শিশু ধর্ষণ: আপনার ছেলেটির কথাও ভাবুন

ছেলে শিশু ধর্ষণ ও মাদ্রাসায় ঘটা ওই ঘটনাকে সচেতনভাবেই কি আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি?
শিশুর ওপর যৌন হিংস্রতা দেখল গোটা দেশ। রাজধানীর পল্লবীতে ঘটে গেলো পৈশাচিক এক ঘটনা। আট বছর বয়সী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হল। পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী সোহেল এই অপরাধের কথা স্বীকারও করল।
কোন দেশ কতটা সভ্য তার অন্যতম মাপকাঠি হল ওই দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা কতটা কম। সেখানে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে শিশু ধর্ষণের যেসব খবর সাম্প্রতিক সময়ে উঠে আসছে, তা সত্যি ভয়াবহ।
শিশুরাও কেন এমন নির্মমতায় আক্রান্ত হচ্ছে, কোন যুগের দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা–এসব প্রশ্ন এখন মুখে মুখে।
রামিসা হত্যায় ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা দেশ। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও বৃহস্পতিবার ছুটে গেছেন তার পরিবারের কাছে। বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিবারটির নিরাপত্তা ও রামিসার বড় বোনের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি।
তাৎক্ষণিকভাবে এগুলো অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এমন ঘটনা নাগরিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই সময়ে আরেকটি শিশু মৃত্যুর নির্মম ঘটনা ঘটেছে। আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া সেই মাদ্রাসা ছাত্রও ধর্ষণের শিকার হয়েছিল অভিযোগ করে মামলা করেছে পরিবার। তবে ওই ঘটনা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় ততটা আলোচনা নেই।
কী সেই ঘটনা?
রাজধারীর বনশ্রী সি ব্লকে ‘আলোকিত কুরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদরাসায় ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় শিশুটির পায়ুপথে অস্বাভাবিক যৌনাচার বা ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় শিহাব হোসেন নামে ২০ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তা করা হয়। এই শিহাব এর আগেও ওই মাদ্রাসায় আরও চারজন ছাত্রকে যৌন নিপীড়ন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ধর্ষণের এ অভিযোগটি কেন ততটা আলোচিত হলো না? প্রতিবাদ জানাতে কেন কেউ রাস্তায় নামলেন না? প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা সরকারের কর্তাব্যক্তিরা কেউ তার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন–এমন খবরও তো নেই আমাদের কাছে।
তাহলে ছেলে শিশু ধর্ষণ ও মাদ্রাসায় ঘটা এই ঘটনাকে সচেতনভাবেই কি আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি? যদি তাই হয়, তাহলে এই দেশটাকে সত্যিকারভাবে প্রত্যেক শিশুর বাসযোগ্য করে গড়ে তোলা কীভাবে সম্ভব হবে!
দেশে প্রতিদিনই একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। তাতে বাবা-মায়েদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। ধর্ষণের পর শিশুকে মেরে ফেলার মতো পাশবিকতা কীভাবে মেনে নিচ্ছি আমরা?
এ পরিস্থিতিতে মেয়েশিশুদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে একই অপরাধের বিষয়েও আমাদের সোচ্চার হওয়াটা জরুরি। কেননা বছরজুড়েই এমন ঘটনা ঘটছে, কিন্তু সেসব খুব একটা সামনে আসছে না।
নিজের দেখা কয়েক বছর আগের একটি ঘটনার কথা বলছি। ঢাকা মহানগরের কাফরুলে বসবাস করেন এক বন্ধু। সফল ব্যবসায়ী। তার সারা দিন কাটে ব্যস্ততায়। একমাত্র ছেলেকে তেমন সময় দিতে পারেন না। কিন্তু সন্তানের লেখাপড়ার বিষয়ে এতটুকু ঘাটতি রাখতেও রাজি নন।
ছেলের বয়স ছয় পেরোলে ব্যবস্থা হয় আরবি শিক্ষার। বাসায় পড়ানোর জন্য রাখা হয় স্থানীয় স্কুলের এক আরবি শিক্ষককে। তার নাম তাজুল ইসলাম।
প্রতিদিন দুপুরে এক-দুই ঘণ্টার জন্য পড়াতে আসেন তিনি। নিরিবিলি একটি কক্ষে চলে আরবি পড়া। কিন্তু মাসখানিক যেতেই বেঁকে বসে বন্ধুর ছেলে। কিছু না বলেই বাবা-মাকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে সে। বলে, ‘এ হুজুর ভালো না, উনার কাছে পড়ব না।’
তার কথায় গুরুত্ব দেননি বাবা-মা। বরং সন্তানকে অবিশ্বাস করতে শুরু করন। তারা ধরে নেন, আরবি না পড়ার জন্যই হুজুর সম্পর্কে খারাপ ধারণা দিচ্ছে তাদের ছেলে।
দোতলা বাড়ির বারান্দায় পার্টিশন দেওয়া একটি কক্ষে চলত শিশুটির আরবি পড়া। হুজুর যখন আসতেন, তখন নীরবতার স্বার্থে রুমের দরজা ভিড়িয়ে দেওয়া হতো।
এভাবে চলে বছরখানেক। দিনে দিনে ছেলেটি শারীরিকভাবে রোগাপাতলা হতে থাকে। খাওয়া-দাওয়া যায় কমে। চোখের কোণে জমে কালো দাগ। সন্তানের কষ্টের কথা অজানাই থেকে যায় মা-বাবার কাছে।
কিন্তু এক দুপুরে সত্যটি উন্মোচিত হয়। প্রতিদিনের মতো ওই দিন পড়াতে আসেন শিক্ষক। মিনিট পনেরো পড়ানোর পর ছেলেটি চিৎকার দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। সন্তানের চিৎকারে ছুটে আসেন মা। পরিস্থিতি ঠাহর করতে পেরে পালিয়ে যান ওই আরবি শিক্ষক।
ছেলেটি তখন পায়ুপথের প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছে। এক বছর ধরে এভাবেই তাকে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন করে গেছেন ওই আরবি শিক্ষক।
শুধু তা-ই নয়, কারও কাছে মুখ না খুললে ‘গুনাহ হবে’, আল্লাহ তোমাকে শাস্তি দেবে’–এমন কথা বলে নানাভাবে ভয়ও দেখাতেন। ছেলেটির কাছে একেকটি দুপুর ছিল একেকটি অভিশাপ। মায়ের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে ওই দিন সব কথা বলে দেয় সে।
ঘটনার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় যুবকরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ধরে আনে আরবি শিক্ষক তাজুলকে। দণ্ডবিধি ৩৭৭ ধারায় মামলা করে শিশুটির পরিবার। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তাজুল স্বীকার করে নেন তার অপকর্মের কথা।
আরবি শিক্ষকের ওই যৌন নির্যাতনে শিশুটি মানসিক ট্রমার মধ্যে পড়ে। দীর্ঘ সময় পরও সেখান থেকে সে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।
ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার হওয়ার এমন ঘটনা প্রায়ই আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখছি। কিন্তু লোকলজ্জা আর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ভয়ে ছেলেশিশু ও তার পরিবারের কষ্টের চাপা কান্নার খবরগুলো বেশিরভাগ সময় অপ্রকাশিতই থেকে যায়।
আবার, ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টিকে আমরা প্রায় বিবেচনার মধ্যেই রাখছি না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা পরিবারে মেয়েশিশুটির করণীয় বিষয়ে কিছুটা ধারণা দেওয়া হলেও ছেলেশিশুটি কীভাবে ধর্ষণকারী বা যৌন নির্যাতনকারীর হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে, সে বিষয়ে কোনো ধারণা তারা পায় না। ফলে নিরাপদ থাকছে না আমাদের ছেলেশিশুরাও।
ছেলেশিশু ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে কোন আইনে বিচার হবে–সে বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা নেই অনেকের। একসময় এ অপরাধ স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা হতো। তখন উপযুক্ত বিচার থেকে বঞ্চিত হতো ভুক্তভোগীরা।
ছেলেশিশু ধর্ষণের শিকার হলে আগে দণ্ডবিধি ৩৭৭ ধারায় মামলা হতো। কিন্তু বর্তমানে শিশু ছেলে বা মেয়ে হোক, ধর্ষণের মামলার বিচার হবে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুযায়ী। এর সব কটি ধাপ মেয়েশিশু ধর্ষণের মামলার মতোই। সচেতনতার জন্য আইনের এ বিষয়টির আরও বেশি প্রচার করা প্রয়োজন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষণকে ধর্ষণই বলতে হবে, সেটা মেয়ের ক্ষেত্রে হোক, অথবা ছেলে। ‘বলাৎকার’ বা অন্য কোনো প্রতিশব্দ এ ধরনের অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তাছাড়া সচেতনভাবেই আমরা ছেলেশিশুর যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিই না। ফলে ছেলেশিশুর সুরক্ষার জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রমও তেমন নেই, যা সরকারিভাবেই হাতে নেওয়া দরকার।
শিশু ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা অতিদ্রুত নিশ্চিত করে তা কার্যকরের দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়। বরং বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনের নানা ফাঁকফোকর দিয়ে নিশ্চিত জীবনে ফিরে এসেছে অনেক আসামি।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কারণেও শিশু ধর্ষণের মত অপরাধ ক্রমেই বাড়ছে। আমরা চাই রাষ্ট্র ধর্ষণের মত অপরাধের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স দেখাক।
ছেলে বা মেয়েশিশুদের ধর্ষক আসলে কারা?
আপনার আমার মত সম্পর্কের মুখোশ পরা কোনো পরিচিতজন। কখনো সে পরিচিত ভাই, কখনো কাকা, কখনো নানা-দাদা-চাচা কিংবা ওঁৎ পেতে থাকা যে কোনো মানুষ। যার বা যাদের কাছে আমাদের শিশুটি খুব সহজভাবেই যেতে পারে।
আপনার ও আমার সম্পর্কের মধ্যেই ঘাপটি মেরে বসে আছে কোনো ধর্ষক, যাদের আমরা ঘটনা ঘটার আগে সহজে চিহ্নিত করতে পারি না। যখন তার পৈশাচিক রূপটি উন্মোচিত হয়, তার আগেই আমাদের শিশুটি ক্ষতবিক্ষত হয় শারীরিক ও মানসিকভাবে।
এসব গুপ্ত ও বিকৃত মানসিকতার মানুষের থাবা থেকে শিশুকে রক্ষা করতে পরিবারের ভেতর থেকেই শুরু করতে হবে সচেতনতা। পরিবর্তন করতে হবে নারী ও পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি।
ছেলে বা মেয়েশিশুটিকে বিশ্বাস করুন, তার কথাকে গুরুত্ব দিন, আত্মরক্ষার কৌশলটি তাকে শেখান।
ছেলে বলে ধর্ষণের শিকার হবে না–এমন ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। শিশুর কাছে পরিবার যেন সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা হয়েই থাকে। তার সেই আস্থা যেন অপনার আমার অবিশ্বাস আর অবহেলায় নষ্ট হতে না পরে।
এ দায়িত্ব নিতে হবে আমাদের সবাইকেই। আর রাষ্ট্রকে শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি রাখতে হবে সবার ওপরে।
মেয়েশিশু বা ছেলেশিশু নয়, সব শিশুর জন্যই নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে হবে আমাদের।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ২২ মে ২০২৬
© 2026, https:.




