মুক্তিযুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের ষড়যন্ত্র প্রমাণে টর্চার করে মুচলেকা নিত পাকিস্তানিরা

নামাজে দাঁড়াতাম, রুকুতে যাওয়ার মুহূর্তেই গাছের ডাল এনে আঘাত করত সৈন্যরা।

একাত্তরের অগাস্ট। টাঙ্গাইলের তারুটিয়া ভাতকুড়ার নামপাড়ায় একটি অপারেশনে অংশ নিতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগী রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ, পরে যিনি বীরবিক্রম খেতাবে ভূষিত হন। ধরা পড়ার পরই শুরু হয় নির্যাতনের এমন এক অধ্যায়, যা শুধু একজন মানুষের শরীরকে নয়, পুরো মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক সত্যকেও ভেঙে দিতে চেয়েছিল।

পাকিস্তানি সেনারা তাকে প্রথমে নিয়ে যায় টাঙ্গাইল সার্কিট হাউজে। রাতভর রাখা হয় একটি ঘরে। ঘরের দেয়াল ও মেঝে জুড়ে রক্তের ছোপ, সেই রক্ত যেন আগেই জানিয়ে দিচ্ছিল, এই ঘর থেকে খুব কম মানুষই জীবিত বেরিয়েছে। দুইজন সুবেদার পালা করে চালাতে থাকে টর্চার। পরদিন সকালে চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয় টাঙ্গাইল বধ্যভূমিতে। পাঁচজন সৈন্য রাইফেল তাক করে দাঁড়ায়। ক্যাপ্টেনের নির্দেশ পেলেই গুলি চলবে, ঠিক এমন মুহূর্তে ওয়াকিটকিতে ভেসে আসে আদেশ, “উসকো ওপাস লিয়ে আও।”

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আবার সার্কিট হাউজে নেওয়া হয় আবুল কালাম আজাদকে। সেখানে এক কর্নেল বসেছিলেন বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকাসহ কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে। আবুল কালাম আজাদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও বিস্ফোরক দেখিয়ে সাংবাদিকদের সামনে নানা প্রশ্ন করা হয়। তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে সত্য কথাই বলেন। এই সত্যই পাকিস্তানি সেনাদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। সিদ্ধান্ত হয়, তাকে পাঠানো হবে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নির্যাতনের মাত্রা ছিল আরও ভয়াবহ। প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত, সবসময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হতো। আবুল কালাম আজাদ নামাজে দাঁড়াতেন, রুকুতে যাওয়ার মুহূর্তেই গাছের ডাল এনে আঘাত করত সৈন্যরা। দুটি শেডে বহু বন্দিকে রাখা হয়েছিল। সেখানে ছিলেন হাজী গোলাম বশির, শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি থেকে যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ছিলেন টাঙ্গাইলের দিগুলিয়ার হাবিলদার হাবিবুর রহমান লুডু, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় ছুটিতে এসে ধরা পড়েন। প্রায় দেড় মাস ধরে প্রতিদিনই চলে অমানুষিক নির্যাতন।

একদিন তাকে নিয়ে যাওয়া হয় তথাকথিত ফাইনাল ইন্টারোগেশন সেন্টারে। বন্দিদের মধ্যে গুঞ্জন ছিল, ওখানে গেলে কেউ জীবিত ফেরে না। বিশাল সেই রুমের মেঝেতে রক্ত, পাশে ইলেকট্রিক টর্চারের যন্ত্র। বসতে দেওয়া হয়, চা-নাস্তাও দেওয়া হয়। এই ভদ্রতার আড়ালেই ছিল আসল ফাঁদ। একজন মেজর একটি লিখিত স্টেটমেন্ট এগিয়ে দিয়ে আবুল কালাম আজাদকে বলেন, “ইধর সে দস্তখত কর দেও।” আজাদ জানতে চান, “ক্যায়া লিখা হ্যায়?” উত্তর আসে, “জো কুচ লিখা হ্যায়, দস্তখত কর দো।”

আজাদ পড়তে চান। ইংরেজিতে লেখা সেই স্টেটমেন্টে বলা ছিল, তিনি একজন ভারতীয় অনুচর, গুপ্তচর; ভারত থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে পাকিস্তান ধ্বংস করার জন্য। এই স্বাক্ষর আদায় করে বিশ্বকে দেখানো হবে, পূর্ব পাকিস্তানে যা হচ্ছে তা মুক্তিযুদ্ধ নয়, ভারতের সাজানো ষড়যন্ত্র।

আজাদ রাজি হননি। শুরু হয় আরও ভয়ংকর টর্চার। ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়। চরম ও অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। তবু দস্তখত করেননি। তখন আগুনে লাল করা চিকন লোহার রড আনা হয়। দেয়ালের সঙ্গে দুই হাত বেঁধে চোখ উপড়ে ফেলার ভয় দেখানো হয়। মনে মনে শুধু আল্লাহর নাম জপ করছিলেন তিনি।

হঠাৎ এক পাকিস্তানি মেজর থামতে বলেন। তারপর হাত ওপরে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়। গরম লোহার রড ঢুকিয়ে দেওয়া হয় দুই পায়ের তালুতে। যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতেই জ্ঞান হারান তিনি। সাত দিন ছিলেন অচেতন। পায়ের ক্ষতে কোনো ওষুধ দেওয়া হয়নি। পচে গিয়ে সেখানে সাদা পোকা ধরেছিল। কাঁদতেও দেওয়া হতো না। বরং বলা হতো, আল্লাহ আল্লাহ করতে।

কয়েক দিন পর আজাদকে নিয়ে যাওয়া হয় রেডিও স্টেশনে। সঙ্গে ছিল বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্য ও দুজন ক্যাপ্টেন। রেডিওর এক কর্মকর্তা তাকে জানিয়ে দেন, তার কথাবার্তার ভিত্তিতে একটি সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করা হবে। সত্য কথা বললে সেখান থেকেই মেরে ফেলা হবে, এমন ঘটনা এর আগেও ঘটেছে।

শেষ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচানোর জন্য একটি সাজানো বক্তব্যে রাজি হতে হয় তাকে। রেডিওতে প্রচারিত সেই বক্তব্যে বলা হয়- তিনি মামার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে কাদের সিদ্দিকীর লোকদের হাতে জোর করে মুক্তিযুদ্ধে যেতে বাধ্য হয়েছেন। পাঁচ-ছয় দিন ধরে পাকিস্তানি সেনারা সেই বক্তব্যই রেডিওতে প্রচার করে।

এরপর শেরেবাংলা নগরে সামরিক আদালতে বিচার হয়। রায়ে আজাদের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। তবে বয়স কম এবং ওই রেডিও স্টেটমেন্ট বিবেচনায় নিয়ে সাজা পরিবর্তন করে দেওয়া হয়, ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১৫টি বেত্রাঘাত। কারাগারেই কার্যকর করা হয় সেই বেত্রাঘাত। সেটিও ছিল যন্ত্রণার আরেক অধ্যায়।

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৭ ডিসেম্বর আজাদ কারাগার থেকে মুক্তি পান। আজও বীরবিক্রম আবুল কালাম আজাদের কণ্ঠে পাহাড়সম আশা নতুন প্রজন্মের প্রতি। তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধে কী ঘটেছে, কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, সব জেনে নিও। ইতিহাসের সত্য ঘটনাগুলো হৃদয়ে রেখো। একাত্তরের বীরত্বের ইতিহাসই তোমাদের সাহসী করে তুলবে।”

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

© 2025, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button