মুক্তিযুদ্ধের এক প্রামাণ্য ইতিহাস

সুলতানা রাজিয়া
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে নৃশংস গণহত্যা চালায়, তা দেখে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বুঝে ফেলে এই নরপশুদের সঙ্গে আর থাকা চলবে না। যারা এ দেশের মানুষকে মানুষ হিসেবে ন্যূনতম গ্রাহ্যও করে না, তাদের সঙ্গে একই দেশের নাগরিক হিসেবে ভাই-ভাই পরিচয়ে থাকা যায় না। ২৫ মার্চ গণহত্যা দেশবাসীর মনে এমন গভীর ক্ষতের জন্ম দিয়েছিল, তা উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না কারও পক্ষে। চোখের সামনে স্বজন ও বন্ধুদের মৃত্যু দেখে এ দেশের মানুষ প্রতিশোধের শপথ নেই। তারা দলে দলে যোগ দেন মুক্তিবাহিনীতে। মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশেরই ছিল না কোনো সামরিক প্রশিক্ষণ। কিন্তু মাতৃভূমিকে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করার জন্য তারা স্বল্পদিনের প্রশিক্ষণ নিয়েই অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনীর ওপর। তারপরও জয় হয় এই ছিন্ন পোশাকের, কৃশকায় মানুষের। তাদের চোখে ছিল দেশকে মুক্ত করার স্বপ্ন আর প্রতিশোধের আগুন এক অমোঘ অনুপ্রেরণা। এই অনুপ্রেরণাই তাদের করে তুলেছিল একেকজন দিগি¦জয়ী লড়াকু। তাদের বীরত্বেই দেশ হয়েছিল স্বাধীন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৪ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামের ইতিহাস শতভাগ লিপিবদ্ধ করতে পারিনি। কালের নিয়মানুসারে মুক্তিযোদ্ধা একে একে প্রয়াত হচ্ছেন আর কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের বীরত্বের ইতিহাস। আর কয়েক দশক পর হয়তো হারিয়ে যাবে শেষ মুক্তিযোদ্ধাও। তাহলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের কাহিনি কীভাবে উচ্চারিত হবে আগামীর দিনে? এই ইতিহাস সংরক্ষণ করে রাখতে হবে বইয়ের পাতায়, সচল চিত্রে; সঞ্চারিত করতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তবেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্থায়ী হবে, চিরকালীন হয়ে থাকবে।
সে লক্ষ্যেই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ও লেখক সালেক খোকন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গিয়ে শুনেছেন যুদ্ধদিনের কাহিনি। তিনি শুনেছেন কীভাবে তারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গেলেন, কীভাবে প্রশিক্ষণ নিলেন আর শুনেছেন রণাঙ্গনের বীরত্বের কাহিনি। তিনি বিশ্বাস করেন, একেকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনের গদ্যই মুক্তিযুদ্ধের একেকটি ইতিহাস। এ ইতিহাসই তিনি মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন ‘বীরত্বে একাত্তর’ বইতে। এ বইয়ে ১৭ বীর মুক্তিযোদ্ধার জবানিতে তুলে ধরেছেন তাদের যুদ্ধযাত্রা ও বীরত্বের কাহিনি। এই ১৭ জনের মধ্যে চারজন বীরপ্রতীক, সাতজন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ছয়জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
সাধারণ মানুষ যখন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, তাদের ত্যাগ ও জীবন বলিদানের কাহিনি বলেন, তখন তাতে ফুটে ওঠে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস আর তুলনারহিত ত্যাগ। কিন্তু যখন বীর মুক্তিযোদ্ধারা তাদের যুদ্ধযাত্রা বর্ণনা করেন, তখন তারা বারবার স্মরণ করেন সাধারণ মানুষের অবদানের কথা। তাদের সাহায্য-সহযোগিতা, ঝুঁকি নিয়ে তথ্য জোগান দেওয়া, অস্ত্র বহন, সীমান্ত পার করিয়ে দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক অত্যাচারের শিকার হওয়া সব কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের এই সাক্ষ্য প্রমাণ করে মুক্তিযুদ্ধকে গণযুদ্ধ হিসেবে অভিধা দেওয়ার সার্থকতা। সাধারণ মানুষ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা উভয়ের বীরত্বে মুক্ত হয়েছিল এই দেশটি।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বর্ণনায় প্রকাশিত এমন দু-একটি উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হবে বিষয়টি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন তাদের আধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর, তখন তাদের বিরুদ্ধে অসীম সাহসে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের পুলিশ সদস্যরা। তাদেরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কনস্টেবল মো. আবু শামা। তিনি তখন সারদা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে রাজারবাগে এসেছেন। পশ্চিম পাকিস্তানি পুলিশদের হাবভাবে তারা বুঝে ফেলেছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন দু-এক দিনের মধ্যে আক্রমণ আসবে। তারা সেই অনুযায়ী প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছিলেন। সেনাবাহিনী আসার খবর পেয়েই তারা অস্ত্র তুলে নেন এবং প্রতিরোধ করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীদের ভারী অস্ত্রের সঙ্গে তারা পেরে ওঠেননি। তাদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। বাকিদের ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় অত্যাচার। আবু শামা বলেন, তাদের ক্যানটিনবয় মৃত্যুমুখে পানি পানি বলে চিৎকার করলে এক পাকিস্তানি সেনা প্যান্টের জিপার খুলে প্রস্রাব করে দেয়।
আবু শামাসহ কয়েকজনকে অত্যাচার শেষে মিল ব্যারাকে রিপোর্ট করার কথা বলা হলেও তারা পালিয়ে যান। সে সময় রাজধানীর গেন্ডারিয়ার কিছু মানুষ তাদের অবস্থা দেখে আশ্রয় দেন, সেবা করেন ও ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দেন। অন্যরা ব্যবস্থা করেন খাবারের। পুলিশের পোশাকে তাদের চিনে ফেলবে বলে তারা পরিধান করেন সাধারণ পোশাক। তার জোগানও দেন গে-ারিয়াবাসী। এরপর চার-পাঁচ দিন হেঁটে হেঁটে গ্রামের বাড়িতে ফেরেন। এই দিনগুলোতেও পেয়েছেন সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সহযোগিতা। তার বাবাও একজন মানুষের ছোট্ট একটি কথায় জীবন ফিরে পান। ছেলের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কথা শুনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তার বাবাকে ধরে এবং অত্যাচার করে কথা বের করার চেষ্টা করে। গ্রামের একজন মানুষই চিনিয়ে দিয়েছিল তাদের বাড়ি ও তার বাবাকে। কিন্তু আরেকজন ব্যক্তি একসময় তার বাবার নাম জিজ্ঞেস করেন এবং বলেন, ‘কালেমা জানতা হে?’ যখন তার বাবা কালেমা পড়লেন, তখন তাকে ছেড়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর আবু শামা তার বাবার কাছে তাকে ধরিয়ে দেওয়া বিশ্বাসঘাতকের পরিচয় জানতে চাইলেও তা তিনি বলেননি, তিনি শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন, যিনি তাকে মুক্তি পেতে সাহায্য করেছিলেন তার প্রতি। এই ক্ষমা কোনো সাধারণ মানুষ করতে পারেন না। একজন বীরযোদ্ধাই পারেন এমন বলিষ্ঠ মনোভাব প্রকাশ করতে। এটিও কম বীরত্বের বিষয় নয়। ‘বীরত্বে একাত্তর’ বইয়ের পাতায় পাতায় এমন বীরত্বের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের বর্ণনায়। ফলে বইটি হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের এক প্রামাণ্য ইতিহাস। বইটি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরবে বাঙালির বীরত্বের কাহিনি।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে দেশ রূপান্তরে , প্রকাশকাল: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.