মুক্তিযুদ্ধ

তিনো খতম হো গয়ে, লাথি মেরে বলেছিল পাকিস্তানি সেনা

পাহাড় থেকে নেমে দৌড়ে ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর উঠলাম। পেছনে পাকিস্তানি সেনাদের ছুটে আসার বুটের শব্দ পাই।

পঁচিশে মার্চ, ১৯৭১। ঘড়িতে তখন রাত দশটা। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে এক জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসলেন পাকিস্তানি অধিনায়ক ইয়াকুব মালেক। তার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো এক ভয়াবহ নির্দেশ। তিনি বললেন, “পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান, দুই জায়গায়ই কারফিউ জারি করা হয়েছে। ভুট্টো ও মুজিব দুজনকেই অ্যারেস্ট করা হচ্ছে। তোমরা এখনই কুমিল্লা শহরে যাও। সেখানে যাদের বাইরে দেখবে তাদেরকেই গুলি করবে। কুমিল্লা শহর যেন লাশে ভরপুর হয়ে যায়। তা হলে আগামীকালই দেশটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।”

একাত্তরের সেই কালরাতের বিভীষিকা এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভেতরের নানা ঘটনা এভাবেই তুলে ধরেন বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ইমাম উজ-জামান। সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার উজানঢাকি গ্রামের এই সন্তান বাঙালির অবস্থান শক্ত করতেই ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন।

পাকিস্তানি প্রায় ২২ জন অফিসার যখন অস্ত্র ও ফোর্স নিয়ে হত্যাযজ্ঞের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল, তখনকার পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে ইমাম উজ-জামান বলেন, “অধিনায়ক তখন আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা পাশের রুমে গিয়ে বসো। বাঙালি বলে তোমাদেরকে এসব দায়িত্ব দিতে চাই না। তোমরা অফিসে অভ্যন্তরীণ দায়িত্ব পালন করবে।”

সেদিন রাতেই রচিত হয়েছিল এক ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। চারজন বাঙালি অফিসারকে একটি রুমে আটকে রাখা হয়, যার মধ্যে ছিলেন বাঙালি ক্যাপ্টেন জামানও। নিজ দেশের মানুষের সঙ্গে বেইমানি করার জন্য তিনি ছিলেন ব্যগ্র। ইমাম উজ-জামান সেই মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করেন এভাবে, “জামান বারবার অধিনায়কের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করছিলেন। একপর্যায়ে তিনি অধিনায়ককে বলেন, স্যার, আমাকে বিশ্বাস করেন। এই এলাকার আওয়ামী লীগের লিডাররা কোন কোন জায়গায় লুকিয়ে আছে, কোন কোন জায়গায় হিন্দু লোকজন আছে, আমি আপনাদেরকে সঠিক গাইডেন্স দিয়ে নিয়ে যেতে পারব।”

তার কথায় আশ্বস্ত হন অধিনায়ক। পরবর্তীতে এই ক্যাপ্টেন জামান পুরো নয় মাস পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে বাঙালি নিধনে অংশ নেন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি পাকিস্তানে পাড়ি জমান এবং সেখানে ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদা পর্যন্ত পান। মুক্তিযোদ্ধা ইমাম উজ-জামান যুদ্ধকালীন সময়েই লেফটেন্যান্ট হন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মেজর জেনারেল হিসেবে অবসরে যান।

২৫ মার্চ আটকের পর ক্যান্টনমেন্টে তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল? সেই লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বর্ণনায় তিনি বলেন, “২৫ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত আমাদেরকে বন্দী করেই রাখা হয়। ভেবেছিলাম ওরা আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি করে দিবে। কিন্তু আটক করে মেরে ফেলবে, এটা ভাবিনি। ৩০ মার্চ বিকেল ৪টার দিকে হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হয়। ওরা বাঙালি সেনা সদস্যদের মারছিল। কোটবাড়িতে যে বাঙালি ইউনিট ছিল ওইদিকে কামানের গোলা বর্ষণ করে। ওরা চায়নি কোনো বাঙালি বেঁচে থাকুক।”

বিকেলের দিকে এক পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন অস্ত্র হাতে বন্দি ডিসি ও এসপির রুমের দিকে এগিয়ে যায়। ঠিক তখনই দুটি গুলির শব্দ। ইমাম উজ-জামান বলেন, “ক্যাপ্টেন নুরুল ইসলাম তখন আমার হাত টিপে বললেন, ডিসি এসপি মাস্ট হ্যাভ বিন কিলড। বুঝলাম আমাদেরকেও ওরা মারবে! এমন সময় সুবেদার ফয়েজ সুলতান স্টেনগান নিয়ে দরজার কাছে এসে কাচ ভেঙে বন্দুকের ব্যারেলটা ঢোকাল। ক্যাপ্টেন নুরুল ইসলাম হাত জোড় করে প্রাণভিক্ষা চাইলেন। কিন্তু পাষাণ মন গলল না। আমি দৌড়ে দেওয়ালের পাশে গিয়ে দাঁড়াই। নুরুল ইসলাম ও সিদ্দিকীকে তৎক্ষণাৎ গুলি করে সে। তারা মেঝেতে পড়ে যায়। মৃত্যু তখন খুব কাছে। বাঁচার জন্য খাটের নিচে আশ্রয় নিলেন তিনি। কিন্তু সুবেদার চাবি দিয়ে দরজা খুলে ব্রাশফায়ার করল। তিনটি গুলি লেগেছিল আমার। পিঠের ওপর গরম পানি পড়লে যেমন গরম লাগে, তেমনটা অনুভব করলাম। বুঝলাম একটা গুলি পিঠ দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে গেছে। আরও একটি গুলি ডান হাতের কবজিতে এবং আরেকটি ডান চোখের পাশের হাড় ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল।”

রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝের ওপর পড়ে রইলেন তিনি। বাঁচার একমাত্র উপায় তখন মৃতের ভান করা। সেই রোমহর্ষক মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে আজও শিউরে ওঠেন তিনি। বলেন, “আমি মরার ভান করে পড়ে থাকি। কেউ একজন এসে বলে, এ লোককে চেক করো। পায়ের মধ্যে লাথি মেরে একজন বলল, তিনো খতম হো গিয়া। এরপর আরেকজন আসে। গলার আওয়াজে বুঝতে পারি তিনি ব্রিগেডি মেজর সুলতান। বললেন, কর্নেল ইয়াকুব মালেক এ দ্যাখা হ্যা। বাস চলো সারা বাঙালি খতম হো গিয়া।”

সন্ধ্যার অন্ধকারে লাশগুলো পড়ে থাকে অবহেলায়। বাইরে থেকে যেন লাশের স্তূপ দেখা না যায়, তাই জানালার কাচে কাগজ সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। এই সুযোগেই পালানোর পরিকল্পনা করেন ইমাম উজ-জামান। সহকর্মী ক্যাপ্টেন সিদ্দিকী তখনও যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিলেন, কিন্তু পালানোর শক্তি তার ছিল না। পালানোর সেই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “রাত তখন ১২টা কি ১টা হবে। টেবিলের ওপর উঠে জানালার হুকটা খুলে লাফ দিলাম। দূরে এক সেন্ট্রি ছিল, সে বুঝতে পেরে গুলি করতে থাকে।”

“পাহাড় থেকে নেমে দৌড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর উঠলাম। পেছনে পাকিস্তানি সেনাদের ছুটে আসার বুটের শব্দ পাই। তখন বাঁ দিকে জঙ্গলে লুকাই। এর পর গেঞ্জিটা খুলে কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রোড ক্রস করে টিপরাবাজার যাই। উত্তর-পূর্ব দিকে ম্যাক্সিমাম ৫ মাইল দূরে ইন্ডিয়া। ওই চিন্তা থেকেই ধানক্ষেতে ক্রলিং করে এগোই। ওরা একটা পিকআপ ভ্যানে লাইট মেরে আমার খোঁজ করে।”

“বহুকষ্টে গোমতী বাঁধ ক্রস করে ভেতরে চলে আসি। শরীর দিয়ে তখনও রক্ত পড়ছে। পালানোর চিন্তায় সে অনুভূতিটাও ভুলে যাই। ফজরের আজানের পর এক গ্রামে এসে পৌঁছাই। ওটা বুড়িচং থানার ভরাশাল গ্রাম। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে এসেছি শুনে মানুষজন এগিয়ে আসে। একজন পুকুরে নিয়ে গোসল করায়, বুটটাও খুলে দেয়। স্কুলঘরের একটা কামরায় থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। স্থানীয় এক গ্রাম্য ডাক্তার ইনজেকশন দিয়ে ক্ষতস্থানের প্রাথমিক চিকিৎসা করেন। পরদিন বুড়িচং হাসপাতালে হাতের কবজি থেকে বের করে আনা হয় গুলিটি।”

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ৯ ডিসেম্বর ২০২৫

© 2025, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button