আদিবাসী ভাষার বিপন্নতা

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি চলছে। মাতৃভাষা বাংলার জন্য এ মাসেই প্রাণ দিয়েছেন বাঙালি বীর সন্তানরা। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য লড়াইয়ের এটিই একমাত্র ঘটনা। আমরা সেই জাতি, যারা মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত দিয়েছি। এই ইতিহাস বাঙালি সংস্কৃতি, ইতিহাস, জীবনধারা ও আত্মপরিচয়কেই তুলে ধরে।
কিন্তু ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া শহীদদের এদেশে রক্ষা পাচ্ছে কি অন্য জাতির মাতৃভাষাগুলো? অন্য জাতির শিশুরা কি পড়ছে তাদের মায়ের ভাষায়? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই লেখার অবতারণা।

বাংলাদেশে আদিবাসী ভাষাগুলোর মধ্যে প্রায় ১৪টি ভাষাই আজ বিলুপ্তির পথে। বান্দরবানে বসবাসরত ম্রো আদিবাসীদের মধ্যে মাত্র দুই নারী ও চারজন পুরুষ ‘রেংমিটচা’ ভাষায় কথা বলেন। তাদের মৃত্যুর পর এ ভাষাটি যেন হারিয়ে না যায় সে কারণে কয়েক বছর আগে রেংমিটচা ভাষার একটি ‘শব্দের বই’ প্রকাশ করেছেন ম্রো-ভাষার লেখক ও গবেষক ইয়াংঙান ম্রো। কিন্তু এই ভাষাটি রক্ষায় কোনো সরকারি উদ্যোগের খবর এখনও আমরা পাইনি।
বাংলা ভাষার নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায় বাংলার অন্যান্য আদিবাসীদের ভাষা থেকে বহু শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাংলা ভাষায়। সাঁওতালি ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রয়েছে। পণ্ডিতেরা মনে করেন, সাঁওতালি ভাষা বাংলা ভাষার ব্যাকরণে প্রভাব বিস্তার করেছে। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত দেশি শব্দগুলো অনেকই প্রধানত সাঁওতালি ও মুণ্ডা ভাষা থেকে আসা। অথচ আজ হারিয়ে যাচ্ছে আদিবাসী জাতির সে ভাষাগুলোও। এরই মধ্যে কোচ ও রাজবংশীদের ভাষা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। প্রায় পুরো বিলুপ্ত হয়ে গেছে আদিবাসীদের ‘কুড়ুখ’ ও ‘নাগরি’ ভাষা। আসলে ভাষা যেমন একটি সতত প্রবহমান বিষয় তেমনি একই অঞ্চলের নানান গোষ্ঠীগুলোও পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের আদিবাসীদের অনেক ভাষাও তেমনি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এদের মধ্যে কয়েকটি ভাষা পরস্পর এতটা ঘনিষ্ঠ যে এগুলোকে ‘উপ-ভাষিক’ বৈচিত্র্য বলা যায়। যেমন ‘তঞ্চঙ্গা’ মূলত ‘চাকমা’ ভাষারই অংশ, ‘রাখাইন’ মারমা ভাষার, ‘লালং’ বা ‘পাত্র’ গারো ভাষার এবং ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’ মণিপুরি ভাষার এবং ‘হাজং’ ভাষাকে বাংলা ভাষার উপভাষা হিসেবে অভিহিত করা যায়।
বাংলাদেশে অস্ট্রো-এশিয়াটিক, তিব্বতি-চীন, দ্রাবিড় ও ইন্দো-ইউরোপীয় সব ভাষাগোষ্ঠীর ভাষাই রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগুলো দুটি শাখায় বিভক্ত। এগুলো হচ্ছে মোন-খমের ও মুণ্ডারি শাখা। বাংলাদেশে এই শাখার ভাষার মধ্যে উল্লেখযোগ্য খাসি ভাষা। এ ভাষার কোনো বর্ণমালা নেই। তবে বর্তমানে এ ভাষা রোমান হরফে লেখা হয়।
তিব্বতি-চীনা ভাষাগোষ্ঠী আবার কয়েকটি শাখায় বিভক্ত। যেমন– বোডো, কুকি-চিন, সাক-লুইশ ও লোলো-বার্মিজ শাখা। মান্দি বা গারো, ককবোরক (ত্রিপুরা), লিঙ্গাম, পাত্র বা লালং, কোচ, রাজবংশী প্রভৃতি ভাষা বোডো শাখার অন্তর্ভুক্ত। মৈতেয় বা মণিপুরি, লুসাই, বম, খেয়াং, খুমি, ম্রো, পাংখো প্রভৃতি ভাষা কুকি-চিন শাখাভুক্ত।
বাংলাদেশের রাখাইন, ওঁরাওদের কুড়ুখ, পাহাড়িকা ও মাহালি ভাষা দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। রাখাইন ভাষা অত্যন্ত প্রাচীন ও সমৃদ্ধ একটি ভাষা। রাখাইন ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। ওঁরাওদের কুড়ুখ ভাষাটি আদি ও কথ্য ভাষা। আর বাংলাদেশে ইন্দো-আর্য পরিবারভুক্ত ভাষার মধ্যে বাংলা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া এই পরিবারে আদিবাসীদের মধ্যে চাকমা ভাষা এবং সাদরি ভাষাও রয়েছে। মণিপুরিদের বিষ্ণুপ্রিয়া, হাজং প্রভৃতি ভাষাও এই শ্রেণিভুক্ত। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে প্রতি দুই সপ্তাহে হারিয়ে যাচ্ছে একটি ভাষা। বিলুপ্তপ্রায় ভাষা রক্ষায় গুরুত্বারোপ করেছে ইউনেস্কো। এজন্য ২০১৯ সালকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী মাতৃভাষাবর্ষ’ ঘোষণার পর ‘২০২২-২০৩২’ সালকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী মাতৃভাষা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো। সেটি পালনে সরকারি উদ্যোগগুলোর গতি তেমন নেই বললেই চলে।

বিলুপ্তপ্রায় ভাষা সংরক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন-২০১০’ প্রণয়ন করে। কিন্তু ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট’ দেশের আদিবাসী ভাষাগুলোর যে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা জরিপ শুরু করেছিল, তা এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এ দেশে কয়টি আদিবাসী জাতি আছে, তাদের ভাষার সংখ্যা কত–এসব ভাষার অবস্থাই বা কেমন, তা সুরক্ষায় সরকারি উদ্যোগের খবরও আমরা পাইনি।
ভাষা রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ তেমন না হলেও আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের বিষয়ে কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ রয়েছে। সরকার সব শিশুর মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে প্রথম দফায় পাঁচটি মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী শিশুদের পড়াশোনা শুরুর উদ্যোগ গ্রহণ করে ২০১২ সালে। এর জন্য প্রথমে জাতীয় পর্যায়ে তিনটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রথম দফায় পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এবং সমতলের সাদরি ও গারো এই পাঁচটি ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার উদ্যোগ চূড়ান্ত হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ে ম্রো, মণিপুরি, তঞ্চঙ্গ্যা, খাসি, বমসহ ছয়টি ভাষায় এবং তৃতীয় পর্যায়ে কোচ, ওঁরাও (কুড়ুখ), হাজং, রাখাইন, খুমি ও খ্যাং ভাষার পর অন্যান্য ভাষাতেও প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হবে। সে অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ের ৫টি ভাষায় ২০১৪ সালের জানুয়ারিতেই প্রাক-প্রাথমিকে আদিবাসী শিশুদের হাতে নিজ নিজ ভাষার বই তুলে দেওয়ার কথা থাকলেও সেটি সম্ভব হয় ২০১৭ সালে।
অন্যান্যবারের মতো এ বছরও ওই পাঁচটি মাতৃভাষায় পাঠদানের বই বিতরণ করা হয়। তা শুধু প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। চাকমা ও মারমাদের নিজস্ব হরফে বইগুলো লেখা হলেও বাকি জাতির বইগুলো লেখা হয়েছে বাংলা, ইংরেজি ও রোমান হরফে। ভাষা রক্ষায় সেটিও ভালো উদ্যোগ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
আদিবাসী ভাষাগুলো কতটা বিপন্ন এ নিয়ে কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিকস’-এর বাংলাদেশ শাখা প্রায় ৩০টি আদিবাসী ভাষার ওপর একটি জরিপ চালায়। জরিপ চলে ‘ফিশম্যান মানদণ্ড’ অনুসারে। একটি ভাষার অবস্থা কী, সেটি বোঝাতে এই মানদণ্ডের রয়েছে আটটি স্তর। কোনো ভাষা চতুর্থ স্তরের পরের স্তরে চলে গেলেই ওই ভাষা বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওই মানদণ্ডের প্রথম স্তরের বিবেচনার বিষয় ছিল, ভাষাটি ঊর্ধ্বতন সরকারি পর্যায়ে ব্যবহৃত হয় কিনা। বিপন্নতার শুরু যে পঞ্চম স্তরে, সেখানে বিচার্য বিষয়–ভাষাটির মাধ্যমে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তৃতি এবং ওই ভাষায় সাহিত্য রয়েছে কিনা। বাস্তবতা হলো এই মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় সব আদিবাসী মাতৃভাষাই আছে বিপন্নে স্তরে।
নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা ছাড়া শিক্ষা বা কোনো কাজেই নিজ ভাষা ব্যবহার করতে পারে না আদিবাসীরা। আবার এসব ভাষায় বাংলা ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটেছে প্রবলভাবে। বয়সে প্রবীণ আদিবাসীরা নিজ ভাষায় কথা বলতে পারলেও নতুন প্রজন্ম তাদের ভাষাটির কোনো ব্যবহারই জানে না।
দেশের সবচেয়ে বড় আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী চাকমাদের ভাষায় সাহিত্য রয়েছে। কিন্তু ওই সাহিত্য খুব কম লোকের কাছেই পৌঁছে। জরিপে অংশ নেওয়া চাকমাদের পঞ্চাশ শতাংশ বলেছে, তারা নিজ ভাষার নানা উপকরণ পড়েছে; কিন্তু সেগুলো তাদের কঠিন মনে হয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ বলেছে, শুধু প্রার্থনার সময় তারা মাতৃভাষা ব্যবহার করে। জরিপটিতে দেখা যায়, আদিবাসীরা প্রয়োজনীয়তার চাপে পড়ে নিজ মাতৃভাষা থেকে এখন বাংলাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। তবে এর প্রভাব সমতলের আদিবাসীদের মধ্যেই বেশি। সাঁওতালদের ৪৯ শতাংশই মনে করে, নিজ মাতৃভাষার চেয়ে আজ বাংলাই বেশি প্রয়োজনীয়। ভাষা রক্ষায় আদিবাসী পরিবারগুলোকে মাতৃভাষার চর্চা অব্যাহত রাখা জরুরি। এ ছাড়াও প্রয়োজন অতিদ্রুত আদিবাসীদের ভাষাগুলো সুরক্ষার পাশাপাশি আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদান পুরোপুরি নিশ্চিত করা, আদিবাসী এলাকায় বিদ্যালয় স্থাপন এবং সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ। এজন্য সত্যিকার আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকেই। তবেই ভাষার এ দেশে রক্ষা পাবে সব জাতির মাতৃভাষা। তা না হলে একটি প্রশ্ন উঠবেই–বাংলার আধিপত্যে কি হারিয়ে যাবে আদিবাসী ভাষা?
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে সমকালে, প্রকাশকাল: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
© 2026, https:.




