মুক্তিযুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধের তিন বীর নারী: তারামন, সিতারা ও কাঁকন বিবি

তারামন বিবি, সিতারা বেগম ও কাঁকন বিবি—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই তিন নাম নারীর সাহস, ত্যাগ ও নেতৃত্বের তিন ভিন্ন রূপ।

মহান মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদান রেখেছিলেন নারী মুক্তিযোদ্ধারাও। কখনো অস্ত্র হাতে সম্মুখযুদ্ধে, কখনো গুপ্তচরবৃত্তিতে, কখনো আহত মুক্তিযোদ্ধার সেবায়—তারা জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য লড়ে গেছেন। বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন অদম্য নারী যোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকার জন্য তিন নারী মুক্তিযোদ্ধাকে বীর প্রতীক উপাধিও দেওয়া হয়। ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম অনেক সময় অবহেলিত থেকেছে, কিন্তু তাদের সাহস আর ত্যাগই একাত্তরের বিজয়ের পথকে সুগম করেছে।

শত্রু ক্যাম্পের খবর জেনে আসতেন তারামন বিবি

দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি। আগে তার নাম ছিল তারাবানু। জন্মেছিলেন কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরের শংকর মাধবপুর গ্রামে।

যুদ্ধের সময় ওই গ্রাম ছিল ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে। ওই সময় মুহিব হাবিলদার নামে স্থানীয় এক মুক্তিযোদ্ধা তারাবানুকে নিয়ে যান তাদের ক্যাম্পে। তখন তার বয়স ছিল ১৩ বছর।

মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার আগে মুহিব হাবিলদার প্রথমে তাকে ধর্ম মেয়ে বানান। অতঃপর ‘তারাবানু’ নাম পাল্টে নাম দেন ‘তারামন’।

ক্যাম্পে রান্নাসহ নানা কাজে যুক্ত থাকতেন তারামন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করতেন। পরে যুদ্ধের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ দেখে মুহিব হাবিলদার তাকে স্টেনগান চালানো শেখান। এভাবেই যোদ্ধা বনে যান তারামন বিবি।

সম্মুখযুদ্ধ ছাড়াও গুপ্তচর সেজে পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে ঢুকে তথ্য নিয়ে আসতেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন অপারেশনের আগে কলার ভেলায় করে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পের রসদ, অস্ত্র ও গোলাবারুদ পৌঁছে দিতেন।

অক্টোবর ১৯৭১। খালিয়াভাঙ্গা গ্রাম। ভেড়ামারি খালের পাশের গ্রাম এটি। ওই গ্রামের এক পাশে মুক্তিবাহিনীরা, অন্য পাশে পাকিস্তানিদের ক্যাম্প। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা ছিল না মুক্তিযোদ্ধাদের। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ক্যাম্পের ভেতর ঢোকার সাধ্যি কার?

তারামন তখন এগিয়ে আসেন। শরীরে কাদা মেখে পাগলের বেশ ধরে খাল পার হয়ে পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে ঢোকেন। ক্যাম্পের সামনেই হানাদার বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। তারামনের গায়ে কাদা, মাথায় চুলের জট, কাপড় ছেঁড়া, হাত পা যেন অনেকখানি বিকলাঙ্গ। এই বেশ দেখে পাকিস্তানি আর্মি তাকে পাগল ভেবে নিজেদের মধ্যে হাসিঠাট্টায় লিপ্ত হয়। কেউ কেউ তাকে দেখে অশ্লীল ভাষায় গালিও দেয়। জবাবে তারামনও অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করেন।

সবাই ভাবল পাগল। আর এই ফাঁকে তারামন রেকি করে নিলেন পুরো পাকিস্তানি ক্যাম্পটির। কোন পাশে হামলা করলে পাকিস্তানিদের ভয়ংকর পরিণতি ঘটবে, কোন পয়েন্ট দিয়ে তাদের ওপর হামলা করা সহজ হবে—চারপাশ দেখে এমন পরিকল্পনা করে নেন তিনি। অতঃপর ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে সাঁতরে খাল পেরিয়ে চলে আসেন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে।

গোপন খবরের অপেক্ষায় ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। তারামন পাকিস্তানিদের ক্যাম্পের পুরো অবস্থা কমান্ডারকে জানিয়ে দেন। তার নির্ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মুক্তিযোদ্ধারা পরদিনই পাকিস্তানিদের ওই ক্যাম্পে আক্রমণ করে বিজয় লাভ করে।

একাত্তরে এভাবেই মোহনগঞ্জ, তারাবর কোদালকাটি, গাইবান্ধার ফুলছড়ির অপারেশনগুলোতে পুরুষ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে থেকে সম্মুখসমরে সরাসরি অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি।

স্বাধীনতাযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৭৩ সালে তারামন বিবিকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করা হয়। কিন্তু এ খবর জানতেন না তিনি। কেটে যায় বাইশটি বছর। প্রায় লোকচক্ষুর অন্তরালেই চলে যান মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি। পরে প্রকাশ্য হন ১৯৯৫ সালে, ২১ নভেম্বর দৈনিক ভোরের কাগজের প্রথম পাতায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে। ফলে ওই বছরের ১৯ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এই বীর নারীর হাতে তুলে দেন ‘বীর প্রতীক’ সম্মাননা।

২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি নারী তারামন বিবি (বীর প্রতীক)।

অস্ত্র নয়, চিকিৎসাই ছিল ক্যাপ্টেন সিতারার যুদ্ধ

যুদ্ধদিনে সিতারা বেগম।

মুক্তিযুদ্ধের লড়াকু বীর ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম। তিনি সেবা, যত্ন ও স্নেহে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিকূল সময়ে অসুস্থ ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন।

সিতারা বেগমের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। বাবা মোহাম্মদ ইসরাইল এবং মা হাকিমুন নেসা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন তিনি। অতঃপর ১৯৭০ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরে লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগ দেন। সিতারা বেগমের বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা এ টি এম হায়দার (বীর উত্তম) ও ছোট ভাই এ টি এম সাফদারও ছিলেন রণাঙ্গনে।

একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে সিতারা বেগম কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। মার্চ মাসে পাকিস্তানি সেনারা যখন বাঙালিদের ওপর হামলা শুরু করে, তখন তিনি ছুটিতে চলে যান বাবার বাড়িতে, কিশোরগঞ্জে। পরে কুমিল্লা কম্বাইন্ড মেডিকেল হসপিটাল (সিএমএইচ) থেকে তিন-চারটি অফিশিয়াল টেলিগ্রাম এলেও তিনি কর্মস্থলে ফিরে যাননি।

কিশোরগঞ্জ পাকিস্তানি সেনাদের দখলে চলে আসায় সিতারারা পালিয়ে আশ্রয় নেন তার নানাবাড়ি হোসেনপুর দরগা বাড়িতে। পরে সেখান থেকে সিতারা চলে যান আগরতলায়।

কীভাবে আগরতলায় পাড়ি জমান তিনি ও তার পরিবার?

সিতারা বললেন এভাবে, “এরই মধ্যে হায়দার ভাই দুটি ছেলের হাতে পেনসিলে লেখা একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। চিঠিতে তিনি আমাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলেন। বিশেষ করে আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। এ ছাড়া তাদের হাতে আমার জন্য একটা ছোট পিস্তলও পাঠিয়েছিলেন তিনি। নির্দেশ ছিল, যদি পথে কোথাও পাক সেনাদের হাতে ধরা পড়ি, তাহলে যেন সেই পিস্তল কাজে লাগাই। আর নিজেকে বাঁচাতে যদি না পারি, আত্মহত্যা তো করতে পারব। ভাইয়ার পাঠানো সেই ছোট্ট পিস্তল আমি ব্লাউজের ভেতর ঢুকিয়ে রাখতাম।”

আগরতলার মেলাঘরে ব্যবসায়ী হাবুল ব্যানার্জির দেওয়া খেতের জমিতে মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফর উল্লাহর ও ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের পরিকল্পনা থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ হাসপাতাল, যা ছিল মূলত একটি বাঁশের ঘর। সেখানে কাজ শুরু করেন ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম।

তার ভাষায়, ‘হাসপাতালটিতে মেডিকেলের শেষ বর্ষের চার-পাঁচজন ছাত্র কর্মরত ছিলেন। লন্ডন থেকে ডা. মবিন, ডা. জাফরুল্লাহ, ডা. কিরণ সরকার দেবনাথ, ডা. ফারুক মাহমুদ, ডা. নাজিমুদ্দিন, ডা. আকতার, ডা. মুর্শেদ প্রমুখ এ হাসপাতালে কাজ করেছেন। ১০ থেকে ১২ জন স্বেচ্ছাসেবী সেনাবাহিনী থেকে এসেছিলেন। সুবেদার পদের ওপরের কেউ ছিল না। কোনো ভারতীয় চিকিৎসক এ হাসপাতালে নিয়মিতভাবে থাকতেন না। প্রায়ই রোগীদের ওষুধের জন্য আগরতলা ও উদয়পুরে যেতে হতো। উদয়পুরের ডিসি মি. ব্যানার্জি, আগরতলার অ্যাডুকেশন বোর্ডের পরিচালক ড. চ্যাটার্জি মজুমদার ও ডা. চক্রবর্তী এ হাসপাতালকে প্রচুর সহযোগিতা করেছেন।’

ওই হাসপাতালে শুধু বাঙালি রোগী ও আহত মুক্তিযোদ্ধারাই আসতেন না; ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যরাও চিকিৎসার জন্য যেতেন। জেনারেল রব গুলিবিদ্ধ হলে বাংলাদেশ হাসপাতালেই চিকিৎসা নেন। তখন ওই হাসপাতালের একমাত্র নারী চিকিৎসক ছিলেন ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম। তবে সবাই মিলে গড়ে তুলেছিলেন অসাধারণ এক সেবাকেন্দ্র। পরে তা হয়ে ওঠে প্রায় ৪০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল।

আগস্টের শেষে ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম সিও হিসেবে দায়িত্ব নেন বাংলাদেশ হাসপাতালের। মূলত তখন থেকেই এ হাসপাতাল হয়ে ওঠে রণক্ষেত্রে আহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক আশ্রয়ের ঠিকানা। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা গুলিবিদ্ধ, স্প্লিন্টারের আঘাতে ঝাঁজরা, গুরুতর জখম মুক্তিযোদ্ধাদের এখানে সারিয়ে তোলা হতো খুব সামান্য এবং সাধারণ ওষুধপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে। সিতারা বেগমের রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিপুণ পরিচালনার ফলে তখন বিপুলসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধরত ভারতীয় সেনাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।

হাসপাতালের কাঠামোগত বর্ণনা দিতে গিয়ে ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম বলেন এভাবে, “রোগীর জন্য প্রতিটি বিছানা তৈরি হতো বাঁশের চারটি খুঁটির ওপর মাচা বেঁধে। প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরা ঘরে করা হতো অস্ত্রোপচার। শুধু দিনের বেলাতেই অস্ত্রোপচার হতো। কখনো কখনো রাতে কোনো জরুরি অপারেশনের দরকার হলে ব্যবহার করা হতো হারিকেন কিংবা টর্চলাইট। এমন কাঠামো আর ব্যবস্থা নিয়েও এ হাসপাতাল যুদ্ধের সময়কার সফলতম একটি উদ্যোগ হিসেবে গণ্য হয়।”

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। রাতে বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ হাসপাতালে রেডিওর মাধ্যমে ডা. সিতারা বেগম ও তার সহকর্মীরা দেশ স্বাধীন হওয়ার সংবাদটি পান। অতঃপর তিনি কয়েকজন অসুস্থ রোগীকে এনে কুমিল্লা সিএমএইচে ভর্তি করান। এরপর তাদের কুমিল্লা লেডিস কলেজ হোস্টেলে থাকতে হয় সপ্তাহখানেক। পরে কয়েকজন রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে তাদের ঢাকা সিএমএইচে ভর্তি করাতে ঢাকায় চলে আসেন।

মুক্তিযুদ্ধে এ মহীয়সী নারীর সাহসী আবদানের জন্য তাকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। শুধু তা-ই নয়, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার পান্ডে ঢাকায় এলে তাকে ‘সাহসী নারী’ আখ্যা দিয়ে তার প্রশংসাও করেছিলেন। এভাবেই একজন সিতারা বেগমের বীরত্বের ইতিহাস জায়গা করে নেয় গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে।

যন্ত্রণা ভেঙে নারী যোদ্ধা হয়ে ওঠেন কাঁকন বিবি

মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি জন্মেছিলেন ভারতের মিজোরাম প্রদেশে, এক খাসি আদিবাসী পরিবারে। গিসয় ও মেলি দম্পতির ছোট মেয়ে তিনি। ওই পরিবার ছিল খ্রিস্টধর্মাবলম্বী। মা-বাবা কাঁকনের নাম রেখেছিলেন কাকাত হেনিনচিতা। তার বয়স যখন ছয় মাস, তখনই দুরারোগ্য এক ব্যাধিতে মারা যান তার বাবা।

বড় বোন কাফলের তখন বিয়ে হয় এক বাঙালি মুসলমানের সঙ্গে, নাম খুশি কমান্ডার। ব্রিটিশ আমলে সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে চাকরি করতেন বলেই লোকে তাকে কমান্ডার বলে ডাকত। খুশি কমান্ডারের বাড়ি ছিল সিলেট জেলার কাঁঠালবাড়ি গ্রামে। ওই গ্রামেই তাদের স্নেহে বড় হন কাঁকন বিবি। মা বলতে বড় বোনকে আর বাবা বলতে তিনি বুঝতেন খুশি কমান্ডারকে।

মুক্তিযুদ্ধ চলছে তখন। একদিন খুশি কমান্ডারকে পাকিস্তানি সেনারা ধরে নিয়ে যায়। ভারত থেকে যেসব মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশে আসত, তাদের তিনি সহযোগিতা করতেন। স্থানীয় রাজাকাররা পাকিস্তানি ক্যাম্পে এ খবর জানিয়ে দেয়। ফলে খুশি কমান্ডারকে টর্চার করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা।

এই ঘটনা কাঁকন বিবির মনে দারুণ ঝড় তোলে। পিতার মতো স্নেহ দিয়ে যে মানুষটি তাকে বড় করেছেন, তার হত্যার বদলা নিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন সুনামগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলটি ছিল ৫ নম্বর সেক্টরের অধীন। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল মীর শওকত আলী। কাঁকন বিবি যে গ্রামে থাকতেন, তার পাশেই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ওই ক্যাম্প থেকে খানিকটা দূরেই ছিল পাকিস্তানিদের ক্যাম্প; যা স্থানীয়ভাবে টেংরা ক্যাম্প নামে পরিচিত।

মুক্তিবাহিনীর টেংরা ক্যাম্পে কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন শহীদ মিয়া। মীর শওকত আলী এক দিন ওই ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন। তিনিই কাঁকন বিবিকে পাকিস্তানিদের ক্যাম্প থেকে খবর সংগ্রহের কাজে লাগার জন্য উৎসাহিত করেন। খুশি কমান্ডার হত্যার বদলা নেওয়া আর দেশের জন্য কিছু একটা করতে পারার আকাঙ্ক্ষায় কাঁকন বিবিও রাজি হয়ে যান।

এরপর কী করলেন কাঁকন বিবি?

বুদ্ধি খাটিয়ে একটি ময়লা ও ছেঁড়া কাপড় পরে দিনের বেলায় ভিক্ষা করতে করতে রওনা দেন পাকিস্তানিদের টেংরা ক্যাম্পের দিকে। প্রথমে ক্যাম্পের বাইরে কয়েকটি বাড়িতে ভিক্ষা করেন। পরে কৌশলে ঢুকে পড়েন ক্যাম্পের ভেতরেই। ভিক্ষা চান পাকিস্তানি মিলিটারিদের কাছে। ভিক্ষুক ভেবে ওরা কিছু ময়দা ও আটা ভিক্ষা দেয়। ভিক্ষা করার পাশাপাশি কাঁকন মিলিটারিদের কাছে তার প্রথম স্বামী আবদুল মজিদ খানের খোঁজও করেন। যিনি ছিলেন সেনাবাহিনীতে। নানা কায়দায় কিছুক্ষণ ক্যাম্পের ভেতর অবস্থান করে আশপাশের সবকিছু ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করেন।

টেংরা ক্যাম্পে তিনি যা দেখেছেন, তার সবই এসে জানান কোম্পানি কমান্ডার শহিদ মিয়াকে। মুক্তিবাহিনী তখন সেই মোতাবেক তাদের অপারেশন চালায় এবং এতে তারা দারুণভাবে সফলও হয়।

একইভাবে আরেক দিন তিনি যখন মিলিটারির কাছে তার স্বামীর খবর জানতে চান, তখনই তাকে আটক করে ফেলা হয়। কয়েকজন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্য মিলে তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। কিন্তু তখন পর্যন্ত কাঁকন বিবি যে একজন ‘ইনফরমার’, এটা তারা ভাবতে পারেনি।

নির্যাতন শেষে তারা কাঁকন বিবিকে ছেড়ে দেয়। এমন অত্যাচারের মুখেও তিনি ঠিকই সেদিনের সব তথ্য এনে কোম্পানি কমান্ডারকে জানিয়ে দেন। কাউকে বুঝতেও দেননি তিনি নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

এভাবেই কাঁকন বিবি ‘ইনফরমার’ হিসেবে নানা তথ্য সংগ্রহ করেন সুনামগঞ্জে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে, সিলেট ক্যাম্পে এবং পরে গোবিন্দগঞ্জ, জাউয়া বাজার ক্যাম্পে। তার দেওয়া তথ্যই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনে জয়ের মূল কারণ।

একাত্তরে একনাগাড়ে সাত দিন পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা কাঁকন বিবির ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। লোহার রড গরম করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছেঁকা দেয় ওরা। তবু দমে যাননি তিনি; বরং দেশকে মুক্ত করতে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নেন, মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর কাছে। অতঃপর প্রায় ২০টি অপারেশনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। একাত্তরের নভেম্বর মাসে টেংরাটিলায় পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে কাঁকন বিবি গুলিবিদ্ধও হন।

স্বাধীনতা লাভের পর বীর প্রতীক খেতাব লাভের সংবাদটি পাননি মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার সংগ্রামে প্রায় দুই যুগ তিনি ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। সাংবাদিকদের লেখনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে তিনি আবার প্রকাশ্য হন। তখনই আলোচনায় আসে তার খেতাব পাওয়ার বিষয়টি।

ওই বছরই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বীর প্রতীক উপাধির সম্মাননা তার হাতে তুলে দেন। শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে এই বীর নারী ২০১৮ সালের ২১ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।

কাঁকন বিবির বীরত্বের ইতিহাস বেঁচে থাকবে মুক্তিযুদ্ধে নারীর বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণের ইতিহাস হয়ে।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো কাঁকন বিবি বীর প্রতীক খেতাবের জন্য ঘোষিত ও সনদ প্রাপ্ত হলেও, সরকারিভাবে চূড়ান্ত গেজেটভুক্ত করা হয়নি তার নাম। ফলে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির চূড়ান্ত ধাপটি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ৬ জানুয়ারি ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button