
সারাদেশের মানুষই আমার রক্ত, তাদের জন্যই যুদ্ধ করেছি।
সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের শান্ত জনপদ বিষম্বরপুর উপজেলার লামাপাড়া গ্রাম। এই গ্রামের নিভৃত এক বিকেলে মুখোমুখি বসা এক মানুষের চোখেমুখে এখনো ভাসে একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলো। তিনি এস এম সামছুল ইসলাম। ১৯৭১ সালে যিনি ছিলেন সুনামগঞ্জ বুলচাঁদ হাই স্কুলের দশম শ্রেণির দুরন্ত এক কিশোর।
আজ তার পরিচয়- একজন অকুতোভয় যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা, যার জীবনের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল একাত্তরের একটি তপ্ত বুলেট।
একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে যখন ঢাকার রাজপথে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হয়, সেই বিভীষিকার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সুনামগঞ্জে। উত্তাল জনতা তখন রুখে দাঁড়ায়। আনসার-মুজাহিদ, ইপিআর ও স্থানীয় মানুষ মিলে আক্রমণ চালায় এসডিওর বাংলোয়।
সেই উত্তাল সময়ে একদিকে যেমন মুক্তির নেশা ছিল, অন্যদিকে ছিল জীবনের ভয়। অনেক যুবক আত্মরক্ষার্থে শান্তি কমিটিতে নাম লেখালেও সামছুল ইসলামের পথ ছিল ভিন্ন। বাবার অদম্য উৎসাহে তিনি সিদ্ধান্ত নেন মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার।
মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বন্ধু সিরাজুল ইসলাম ও আবুল কালাম আজাদকে সঙ্গে নিয়ে জয় বাংলা বাজার হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছান ভারতের বালাটে। সেখানে গিয়াস উদ্দিন সুবেদারের মাধ্যমে প্রস্তুত হন যুদ্ধের জন্য। সামছুল ইসলামের স্মৃতিতে আজও অমলিন সেইসব দিনের কথা।
সে সময় অনেক তরুণের বয়স ১৮-এর নিচে থাকলেও অদম্য আকাঙ্ক্ষায় তারা বয়স বাড়িয়ে নাম লিখিয়েছিলেন। প্রশিক্ষণের সময় গুলি করতে গিয়ে অনেক কিশোর শারীরিক শক্তিতে কুলিয়ে উঠতে না পেরে পেছনে ছিটকে পড়তেন, কিন্তু তাদের মনের জোর ছিল পাহাড়সম।
মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জির ‘ইকো ওয়ান’ ক্যাম্পে চলে এক মাসের কঠোর প্রশিক্ষণ। ৫ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর ব্যাচের সেই ১০৫ জন যোদ্ধার ব্যাচ কমান্ডার ছিলেন বীরবিক্রম জগৎজ্যোতি দাস। ভারতের গুর্খা রেজিমেন্টের অধীনে পাহাড় বেয়ে ওঠা-নামাই ছিল তাদের নিয়মিত প্যারেড।
সেখানে তারা রপ্ত করেন হাতিয়ার চালনা, থার্টি সিক্স হ্যান্ড গ্রেনেড, অ্যান্টি ট্যাংক মাইন ও ডিনামাইটের মতো মরণঘাতী অস্ত্রের কলাকৌশল। প্রশিক্ষণ শেষে তারা রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন ৫ নম্বর সেক্টরের ছফেরগাঁও, ডালার পাড়, ইসলামপুর ও বৈশারপাড়ের মতো জায়গাগুলোতে।
১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৫টা। সুনামগঞ্জের বৈশারপাড় গ্রামে পাকিস্তানি সেনাদের এক শক্তিশালী ঘাঁটির বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন সামছুল ইসলাম ও তার ১৬ জন সহযোদ্ধা। বৈশারপাড়ের একটি বাড়ির ভেতর বাংকারে পজিশন নিয়ে তারা অপেক্ষা করছিলেন শত্রুর আক্রমণের।
হাওর এলাকা থেকে হঠাৎ এক ব্যক্তিকে দেখা যায় হাত উঁচিয়ে পাকিস্তানিদের কাছে তাদের অবস্থান ইশারা করে দেখিয়ে দিতে। মুহূর্তেই শুরু হয় ভয়াবহ মর্টার হামলা।
সবাই বাংকার ছেড়ে বাইরে পজিশন নিলেন। সামছুল ইসলাম আশ্রয় নিলেন একটি মেরা গাছের আড়ালে। পাশেই ছিলেন এলএমজিম্যান। চারদিকে গুলির তুবড়ি ছুটছে। হঠাৎ দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে আসা একঝাঁক ব্রাশফায়ারের একটি গুলি সামছুল ইসলামের বাঁ হাতের পেছন দিক দিয়ে ঢুকে শরীরের ভেতরে বিঁধে যায়।
যন্ত্রণায় চিৎকার করার শক্তিটুকুও ছিল না তার। দুচোখে অন্ধকার নেমে আসছিল, মনে পড়ছিল কেবল বাবা-মায়ের মুখ। মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার সময় দাঁতগুলো বেরিয়ে গিয়েছিল। সহযোদ্ধা আবু লেস ও সিরাজুল ইসলাম রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করতে ছুটে আসেন। সেদিন আরও আহত হয়েছিলেন সহযোদ্ধা পাগলা সফি ও ভুঁইয়া।

আহত সামছুল ইসলামকে প্রথমে নেওয়া হয় বালাট ইয়ুথ ক্যাম্পে, পরে শিলং মিলিটারি হাসপাতালে। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার পিঠ থেকে সেই প্রাণঘাতী বুলেটটি বের করা হয়। কিন্তু বুলেটটি তার স্পাইনাল কর্ড বা মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়, ফলে দুই পা চিরতরে অবশ হয়ে যায়।
সেই স্মৃতিবহ বুলেটটি আজও সযত্নে রেখেছেন তিনি, যা দেখলে আজও একাত্তরের সেই দিনগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে চোখের সামনে। চিকিৎসার জন্য তাকে শিলং থেকে গুয়াহাটি এবং পরে লখনৌ কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালের এক মেজর তাকে সুস্থ হওয়ার আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত হুইলচেয়ারই হয় তার চিরসাথী।
দেশ স্বাধীনের খবর যখন লখনৌ হাসপাতালে পৌঁছাল, তখন সেখানে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে সামছুল ইসলাম আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “দেশ স্বাধীনের খবর পেয়ে খুব কেঁদেছিলাম। বাঁচমু কিনা তাই জানতাম না। মা কোথায় আছে, ভাইবোন কোথায় আছে, জানি না। পা দুইটাই অচল। তাদের কাছে ফিরতে পারব কিনা তাও জানি না। তবুও আনন্দে বুকটা ভরে যাচ্ছিল।”
লখনৌ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তিনি তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটি করে ফিলিপস রেডিও। সেদিন তিনি ভাষণে বলেছিলেন, “দেশপ্রেম কাকে বলে জানতে চাইলে, যাও বাংলার লোকদের দেখে এসো। কারো দাড়ি নাই। দুধের শিশুর মতো বয়স। সেও দেশের জন্য রক্ত দিয়েছে।”
সামছুল ইসলামের কাছে কেন যুদ্ধে গিয়েছিলেন, এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত সহজ ও গভীর। তিনি বলেন, “আমার বাবা, মা, ভাইবোনের শান্তির জন্য আমি যুদ্ধ করেছি। আমি মনে করি সারাদেশের মানুষ আমার মা, বাবা, ভাইবোন। সবাই আমার রক্ত। আমরা তাদের জন্য যুদ্ধ করেছি।”
আজ দেহ ক্ষতবিক্ষত, দুই পা অচল, কিন্তু বুকের ভেতর একাত্তরের সেই জয়ের আনন্দ আর দেশপ্রেম আজও অম্লান।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১০ মার্চ ২০২৬
© 2026, https:.




