মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১: ওস্তাদরা বলতেন–গুলির মধ্যে নাম লেখা থাকে

অগাস্টে ঢাকায় গেরিলারা অনেকেই ধরা পড়ে যায়। হাইডআউট ক্যাম্পগুলোও প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। শহীদও হন কেউ কেউ। ফলে একাত্তরের অগাস্টে ঢাকা ছিল গেরিলা অপারেশন মুক্ত

“২৬ অগাস্ট ১৯৭১। পল্টনের বাসা থেকে সকালে চলে যাই বাসাবোর ঠাকুরপাড়া মায়াকাননে। সেখান থেকে মুগদা হয়ে যাই মাদারটেক। ওখানে একটা ব্রিজের নিচ থেকে ছইওয়ালা নৌকায় উঠি। পাকিস্তানি সেনাদের হেলিকপ্টার মাথার ওপর দিয়ে টহল দিচ্ছিল। এ কারণেই ১২ মনি কি ১৪ মনি ছইওয়ালা নৌকা ভাড়া করি আমরা।

নৌকার ভেতর ১২ জন। ঢেউয়ে ডুবুডুবু অবস্থা। সবাই শুয়ে আছি। একজনের পা আরেকজনের মাথার ওপর। সবাই স্থির হয়ে আছি। নড়াচড়া করলেই ডুবে যাবে নৌকা। এভাবেই নদী পার হচ্ছি। ঢেউয়ের পানি ছিটকে সবাইকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। তখন একজন আরেকজনের শরীর চেপে ধরি। প্রতিজ্ঞা করি, মরলে সবাই একসঙ্গেই মরব।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার সাইডে এক বাড়িতে গিয়ে উঠি আমরা। এরপর বর্ডার পার হয়ে ঢুকি ভারতে। পরে ট্রাকে করে যাই আগরতলায়, মেলাঘরে।

একটা জায়গায় বসেছিলাম। হঠাৎ দেখি বনমানুষের মতো একটা লোক খালি গায়ে হেঁটে আসছে আমার দিকে। তার হাতে একটা কুড়াল। লুঙ্গি গোছ মারা। প্রথম ভড়কে যাই। লোকটা কাছে এসেই বলে, ‘ওই স্বপন নাকি রে’।

অবাক হয়ে আমি বলি, ‘হায় হায় আসাদ (রাইসুল ইসলাম আসাদ), তুমি।’

জড়িয়ে ধরি তাকে। মুচকি হেসে সে বলে, ‘মানিক, বাচ্চু সবাই আছে। ভেতরে যাও তুমি।’

এরপরই ট্রেনিং শুরু হয়। ট্রেনিংয়ে আমাদের ক্রলিং করায় নাই। কারণ হাতে দাগ পড়বে। ঢাকায় প্রবেশ করতে চেক করলে আর্মিরা বুঝে ফেলবে। ক্রলিং ছাড়া সব হয়েছে। এলএমজিসহ সব অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ করায়। তিন সপ্তাহের মতো ট্রেনিং হয়। আমরা ছিলাম ৫২ জন।”

একাত্তরে ট্রেনিংয়ে যাওয়ার ঘটনা এভাবেই তুলে ধরেন মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম স্বপন। ওইসময় তিনি ছিলেন মতিঝিল সেন্ট্রাল গর্ভমেন্ট স্কুল (মতিঝিল সরকারি বালক বিদ্যালয়) থেকে এসএসসি পরীক্ষার্থী। বাড়ি ঢাকার পল্টনে।

আলাপচারিতায় ফিরে আসি একাত্তরে।

মেলাঘরে টিলার নিচের দিকে ছিল খালেদ মোশাররফ আর মেজর (তখন ক্যাপ্টেন ছিলেন) হায়দারের অফিস। আর টিলার ওপরে ইয়ুথ ক্যাম্প। ওই ক্যাম্পেই ট্রেনিং হয় তাদের।

ওইসময় ঢাকায় অপারেশন শুরু করে গেরিলাদের একটি গ্রুপ। যাদের বলা হয় ক্র্যাক প্লাটুন। অল্প কয়েকজনের গ্রুপ ছিল সেটা। লিডেড বাই গেরিলা হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক। তারাই হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে প্রথম অ্যাটাক করেছেন। যারা বলে দিয়েছিলেন, গেরিলা ওয়ার মানে ‘হিট অ্যান্ড রান’।

সাভারে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বন্দী এক পাকিস্তানি সেনা। ছবি: শফিকুল ইসলাম স্বপন

তারা প্রত্যেকেই এক একজন হিরো হয়ে দাঁড়িয়ে যান। প্রকাশ্যে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বোমা মেরে দেওয়া। পাগলামিরও একটা লিমিট থাকে! আবার ফার্মগেটে হলিক্রস স্কুলের সামনে দিনেদুপুরে পাকিস্তানি আর্মির গাড়িও চেজ করছে। ভাবা যায়! একেই বলে বীর। বলেন মুক্তিযোদ্ধা স্বপন।

ক্র্যাক প্লাটুন কেন নাম হয়েছে?

তার ভাষায়, “এটা সেক্টর টু থেকে দেয়া কোনো নাম নয়। খালেদ মোশাররফের একটা কমেন্ট এটা। ওদের এমন সাহস দেখে তিনি বলেছিলেন, ‘দিজ অল আর ক্র্যাক বয়েজ’। ওই থেকে নাম হয়ে যায় ক্র্যাক প্লাটুন।”

অগাস্টে ঢাকায় গেরিলারা অনেকেই ধরা পড়ে যায়। হাইড-আউট ক্যাম্পগুলোও প্রকাশ্য হয়ে যায়। শহীদও হন কেউ কেউ। ফলে একাত্তরের অগাস্টে ঢাকা ছিল গেরিলা অপারেশন মুক্ত। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে স্বপনদের ভেতরে পাঠানোর নির্দেশ আসে। ৫০ জনের গ্রুপটাকে লিড করেন রেজাউল করিম মানিক। গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। ১০ জন করে মোট ৫টি সেকশন ছিল। সবাই ইন্ডিয়ায় হায়ার ট্রেনিং করা এবং মে মাস থেকেই বর্ডারেই ফাইট করছিল। শুধু স্বপন আর বাবলু ছিলেন ইয়ুথ ক্যাম্প ট্রেন্ড।

যাত্রাপথের ঘটনা শফিকুল ইসলাম স্বপন বললেন যেভাবে, “ভেতরে ঢোকার আগে হায়দার ভাই তিনটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। প্রথমত, ‘তোমাদের ওপর যদি আর্মি অ্যাটাক করে তোমরা রিটার্ন অ্যাটক করবা না। এটা করলেই আমাদের পরিকল্পনা ওপেন হয়ে যাবে। বরং ওরা অ্যাটাক করলে যেভাবেই হোক পালিয়ে নিজেকে সেভ করবা।’ দ্বিতীয়ত, ‘দশজন মারা গেলেও একটা রাইফেল ফেরত আনতে হবে। ওয়ান রাইফেল ইজ টু টেন মুক্তিযোদ্ধা।’ তৃতীয়ত, ‘রাতে মুভমেন্ট করবা। কিন্তু বর্ডার এরিয়ায় কেউ সিগারেট জ্বালাবে না। সিগারেট তোমার মৃত্যু ডেকে আনবে।’

আমরা প্রস্তুতি নিয়ে মতিনগর শরণার্থী ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। আমার কাঁধে অ্যামুনেশন ভরা একটা ব্যাগ। বাম কাঁধে রাইফেল আর কেরোসিনের চুলার মতো দুটো অ্যান্টিট্যাঙ্ক মাইন। এগুলো নিয়ে হাঁটা-দৌড় দিয়ে এগোচ্ছি। টার্গেট হলো যত তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারি।

কসবা স্টেশনের কাছাকাছি তখন। এক বাঙালি যুবক দূরে বসা। শরণার্থী ক্যাম্পেই থাকে সে। ব্যঙ্গ করে দূর থেকে জোরে জোরে বলে, ‘গাধার পিঠে বোঝা বেশি হলে গাধা হাঁটে না দৌড়ায়।’ শুনে মনটা খুব খারাপ হয়। কথাটা এখনও কানে বাজে ভাই।

আমরা তো ওইপারে সেইফ সাইডে চলেই গিয়েছিলাম। ট্রেনিং নিয়ে দেশকে বাঁচাতে আবার ভেতরে মরতেই ঢুকছি। সো আমরা গাধা। আর ওরা ওখানে বসে বসে রিলিফ খাচ্ছে। ওরা খুব ভালো। পরবর্তীকালে কিন্তু শরণার্থী ক্যাম্পে নয় মাস কাটিয়ে আসা অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার খাতায় নাম লিখিয়েছে, ভাতাও পেয়েছে!”

এরপর কী করলেন?

“বর্ডারের কাছে একটা খাল পার হই সন্ধ্যার মধ্যেই। ভেতরে ঢুকছি। একজনের পেছনে আরেকজন। হাঁটু পর্যন্ত কাদার পথে। হাঁটছে সবাই। হঠাৎ লাইনটা দাঁড়িয়ে যায়। মানিক ভাই আমার ঠিক পেছনে। কী হলো সামনে? বলেই তিনি আমার কাছে তার ব্যাগ আর এলএমজিটা দিয়ে এগিয়ে যান। আমি তার ব্যাগ আর অস্ত্রসহই অনেক কষ্টে হাঁটছি। পরে একটা বাড়িতে সবাই একত্র হই। এরপর আবার রওনা দেই নৌকায়।

১৭ জন এক নৌকায়। ডান পাশে আমি। বাঁ পাশে আরেকজন। সামনে একজন। এভাবে ৮ দিকে দুজন করে ১৬ জন। এক পাশে মাঝি আর অন্য পাশে আরেকজন অস্ত্র নিয়ে পজিশনে থাকে।

নৌকা চলছিল। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি। হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ। পাকিস্তানিদের অ্যাম্বুশের ভেতর পড়ে যাই আমরা। মাঝি তখন লগি দিয়ে নৌকাটায় একটা ধাক্কা দিলো। নৌকা ঝোপের ভেতর আটকে যায়। আশপাশে তাকিয়ে দেখি সহযোদ্ধা সাহার ছাড়া কেউ নেই। জীবন বাঁচাতে পানিতে ডুব দিয়ে যে যার মতো সরে পড়েছে।

কিন্তু নৌকা ভর্তি অ্যামুনেশন। সেটা রক্ষা করতেই হবে। প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছিল তখন। আমার মনে হয় লাইফে ওই টাইমটার মধ্যে কত হাজারবার যে কলেমা পড়েছি। আর আল্লাহকে বলেছি, যদি তুমি বাঁচায়া দাও তোমার রাস্তায় চলব, দেশের জন্য বাঁচব। আর যদি নিয়া যাও শহীদ করে ফেল। ওদের হাতে যেন ধরা না পড়ি বা পঙ্গু না হই।

বিশ্বাস করেন আল্লাহ ডাক শুনছে। ওই গোলাগুলির মধ্যেও একটা গুলি গায়ে লাগে নাই। ট্রেনিংয়ের সময় ওস্তাদরা বলতেন, ‘গুলির মধ্যে নাম লেখা থাকে। তোমার নামে গুলি যদি না আসে তুমি মরবা না’। তাই-ই হয়েছিল।

ঝোপের ভেতর থেকে নৌকা বের করি আমরা। গোলাগুলির মধ্যেই পেছনে ফিরে প্রথম বাড়িটার কাছে গিয়ে নৌকাটা সাইড করে রাখি। দুজন মিলে দ্রুত নামিয়ে রাখি সমস্ত আর্মস-অ্যামুনেশন। এরপর আমি স্টেনগান আর সাহার একটা অস্ত্র নিয়ে পজিশন থাকি।

মানিক ভাই আর বাচ্চু ভাইরা ছিলেন পেছনের দিকে, অন্য নৌকায়। ভোরে এসে তারা আমাদের অবস্থা দেখে অবাক হন। সবাইকে তখন ক্যাম্পে ব্যাক করতে বলেন।

বাকিরাও ক্যাম্পে ফিরে আসে। মানিক ভাই সবাইরে খুব ধোলাই দেন। বলেন, ‘সাহার আর স্বপন এত বড় দায়িত্ব পালন করল, নৌকা ছাড়ল না। আর তোরা সব বর্ডারে ফাইট করা মুক্তিযোদ্ধা। তোরা এভাবে নৌকা ফেলে পালিয়ে গেলি!’

তখন হায়দার স্যার এসে আবার একটা ব্রিফ করেন। অতঃপর বললেন, ‘তোমরা আজ রেস্ট নাও। কালকে রওনা দিও’। ফলে ওইদিন আর ভেতরে যাওয়া হয়নি আমাদের।”

একদিন পরই তারা আবার বর্ডার পার হয়ে ভেতরে ঢোকে। ওইসময় আরও দুজনসহ স্বপন ছিলেন কমান্ডার রেজাউল করিম মানিকের নৌকায়। কসবার কাছাকাছি ঘটনা। তারা সিএমভি ব্রিজ পার হয়ে যাচ্ছে। ওই ব্রিজ পাহারা দিত রাজাকাররা। কিন্তু গোপনে ওরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কাজ করত। মানিক ভাইয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। এসব তাদের জানা ছিল না।

এরপর কী ঘটল?

মুক্তিযোদ্ধা স্বপন বললেন যেভাবে, “নৌকা দেখে ওরা ওপর থেকে ডাক দিয়ে জানতে চায়, এই নৌকায় কি মানিক ভাই আছেন? স্বপনরা প্রথম ভড়কে যান। সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্র তাক করেন। মানিক ভাই তাদের বলেন, ‘বল আছি’।

শুনে ওরা বলে, নৌকাটা একটু ভিড়ান। ব্রিজটা পার হয়ে নৌকাটা ভিড়ানো হয়।

তখন তিন-চারজন রাজাকার একটা বিরাট পেটি (বাক্স) নিয়ে ঢাল দিয়ে নেমে আসে। অতঃপর নৌকার মধ্যে ওই পেটিটি উঠিয়ে দেয়।

মানিক ভাই শুধু বললেন, তোমাদের অসুবিধা হবে না।

ওরা বলে, কাজে লাগানোর জন্যই জমাইছি এতদিন। এটা নিয়ে যান, আপনাদের কাজে লাগবে।

পুরো পেটি ভরা ছিল থ্রি নট থ্রির গুলি। এগুলো ওদের দেয়া হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মারার জন্য। ওরা সেগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেই তুলে দিয়েছিল। একাত্তরের এমন ঘটনাগুলোই বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।

রাজাকারে নাম লিখিয়ে ওরা গোপনে কাজ করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। তবে এটা সব জায়গার রাজাকাররা কিন্তু করেনি। বরং অনেকেই সরাসরি গণহত্যায় অংশও নিয়েছিল।”

একাত্তরে সাভার শিমুলিয়া ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং। ছবি: শফিকুল ইসলাম স্বপন

মানিক গ্রুপের অধীনে ছিল ঢাকা নর্থ, মানিকগঞ্জ, ধামরাই, সাভার আরও কয়েকটি থানা। এছাড়া ঢাকা সিটিতেও আলাদা গ্রুপ কাজ করেছে। মোট গেরিলা প্রায় ৫২ জন। তাদের সঙ্গে সবচেয়ে ছোট ছিল মুক্তিযোদ্ধা পলাশ। ১০ বছর বয়স ছিল তার। তাদের প্রথম বেইস ক্যাম্পটি ছিল ধামরাইয়ে। পাকিস্তানি আর্মি ওই ক্যাম্পে অ্যাটাক করলে ক্যাম্প চলে যায় শিমুলিয়ায়, সাভারের বাইশ মাইলে। ঘোড়াপীর মাজারে নেমে নদী পার হয়ে যেতে হতো শিমুলিয়ায়।

পাকিস্তানি আর্মি ঢাকায় নির্মমভাবে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধা সাহারকে। ওই ঘটনা বলতে গিয়ে আজও বুকের ভেতরটা খামচে ধরে মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম স্বপনের। তিনি বলেন, “আমরা তখন ঢাকাতেই থাকতাম। রেকি করাই ছিল প্রধান কাজ। বায়তুল মোকারমের গেরিলা অ্যাটাকসহ ঢাকায় বড় বড় অপারেশনের রেকি করেছি।

ডিসেম্বরে ঢাকায় খুব বেশি হলে ১০ জন গেরিলা ছিলাম। আমাদের গ্রুপে আমিসহ রাইসুল ইসলাম আসাদ, বাবলু, সাহার প্রমুখ ছিল।

তখন অনেক এক্সপ্লোসিভ ছিল। কিন্তু আমাদের প্রয়োজন আর্মস। একদিন আসাদ বলল, সাহারের বাসা থেকে অস্ত্র আনতে হবে। বললাম চল তাহলে। আমার দুলাভাইও আমাদের সহযোগিতা করতেন। তিনি নিজের গাড়িটি বের করেন। ওই গাড়িতেই আর্মস আনা যাবে। কারণ তখন ঢাকায় খুব বেশি চেকিং হচ্ছিল না।

১৫ ডিসেম্বর সকালে ওরা সাহারের বাড়িতে যায়, তেজগাঁওয়ে। কিন্তু আমাকে নিল না। আসাদ আর বাবলু গেল সঙ্গে। ঘণ্টাখানেক পর ফিরে আসে। কিন্তু সবার মন খারাপ। আসাদকে বললাম, আর্মস কই, নামাতে হবে না? ওরা কিছু বলল না। ঘরে যা, বলেই চলে যায়।

আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না। পরে দুলাভাই সব খুলে বলেন।

গেরিলা সাহাররা ছিল ৩ ভাই। তারা গিয়ে দেখে তিনজনেরই লাশ পড়ে আছে বাড়ির সামনে। শুনেই বুকের ভেতরটা ধপ করে ওঠে।

পাকিস্তানিদের গুলি গেরিলা সাহারের পিঠ দিয়ে ঢুকে বুকের সামনে বড় ফুটো হয়ে বেরিয়ে যায়। ছবি: শফিকুল ইসলাম স্বপন

১৪ ডিসেম্বর ভোর রাতে এলাকার এক বন্ধু সাহারকে বাইরে থেকে ডাক দেয়। তিন ভাইই একত্রে বের হয়ে দেখে আর্মি রেইড। ওরা ঘুরে দরজার ভেতর ঢুকে অস্ত্র বা কিছু একটা নিতে চাইছিল। তখনই আর্মিরা পেছন দিক থেকে গুলি করছে। গুলিটি সাহারের পেছন দিক দিয়ে ঢুকে বুকের সামনের দিকে বিরাট ফুটো হয়ে বেরিয়ে যায়। সাহারের মৃত্যুটা ঠিক মেনে নিতে পারছিলাম না।

১৬ ডিসেম্বর সকালে দুলাভাইকে নিয়ে বের হলাম। তিনি গাড়ি চালাচ্ছেন। বাঁ দিকে জানালা দিয়ে বাইরে দেখছি। আমার গলায় ক্যামেরাটা ঝুলানো। পাশেই বসা বাবলু। পাড়া থেকে বাইর হতে হতে স্লোগান শুরু করছি ‘জয় বাংলা’। দুলাভাই বলতেছে। আমরা দু’জন জবাব দিচ্ছি।

ঢাকার রাস্তা খালি। আমরা জোরে স্লোগান দেই আর একেকটা গলির ভেতর থেকে মানুষ বের হয়ে আসে। স্লোগান দিতে দিতে শেরাটনের সামনে দিয়ে চলে যাই সাহারের বাসায়। টিনের একটা বাড়ি। উঠানের মধ্যে তিনজনের লাশ পড়ে আছে। এলাকার লোকজন কাপড় দিয়া ঢেকে রাখছে। ওখানেই সাহারের গুলিবিদ্ধ ছবিটি তুলি। ওই ছবির দিকে তাকালে আজও একাত্তরটা জীবন্ত হয়ে ওঠে। যে আর্মি নিয়ে এসে ডাক দিয়েছিল সাহারকে, পরে ওই রাজাকারকে ধরেছিলাম আমরা। ওই ছবিটাও আছে এখনও।”

মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বন্দী পাকিস্তানি এক দোসর, যে শহীদ সাহারকে যে ডেকে আনে। ছবি: শফিকুল ইসলাম স্বপন

ছবি তোলা প্রসঙ্গে এই বীর বললেন যেভাবে, “ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই। আমাদের ক্যাম্প যখন সাভার শিমুলিয়ায় তখনও সেখানকার ছবি তুলেছি। গ্রামের মানুষ ট্রেনিং নিচ্ছে নানা কিছুও করছে, এসব ছবি। ওগুলো তুলেছি আগফা ক্লিক ক্যামেরা দিয়ে। পরিচিত এক বড় ভাইয়ের ছিল ক্যামেরাটা। তখন আফজাল করিম ছিলেন ডিএফপিতে। মামা হন। উনি রিফিল ভরে ভরে দিতেন আমাকে।

ডিসেম্বরের দুলাভাইয়ের ছোট ভাই মারুফ ভাই তার এসএলআর ক্যামেরাটা দেন আমাকে। ফিফটি এমএম ল্যান্সের রিকো ক্যামেরা। ওটা দিয়েই পরের ছবিগুলো তোলা।

আমাদের বাড়িটা ছিল দোতলা। সামনের বাড়িটা তখন তিনতলা। আওয়াজ পাইলেই দৌড় দিয়া ওই বাড়ির ছাদে চলে যেতাম। ওই ছাদ থেকেই প্রচুর এয়ারফাইটের আর ডগ ফাইটের ছবি তুলছি। গর্ভনর হাউজ বোম্বিংয়ের ছবিও ওখান থেকে তোলা। এই ছবিগুলোই এখন একাত্তরকে সাক্ষ্য দিচ্ছে।”

মুক্তিযোদ্ধা স্বপন আফসোস করে আরও বলেন, “মজার ব্যাপার হলো ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্সের আশপাশের ছবি তুলেছি। কিন্তু সারেন্ডার বলতে যে অফিসিয়ালি কিছু থাকে এটা তো আগে জানতাম না। ফলে ওইদিন আশাপাশের নানা জায়গার ছবি তুলে বাসায় এসে রেস্ট নিছি।”

দেশ তো স্বাধীন করলেন, স্বপ্নের বাংলাদেশ কি পেয়েছেন?

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, ঢাকায় সেক্টর-০২ এর একটি জিপ। ছবি: শফিকুল ইসলাম স্বপন

মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম স্বপনের অকপট উত্তর, “আমি মনে করি আমার স্বপ্ন ১৬ ডিসেম্বর পূরণ হয়ে গেছে। দেশও স্বাধীন হয়েছে, আমিও স্বাধীন হয়েছি। আমি আমার নিজের মতো চলা শিখে গেছি। আমি কিন্তু হ্যাপি। এরপর একদিকে লেখাপড়া করছি, একদিকে প্রেসফটোগ্রাফি করছি, আরেক দিকে মডেল ফটোগ্রাফি করছি। পরে ছবিও বানালাম। প্রথম চলচ্চিত্র ‘ঘুড্ডি’।”

এই বীর মনে করেন একাত্তরের জায়গায় বঙ্গবন্ধু আছেন। তাকে ছাড়া একাত্তরকে ভাবা যায় না। তার ভাষায়, “প্রশ্নই আসে না। একাত্তরের বঙ্গবন্ধু বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত। পরবর্তীতে একটা লোক পলিটিক্যালি চেঞ্জ হচ্ছে বা না হচ্ছে এটা আমাদের মতো ননপলিটিক্যালদের হেডেক না। আমাদের হেডেক কার আহবানে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এমনকি তখন জিয়াউর রহমানও তো বলেছেন যে, বঙ্গবন্ধু আমাদের সঙ্গে আছেন। তাই আমি এখনও জয় বাংলা বলি, জয় বঙ্গবন্ধুও বলি।”

প্রজন্মের প্রতি পাহাড়সম আশা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম স্বপন তাদের উদ্দেশ্যেই বললেন শেষ কথাগুলো, “তোমরা দেশকে ভালোবাসো। নিজের জায়গা থেকে নিজের মতো করে কাজ করো। দ্যাটস গুড এনাফ।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত, প্রকাশকাল: ৮ ডিসেম্বর ২০২৫

© 2025, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button