এক সাগর রক্ত আসলে কতটুকু

সুলতানা রাজিয়া
একটি স্বাধীন দেশ আমরা পেয়েছি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। গীতিকার ও সুরকার আব্দুল লতিফ লিখেছিলেন, দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা/ কারও দানে পাওয়া নয়,/ দাম দিছি প্রাণ লক্ষ কোটি/ জানা আছে জগৎময়,…।
সেই দামটা কী? রক্ত, জীবন। সেই রক্ত কতটুকু? তার পরিমাণ শুনলে গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসে। সে কথা মুখে বর্ণনা করা যায় না। যা সরল গদ্যে বলা যায় না, গানের মাধ্যমে গীতিকাররা বলার চেষ্টা করেছেন।
খান আতাউর রহমান লিখেছেন, এক নদী রক্ত অতিক্রম করে আমরা এই স্বাধীন দেশ পেয়েছি (এক নদী রক্ত পেরিয়ে/বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা/ তোমাদের এই ঋণ কোনো দিন শোধ হবে না।/না না না শোধ হবে না।)
গোবিন্দ হালদার লিখেছেন, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি আমরা এই স্বাধীন দেশ (এক সাগর রক্তের বিনিময়ে/ বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা/ আমরা তোমাদের ভুলব না/ আমরা তোমাদের ভুলব না)। কিন্তু কতটুকু রক্তে এক নদী রক্ত বা এক সাগর রক্ত হয়? মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার ইতিহাস জানলে, পড়লে বোঝা যায় কবি, গীতিকারদের এই লেখা একদম অতিশোয়োক্তি নয়।
’৭১-এর ৯ মাসে গ্রামের পর গ্রাম মানুষশূন্য হয়ে গেছে পাকিস্তানি সেনাদের বন্দুক থেকে ছোড়া গুলিতে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরেও যদি কেউ যেন বেঁচে না যায় ভাগ্যক্রমে সে জন্য তারা গুলি করে লাশ স্তূপ করে পেট্রোল ধরিয়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। তারপরও, রাখে আল্লাহ, মারে কে! সেই ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা থেকেও কেউ কেউ বেঁচে ফিরেছেন। তাদের মুখ থেকেই জানা যায় সে সব বর্বরতার সত্য কাহিনি। একেকটি কাহিনি একেকটি মহাকাব্য, হাজার মানুষের মর্সিয়া। সে সব ঘটনা মনে করাও অনেকের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। তবু তারা হৃদয় খুঁড়ে সেই অহর্নিশ বেদনা তুলে আনেন, লেখক-গবেষক-সাংবাদিকদের বলেন, শুধু ইতিহাসটি লিপিবদ্ধ করতে। ’৭১-এর তেমন আটটি গণহত্যার হৃদয়বিদারক ইতিহাস তুলে ধরেছেন লেখক-গবেষক সালেক খোকন তার ‘গৌরব ও বেদনার একাত্তর’ বইতে। এ ছাড়াও বইটিতে সন্নিবেশিত হয়েছে দশজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বের ইতিহাস।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন অতর্কিতে বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তখন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের পুলিশ সদস্যরা। ফলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ভীষণ আক্রোশ ছিল এই পুলিশ বাহিনীর ওপর। পুলিশ সদস্যদের ওপর প্রতিশোধ নিতেই তারা ১৩ এপ্রিল সারদা পুলিশ একাডেমিতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। তাদের সন্দেহ ছিল সারদা একাডেমির পুলিশরা হয়তো গ্রামবাসীদের মধ্যে মিশে আছে। সে জন্য তারা গ্রামবাসী পুরুষদের এক জায়গায় জড়ো করে। কেউ যেন গুলির আওতার বাইরে না থাকে সে জন্য পাকিস্তানি সেনারা তাদের ঘিরে দাঁড়ায়। এরপর দায়িত্বরত ক্যাপ্টেন তাদের গুলি করে মারে। একজন একজন করে মারতে যখন সময় বেশি লাগছিল তখন মেশিনগান ব্যবহার করে সবার ওপর একাধারে বিশ-পঁচিশ মিনিট ধরে গুলি চালায়। সবাই মরে গেছে তা নিশ্চিত হতে না পারায়, এবার তারা লাশগুলো স্তূপ করে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। যারা আহত ছিল তারাও পুড়ে মারা যায় সেই আগুনে। সেদিন রাজশাহীর চারঘাট থানাপাড়ায় এক থেকে দেড় হাজার মানুষ মারা যায়।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর ২৩ বছরের শাসনামলে এ দেশের মানুষ বুঝে গিয়েছিল যে, তারা নিজভূমে পরবাসী হয়ে আছে। পশ্চিম পাকিস্তানের মদদপুষ্ট গোষ্ঠীর কারণে প্রতিনিয়ত অত্যাচারিত হতে হয়েছে মানুষকে। সেসব দিনের কথাই বইটির ‘শরণার্থী ক্যাম্পের বেদনার গদ্য উঠে আসেনি ইতিহাসে’ শিরোনামের লেখাটায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সামাদের জবানিতে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার একটি ঘটনায় তুলে ধরেছেন, নিজেদের একটি স্বাধীন দেশের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কী অধীর হয়ে গিয়েছিলেন। একটি অপারেশনে তার সহযোদ্ধা ছিলেন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রফিকুল্লাহ। তিনি গুলিতে আহত হন। সেই মুহূর্তেও তিনি চিৎকার করে উঠেছিলেন, ‘ওদের আপনারা ছেড়ে দিয়েন না। আক্রমণ করেন। ওদেরও গুলি করে মারেন ভাই।’ নিজের অন্তিম মুহূর্তেও একজন যোদ্ধা শুধুই দেশ স্বাধীনের কথা ভেবেছেন। ১৯৭১ সালে মানুষ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে আর পরাধীন বাংলাদেশের মাটিতে মারা যায়নি, মারা গিয়েছে শরণার্থী শিবিরেও। মো. আব্দুস সামাদ সেদিনের ভয়াবহতার কথা জানিয়েছেন এভাবে, … সেখানে দেখেছি কলেরা, ডায়রিয়া ও ছোঁয়াচে রোগে মানুষ মারা গেছে শত শত। লালমনিরহাটের এক পরিবারের দশ জনের মধ্যে ফিরে এসেছেন মাত্র দুজন। … শরণার্থী ক্যাম্পের ওই মানুষগুলোর কথাও স্মরণকরতে হবে ভাই।’
গণহত্যার শিকার হওয়া পরিবারের সদস্য কিংবা মুক্তিযোদ্ধা, সবার সাক্ষ্যই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য ইতিহাস। চোখের জলে ইতিহাস বর্ণনা করা এই মুক্তিযোদ্ধা ও গণহত্যার শিকার হওয়া পরিবারের সদস্যরা বারবার দাবি জানিয়েছেন, শহীদদের তালিকা করার এবং তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির। কিন্তু তাদের দাবির বাস্তবায়ন হয়নি স্বাধীনতার অর্ধশতক পরেও। লেখক-গবেষকদের কাছেই তারা নিজেদের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুলে দিয়েছেন যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম জানতে পারে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। বইটি তাদের সেই কথিত ইতিহাসই বহন করছে। বইটি পড়লে তোমরা জানতে পারবে, এক নদী রক্ত বা এক সাগর আসলে কতটুকু রক্ত।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে দেশ রূপান্তরে, প্রকাশকাল: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.