১৯৭১: মাকে বললেন, ‘একটা ছেলেকে দেশের জন্য ছেড়ে দাও’
১৯৭১-এ পাবনায় ছাত্র আন্দোলন ও পাকিস্তানি আর্মির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ঘটনা বর্ণনা করেন মুক্তিযোদ্ধা অমল কৃষ্ণ গোস্বামী। তিনি কারফিউ, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম ও ত্যাগ এবং ভারতে ট্রেনিংয়ে যাওয়ার স্মৃতি তুলে ধরেন।
“আমাদের বাড়িটা ছিল পাবনা শহরের ঠিক মাঝখানে। কাছেই থানা। বাসস্ট্যান্ড আর কলেজও কাছাকাছি। বাড়ির পাশেই পিলু ডাক্তারের বাড়ি। ওই বাড়ির ছাদে উঠলে গোটা শহরটাই দেখা যেত। তাই দলবেঁধে ওই ছাদে যেতাম আমরা।
ঊনসত্তরের আন্দোলন দেখেছি খুব কাছ থেকে। পাবনায় ভাসানী ন্যাপ নেতা অমলেন্দু দাক্ষী ছিলেন দাঁতের ডাক্তার। ট্র্যাফিক মোড়েই ছিল তার চেম্বার। ছাত্রলীগের সেক্রেটারি তখন আব্দুর রহিম পাকন, সভাপতি ছিলেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু (বর্তমান রাষ্ট্রপতি)। আর ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপে ছিলেন টিপু বিশ্বাস। সরাসরি ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও সকল মিছিল মিটিংয়েই অংশ নিতাম তখন।
বঙ্গবন্ধু তখন জেলে। টিপু বিশ্বাসকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। তাদের মুক্তির দাবিতে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ একসঙ্গে মিছিল বের করে। মিছিলটি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে এসে শেষ হয়। পরে শপথ বাক্যও পাঠ করা হয়। শপথে শুধু বঙ্গবন্ধুর নাম বলায় টিপু বিশ্বাসের অনুসারীরা ক্ষিপ্ত হয়। এরপর থেকেই ছাত্রলীগ ও ইউনিয়নের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে থাকে।
একবার ছাত্রলীগ মিটিং করছে টাউন হল মাঠে। তখনই ছাত্র ইউনিয়নের একটি মিছিলের সঙ্গে ন্যাপপন্থী নেতা ডাক্তার দাক্ষী মাঠে চলে আসেন। ফলে উভয় দলের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ওইদিন পাবলিক লাইব্রেরির দেয়াল টপকাতে গিয়ে হাত ভাঙ্গে দাক্ষীর। এছাড়া ছাত্রনেতা আহমেদ রফিককে মহিলা কলেজের গলির ভেতরই চাকু মারা হয়।
পাবনায় নকশালপন্থিরাও সক্রিয় ছিল। এ গ্রুপের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন আলাউদ্দিন ও মতিন। ভারতের বামপন্থি আন্দোলনের নেতা চারু মজুমদারের অনুসারী ছিলেন তারা।
মুক্তিযুদ্ধের সময়েও পাবনায় নকশালপন্থি গ্রুপটি নিজেরাই আলাদা ক্যাম্প করে। ফলে তখন মুক্তিযোদ্ধাদের দু-দিকেই যুদ্ধ করতে হয়েছিল। এদিকে পাকিস্তানি আর্মি আর অন্যদিকে ছিল নকশালপন্থিরা। নকশালপন্থিরা অবশ্য বলে তারাও দুই পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। ওরা বলত, শ্রেণিশক্র খতম করো। আওয়ামী লীগ ও সমাজের ধনী শ্রেণিকে তারা শ্রেণিশত্রুই মনে করত।
সত্তরের নির্বাচনে সুজানগর থেকে এমএনএ নির্বাচিত হন আহমেদ রফিক। পরে নকশালপন্থিরা তার বাড়ির সামনে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ওইদিন ডাক্তার দাক্ষী ছিলেন তার চেম্বারে। তাকেও পেটে চাকু মারে ওরা। তার ভুড়িটা বের হয়ে আসছিল। তিনি এক হাতে পেট চেপে হাসপাতালে গিয়ে প্রাণে বেঁচে যান।”
পাবনায় একাত্তর-পূর্ববর্তী নানা ঘটনার কথা এভাবেই তুলে ধরেন মুক্তিযোদ্ধা অমল কৃষ্ণ গোস্বামী। দিলীপ নামেই তিনি অধিক পরিচিত। বৃন্দাবন চন্দ্র গোস্বামী ও সুনীতি রাণী গোস্বামীর অষ্টম সন্তান দিলীপ। বাড়ি পাবনা সদর উপজেলার শালগাড়িয়া এলাকার জয়কালিবাড়ি পাড়ায়।
লেখাপড়ায় তার হাতেখড়ি সেন্ট্রাল স্কুলে। পরে রাধানগর মজুমদার একাডেমিতে ভর্তি হন তৃতীয় শ্রেণিতে। সেখান থেকেই এসএসসি পাশ করেন ১৯৭০ সালে। অতপর ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের ছাত্র।
২৫ মার্চ, ১৯৭১। সারাদেশে পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা শুরু করে। বিভীষিকাময় ওই রাত থেকে পাবনায় কী ঘটেছিল?
অমল কৃষ্ণ গোস্বামী দেখছিলেন যেমন, “রাতেই মারণাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি আর্মি ঢুকে পড়ে পাবনা শহরে। তারা বিসিক শিল্পনগরীতে ঘাঁটি স্থাপন করে। পুরাতন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনও দখলে নেয়।
প্রথম দিকে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের বিন্দুমাত্র সহযোগিতা পায়নি ওরা। ফলে নিজেরাই মাইক ভাড়া করে ভোর থেকে পাবনা শহরে কারফিউ জারির ঘোষণা দেয়। এতে গোটা শহরের মানুষ ঘুম থেকে উঠেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
আর্মি আসার খবর আগেই পেয়ে যায় আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীরা। তারা শহরের দক্ষিণে পদ্মার চরে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। প্রতিরোধের প্রস্তুতিও নেয় সেখান থেকে।
পাবনার তৎকালীন এসডিও (জেলা প্রশাসক) নুরুল কাদের খান ছিলেন মুক্তিকামী বাঙালির পক্ষে। গোটা প্রশাসনকে অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখার, অফিস আদালত বন্ধ রাখার এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দেশ অমান্য করে তিনি নিজ বাংলো ত্যাগ করে প্রথমে গোপন স্থানে এবং পরে চর এলাকায় নেতাদের সঙ্গে প্রতিরোধ কাজে যুক্ত হন। ফলে পাকিস্তানি আর্মির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। এছাড়া এ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন গণপরিষদ সদস্য আমজাদ হোসেন, আব্দুর রব বগা মিয়া, ওয়াজিউদ্দিন খান, ন্যাপ নেতা আমিনুল ইসলাম বাদশা, ছাত্রলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম বকুল প্রমুখ।
পাবনা শহরে তখন কারফিউ চলছে। রাস্তায় কেউ বেরোলেই তাকে কোমরে দড়ি দিয়ে বিসিক এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হতো। তাদের ওপর চলত অমানুষিক নির্যাতনও।
অন্যদিকে বাঙালি তরুণরা দ্রুত সংগঠিত হতে থাকে। গোপনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা একনলা, দোনলা বন্দুক, পিস্তল, লাঠি, ফালা, সড়কি ইত্যাদি সংগ্রহ করে। অস্ত্রগুলো চর এলাকায় নিয়ে জমা করতে থাকে তারা। যা পরে প্রতিরোধ সংগ্রামে ব্যবহার করা হয়। হাজার হাজার কৃষকও সংগঠিত হতে থাকে। প্রতিরোধের প্রস্তুতিও নেয় তারা।”
এরপর কী ঘটল?
দিলীপের ভাষায়, “২৬ মার্চ ১৯৭১। সন্ধ্যা তখন। থমথমে পাবনা শহর। পাকিস্তানি সেনারা শহরে টহল দেয়। বাজার পাহারা দিত অবাঙালিরা। আর্মিদের সহযোগিতায় তারা এগিয়ে আসে। মুক্তিকামী বাঙালি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি চিনিয়ে দেয়। ফলে আর্মিরা তুলে নিয়ে যায় পাবনা মহকুমা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও পাবনা বারের সম্পাদক, পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান জনাব আমিনুদ্দিন এমপিএ, ভাসানী ন্যাপ নেতা দন্ত চিকিৎসক অমলেন্দু দাক্ষী, মোটর মালিক ও হোটেল ব্যবসায়ী আবু সাঈদ তালুকদার এবং রাজেনকে। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বিসিক এলাকায়, আর্মি ক্যাম্পে।
২৭ মার্চ। সন্ধ্যার পরপরই পাকিস্তানিরা বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ও সৈন্য নিয়ে বিসিক এলাকা থেকে পাবনা পুলিশ লাইনের দিকে অগ্রসর হয়। উদ্দেশ্য পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র সরিয়ে নেয়া এবং পুলিশ বাহিনীকে নিরস্ত্র করা। পুলিশবাহিনী তা আগে থেকেই আঁচ করছিল। ফলে তারাও প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেয়। রেজিস্ট্রি অফিস, জজকোর্ট, পুলিশ লাইন, প্রধান ডাকঘর, জেলখানা প্রভৃতি স্থানে ও ভবনের ছাদে সশস্ত্র অবস্থান নেয়।
পাবনা জজকোর্টের সামনে এলেই পাকিস্তানি আর্মি আক্রান্ত হয়। চতুর্দিক থেকে পুলিশবাহিনী তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। ফলে শুরু হয় ভয়াবহ যুদ্ধ। অস্ত্রের ভয়ঙ্কর শব্দে গোটা শহর তখন কেঁপে ওঠে। গোলাগুলি শেষ হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানি আর্মি একসময় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে এক অভূতপূর্ব বিজয় সূচিত হয়। যা ছিল পাবনায় পুলিশের গৌরবোজ্জল ইতিহাস।”
এ খবর পৌঁছে যায় চর এলাকায়। ২৮ মার্চ ভোরে সমগ্র চর ও আশাপাশের এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বিসিক শিল্পনগরীর আর্মির ঘাঁটিটি ঘেরাও করে রাখে। সবার হাতে হাতে ছিল লাঠি, ফালা, সড়কি ও বন্দুক।
এছাড়া পাবনায় পুরাতন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনটি এবং লস্করপুরের একটি সাদা দালানেও ছিল পাকিস্তানি আর্মির একটি দল। নগরবাড়ী মহাসড়ক পাহারা দিচ্ছিল তারা। ছাত্র-যুবক, পুলিশ সম্মিলিতভাবে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনের চারপাশ ঘিরে ফেলে। ওখানে উপস্থিত ছিলেন দিলীপও।
কী ঘটেছিল সেখানে?
তিনি বলেন, “আর্মিরা হতচকিত হয়ে পাল্টা গুলি চালায়। কয়েক ঘন্টার যুদ্ধে টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবস্থানরত সৈন্যদলের সকলেই নিহত হয়। ওই লাশগুলো দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে আসে বহু মানুষ। পাকিস্তানিদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের অংশ হিসেবে লাশগুলোতে লাথি ও থুথু দেয় তারা।
তখনও ঘেরাও ছিল বিসিক শিল্পনগরীর আর্মি হেডকোয়ার্টার। অপরদিকে লস্করপুরে আর্মিদের আরেকটি দল একটি দালানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা বেরিয়ে এসে মানুষের ওপর গুলি চালায়। ফলে শামসুল আলম বুলবুল, আমিরুল ইসলাম ফুনু, মুকুল ও ভাটা শ্রমিক আফসার এই চারজন ওখানেই শহীদ হন। সাধারণ মানুষ এতে আরও ক্ষিপ্ত হয়। জনতার রোষানলে পড়ে পাকিস্তানি আর্মি। ফলে প্রায় ৩২ জন সেনা ওখানে নিহত হয়।
অবস্থা বেগতিক দেখে বিসিক শিল্পনগরী থেকে আর্মিরা ১১টি ট্রাক যোগে রাজশাহীর দিকে সরে যায়। কিন্তু তার আগেই ক্যাম্পে আটকদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। ফলে ওইদিন শহীদ হন অ্যাডভোকেট আমিনুদ্দিন এমপিএ, ন্যাপ ভাসানী নেতা ডা. অমলেন্দু দাক্ষী, ব্যবসায়ী আবু সাঈদ তালুকদার ও রাজেন প্রমুখ। নেতাদের মৃতদেহগুলো আমাদের মনকে রক্তাক্ত করে। অন্তরে জ্বলে প্রতিশোধের আগুন।”
এরপর পাবনা শহর হানাদারমুক্ত ছিল ১০ এপ্রিল পর্যন্ত। তখন নগরবাড়ি ঘাট ছিল সম্পূর্ণ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু সামান্য কিছু অস্ত্র নিয়ে তো পাকিস্তানি সেনাদের ঠেকানো যায় না। ১১ এপ্রিল আর্মিরা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ভেঙ্গে নদীর এপারে চলে আসে। তারা রাস্তার দুইপাশের বাড়িঘরগুলো পোড়াতে পোড়াতে ঢুকে পড়ে পাবনা শহরে। গোটা শহর তাদের দখলে চলে যায়। শহরজুড়ে তখন আতঙ্ক তৈরি হয়। পাকিস্তানিদের একটা মর্টারের শেলও এসে পড়ে দিলীপদের বাড়িতে। ফলে তাদের পক্ষে আর শহরে থাকা সম্ভব হয় না।
দিলীপের ভাষায়, “আমাদের সঙ্গে সদ্য বিয়ে হওয়া বোনের পরিবার, পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি শিবুজিৎ নাথ, সাধনা ঔষাধালয়ের ম্যানেজার ফনিভূষণ সরকারের পরিবারসহ হেঁটে চলে যাই চাটমোহরে, বড় চাচা নারায়ণ চন্দ্র গোস্বামীর বাড়িতে। সেখানে ছিলাম প্রায় এক মাস।
বড় চাচার পেশা ছিল গুরুগিরি। প্রচুর শিষ্য ছিল তার। চাটমোহরের ঘরে ঘরে মানুষ তাকে ভক্তি করত। একদিন পুলিশ এসে তাকে থানায় নিয়ে যায়। শান্তি কমিটির মিটিং হবে আপনাকে থাকতে হবে—এই বলে নিয়ে যায় তারা। ওইদিন আর্মিরা চাটমোহর বাজারের ভেতর গিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের ম্যানেজারসহ কয়েকজনকে গুলি করে। গুলির শব্দ শুনে থানাতে যারা ছিলেন তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ফলে পুলিশ তখনই বড় চাচাসহ সবাইকে ছেড়ে দেয়।”
দিলীপরা তখন ৫টি নৌকা ভাড়া করে অষ্টমনিসা মির্জাপুর নামক স্থান থেকে অনিশ্চিত পথে নৌকা ভাসায়।
তিনি বলেন, “দিনের বেলায় নৌকা চলত। সন্ধ্যা হলেই নোঙর করা হতো বাজার কিংবা লোকালয়ে। এভাবে সাতদিন কেটে যায় নৌকাতেই।
নওগাঁর আত্রাইতে ব্রিজের ওপর দিয়ে আর্মিদের ট্রেন যেত। ওই ট্রেন কখন আসে কেউ জানে না। স্থানীয়রা বলল, ওরা ব্রিজ থেকে নদীতে নৌকার যাতায়াত দেখলেই ব্রাশ ফায়ার করে। কিন্তু ব্রিজের নিচ দিয়েই আমাদের যেতে হবে। দুর্ভাবনা ও আতঙ্কেই কাটে ওই সময়টা। এরপর মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর নামক জায়গা পার হয়ে আসি সাপাহারে। এখানে নৌকা ছেড়ে দিয়ে হেঁটে বর্ডার পার হই। অতপর পৌঁছি যাই ভারতের গঙ্গারামপুরে।”
দীর্ঘ যাত্রায় তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন এই মুক্তিযোদ্ধা।
তার ভাষায়, “প্রসাদপুরে আমাদের নৌকা আটকে দেয় স্থানীয় একদল লোক। সঙ্গে থাকা মূল্যবান জিনিস, সোনাদানা ও টাকাপয়সা লুটপাট করে ওরা। শুধু হিন্দু ধর্মালম্বীরাই নয়, একাত্তরে ওই জায়গা দিয়ে যারাই ইন্ডিয়ায় গিয়েছে তাদেরই সোনাদানা ও মূল্যবান জিনিস লুটে নিয়েছিল একটি গ্রুপ।”
যাত্রাপথে মানুষের আন্তরিক সহযোগিতাও পেয়েছিলেন তারা।
তিনি বলেন, “সাপাহারের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। স্থানীয়দের বললাম এখানে কি জল পাওয়া যাবে? ওরা প্রথম বুঝল না। পরে বললাম, পানি আছে? কয়েকজন লোক ছুটে যায় বাড়িতে। অতঃপর পানির সঙ্গে খৈ, মুড়ি আর গুড় এনে দেয়। ক্ষুধার্ত সবাই। একটা বড় গাছের নিচে বসে ওগুলো আমরা তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছিলাম। এভাবে সাধারণ মানুষ হেল্প করেছে আমাদের।”
সেখানে থেকে কীভাবে ট্রেনিংয়ে গেলেন?
দিলীপ বললেন যেভাবে, “আমাদের জামাই বাবু (বড় ভগ্নিপতি) চাকরি করতেন পাবনা এসপি অফিসে। নাম গৌরপদ বিশ্বাস। ইন্ডিয়ায় এসে কৃষ্ণ নগরে মুজিবনগর সরকারের অধীনে কাজ করেন তিনি। কেচুয়া ডাঙ্গায় একটা ক্যাম্প ছিল। পরে করিমপুর ক্যাম্পটি গড়ে ওঠে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে। ক্যাম্পগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল জামাই বাবুদের। তিনিই একদিন খবর পাঠান, ‘তোমরা ট্রেনিংয়ে গেলে রেডি হয়ে চলে আসো।’
আমার সঙ্গে জামাই বাবুর ছোটভাই নিমাই পদ বিশ্বাসও ট্রেনিংয়ে জন্য প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু বাড়ি থেকে মা রাজি হন না। অনিশ্চয়তার পথে যেতে দিবেন না তিনি। তখন আমার এক নোয়া দাদু (সেজো দাদু) বাড়িতে আসেন। এলএলবি পাশ, হাই স্কুলের টিচার ছিলেন তিনি। মাকে বুঝিয়ে বললেন, ‘তোমার তো অনেকগুলো ছেলে, একটা ছেলেকে দেশের জন্য ছেড়ে দাও’।
মা তার কথা রাখলেন। করিমপুর ক্যাম্পে গিয়ে আমরা পাই রণেশ দা (রণেশ মৈত্র), বিদেশ মৈত্র, আমিনুল ইসলাম বাদশা, তার ভাই রবিউল ইসলাম রবিসহ অনেককেই।
ট্রামে করে আমাদের প্রথম পাঠানো হয় কলকাতায়, সিপিআই অফিসে। বাংলাদেশ থেকে আসা আরও ৭৪ জন যুক্ত হয় সেখানে। অতঃপর নিয়ে যাওয়া হয় হাওড়ায়। সেখান থেকে রাতে ট্রেনে উঠি। দুদিন ছিলাম ট্রেনেই। ট্রেন এসে থামে আসাম প্রদেশের তেজপুর স্টেশনে। সেখানে থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ছেলুনবাড়ি ক্যান্টনমেন্টে। ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের ট্রেনিং হতো ওখানে।”

সামরিক কায়দায় ট্রেনিং হতো দিলীপদের। তার সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেন নিয়াই পদ বিশ্বাস, খোকন লহিড়ী, ইয়াছিন আলী, মজিবর রহমান প্রমুখ। পাকশীর আব্দুল হামিদ ছিলেন প্রশিক্ষণকালীন পাবনা গ্রুপের লিডার। ট্রেনিং করান বি বি ছেত্রী, আর বি থাপ্পা প্রমুখ। দেশ স্বাধীনের জন্য নানাভাবে সাহস দিতেন তারা।
দিলীপের ভাষায়, “খুব ভোরে পিটি হতো এক ঘন্টা। কাঁটাতারের নিচ দিয়ে ক্রলিং করে যেতে হতো। বড় পুকুরের মতো ছিল। দড়ি বেয়ে সেটা পার হতাম। একটা বড় প্রাচীরে উঠে লাফ দিতে হতো। সকাল ৮টা থেকে ক্লাস শুরু হতো। রাইফেলের বিভিন্ন পার্টের নাম জানা এরপর প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস। মাঠে নিয়ে ৫ রাউন্ড করে গুলি করতে দেয়া হতো আমাদের।
নিশানা দেখত লাইন পজিশন, সিটিং পজিশন, স্টেন্ডি পজিশনে রেখে। টু টু বোর রাইফেল চালাতে দিয়ে আমাদের ভয় ভাঙ্গাত। থ্রি নট থ্রি রাইফেলটা ছিল ভারি। এস.কে.এস রাইফেল, জি.এফ রাইফেল, গ্রেনেড ফায়ার প্রভৃতিও চালান শেখান তারা। একুশ দিন ট্রেনিং হয় আমাদের। আমার এফএফ (ফ্রিডম ফাইটার) নম্বর ছিল ১৩৭৪০।”
স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কথা বলেন মুক্তিযোদ্ধা অমল কৃষ্ণ গোস্বামী দিলীপ। বলেন “আমাদের স্বপ্ন ছিল সর্বস্তরের মানুষের জন্য দেশটা আরও উন্নতির দিকে যাবে। কিন্তু সেটা তো হয়নি। বরং নিজেদের মধ্যে বিভক্তি শুধু বেড়েছে।”
আগামী প্রজন্মের প্রতি বুকভরা আশা প্রকাশ করেন অমল কৃষ্ণ গোস্বামী। তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন শেষ কথাগুলো, ঠিক এভাবে, “মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকারের জায়গা। আমাদের বিজয়ের সোপান। এর চেতনাকে তোমরা ধরে রেখো। মনে রেখো, অন্যায় পথে বা কারও দয়ায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যই সংগ্রাম হয়েছে একাত্তরে। তাই তোমাদেরকেও সৎ হতে হবে। আর সততাই হচ্ছে জীবনের মূল ভিত্তি। সত্য কথা বললে আর সত্য পথে চললে তুমি কখনও ঠেকবে না। দেশও তখন এগিয়ে যাবে।”
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ৩০ আগস্ট ২০২৫
© 2025, https:.




