রাজাকারের বিশ্বাসঘাতকতা ও এক চিকিৎসক পিতার রক্তঋণ

লাশ জোটেনি, কবরও নেই, তবুও যশোরের মাটিতে মিশে আছে যার অমর স্মৃতি।
যশোরের শার্শা উপজেলার নাভারণ রেল বাজার। একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে এই জনপদ সাক্ষী হয়েছিল এক মহৎ প্রাণের আত্মত্যাগ আর এক ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতার। সেই ইতিহাসের মহানায়ক শার্শা থানার প্রথম শহীদ ডা. আজিজুর রহমান।
একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর কবীরের পিতা তিনি। কেমন মানুষ ছিলেন আজিজুর রহমান? এই প্রশ্নের উত্তরে আলমগীর কবীর যখন স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেন, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক ঋজু ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। তিনি অকপটে তুলে ধরেন তার শহীদ পিতার জীবনের নানা অজানা তথ্য ও সংগ্রামের দিনলিপি।
আজিজুর রহমানের আদি জীবন ও উচ্চশিক্ষার শেকড় ছিল কলকাতায়। সেখানকার ‘ন্যাশনাল হোমিও মেডিকেল কলেজ’ থেকে এইচএমবি ডিগ্রি পাওয়ার পর তিনি ওপার বাংলার রনগাঁয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন। চিকিৎসক হিসেবে সেখানে তার খ্যাতি ছিল। কিন্তু নাড়ির টানে ষাটের দশকের শুরুতে তিনি সপরিবারে ফিরে আসেন নাভারণ রেল বাজারে। শুরু করেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা।
তবে তার কাছে চিকিৎসা কেবল পেশা ছিল না, ছিল আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে সঁপে দেওয়ার এক ব্রত। এলাকায় তিনি একজন অজাতশত্রু, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্ত চেতনায় বিশ্বাসী রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। চিকিৎসা সেবা দেওয়া ছাড়াও তার নিত্যদিনের প্রিয় কাজ ছিল স্থানীয় লাইব্রেরিগুলো থেকে বই ও পত্র-পত্রিকা সংগ্রহ করে পড়াশোনা করা।
সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে আজিজুর রহমান মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। ফলে পাকিস্তান আমলে প্রগতিশীল ও কমিউনিস্ট ঘরানার রাজনীতিকদের সঙ্গে ছিল তার নিবিড় যোগাযোগ। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনের একনিষ্ঠ সমর্থকও ছিলেন।
একাত্তরে যখন দেশমাতৃকার মুক্তির ডাক এলো, আজিজুর রহমানের বয়স তখন ৭২ বছর। জীবনের এই অপরাহ্ণে এসেও তিনি ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার। শুধু তাই নয়, তিনি প্রতিনিয়ত মুক্তিযোদ্ধাদের লড়ে যাওয়ার সাহস জোগাতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তার ছেলে আলমগীর কবীর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে তিনি প্রথমে শরণার্থীদের সেবায় নিয়োজিত হন এবং পরবর্তীতে সশস্ত্র যুদ্ধের কঠিন প্রশিক্ষণে অংশ নেন।
সুচিকিৎসক আজিজুর রহমানের ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে- এই খবরটি স্থানীয় শান্তি কমিটির লোকজনের কাছে মোটেই স্বস্তিদায়ক ছিল না। এই শান্তি কমিটির সদস্যরাই পরবর্তীতে কুখ্যাত রাজাকার বাহিনীতে নাম লেখায় এবং তারাই পাকিস্তানি ঘাতক সেনাদের কাছে আজিজুর রহমানের বাড়িটি সুনির্দিষ্টভাবে চিনিয়ে দেয়।
পিতার শহীদ হওয়ার সেই বিষাদময় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর কবীর বলেন, “শার্শা থানার প্রথম শহীদ আমার বাবা। মূলত আমার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অপরাধেই বাবাকে ধরে নিয়ে যায় ওরা।”
একাত্তরের শুরুতেই প্রতিরোধ যুদ্ধে যশোর রোডের ভৌগোলিক গুরুত্ব ছিল। ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর এই রোডের বিভিন্ন জনপদে পুলিশ, ইপিআর, আনসার ও ছাত্র-যুবসমাজের সমন্বয়ে গঠিত মুক্তিবাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরবর্তীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভারী আধুনিক অস্ত্রের মুখে প্রতিরোধ যোদ্ধারা কৌশলগত কারণে পিছু হটতে বাধ্য হয়। একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ত পরিবারগুলো একে একে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে সীমান্তের ওপারে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে চলে যেতে থাকে।
৯ এপ্রিল ১৯৭১। নাভারণ রেল বাজার এলাকাটি পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে যায়। পরিবারের অন্য সদস্যরা তখন নিরাপত্তার খোঁজে সীমান্তবর্তী গ্রাম সালতায় আশ্রয় নেয়। কিন্তু বয়সের ভার এবং নিজের ভিটেমাটির প্রতি মমতার কারণে নাভারণের নিজ বাড়িতেই থেকে যান আজিজুর রহমান। এর আগেই আলমগীর কবীর তার সহযোদ্ধা সিরাজুল হক মঞ্জু, মশিয়ার রহমান মধু ও আরও অনেকের সঙ্গে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে গিয়েছিলেন।
তৎকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনারা নাভারণ রেল বাজারে একটি বেস ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। সেখান থেকেই তারা বিভিন্ন এলাকায় অপারেশন চালাত। রাজাকারদের সহযোগিতায় তারা নিয়মিতভাবে স্বাধীনতার পক্ষের নিরীহ ও প্রতিবাদী মানুষদের ধরে আনত। ঠিক সেই উত্তাল সময়টাতে কলকাতা পিজি হাসপাতালের শল্য চিকিৎসক ডা. এস এন বসু নাভারণ হাসপাতালে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষ ক্যাম্প খোলেন।
সেই ক্যাম্পে আজিজুর রহমানের আরেক পুত্র নাজমুল আহসান স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দিনরাত কাজ করতেন। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী নাভারণ দখল করে নিলে সেই চিকিৎসা ক্যাম্পটি সীমান্ত পেরিয়ে বনগাঁয় স্থানান্তর করা হয়। ফলে স্বেচ্ছাসেবকদের কাজ তখন অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়ে। ১৩ এপ্রিল নাজমুল আহসান পাকিস্তানি সেনাদের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে তার বাবা আজিজুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে শেষবারের মতো বাড়িতে ফিরে আসেন।
নাজমুল আহসান বর্তমানে একজন চিকিৎসক। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি এখনও নাভারণ রেল বাজারে নিজের চেম্বারে মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “১৪ এপ্রিল ১৯৭১। সেদিন রাতে আমি আর বাবা খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় প্রচণ্ড করাঘাতের শব্দ। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে একজন পাকিস্তানি সেনা অফিসার সাত-আটজন সশস্ত্র সৈন্যসহ হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই তারা ঘর তল্লাশি শুরু করে এবং চিৎকার করে ধমকাতে থাকে, ‘মুক্তি কাহা হ্যায়?’ প্রায় দশ-পনেরো মিনিট তাণ্ডব চালানোর পর তারা বাবাকে (আজিজুর রহমান) গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।”
নাজমুল আহসান আরও যোগ করেন, “আমি তাদের পিছু নিই। ঘরের বাইরে উঠানের কাছে আসতেই থমকে দাঁড়াই। দেখি, তোফাজ্জেল মুন্সির ছেলে কুখ্যাত রাজাকার আব্দুল কাদের শুকুরকে। সেই-ই খবর দিয়ে পাকিস্তানি আর্মিদের আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। শুকুর আমাকে দেখে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। তৎকালীন সেই কঠিন কারফিউর মধ্যে শুকুর কীভাবে সেখানে উপস্থিত হলো? আসলে বাবার গ্রেপ্তার ও হত্যায় এই রাজাকারের সরাসরি সহযোগিতা ছিল।”
বাবার লাশের হদিস কি মিলেছিল কোনোদিন? এই প্রশ্নের উত্তরে মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর কবীর বলেন, “না, আমরা বাবার লাশ পাইনি। আমার বড় ভাই জুট মার্কেটিংয়ে চাকরি করতেন, তিনি পরিচিত জনদের মাধ্যমে বাবাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেছেন। এমনকি যশোর ক্যান্টনমেন্টেও গিয়েছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। কিন্তু তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছিল যে খুঁজে লাভ নেই, তিনি আর নেই। ঘাতকরা তাকে মেরেই ফেলেছিল। আমরা তার লাশটাও পাইনি।”
কোথায় হত্যা করা হয়েছিল তাকে? আলমগীর কবীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, “নাভারণে ‘ঢকের বাগান’ নামক একটা জায়গা আছে। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনারা ওখানে স্বাধীনতার পক্ষের লোকজনকে ধরে এনে গুলি করে মেরে ফেলে দিত। হয়তো ওখানেই ঘাতকের বুলেট বিদ্ধ করেছিল বাবার বুক। বাবার লাশ পাইনি, ফলে তার কোনো সুনির্দিষ্ট কবরও নেই। তবে স্বাধীন এই দেশের মাটির সঙ্গে মিশে আছে আমার বাবার রক্ত, তাই এই মাটি আমাদের কাছে পবিত্র!”
স্বাধীনতাবিরোধীদের সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর কবীরের অনুভূতি স্পষ্ট। তিনি বলেন, “একাত্তরের ঘাতকরা আজ যতই পাক-পবিত্র সাজুক না কেন, আমাদের কাছে তারা চিরকালই শহীদ পিতার হত্যাকারী হিসেবেই গণ্য হবে। মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রিয়জন হারাননি, যারা কাছ থেকে রাজাকার ও আলবদরদের নিষ্ঠুরতা দেখেননি, তারা এটি কোনোদিন উপলব্ধি করতে পারবেন না। যারা এই দেশের অভ্যুদয়ই চায়নি, তারা কীভাবে এ দেশের মঙ্গল চাইবে? মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা এই খুনিদের ঘৃণা করে যাব।”
শহীদ ডা. আজিজুর রহমানের আত্মত্যাগ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অমলিন অধ্যায়। একাত্তরের শহীদদের কথা ভুলে গেলে তাদের রক্তঋণ কখনোই শোধ হবে না। এই দায় আমাদের সবার। শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন না হওয়া এবং শহীদ পরিবারগুলোর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পাওয়া আজও স্বাধীন বাংলাদেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আজিজুর রহমানের মতো অসংখ্য শহীদের রক্তে ভেজা এই মাটিই আমাদের পরম অস্তিত্ব ও অনুপ্রেরণা।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
© 2026, https:.




