
সহযোদ্ধা আর কাছের মানুষদের কাছে তিনি পরিচিত ‘মুক্তি বাবু’ নামে।
ধানমন্ডির সাত নম্বর রোডের একটি শান্ত সকাল। জানালার বাইরে ভোরের আলো ফুটেছে মাত্র। কিন্তু এই প্রশান্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ঝোড়ো অতীত, যা আজও শরীরে বয়ে বেড়ান এক অকুতোভয় মানুষ।
তার নাম রুহুল আহম্মদ বাবু। সহযোদ্ধা আর কাছের মানুষদের কাছে তিনি পরিচিত ‘মুক্তি বাবু’ নামে। আদি নিবাস সিলেটের গোলাপগঞ্জের ফুলবাড়ি গ্রামে, তবে জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে ঢাকাতেই। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র।
কিন্তু উত্তাল মার্চে পেন্সিল আর ড্রয়িং বোর্ড ফেলে এই তরুণ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশমাতৃকার মুক্তির নেশায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রুহুল আহম্মদ বাবু প্রশিক্ষণের জন্য পাড়ি জমান ভারতে। আসামের ইন্দ্রনগর ট্রেনিং ক্যাম্পে কঠোর প্রশিক্ষণে নিজেকে গড়ে তোলেন গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে। প্রশিক্ষণ শেষে তার ওপর অর্পিত হয় গুরুভার। ৪ নম্বর সেক্টরের কুকিতল সাব-সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে তাকে পাঠানো হয় রণক্ষেত্রে।
তার নেতৃত্বে তখন প্রায় ছয়শ দুর্জয় মুক্তিযোদ্ধা, যাদের ৯৫ শতাংশই ছিল সাধারণ গ্রামের কৃষক, মেহনতি মানুষ আর দেশপ্রেমিক ছাত্র। যুদ্ধের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন বড়লেখা, ছোটলেখা, জুড়ি, দিলখুশা চা বাগান, লাঠিটিলা, সোনারুপা চা বাগান ও বিয়ানীবাজারের মতো দুর্ধর্ষ সব এলাকায়।
সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকের সেই দিনটি আজও বাবুর স্মৃতিতে স্পষ্ট। ক্যাম্পে এলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেল কাপুর। সুনির্দিষ্ট নির্দেশ, “ইউ আর রেডি টু মেজর অ্যাটাক”। লক্ষ্য ছিল দিলখুশা চা বাগানে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের শক্তিশালী ক্যাম্প। সেখানে প্রায় ১২৫ জন পাকসেনার একটি পুরো কোম্পানি আস্তানা গেড়েছে।
পরিকল্পনা হলো, ভারতীয় সেনারা গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তা (আর্টিলারি সাপোর্ট) দেবে আর মুক্তিযোদ্ধারা চালাবেন সম্মুখ আক্রমণ। পুরো অপারেশনটির চূড়ান্ত দায়িত্ব ছিল তরুণ কমান্ডার রুহুল আহম্মদ বাবুর কাঁধে। আর্টিলারিতে ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে সমন্বয়ে ছিলেন ক্যাপ্টেন শরিফুল হক ডালিম।
কৌশল সাজানো হলো নিপুণভাবে। আক্রমণটি হবে তিনটি ভাগে- কাট অফ পার্টি, কাভার পার্টি এবং অ্যাসল্ট পার্টি। কাট অফ পার্টির কাজ হলো পেছনের দুটি ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে শত্রুর পালানোর পথ এবং রসদ আসার পথ বন্ধ করে দেওয়া। কাভার পার্টি টিলা থেকে ফায়ারিং করে শত্রুকে ব্যস্ত রাখবে, আর নিচ থেকে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বাংকারের দিকে এগিয়ে যাবে অ্যাসল্ট পার্টি।

সন্ধ্যার অন্ধকারে এগিয়ে গিয়ে ভোরে গন্তব্যে পৌঁছাল প্রায় দেড়শ মুক্তিযোদ্ধার একটি দল। অ্যাসল্ট গ্রুপে পজিশন নিয়ে রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষায় বাবু। ভোর চারটার দিকে শুরু হলো আর্টিলারি ফায়ারিং। কামানের গোলায় কেঁপে উঠল চা বাগানের মাটি। ২১টি গোলা বর্ষিত হওয়ার সময় ভেতর থেকে ভেসে আসছিল পাকিস্তানি সেনাদের ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ চিৎকার।
আর্টিলারি থামার এক মিনিটের মাথায় পর পর দুটি বিকট শব্দ হলো। বাবু ধরে নিলেন লিয়াকত ও রফিকের নেতৃত্বাধীন কাট অফ পার্টি দুটি ব্রিজই উড়িয়ে দিয়েছে। এবার আক্রমণের পালা। কাভার পার্টি মুহুর্মুহু গুলি শুরু করলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বাংকারের দিকে সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাবু। ডানে আতিক (পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গাড়িচালক) আর বামে খায়েরকে নিয়ে তারা তিনটি বাংকার দখল করে নিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রথম আঘাতটি আসে; একটি মর্টার শেলের ছোট স্প্লিন্টার এসে বিঁধল তার বাঁ পায়ের হাঁটুর ওপর। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছিল, কিন্তু সেই রক্তাক্ত অবস্থাতেই গামছা দিয়ে পা বেঁধে লড়াই চালিয়ে গেলেন অকুতোভয় এই কমান্ডার।
ভোর তখন ছয়টা। যুদ্ধের ময়দানে হঠাৎই শোনা গেল সাঁজোয়া যানের ভারী আওয়াজ। বাগানের রাস্তা দিয়ে পাকিস্তানি সাজোয়া বাহিনীর ট্রাক আসছে, যার ওপর ফিট করা মেশিনগান থেকে অবিরাম গুলি ছুড়ছে তারা। বাবু তখনই বুঝতে পারলেন, কোথাও একটা মস্ত ভুল হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে একটি দল রাজাকারদের ওত পেতে থেকে অতর্কিত আক্রমণের (অ্যাম্বুস) কারণে ব্রিজে পৌঁছাতেই পারেনি, আর অন্য দলটি একটি বড় ব্রিজ ধ্বংস করতে গিয়ে দুটি বিস্ফোরক (এক্সপ্লোসিভ) ব্যবহার করেছিল। সেই দুটি শব্দ শুনেই বাবুরা ভেবেছিলেন দুটি ব্রিজই ধ্বংস হয়েছে।
সাঁজোয়া বাহিনীর সামনে সাধারণ অস্ত্র নিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। বাবু ‘রেড ফায়ার’ বা পিছু হটার সংকেত দিলেন। হাতে স্টেনগান আর তিনটি গ্রেনেড নিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তখনই ঘটল সেই ভয়াবহ ঘটনা। টিলার ওপর এক লুকানো বাংকার থেকে ধেয়ে এলো সাবমেশিনগানের গুলির বৃষ্টি। লুটিয়ে পড়লেন বাবু।
প্রথমে কোনো যন্ত্রণাই অনুভব করেননি তিনি। কিন্তু যখন উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন, দেখলেন বাঁ পা-টি অদ্ভুতভাবে বেঁকে গেছে। হাঁটুর নিচ থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলেন, হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালির ওপর পর্যন্ত হাড়ের অনেকটা অংশ বুলেটের আঘাতে পুরোপুরি উড়ে গেছে। পা-টি শরীরের সঙ্গে কোনোমতে চামড়া দিয়ে লেগে আছে। অসহ্য যন্ত্রণায় নিস্তেজ হয়ে আসছিল শরীর।
সেই অবস্থাতেই রক্তমাখা পা টেনে টেনে চা বাগানের শুকনো বাঁশ পাতার ওপর দিয়ে এগোতে লাগলেন তিনি। ঝাপসা চোখে দেখলেন সহযোদ্ধা মাশুককে। তাকে চিৎকার করে বললেন, “তোমরা সরে যাও, আমি ওদের ঠেকাই।” কিন্তু সহযোদ্ধারা তাদের প্রিয় কমান্ডারকে ফেলে যাননি। মইয়ের ওপর চাটাই বিছিয়ে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় কুকিতলে, সেখান থেকে মাসিমপুর মিলিটারি হাসপাতালে।
দেশ স্বাধীন হলো, কিন্তু বাবুর লড়াই তখনো শেষ হয়নি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সরকারিভাবে পাঠানো হয় তৎকালীন পূর্ব জার্মানিতে। ইস্ট বার্লিনের ‘ক্রাংকেনহাউজ বুখ’ হাসপাতালে তার পায়ে হাড়ের গ্রাফটিং করা হয়। সেই ২৫ জনের দলে তার সঙ্গে চিকিৎসাধীন ছিলেন শমসের মবিন চৌধুরী, আমিন আহমেদ চৌধুরী এবং জেনারেল হারুনের মতো মুক্তিযোদ্ধারাও। দীর্ঘ চিকিৎসায় তিনি ফিরে পান চলাচলের শক্তি।
আজকের বাংলাদেশে যখন নতুন প্রজন্ম জাতীয় সংগীত শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আহম্মদ বাবুর চোখ ভিজে আসে। তিনি এই প্রজন্মের ওপর ভীষণ আশাবাদী। তার ভাষায়, “আমরা নয় মাসে খুব সোজা একটা কাজ করে গেছি, দেশটাকে স্বাধীন করেছি। কিন্তু এর চেয়ে একশ গুণ কঠিন কাজ হলো দেশটাকে গড়া। তোমাদের ৯ বছর না, ৯০ বছর দিলাম- দেশটাকে গড়ো। শুধু দেশটাকে ভালোবাসো।”
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১১ মার্চ ২০২৬
© 2026, https:.




