এদেশে নিজস্ব ধারার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য লালন করে গড়ে তুলেছে বৈচিত্র্যময় জীবনপ্রণালি। ইংরেজ আমলে এ-অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় বসেছে রেললাইন। পাহাড় কেটে, মাটি খুঁড়ে সেই রেললাইন বসানোর কাজে ঘাম ঝরিয়েছে এই আদিবাসীরা। মূলত রেললাইনের কাজের সূত্র ধরেই ভারতের ঝাড়খন্ড থেকে এদের আগমন এদেশে। দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার বহবলদিঘি ও পিপল্লা গ্রামে ভুনজারদের বসবাস। এছাড়া রাজশাহী ও নাটোরেও কিছুসংখ্যক ভুনজার আদিবাসী রয়েছে। একসময় এদেশে এদের একাধিক গ্রাম ছিল। মূলত স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে ভূমিকেন্দ্রিক বিরোধের কারণেই বিভিন্ন সময়ে এরা পাড়ি জমিয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। ফলে এদেশে ভুনজারদের সংখ্যা ক্রমেই কমছে।

বহবলদিঘির ভুনজারপাড়ায় কোনো বৈশাখি আয়োজন চোখে পড়ল না। বিশটির মতো ভুনজার আদিবাসী পরিবার আছে বহবলদিঘিতে। তাদের বাড়িগুলির অবয়বই বলে দেয় ভুনজারদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কথা। একটি বাড়িতে ঢুকে দেখি তুলসীগাছের পাশে মাটিতে বেশ কয়েকটি সিঁদুরফোঁটা দেওয়া। বেশকিছু ফুলও পড়ে আছে সেখানে। বোঝা যায় একদিন আগেই পূজার আনুষ্ঠানিকতা হয়েছে।

মহত বা গোত্রপ্রধানের খোঁজ করতেই অন্ধকারাচ্ছন্ন জানালাবিহীন একটি ছোট্ট ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন এক বৃদ্ধ। বয়স ষাটের মতো। হাসিমুখে পিঁড়ি টেনে আমাদের বসতে দেন।

নাম তাঁর বাতাসু ভুনজার। বহবলদিঘির  ভুনজার গোত্রের মহত। এখানে আছেন পূর্বপুরুষদের আমল থেকেই। বৈশাখে কি ভুনজারদের কোনো উৎসব হয় না? প্রশ্ন করতেই বাতাসুর হ্যাঁ-সূচক উত্তর। তিনি জানান, বৈশাখ উদ্যাপনের অংশ হিসেবেই গোত্রের সবাই আজ দলবেঁধে বেরিয়েছে শিকারে। বাতাসুর কথায় আমরা খানিকটা অবাক হই। কিছুটা থেমে থেমে বাতাসু বলতে থাকেন ভুনজারদের বৈশাখ উদ্যাপনের কথা।

আদিবাসী ভুনজাররা পূর্বপুরুষদের রীতি অনুসারে চৈত্র মাসের শেষদিন আর বৈশাখ মাসের প্রথম দিনকে বিশেষ পূজা আর আচারের মাধ্যমে পালন করে আসছে। ভুনজারদের ভাষায় এটি চৈতবিসিমা উৎসব। এ-উৎসবের অংশ হিসেবে চৈত্র মাসের শেষদিন এরা বাসন্তী পূজা করে থাকে। কেন এই পূজা? প্রশ্ন করতেই বাতাসুর উত্তর, ‘বাপ-দাদারা পূজেছে, তাই পূজি।’

বাসন্তী পূজা নিয়ে ভুনজারদের মধ্যে এখনো প্রচলিত আছে কিছু আদি বিশ্বাস। একসময় যখন চিকিৎসার জন্য কোনো পাশ করা চিকিৎসক ছিল না এখানে, তখন ডায়রিয়া আর বসন্তে মারা যেত শত শত আদিবাসী। এই দুটি রোগ থেকে মুক্তি পেতেই ভুনজাররা চৈত্রের শেষ সন্ধ্যায় ঠাকুরের কাছে পূজা করে। বাতাসু জানালেন, বসন্ত রোগ থেকে মুক্তির জন্য এই পূজা করা হতো বলেই এর নামকরণ হয়েছে বাসন্তী পূজা।

এ-পূজায় একটি মাটির ঘটিতে আমপাতা, কলা, নারকেল, ধূপ আর চার ফোঁটা সিঁদুর দিয়ে ঠাকুরের উদ্দেশে পূজা দেওয়া হয়। কেউ কেউ এই দিনেই বলি দেয় মানতের হাঁস, মুরগি কিংবা পাঁঠা। এর আগে চৈত্রের শেষ শুক্রবার এরা উপোস থাকে। উদ্দেশ্য ঠাকুরের সন্তুষ্টি ও আয়-রুজি বৃদ্ধি। বিনা লবণে আতপভাত খেয়ে উপোস শুরু হয়। উপোস অবস্থায় খাওয়া যায় শুধু ফলমূল আর দুধ।

বাসন্তী পূজাশেষে ভুনজাররা সবাই কালাইসহ নানা ধরনের ছাতু-গুড় খেয়ে আনন্দ-ফূর্তিতে মেতে ওঠে। বাতাসু জানান, সে কারণেই গতরাতে চলেছে খেমটা নাচ আর হাঁড়িয়া খাওয়া। তাদের বিশ্বাস, প্রতি চৈত্রে এই পূজার কারণেই তাদের গোত্রে এখন আর ডায়রিয়া কিংবা বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব হয় না।

কথায় কথায় পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন রবি ভুনজার, বাতাসুর ছেলে। কথা বলছেন বেশ চেঁচিয়ে। আমাদের দেখে খানিকটা লজ্জিত হন। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তাঁর কথা খানিকটা জড়িয়ে যাচ্ছিল। গতরাতের বাসন্তী পূজার হাঁড়িয়ার নেশা তাঁর তখনো কাটেনি। কেমন মজা করলেন – বলতেই তিনি ভুনজারদের খট্টা ভাষায় গেয়ে ওঠেন খেমটা নাচের একটি গান :

কেলাগাছে আয়না টাঙ্গাবে রে

কালো তরি মনো না ভুলারে

হে হাগলে হাগলে …

রবির গান থামতেই বাতাসু আবার কথা শুরু করেন। বাঙালিদের মতো বৈশাখে আদিবাসীরা তাদের প্রিয়জনকে নতুন কিছু উপহার না দিলেও বৈশাখের সকালে তারা সবাই মিলে পোনতা (পান্তা ভাত) খায়। তবে পান্তার সঙ্গে জোটে না কোনো ইলিশের টুকরো। পূর্বপুরুষের আমল থেকেই চৈতবিসিমার অংশ হিসেবে ভুনজাররা বৈশাখের সকালে কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে সেরে নেয় পান্তা খাওয়া। এদের বিশ্বাস, বৈশাখের প্রথমে পান্তা খেলে সারাবছর গায়ে রোদ লাগলেও তারা কষ্ট পাবে না। তাছাড়া পান্তার পানি তাদের শরীরকে ঠান্ডা রাখে।

বৈশাখের প্রথমদিন ভুনজাররা কাজে না গেলেও তীর-ধনুক আর কোদাল নিয়ে দলবেঁধে শিকারে বের হয়। সন্ধ্যা অবধি শিকার করে নিয়ে আসে ধুরা, কুচিয়া আর ইঁদুর। সন্ধ্যায় ঠাকুরকে ভক্তি দিয়ে শিকারগুলি দিয়ে রান্না হয় খিচড়ি (খিচুড়ি)। রাতভর চলে আনন্দ-ফুর্তি আর হাঁড়িয়া খাওয়া। বাঙালির বৈশাখের আয়োজনকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি গ্রাস করলেও আদিবাসী সংস্কৃতিতে খেমটা আর জুমের নাচ এখনো আদি ও অকৃত্রিম।

দুপুরের দিকে আমরা ভুনজারপাড়া থেকে বের হয়ে কালিয়াগঞ্জের পথ ধরি। রবি ভুনজার তখনো থেমে থেমে গান গাইছেন। চলতে চলতে কানে বাজে আদিবাসী সেই গানের সুরটি :

পানের ডেলা পানে রইলো

সুপারিতে ঘুনো লাগি গেল, মা

সুপারিতে ঘুনো লাগি গেল

হে সেবেল, সেবেল, ওয়াহাগলে, ওয় হাগলে,

হে …

আঁকাবাঁকা মেঠোপথ পার হতেই বিশাল শালবন। লাল মাটির পথ পেরিয়ে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের ক্যাম্পকে পেছনে ফেলে আমরা চলে আসি শালবনের একেবারে ভেতরে। চারপাশে গা-ছমছমে পরিবেশ। খুব কাছেই সীমান্ত। খানিকটা ভয় ভয়ও লাগছিল। পাছে ফেলানির মতো অবস্থা হয় আমাদের!

বনের ভেতরেই একটি আদিবাসী পাড়ার সামনে আমরা থামি। পাড়াটি মুণ্ডা পাহানদের। মাটি আর ছনের আদিবাসী ঘরগুলির একপাশে গহিন শালবন। অন্যপাশের মাঠ পেরোলেই কালো কাঁটাতারের বেড়া। আমাদের দেখে এগিয়ে আসেন সবুজ পাহান। তাঁকে নিয়ে আমরা পাড়াটি ঘুরে দেখি।

বাংলাদেশের খুলনা, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা প্রভৃতি জেলায় মুণ্ডা আদিবাসীদের বাস। নৃ-তাত্ত্বিকদের মতে মুণ্ডারা অস্ট্রালয়েড গোষ্ঠীভুক্ত। কিন্তু আকৃতি, প্রকৃতি, আচার, রীতি প্রভৃতি অনুযায়ী তাদের নিজস্ব কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য আছে, যা আজো অপরির্তিত। এই মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি তারা যুগ যুগ ধরে বহন করে আসছে।

জাতির নাম কেন ‘মুণ্ডা’?

আর্য সভ্যতারও বহু আগে থেকেই ভারতীয় ভূখণ্ডের বেশ কিছু অঞ্চলে অস্ট্রোলয়েড গোষ্ঠীর আদিবাসীরা বাস করতো। তাদের মূল জীবিকা ছিল চাষবাস ও পশুপালন। একটি নির্দিষ্ট রুচি ও সংস্কৃতিও ছিল তাদের। কিন্তু আর্যরা আসার পরই পাল্টে যেতে থাকে সবকিছু। নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আর্যরা লড়াই শুরু করে ওই অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসীদের সঙ্গে। ফলে তারা সেখান থেকে সরে ছোটনাগপুর, মধ্যপ্রদেশ ও উড়িষ্যার পার্বত্যাঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। অস্ট্রালয়েড জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোল আদিবাসীরাই বনাঞ্চল কেটে প্রথম জনবসতি তৈরি করে বিহারের ছোটনাগপুর এবং রাঁচিতে। কোলদের সমাজে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বা সর্দারকে ডাকা হতো ‘মুণ্ডা’। সেখান থেকেই মুণ্ডা নামের উৎপত্তি বলে নৃ-তাত্ত্বিকরা মনে করেন।

মুণ্ডাদের দুপুরের খাওয়া শেষ হয়েছে তখন। সবুজ পাহান জানালেন, বৈশাখের রীতি অনুসারে তারা ভাতের সঙ্গে খেয়েছেন ১২ ভাজা, অর্থাৎ ১২ পদের তরকারি দিয়ে। আদিবাসী ভুনজারদের মতোই এরা সকালে খেয়েছে পান্তা ভাত আর সন্ধ্যায় ঠাকুরকে ভক্তি দিয়ে চলবে নাচ-গানের আসর।

সবুজের দাদা শ্যামল পাহান। বয়স সত্তরের মতো। একটি বড় গাছের ছায়ায় বসে তাঁর সঙ্গে কথা চলে আমাদের।

কেন পান্তা খান? প্রশ্ন করতেই তিনি আদিবাসী গানের সুর তোলেন :

হামে লাগে প্রথমে আদিবাসীই

পন্তা ভাত ভালোবাসি …

তাঁর গানে আমরা বেশ মজে যাই। কথা চলে চৈত্র-বৈশাখের নানা উৎসব নিয়ে।

বৈশাখের মতো চৈত্রের শেষদিনেও মুণ্ডারা আয়োজন করে নানা আচারের। ওইদিন তারা বাড়িঘর পরিষ্কার করে একে অপরের গায়ে কাদা আর রং ছিটায়। পূর্বপুরুষদের রীতি অনুসারে যার গায়ে কাদা বা রং দেওয়া হয় তাকেই খেতে দিতে হয় প্রিয় পানীয় হাঁড়িয়া। মুণ্ডারা বিশ্বাস করে, এতে বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় হয়। চৈত্রের শেষদিন এবং বৈশাখের প্রথমদিনের এ-উৎসবকে মুণ্ডারা বলে সিরুয়া বিসুয়া।

শ্যামল পাহান জানালেন, এছাড়াও তারা চাঁদের হিসাবমতে চৈত্র মাসে আয়োজন করে চৈতালিপূজা। রোগ থেকে মুক্তি পেতে ঠাকুরের কৃপা লাভই এ-পূজার উদ্দেশ্য। এ-পূজায় আগের রাতে উপোস থেকে পরদিন দুপুরে পূজার প্রসাদ দিয়ে উপোস ভাঙাই নিয়ম। মঈনকাঁটা বা বেলগাছের নিচে মাটির উঁচু ডিবি তৈরি করে, লাল নিশান আর ধূপ কাঠি টানিয়ে, পান, সুপারি, দুধ, কলা, দূর্বাঘাস, বাতাসা, কদমফুল, সিঁদুর, হাঁড়িয়া দিয়ে, ধূপ জ্বালিয়ে ঠাকুরকে পূজা দেওয়া হয় চৈতালিপূজায়। একই সঙ্গে বলি দেওয়া হয় মানতের কবুতর, হাঁস কিংবা পাঁঠা। পূজাশেষে চলে খিচুড়ি খাওয়া। রাতভর চলে হাঁড়িয়া পান আর নাচগান। এরপর আমাদের পায়ের ছাপ পড়ে লোহাডাঙ্গায়, তুরি পাড়ায়।

এদেশের তুরি আদিবাসীদের জীবনপ্রণালি বেশ বৈচিত্র্যময়। দিনাজপুর জেলার লোহাডাঙ্গা, রামসাগর, বোটের হাট, জামালপুর, পুলহাট, খানপুর, মহেশপুর, বড়গ্রাম, সাদিপুর, মুরাদপুর, হাসিলা, গোদাগাড়ি, নাজিরগঞ্জ ছাড়াও রংপুর, জয়পুরহাট, নাটোর, রাজশাহী ও বগুড়া জেলায় অধিকসংখ্যক এই আদিবাসীদের বসবাস। জানা যায়, তুরি জাতির পূর্বপুরুষেরা ছিলেন পাহাড়ের তথা বনভূমির অধিবাসী। তখন তাদের খাদ্য ছিল রুটি, ফলমূল, জীবজন্তুর মাংস, ছাতু। ধানের আবাদ না হওয়ায় ‘ভাত’ ছিল না খাদ্যতালিকায়। হিংস্র বন্যপশুর হাত থেকে বাঁচতে ঢাল-তলোয়ার, বর্শা ও তীর-ধনুকই ছিল এদের নিত্যসঙ্গী। বন্যজন্তুর ভয়ে জঙ্গল কেটে এরা টং বানিয়ে বাস করত। এদের পূর্বপুরুষরা ঢাক-ঢোল বাজানোয় পারদর্শী ছিলেন। সে-সময় রাজার লোকেরা খুশি হয়ে তাদের জিজ্ঞেস করতো – ‘তোমরা কোন জাত?’ উত্তরে তারা বলতো – ‘আমরা তুরই জাত’, মানে তোর-ই বা তোমাদেরই জাত। লোকমুখে সেখান থেকেই তাদের তুরি বলে ডাকা হয়। বিভিন্ন গ্রন্থের তথ্যমতে, এ-অঞ্চলে তুরিরা এসেছে প্রায় দেড়শো বছর আগে, ভারতের দুমকা থেকে। এদের ঝুমটা নাচের গানেও পাওয়া যায় দুমকার অস্তিত্ব। ঝুমটা নাচের গানটি – ‘কিনে দেব ঝুমকা/ ত লেয়ে যাব দুমকা’ (কিনে  দেব ঝুমকা তারপর নিয়ে যাব দুমকা)। মূলত রেললাইনের কাজের সূত্রেই এ-অঞ্চলে এদের আগমন। দুমকা থেকে এলেও বর্তমানে তুরি আদিবাসীদের সংখ্যা বাংলাদেশেই বেশি। এরা পুরুষদের নামের শেষে ‘শিং’ এবং নারীদের নামের শেষে ‘বালা’ বা ‘দেবী’ পদবি ব্যবহার করে।

চৈত্র ও বৈশাখে তাদের উৎসবটি কেমন হয়? মুচকি হেসে তুরিদের গোত্রপ্রধান বা মহত লবানু শিং বলেন আদ্যোপান্ত।

চৈত্র মাসের শেষ পাঁচদিন আদিবাসী তুরিরা পালন করে চৈতাবালির অনুষ্ঠান। শুরুর দিন থেকেই এরা ছাতু-গুড় খেয়ে নাচ-গান করে। চৈত্রের শেষদিন এরা বাড়িতে রান্না করে সাত পদের তরকারি। সাত পদ দিয়ে ভোজ সেরে এরা চৈত্রকে বিদায় দেয়। বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে চলে নাচ-গান পর্ব। শেষ চৈত্রের পরদিনই বৈশাখ। বৈশাখ শুরু হলেই তুরিরা বন্ধ করে দেয় মাছ-মাংস খাওয়া। পুরো এক মাস তারা শুধু নিরামিষ খেত। প্রতিরাতে তুরি পাড়াতে চলে কির্তন। কির্তন করে শুধুই পুরুষেরা। এ-সময় দূর-দূরান্ত থেকে নানা বিশ্বাসের আদিবাসীরা ভিড় জমায় তুরি পাড়ায়। বৈশাখের শেষের দিকে তারা প্রতিটি বাড়ি থেকে চাল তুলে একত্রে খিচড়ি রান্না করে খায়। বৈশাখে ভগবানের কৃপালাভের আশায় চলে এমন আচার।

এরই মধ্যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। অন্ধকারও জেঁকে বসে। বৈশাখের আনন্দে বেজে ওঠে আদিবাসী গ্রামের মাদল আর ঢোলগুলি। আশপাশে শুরু হয় ঝিঁঝি পোকার ডাক। মাঝে মাঝেই ডেকে উঠছে দু-একটা শেয়াল। এরই মধ্যে আমরা ফিরতি পথ ধরি।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলমে, প্রকাশকাল: ৩১ জুলাই ২০২২

© 2022, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button