মুক্তিযুদ্ধ

নিজে শোধরাও, দেশ এমনিতেই এগিয়ে যাবে: মুক্তিযোদ্ধা দুলাল

ক্ষতচিহ্নের গদ্য: পর্ব ৯

বাবার আলমারি থেকে ৫০ টাকা নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন এই মুক্তিযোদ্ধা।

সালটা ১৯৭১। চারদিকে বারুদের গন্ধ আর বুলেটের শিস। বাংলার আকাশে তখন ঘোর অমানিশা, কিন্তু একঝাঁক তরুণের চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন। সেই উত্তাল সময়ের এক ধুলোমাখা দুপুরে, আলমডাঙ্গার এক বাড়ি থেকে এক কিশোর চুপিচুপি বেরিয়ে পড়েছিল অজানার উদ্দেশ্যে।

যাওয়ার আগে বাবার আলমারি থেকে মাত্র ৫০টি টাকা নিয়ে সে রেখে গিয়েছিল একটি ছোট্ট চিরকুট। সেই কিশোর আর কেউ নন, তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা দুলাল। নিচের কথোপকথনে উঠে এসেছে এই বীরের জীবন ও যুদ্ধের সেই লোমহর্ষক উপাখ্যান, যা তিনি তার জীবদ্দশায় বর্ণনা করেছিলেন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাস। সারা দেশ যখন উত্তাল, তখন আলমডাঙ্গায় হান্নান প্রথম প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেন। গোলাম মোস্তফা দুলালের আগে থেকেই স্কাউট ট্রেনিং ছিল, যার সুবাদে আনসারদের কাছ থেকে রাইফেল চালানোও তিনি রপ্ত করে নিয়েছিলেন। যুদ্ধের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে স্কুল থেকে অ্যাসিড বাল্ব চুরি করে আনা হতো এবং সেগুলো দিয়েই এলজিইডির মাঠে শেখানো হতো ককটেল বানানো।

কিছুদিন পর হাসু আর হান্নান রেলওয়ে স্টেশনের জিআরপি পুলিশের কাছ থেকে কয়েকটি রাইফেল কেড়ে আনেন। সেই সম্বল দিয়েই তারা আলমডাঙ্গায় পাহারা বসানো শুরু করেন।

কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। ৩০ মার্চ ১৯৭১ তারিখে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি সেনারা এসে কুষ্টিয়া দখল করে নেয়। এপ্রিলের ৭ তারিখে তারা আলমডাঙ্গা থানায় অবস্থান নেয়। ওই দিনই তারা আবুল হোসেনসহ ৮-১০ জনকে ধরে নিয়ে যায় হাটবলিয়া ফেরিঘাটের সামনে এবং সেখানে গুলি করে হত্যা করে।

আলমডাঙ্গায় সেটিই ছিল প্রথম বড় কোনো গণহত্যা। এই নৃশংসতা দেখার পর দুলালরা আর স্থির থাকতে পারেননি, তারা ভারতে গিয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেন।

মে মাসের প্রথম সপ্তাহের ঘটনা। দুলাল ও তার বন্ধু সেকান্দারসহ কয়েকজন মিলে ঠিক করলেন তারা বাড়ি ছাড়বেন। দুলালের বাবা সরকারি চাকরি করতেন, বেতনের টাকা আলমারিতে রাখা থাকত। দুলাল সেখান থেকে ৫০টি টাকা হাতে নিয়ে একটি কাগজে লিখেছিলেন, “খুব প্রয়োজনে ৫০টা টাকা নিলাম আব্বা। পরে দিয়ে দিব।”

সেদিন বাড়ির সবাই কাজে ব্যস্ত ছিল। সেই সুযোগে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়েন দুলাল। মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া পার হয়ে কাজিপুর সীমান্ত দিয়ে পৌঁছান ভারতের নদীয়ার দমপুকুর ক্যাম্পে। সেখানে ১৫ দিন চলে কঠোর লেফট-রাইট।

তারপর একদিন ভারতীয় সেনারা এলেন উচ্চ প্রশিক্ষণের জন্য লোক বাছাই করতে। দুলাল ছিলেন রোগা-পাতলা আর বয়সে ছোট, তাই প্রথম দফায় বাদ পড়ে গেলেন। কিন্তু যুদ্ধে যাওয়ার তীব্র বাসনা তাকে দমাতে পারেনি। যখন অফিসাররা জানতে চাইলেন কুষ্টিয়া ও যশোরের বাইরের কেউ আছে কিনা, বরিশালের সন্তান দুলাল সঙ্গে সঙ্গে হাত তুললেন।

তার প্রশিক্ষণ শুরু হলো বিহারের চাকুলিয়ায়। সেখানে ক্যাপ্টেন ভোলা শিং ও হাবিলদার রাজেন্দ্র কুমারের অধীনে ২৮ দিনের কঠোর প্রশিক্ষণ চলল। সেখানে তিনি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এসএমজি, এসএলআর, গ্রেনেড, মাইন, মর্টার এমনকি রকেট লঞ্চার চালানোও আয়ত্ত করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ শুরু করেন।

নভেম্বরের মাঝামাঝি রোজা চলছে। আলমডাঙ্গার ভেতরে তখন পাকিস্তানি মিলিশিয়া বাহিনী, বিহারি আর কালো পোশাকের রাজাকারদের দৌরাত্ম্য। মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পনা করলেন ঈদের দিনে আলমডাঙ্গা শহর আক্রমণ করার, কারণ তখন ঈদগাহ মাঠে শত্রু ও সমর্থকদের একসঙ্গে পাওয়া যাবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১১ নভেম্বর সন্ধ্যায় তারা কুমার নদের ওপারে কুঠিবাড়ির পাওয়ার স্টেশনটি উড়িয়ে দেন। চুয়াডাঙ্গা থেকে যেন শত্রু সেনা আসতে না পারে, সেজন্য রেললাইনও উপড়ে ফেলা হয়। কুষ্টিয়া থেকে আলমডাঙ্গাকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা চারপাশ থেকে পজিশন নেন।

১২ নভেম্বর ভোরে নান্নু ভাইয়ের নেতৃত্বে চারজন মুক্তিযোদ্ধা রেকি করার জন্য শহরে ঢোকেন। সকাল ৯টার দিকে হঠাৎ গুলির শব্দে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে আলমডাঙ্গা। দুলালরা কুমার নদ পার হয়ে শহরে ঢুকে পড়েন। চারদিকের আক্রমণে রাজাকার ও মিলিশিয়ারা কোণঠাসা হয়ে আলমডাঙ্গা থানায় গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং সেখানকার বাংকার থেকে ব্রাশ ফায়ার শুরু করে।

পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে দুলালের ডান হাতের কবজির হাড় ভেঙে রগগুলো ছিঁড়ে গিয়েছিল, ছবি: সালেক খোকন।

সেই ‘আরবান ফাইট’-এ একের পর এক সহযোদ্ধার মৃত্যু দেখেন দুলাল। সহযোদ্ধা নান্নু গার্লস স্কুলের পাশ দিয়ে ঢোকার সময় মাথায় গুলি লেগে শহীদ হন। একইভাবে গুলিতে মারা যান বজলু ডাক্তার। সহযোদ্ধা হাসু ডাকবাংলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পাকিস্তানি সেনাদের খপ্পরে পড়েন; মিলিশিয়ারা মুক্তিযোদ্ধাদের পোশাক পরে তাকে বিভ্রান্ত করে এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। চাঁদতারার কাছে গুলিবিদ্ধ হন আনসার নামে আরেক সহযোদ্ধা।

দুপুর তখন গড়িয়েছে। দুলাল ও হান্নানসহ কয়েকজন একটি বাড়ির পজিশন থেকে থানার দিকে ফায়ার করছিলেন। ঠিক ডান পাশে পোস্ট অফিসের কাছে একটি গোপন বাংকার ছিল, যা তাদের নজরে আসেনি। সেখান থেকে দুলালকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। দুলাল যখন ম্যাগাজিন পরিবর্তন করছিলেন, তখন একটি গুলি সরাসরি এসে লাগে তার হাতের এসএলআর-এ। এসএলআর না থাকলে গুলিটি সরাসরি তার মুখে লাগত। ঠিকরে আসা স্প্লিন্টার তার ডান হাতের কবজিতে ঢুকে যায়।

মুহূর্তেই কবজির হাড় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, চামড়া ঝলসে মাংস বেরিয়ে পড়ে আর হাতের রগগুলো গাছের শিকড়ের মতো ঝুলতে থাকে। সেই অবস্থায় চুয়াডাঙ্গা থেকে পাকিস্তানি সেনারা মুহুর্মুহু গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসছিল। রক্তে ভেজা শরীর নিয়ে জীবন বাঁচাতে দুলাল এক কবরস্থানে আশ্রয় নেন। একটি পুরনো কবরের ভেতরে সারারাত নিজেকে লুকিয়ে রাখেন। একাত্তরে এভাবেই বেঁচে থাকার জন্য জীবিত মানুষেরও ঠাঁই হয়েছিল কবরে।

যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা দুলালকে পরে নওশের নামের একজন সহযোদ্ধা কাঁধে তুলে এরশাদপুর গ্রামে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসা ছিল না, হাত শুধু গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। ধরা পড়ার ভয়ে সহযোদ্ধারা তাকে মসজিদের খাটিয়ায় শুইয়ে সাদা কাপড়ে ঢেকে দেন, যেন তিনি একজন মৃত মানুষ। বেলগাছির ওহাব মেম্বারের বাড়িতে গ্রাম্য চিকিৎসা চললেও তার হাতে গ্যাংগ্রিন বা পচন ধরে যায়। পচনের গন্ধে কেউ তার কাছে আসতে পারছিল না।

অবশেষে লালচান ও শহীদুল নামের দুই সহযোদ্ধা তাকে পালকিতে করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পার করে করিমপুর ফিল্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। দীর্ঘ চিকিৎসায় প্রাণ বাঁচলেও তার ডান হাতের তিনটি আঙুল চিরদিনের জন্য অবশ হয়ে যায়। আমৃত্যু তিনি সেই আঙুলগুলো আর পুরোপুরি সোজা করতে পারেননি।

মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা দুলাল আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার শরীরে বয়ে বেড়ানো সেই স্প্লিন্টারের ক্ষতচিহ্ন স্বাধীন বাংলাদেশের এক অমলিন দলিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও ইতিহাসের চর্চার মাধ্যমেই নতুন প্রজন্মের মনে দেশপ্রেম জাগ্রত করা সম্ভব।

বিদায়বেলায় তিনি নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে এক অমর বাণী দিয়ে গিয়েছিলেন, “তোমরা বই পড়ো। নিজেকে জানো। নিজের চিন্তা ও মানসিকতাকে উদার করো। দেশটাকে ভালোবাসো। নিজে শোধরাও, তাহলেই দেখবে দেশ এমনিতেই এগিয়ে যাবে।”

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ০৯ মার্চ ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button