মুক্তিযুদ্ধ

এই মাটিতে আমাদের রক্তের গন্ধ আছে: মুক্তিযোদ্ধা লিবিও

ক্ষতচিহ্নের গদ্য: পর্ব ১৬

তার কাছে প্রশ্ন ছিলযে দেশের জন্য অঙ্গ হারালেন, সেই দেশ থেকে কী পেলেন?

সদ্য কৈশোরে পা রাখা অষ্টম শ্রেণির এক চঞ্চল ছাত্র। চারদিকে তখন উত্তাল সময়। যে বয়সে হাতে থাকার কথা পাঠ্যবই কিংবা খেলার সরঞ্জাম, সেই বয়সে পরিস্থিতির টানে তাকে তুলে নিতে হলো আড়াই হাত লম্বা বাঁশের লাঠি। সেই লাঠিই তখন প্রতীকী রাইফেল, আর হাতে থাকা ইটের টুকরোগুলো শানিত গ্রেনেড।

এভাবেই খুলনার নিউ মার্কেটের পাশের মাঠে শুরু হয়েছিল এক কিশোরের দেশমাতৃকাকে রক্ষার প্রস্তুতি। তিনি লিবিও কিত্তনীয়া। জন্ম খুলনার সোনাডাঙ্গা গ্রামে হলেও স্বাধীনতার পর থিতু হয়েছেন খালিশপুরের বড় বয়রা খ্রিস্টান পাড়ায়। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনে তিনি কেবল একজন কিশোর ছিলেন না, ছিলেন অদম্য এক যোদ্ধা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রির পরপরই খুলনায় শুরু হয় প্রতিরোধের প্রস্তুতি। আনসার সদস্য আজগারের অধীনে লিবিওরা যখন লেফট-রাইট শিখছিলেন, তখনই আঘাত হানে পাকিস্তানি দোসররা। বিহারী কালু কসাই আর বান্না কসাইয়ের নেতৃত্বে একদল ঘাতক তলোয়ার নিয়ে চড়াও হয় এই কিশোর যোদ্ধাদের ওপর। বেশ কয়েকজন রক্তাক্ত হলেন। সেই রক্তমাখা দিনটিতেই লিবিওরা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন- এই অপমান ও অন্যায়ের উচিত শিক্ষা দিতেই হবে।

শত্রুর চোখে ধুলো দিয়ে লিবিও পাড়ি জমালেন তেরোখাদার পাতলায়। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্পে শুরু হলো আসল যুদ্ধের প্রস্তুতি। ক্যাপ্টেন ফমুদ্দিনের তত্ত্বাবধানে এবং নৌ-কমান্ডো নুরুল হক মোল্লার অধীনে ২০ দিনের কঠোর প্রশিক্ষণ নিলেন প্রায় ৬০-৬৫ জন যোদ্ধা। অস্ত্রের সীমাবদ্ধতা থাকলেও সাহসের কমতি ছিল না। পাতলা ক্যাম্পটি ছিল মূলত জলযুদ্ধের কেন্দ্র।

পাকিস্তানি সেনারা লঞ্চে বালির বস্তা দিয়ে বাংকার বানিয়ে টহল দিত। লিবিওরা দূর থেকে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন এবং সঠিক সময়ে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। এমনই এক দুঃসাহসিক অভিযানে আঠারোবাগির মোড়ে তারা ডুবিয়ে দিয়েছিলেন শত্রুসেনাদের একটি আস্ত লঞ্চ। ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে লিবিও কিত্তনীয়া তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আটারবাগী, সাতপার, বুঝনা আর মানিকদার জনপদ।

দেশ স্বাধীন হতে আর মাত্র দু-তিন দিন বাকি। চারদিকে বিজয়ের সুবাস। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, পাকিস্তানি সেনাদের তৎপরতা তখন স্তিমিত হয়ে এসেছে। নৌ-কমান্ডো নুরুল হক মোল্লা লিবিওকে পাঠালেন এক বিশেষ মিশনে- ছদ্মবেশে খুলনা শহরের খবরাখবর নিতে হবে। ছেঁড়া শার্ট আর প্যান্ট পরে এক পাগলের বেশে লিবিও পৌঁছালেন শহরে।

বেলা তখন তিনটা। খুলনা নিউ মার্কেটের পাশে ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনে পাকিস্তানি ক্যাম্প। সেখানে একটি জিপে মেশিনগান ফিট করা। লিবিও এবং তার সঙ্গী আক্তার লক্ষ্য করছিলেন কীভাবে আক্রমণ করা যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, পাকিস্তানি ইনফর্মারদের নজরে পড়ে যান তারা। হঠাৎ পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে ধেয়ে আসতে শুরু করে রকেট শেল।

লিবিও বলেন, “কিছু বোঝার আগেই একটা রকেট শেল পাশের এক ব্যক্তির মাথায় লেগে আমার ডান পায়ে প্রচণ্ড আঘাত করে। ছিটকে পড়লাম আমি। দেখলাম, আমার ডান পা-টি শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন, কেবল সামান্য চামড়ার সঙ্গে ঝুলে আছে। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। যন্ত্রণার চেয়েও বড় বিস্ময় নিয়ে সেই রক্তে হাত দিতেই অনুভব করলাম- তা যেন টগবগে গরম ফেনের মতো!” এরপর সব অন্ধকার হয়ে আসে।

জ্ঞান যখন ফিরল, তখন রাত দশটা। নিজেকে আবিষ্কার করলেন খুলনা সদর হাসপাতালের মেঝেতে। মিশনারির লোকেরা তাকে উদ্ধার করে সেখানে পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালটি তখন ছিল পাকিস্তানি সেনাদের দখলে। পরের দিন সকালে এক পাকিস্তানি সেনা তাকে গালি দিয়ে লাথি মেরে সিঁড়ি থেকে নিচে ফেলে দেয়।

মৃত্যু যখন আসন্ন, তখন দেবদূতের মতো এগিয়ে এলেন চার্চের ফাদার ডি আর বিশব মাইকেল ডি রোজারিও। তিনি লিবিওকে দ্রুত স্থানান্তর করেন যশোর ফতেমা হাসপাতালে। সেখানেই তার পচন ধরা ডান পা-টি হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে হয়।

যুদ্ধাহত এই বীরের কাছে প্রশ্ন ছিল- যে দেশের জন্য অঙ্গ হারালেন, স্বপ্নের সেই দেশ কি তিনি পেয়েছেন? দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লিবিও কিত্তনীয়া বলেন, “পতাকা পেয়েছি, মানচিত্র পেয়েছি- এটাই ছিল পরম পাওয়া। এই মাটিতে আমাদের রক্তের ঘ্রাণ মিশে আছে, এটা ভাবলে আজও বুকটা ভরে যায়।”

কথা বলতে বলতে পাশে থাকা পাঁচ বছরের নাতি লিয়ন কিত্তনীয়াকে কাছে টেনে নেন তিনি। এক লহমায় লিবিওর চোখ ভিজে ওঠে আনন্দ আর প্রত্যাশার অশ্রুতে। বর্তমান প্রজন্মের উদ্দেশে তার কণ্ঠস্বর তখন দৃঢ় ও আবেগঘন: “তোমরা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে লালন করো। এ দেশ তোমাদের, তোমাদের রক্তেরই উত্তরাধিকার। আমরা আমাদের রক্ত দিয়ে দেশটা এনেছি, তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেলাম। যুগে যুগে তোমরাই এর স্বাধীনতা রক্ষা করো।”

বীর মুক্তিযোদ্ধা লিবিও কিত্তনীয়া আজও বেঁচে আছেন তার সেই ক্ষতচিহ্ন নিয়ে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- স্বাধীনতার এই লাল সূর্য কতটা রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে কেনা।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১৬ মার্চ ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button