আদিবাসী

চার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিয়ে উৎসব

নানা বিশ্বাসের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস এই দেশে। ভিন্ন তাদের ভাষা, ভিন্ন তাদের সংস্কৃতি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে নানা ধরনের উৎসব ও পূজা-পার্বণ, যার দ্বারা ওই জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয় পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বিয়ের উত্সবগুলো অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে থাকে।

তাদের আদি বিয়ে দেখব বলেই বিভিন্ন সময় ঘুরে বেড়িয়েছি নানা বৈশিষ্ট্যের গ্রামগুলোতে। সেই অভিজ্ঞতা এবং খুব কাছ থেকে দেখা বিয়ের আদি রেওয়াজগুলোসহ বৈচিত্র্যময় বিয়ে উত্সবের কথা খানিকটা তুলে ধরছি।

সাঁওতাল বিয়ে

মারোয়ায় আঁকা হয় রংবেরঙের আলপনা একবার পা রাখি দিনাজপুরের এক সাঁওতাল গ্রামে। হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই গ্রামটি।

ওই গ্রামেই সাতটি সাঁওতাল পরিবারের বাস, যারা আগলে রেখেছে পূর্বপুরুষদের সনাতন ধর্মবিশ্বাস। ওই গ্রামেরই কনে ফুল মনি টুডু। তাঁর বিয়ে হচ্ছিল বীরগঞ্জ দক্ষিণ সুজালপুর গ্রামের সকাল সরেনের সঙ্গে।

সাঁওতালরা বিয়েকে বলে বাপলা।

তাদের সমাজে ১২টি গোত্র রয়েছে। কিন্তু একই গোত্রে বিয়ে নিষিদ্ধ। বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয় মেয়ের বাড়িতে। তাদের সমাজে কনে পণ দেওয়ার রীতি চালু আছে। বিয়ের তিন দিন বা পাঁচ দিন আগে জগমাঝির মাধ্যমে বাড়ির উঠানে মারোয়া সাজানো হয় বিশেষ পূজার মাধ্যমে।

জগমাঝি প্রথমে গ্রামের যুবকদের মারোয়ার মধ্যে একটি মহুয়াগাছের ডাল পোঁতার নির্দেশ দেন। যেখানে ডাল পোঁতা হয়, তার ভেতরেই তিনটি কাঁচা হলুদ, পাঁচটি ফুটো কড়ি ও তিনটি দূর্বাঘাসের ডগা এবং বাটা হলুদের সঙ্গে তিনটি আতপ চাল

মিশিয়ে এক জায়গায় বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর জায়গাটি মাটি দিয়ে ভরাট করে গোবর দিয়ে নিকানো হয়। সেখানে আঁকা হয় রংবেরঙের আলপনাও। মারোয়ার দুই পাশে থাকে দুটি জলে ভরা কলসি। সাঁওতালদের কাছে এই কলসি মঙ্গল বা কল্যাণকর। তাদের বিয়ের সব অনুষ্ঠান মারোয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়াই নিয়ম।

বিয়ের আগে ‘দা বাপলা’ বা গ্রামপূজার আয়োজন করা হয়। মাঠের মধ্যে ছোট্ট একটি চারকোনা গর্ত করে তার তিন দিকে তিনটি ধনুক দাঁড় করিয়ে সিঁদুর দিয়ে এই পূজা শেষ করতে হয়। গর্তের মধ্যে দিতে হয় সিটাকা (এক টাকার কয়েন), চাউলি (চাল), হানডি (হাড়িয়া) ও পানি। পূজা শেষে গর্তের কিছু পানি একটি কাঁসার ঘটিতে করে নেওয়া হয়, যা কনের গোসলের সময় ব্যবহার করা হয়।

এই আদিবাসী সমাজে বিয়ের আগের দিন বর ও কনে উভয়ের বাড়িতে ‘তেলাইদান’ নামের একটি অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। এরপর বর ও কনেকে যাঁর যাঁর বাড়িতে নতুন কাপড়, রুপার অলংকার পরানো হয়। ওই দিন থেকেই শুরু হয় নাচ-গান আর আনন্দফুর্তি।

সন্ধ্যার দিকে বর ও বরপক্ষকে বাড়িতে আনা হয়। এর আগে বাড়ির গেটে দুটি কলস ভর্তি পানি নিয়ে দুজন মহিলা এবং কনের মা গুড় ও মিষ্টির থালা হাতে অপেক্ষায় থাকেন। কনের মা প্রথমে নতুন জামাতার পা ধুইয়ে দেন এবং কোলে বসিয়ে মুখে গুড় তুলে খাওয়ান।

সিন্দুর ঘানডি বা সাঁওতাল বিয়ের কাপড় থাকে হলুদ রঙের। বাজার থেকে ১২ হাত সাদা কাপড় কিনে এনে সেটি কাঁচা হলুদে ডুবিয়ে এবং পরে তা শুকিয়ে তৈরি করতে হয় বিয়ের বিশেষ এই কাপড়।

বিয়েতে মা নতুন কাপড় পরিয়ে মেয়েকে পা ধুইয়ে দেন। আগে থেকে রাখা বাঁশের ঝুড়িতে তাঁকে বসিয়ে দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে বরের বড় ভাই বা ভাই সম্পর্কের পাঁচজন এসে ঝুড়িসমেত মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কনেপক্ষ সহজেই নিতে দেয় না। শুরু হয় ধাঁধার বাধা। এ নিয়ে হাস্য-তামাশাও চলে দুই পক্ষের মধ্যে।

ঝুড়ি উঁচু করে মাড়োয়ার সামনে যখন দাঁড় করানো হয়, তখন বরের ভগ্নিপতিরা বরকে কাঁধে নিয়ে পাশাপাশি দাঁড়ান। ঠিক সেই মুহূর্তে বর হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও কনিষ্ঠাঙ্গুলি একত্র করে কৌটা থেকে তিনবার সিঁদুর তুলে কনের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন। সাঁওতালরা মনে করে, সিঁদুরদান থেকেই একটি সুখী পরিবার তৈরি হয়।

কনে নিয়ে বর তাঁর নিজ গ্রামে এলে ধান, দূর্বা, চাল, সিঁদুর দিয়ে বিশেষ আচার মেনে নবদম্পতিকে বরণ করে নেওয়া হয়। বিয়েতে কনে দেখা থেকে শুরু করে বিয়ের শেষ পর্ব পর্যন্ত হাড়িয়া (প্রিয় পানীয়) ব্যবহার করতে হয়। এ ছাড়া বিয়েতে শূকর বা ছাগলের মাংস, গুড়-ভাত, আম, কলা প্রভৃতি খাবার খাওয়ানো হয়ে থাকে। সাঁওতালরা বিয়ের অনুষ্ঠানে ধামসা, মাদল, বাঁশি, বানাম প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে। ছেলেরা বাদ্য বাজায় আর মেয়েরা অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে মাদলের ছন্দে ছন্দে নাচতে থাকে। একের বাহুতে এরা বেঁধে নেয় অন্যের বাহু। সাঁওতালরা একে দোন বা ঝিকা নৃত্য বলে।

সাঁওতালরা বেশির ভাগই এখন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে। ফলে ধর্মান্তরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিয়েকেন্দ্রিক উত্সবের আচার ও বিশ্বাসগুলো আজ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আদি ধর্ম আঁকড়ে থাকা সাঁওতালদের কাছে বিয়ের আদি রূপটিই তাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কড়া বিয়ে

সিঁদুর দেওয়া হয় জোয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ঝনাইকুড়িতে বসবাস করছে কড়া নামের একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। এরা বিয়েকে বলে বিহা। গোত্রকে এরা বলে পেরিস। কড়া সমাজে একই পেরিস বা গোত্রের লোককে একই রক্তের সম্পর্ক ধরা হয়। তাই একই গোত্রে বিয়ে একেবারেই নিষিদ্ধ এবং পাপের সমতুল্য মনে করা হয়।

কড়াদের রীতিতে বিয়ের পাঁচ দিন আগে লগন বাঁধতে হয়। কড়া ভাষায় এটি ‘লাগান বান্ধা’। লগন বাঁধতে লাগে কাঁচা হলুদ, কাঁঠালপাতা, আরোয়া চাল, দূর্বা ঘাস, আট আনা পয়সা, একটি পিড়ি, সাদা মার্কিন কাপড়, সুতা প্রভৃতি।

এ সময় দুই পক্ষের মাহাতো মুখোমুখি বসেন। তাঁদের পেছনে বসেন দুই পক্ষের পাঁচজন করে লোক। প্রথমে দুটি কাঁঠালপাতা ভাঁজ করে বিশেষ ধরনের দুটি ঠোঙা তৈরি করা হয়। ঠোঙায় রাখা হয় হলুদ, আরোয়া চাল, আট আনা পয়সা, দূর্বা ঘাস প্রভৃতি। এরপর দুটি আলাদা সুতায় প্রতিটিতে বিশেষ ধরনের পাঁচটি শক্ত গিঁট দেওয়া হয়। পরে এক দিন কেটে গেলে প্রত্যেক পক্ষই সুতার একটি করে গিঁট খুলে ফেলে।

কড়া বিয়ের মূল পর্বকে তারা বলে ‘সিমরেত হতে’ বা সিঁন্দুর পর্ব। এই পর্বটি বেশ নাটকীয়। কনের ভাইকে উঠতে হয় তার দুলাভাইয়ের কাঁধে আর বরকে গামছা নিয়ে উঠতে হয় তাঁর দুলাভাইয়ের (বোহনে) কাঁধে। এ অবস্থায় বর তাঁর কাছে থাকা

গামছাটি কনের ভাই বা শ্যালককে দিয়ে দেন। আর শ্যালক ওই অবস্থায় বরকে পান খাইয়ে দেয়। পান খাওয়ানোর পর শ্যালক ওই গামছা বরের কাঁধে পরিয়ে দেয়। গামছা পরানোর সঙ্গে সঙ্গেই বর কাঁধ থেকে নেমে চলে আসেন সাজানো মারোয়ার দিকে। কনেকেও মারোয়ায় আনা হয়।

বর-কনের সিঁদুর পর্ব হয় চাষাবাদের প্রতীক জোয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে, খুব গোপনে। দুই পক্ষের মাহাতোর উপস্থিতিতে জোয়ালের দুই দিকে বর ও কনে দাঁড়ানোর পরপরই চারদিকে কাপড় দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। বর ও কনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জোয়ালে তাঁদের এক পা পাশাপাশি স্পর্শ করিয়ে রাখেন। আর ওই অবস্থায় বর তাঁর হাতের তালুতে সিঁদুর নিয়ে পাঁচ আঙুলে কনের মাথায় দিয়ে দেন।

সিঁদুর পর্বের পর বর-কনেকে পালন করতে হয় ‘খান্দা’ বা দশের খাবার পর্ব। নতুন হাঁড়িতে বা যেটিতে খাবার রান্না হচ্ছে সেই হাঁড়িতে একটি কুলায় থাকা ঘাস, চাল ও ধান বর-কনেকে একসঙ্গে ঢেলে দিতে হয়। এরপর পরিচিতজনরা ঘাস আর ধান ছিটিয়ে নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করেন আর কনের হাতে গুঁজে দেন নানা উপহার।

মণিপুরি বিয়ে

কনেকে আগেই তালের তালিম নিতে হয় মণিপুরি বিয়েতে সাধারণত আটটি পর্ব থাকে—ওয়ারৌপদ, হেইজাপদ, নিকন খেলানি, বরবার্তন, মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান (কুঞ্জ সাজন), তিন দিনকার চানা, পাচোভাত খানা ও ঠিল্পা।

ওয়ারৌপদ পর্বে বিয়ের জন্য উভয় পক্ষ সম্মত হলে উত্তম দিন দেখে পাত্রপক্ষ গ্রামের প্রবীণ ও আত্মীয়-পরিজনসহ কয়েক টাপু (বেতের ঝুড়িবিশেষ), খই (গুড় মেশানো), নাড়ু, ফলমূল, মিষ্টিসহ কনের বাড়িতে যায়। উভয় পক্ষ মিলে আলোচনা করে ওই দিন বিয়ের পরবর্তী দিনক্ষণ নির্ধারণ করে। এ সময় মণিপুরি পোশাক পরা নারী পাত্রপক্ষের টাপু বহন করে থাকেন।

হেইজাপদ পর্ব অনুষ্ঠিত হয় বিয়ের এক দিন আগে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিয়ের দিন বিকেলে। এই পর্বের জন্য ওই দিন বিকেলে কনের বাড়ির উঠানে শণের চালা, কাপড় বা শামিয়ানা টানানো হয়। বসার জন্য চাটাইয়ের ওপর নতুন কাপড় এবং ব্রাহ্মণ পুরোহিতের জন্য আলাদা সুদৃশ্য ফিদা (মণিপুরি তাঁতে তৈরি মোটা বিচিত্র কাপড়বিশেষ) বিছানো হয়।

পাত্রপক্ষ নতুন কাপড় পরে কনের বাড়ির দিকে রওনা হয়। প্রায় অর্ধশত টাপুতে গুড়, খই ও নাড়ু পূর্ণ করা থাকে।

সারিবদ্ধভাবে প্রথম টাপু বরের বোন হাতে নিয়ে সামনে থেকে পথ চিনিয়ে নেয়। শত শত নারী-পুরুষ নতুন সাজে সজ্জিত হয়ে টাপু ও পলাংপূর্ণ (বেতের ঝুড়িবিশেষ) খই, নাড়ু, ফলমূল, মিষ্টান্ন কাঁধে বহন করে কনের বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। কনের আত্মীয় ও গ্রামের সবাই জমায়েত হয় হেইজাপদ অনুষ্ঠানে। এই পর্বে দুই গ্রামের দুই পুরোহিত বা ব্রাহ্মণের জন্য আলাদা আসনের ব্যবস্থা করা হয়। উভয় পক্ষের মধ্যে চলে নানা কথার রঙ্গ-তামাশা ও নানা খোশগল্প। এ সময় হরা বা মাটির বাটিতে উপস্থিত সবার মধ্যে ফলমূল, খই, নাড়ু ও মিষ্টি বিতরণ করা হয়।

মণিপুরীিদের বিয়েতে লগ্ন একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। বিয়েযাত্রায় বর স্নান সেরে নতুন ধুতি ও সাদা পাঞ্জাবি, গলায় মালা ও দেহে ক্ষত্রিয়োচিত পইতা পরে কপালে চন্দনরেখা টানেন। যাত্রার আগে বরকে অবশ্যই ঘটপূজায় অংশ নিতে হয়। বরের রওনা দেওয়ার সময় বাদ্য ও পটকা ফোটানো হয়।

অন্যদিকে কনেবাড়ির বিস্তীর্ণ উঠানে কুঞ্জ সাজানো হয় মনোরম রীতিতে। কুঞ্জের চারদিক ঘিরে চলে পালা-কীর্তন বা রাধা-কৃষ্ণের লীলাগীতি।

বিয়ের সাজে বর কুঞ্জের মাঝখানে বসলে ছোট্ট একটি মেয়ে কনেকে ধরে মঙ্গলঘট ও ফিদাসহ নিয়ে আসে। ফিদাটি বরের চৌকিতে বসার নিচে বিছানো হয়। সেখানে এসে কনে বসেন।

কনের অভিভাবক ধুতি পরে গায়ে নামাবলী জড়িয়ে বরের সামনে এসে বসেন। মঙ্গলঘটসহ অন্যান্য আচারের জন্য পুরোহিত মন্ত্র পাঠ করেন, যাতে কনের ভবিষ্যত্ সুখময় হয় এবং কনে পিতৃঋণমুক্ত হতে পারেন। এরপর অভিভাবক কনেকে বরের হাতে সম্প্রদান করেন। এ সময় বর-কনের যুগলবন্ধন হাতের ওপর চলে দান পর্ব। এ সময় মৃদঙ্গ, করতাল, নৃত্যে সুমধুর কণ্ঠে গান গাওয়া হয়।

দান পর্ব শেষে কনে উঠে দাঁড়ান এবং একটি কাচের গ্লাসে ফুল ভরে বরকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করেন। এ সময় তিন ধরনের ব্রজবুলী ধীরলয়ে পরিবেশন করা হয়, যাতে কনে ধীরে ধীরে তাল-লয়ে সাতবার প্রদক্ষিণ করতে পারেন। এ কারণে মণিপুরি সমাজে কনেদের তাল সম্পর্কে আগেই তালিম নিতে হয়।

প্রতিবার প্রদক্ষিণের সময় কনে হাতে থাকা ফুল-পাতাপূর্ণ গ্লাস থেকে ফুল বরের মাথায় দিয়ে প্রণাম করেন। ষষ্টবার প্রদক্ষিণের পর গ্লাস রেখে দুটি সুদৃশ্য ফুলের মালা নিয়ে শেষবার প্রদক্ষিণ শেষে কনে বরের গলায় দুটি মালা পরিয়ে বরের সঙ্গে একত্রে বসেন। বর তখন গলা থেকে একটি মালা খুলে কনের গলায় পরিয়ে দেন। চারদিকে তখন আনন্দধ্বনি ওঠে। এরপর বর-কনেকে ঘরের ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কনেসহ বর নিজের বাড়িতে রওনা হন।

চাকমা বিয়ে

বরযাত্রী যেতে হয় বিজোড়সংখ্যক চাকমারা বিয়ের পাকাপোক্ত কথা হওয়ার দিনটিকে বলে ‘ধারাবানা’। ওই দিনই পাত্রীর হাতের অলংকার ও পোশাকের মাপ নেওয়া হয়। তাদের বিয়ের ঘোষণারীতিটিও বেশ চমত্কার। বিয়ের কথা চূড়ান্ত হলে কনের বাবা উপস্থিত সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘তাহলে এখন উপযুক্ত মদ তৈরি করার হুকুম আছে?’ সবাই তখন সমস্বরে হ্যাঁ-সূচক উত্তর দেয়। তখনই বিয়ে চূড়ান্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।

বরযাত্রী, চামুলাং, জদন বানাহ, খামা সিরানা ও ব্যাসুদ ভাঙা—এই পাঁচটি আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে চাকমাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। চাকমা সমাজে বিয়েতে বর সাধারণত ঘরেই থাকেন। বউ আনতে কনের বাড়িতে যায় বরযাত্রীর দল।

চাকমা বিয়েতে বাঁশ বা বেতের তৈরি কারুকার্যখচিত ঝাঁপিকে ‘ফুল বারেং’ বলে। এটি উচ্চতায় দেড় থেকে দুই ফুট এবং নিচে চার কোনায় চারটি গোলক বা কেরেক বেতের পায়া থাকে। ওপরে থাকে প্যাগোডার চূড়া আকারের একটি ঢাকনি। একজন সুন্দরী কুমারী এটি পিঠে বহন করে নেন। এতে থাকে বোয়ালির জিনিসপত্র। আবার একজন বয়স্ক সধবা মহিলা বউকে যত্নসহকারে পথ দেখিয়ে ঘরে নিয়ে আসার দায়িত্বে থাকেন। একে চাকমারা ‘বউ ধরনি’ বলে। বরের পিতৃস্থানীয় একজন গুরুজন বরযাত্রী পরিচালনার ভার নেন।

চাকমা সমাজে বিয়ের দিন বরযাত্রী যেতে হয় বিজোড়সংখ্যক। বউ আনতে ফুল বারেং নিয়ে তারা বাজনা বাজাতে বাজাতে কনের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়। পাত্রীপক্ষ তখন আগতদের সাধ্যমতো আপ্যায়ন করে এবং কনে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করে।

শুভক্ষণে বউকে সাজিয়ে তাঁর মা-বাবা বা অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে ঘর থেকে উঠানে নিয়ে আসা হয়। চাকমা সমাজে কনে তুলে দেওয়ার সময় প্রথমে কনের পিতা বা অভিভাবক বাড়ির প্রধান দরজায় কলাগাছের চারা দিয়ে সাজানো মঙ্গলঘটের আয়োজন করেন। তিনি ঘরের দরজার সামনে সাত গুণ করে সুতা (সাঁকো) টানিয়ে দেন। এরপর কনের মা এসে ওই সুতা ছিঁড়ে দিলেই বরপক্ষ কনে নেওয়ার অধিকার পায়। চাকমারা মনে করে, এই সুতা ছেঁড়ার অর্থ হলো মা-বাবার সঙ্গে কনের সব সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া। কনে বিদায়ের এই দৃশ্য বড়ই করুণ হয়। তার আগে কনের ভবিষ্যত্ মঙ্গল ও সুখী সংসারের জন্য বয়স্ক আত্মীয়রা চাল, কার্পাস বা তুলা ও টাকা দিয়ে আশীর্বাদ করেন। এরপর মঙ্গলঘটের দরজা খুলে দিলে বউ নামানোর সম্মতি চাওয়া হয়। কনেপক্ষের সম্মতি পেলে বউকে ঘর থেকে উঠানে নামানো হয়। তখন উভয় পক্ষ মিলে বাদ্য বাজায় এবং নতুন বউকে বরের বাড়িতে নিয়ে আসে।

চাকমাদের বিয়ের পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠানকে বলে ‘জদন বানাহ’। বিয়ের এই আচারের জন্য চাকমারা নবদম্পতির বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট ঘরের মেঝেতে একটি পাটি বিছিয়ে রাখে। কনেকে বসানো হয় বরের বাঁ পাশে। এরপর সাত হাত লম্বা একটা কাপড় দ্বারা বর-কনের কোমর একসঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। বরের বাঁ হাত কনের পিঠ বেষ্টন করে বাঁ কাঁধে এবং কনের ডান হাত বরের পিঠ বেষ্টন করে ডান কাঁধে জড়িয়ে দেওয়া হয়। এ অবস্থায় কিছু ডিমমাখা ভাত বরের বাঁ হাতে কনের মুখে এবং কনের ডান হাতে বরের মুখে তুলে দেয় চাকমারা। এ সময় পান খাওয়ানোর রেওয়াজও চালু আছে। এরপর উপস্থিত সবার অনুমতি নিয়ে বর-কনের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে কালের কণ্ঠে, প্রকাশকাল: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫

© 2025, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button