মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১: ঢাকায় পেট্রল পাম্প উড়িয়ে দেন তৌফিকরা

“গেরিলা গ্রুপগুলোর ক্যাম্প ছিল ঢাকার আশেপাশে। ধামরাই, কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, আটি প্রভৃতি এলাকায়। মেলাঘর থেকে বলা ছিল- ‘তোমাদের হাইড-আউটের জায়গাটা এমন জায়গায় হবে যেখানে সহজে পাকিস্তানি আর্মি গাড়ি নিয়ে যেতে না পারে। মাঝখানে যেন নদী বা খাল থাকে। সেখানে একজন পাহারা রাখবা যেন আগেই খবর দিতে পারে। আর এত দূরে ক্যাম্প করবা যেখানে যাওয়া কষ্টকর হয়। আশপাশের লোকজনও যেন তোমাদের সাপোর্ট করে’।”

“মেলাঘর থেকে ৫২ জনের গেরিলা দল নিয়ে আমরা আসি রোহা গ্রামে। ধামরাই-মানিকগঞ্জ বর্ডারে গ্রামটা। ক্যাপ্টেন হালিমের পরিচিত লোকজন ছিল ওখানে। যারা আর্মস লুকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করেন। আমাদের সঙ্গে ছিল এলএমজি, মর্টার, গ্রেনেড প্রভৃতি। নৌকার পাটাতনের নিচে লুকিয়ে আনি ওগুলো। আমাদের কমান্ডার ছিলেন রেজাউল করিম মানিক (পরে তিনি শহীদ হন), সহ-কমান্ডার নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ভাই।”

“তখন গ্রামটির আশেপাশে রাজাকারদের আধিপত্য ছিল। প্রথমেই তাদের নিউট্রালাইজ করার কাজে নামি। রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অ্যাটাক করেছি। দিনে ঘুমাতাম। সন্ধ্যায় ভাত খেয়েই অপারেশনে বের হয়ে যেতাম। মাইলের পর মাইল হেঁটে বা নৌকায় গিয়েছি। এক সময় রাজাকার ও আলবদররা ভয়ে থানাগুলোতে অবস্থান নেয়। এভাবে ধামরাই থেকে সাভার পর্যন্ত পুরো এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।”

“কিন্তু অপারেশন করতে হবে মূলত ঢাকায়। যাতে বিশ্বগণমাধ্যমে সে খবর ছড়িয়ে পড়ে। মানিক ভাই মগবাজার, তেজগাঁও, সিদ্ধেশ্বরী, মোহাম্মদপুরে পরিচিতদের বাসায় অস্ত্র রাখার স্থান তৈরি করেন। তেজগাঁওয়ে অস্ত্র থাকত সাহার বাড়িতে। স্বাধীনের কয়েকদিন আগে রাজাকাররা সেটা জেনে যায়। ফলে সাহা ও তার ভাইদেরও গুলি করে হত্যা করে ওরা। এছাড়া ঢাকার ভেতরেই বেশ কিছু শেল্টার ঠিক করা ছিল।”

“রোহা গ্রাম থেকে নৌকায় সাভারে, সেখান থেকে বাসে ঢাকায় ঢুকতাম। পরিচিতদের বাসায় আত্মগোপন করে থাকতে হতো। আমি উঠতাম খালার বাসায়, নাজিরা বাজারে। ট্রেনিংয়ে বলা ছিল- ‘তোমরা এক জায়গা থেকে গিয়ে অপারেশন করে উঠবা আরেক জায়গায়। অন্যরা জানবে না তুমি কোথা থেকে আসছ এবং কোথায় যাবা। তবে সবাই জানবে কোন জায়গায় এসে তোমরা মিট করবা। কেউ মিট না করলেই বুঝতে হবে সে নিউট্রালাইজড বা ধরা পড়ে গেছে।’ পাকিস্তানি সেনারা তাকে মেরে ফেললেও যেন অন্য গেরিলাদের ঠিকানা না পায় এ কারণেই ছিল এমন কৌশল। অপারেশনের সময় অস্ত্র কোথা থেকে তুলবো, কোথায় ড্রপ করবো এটা শুধু জানতে চাইতাম। মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা হিসেবে এই বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হতো আমাদের।”

একাত্তরে ঢাকার গেরিলাদের নানা কৌশল ও বীরত্বের কথা এভাবেই তুলে ধরেন বীর মুক্তিযোদ্ধা তৌফিকুর রহমান। এক সকালে তার বাড়িতে বসে আলাপ চলে যুদ্ধদিনের নানা প্রসঙ্গে।

আবু নাঈম মো. মুছাদ্দিকুর রহমান ও মাহবুবা রহমানের বড় সন্তান তৌফিকুর রহমান। বাবা ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সচিব। তৌফিকের জন্ম ও বেড়ে ওটা ঢাকার কাঁঠালবাগানে হলেও পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুর জেলার কোতোয়ালি উপজেলার সাদিপুর গ্রামে।

তার লেখাপড়ায় হাতিখড়ি তেজগাঁও পলিটেকনিক্যাল স্কুলে। পরে ভর্তি হন শাহীন স্কুলে। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন ওই স্কুলেরই ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী।

ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “স্কুলে খেলাধুলা করতাম। ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিল নাজমুল হুদা, ফারুক জামান, গাজী নুরুন্নবী, মোসাদ্দেক, ফারুক আহমেদ, জাহেদুল, এম এ সেলিম প্রমুখ। বাসায় ফিরে বিকেলের দিকেও ফুটবল, ডাংগুলি, সাত চারা, হকি খেলেছি। মাগরিবের আজানের আগে বাসায় ঢোকাই ছিল নিয়ম। মাটির সঙ্গে মিশেই আমরা বড় হয়েছি। খারাপ কিছু ভাবার সুযোগও তখন ছিল না।”

“রাজনীতিটা খুব একটা বুঝতাম না। তবে শুনতাম আন্দোলন চলছে। শাহীন স্কুলে অর্ধেকের বেশি ছিল ননবেঙ্গলি ছাত্র। ওরা উর্দুতে কথা বলতো। ‘বন্ধু’ না বলে বলতো ‘ইয়ার’। বিহারী হওয়ায় নানা সুবিধা পেত ওরা। কিছুটা কোনঠাসা ছিলাম আমরা।”

“ক্লাস নাইনে পড়ি তখন। বাঙালিদের নিয়ে খারাপ একটা গালি দেয় এক ননবেঙ্গলি ছাত্র। এ খবরটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে গোটা স্কুলে। রক্ত গরম হয়ে যায়। বাঙালিরা ঠিক থাকতে পারি না। সব বাঙালি ছাত্র এক হয়ে ননবেঙ্গলি ছাত্রদের বেশ ধোলাই করি। বাঙালি হিসেবে ওইদিনই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলাম। ভুলটা ওদেরই ছিল। তাই স্কুল কর্তৃপক্ষও শাস্তি না দিয়ে সকলকে মিলিয়ে দেয়।”

স্কুলে জীবনেই বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ জামাল ও শেখ কামালের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তৌফিকুর রহমানের।

কীভাবে?

তার ভাষায়, “তখন সিক্সে পড়ি। ক্লাসে কথা বলার জন্য একবার রোদে দাঁড় করিয়ে পানিশমেন্ট দেয়। সঙ্গে অন্য সেকশনের আরেক ছাত্রকেও। অপমানিত হয়ে সে খুব রেগে ছিল। তার নাম জানতে চাইলাম। বলে- ‘আমার নাম জামাল। আমার বাবা তো রাজনীতি করে। শেখ মুজিবুর রহমান নাম।’ ওইদিন বাসায় ফিরে আব্বার কাছে তার সম্পর্কে জানতে চাইলাম। আব্বা বোঝালেন, ‘শেখ মুজিব বাঙালিদের পক্ষে কথা বলেন। বড় নেতা তিনি।’ এভাবেই বঙ্গবন্ধুর নাম প্রথম শুনি তারই সন্তান শেখ জামালের মুখে। পরে সে চলে যায় রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুলে।”

স্বাধীনতার আনন্দ নিয়ে ঢাকায় জিপে করে ঢোকেন মুক্তিযোদ্ধা তৌফিকুর রহমান (বাঁ দিকে পেছনে দাঁড়িয়ে), নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু (একেবারে সামনে হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে), আরিফুল (গাড়ি চালাচ্ছেন), আসাদ, জামি, ইফু, আশরাফ, জাহেদুল। ছবি: বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম স্বপন।

“শেখ কামালও পড়তেন শাহীন স্কুলে। দুই ক্লাস সিনিয়র ছিলেন। সারাক্ষণই হাসিখুশি, মেতে থাকতেন খেলাধুলা আর সংস্কৃতি নিয়ে। স্কুলে তখন যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতা হতো। কামাল ভাই ছিলেন বেশ হালকা-পাতলা। একবার তিনি ফকির সাজলেন। এতো সুন্দরভাবে সেজেছিলেন যে বোঝার উপায় ছিল না ওটা আসলেই ফকির নাকি শেখ কামাল !”

সত্তরের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও ক্ষমতা দিতে তালবাহানা করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। ফলে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। তৌফিকরা তখন থাকতেন সরকারি কোয়ার্টারে, চানখাঁর পুলের রশিদ বিল্ডিংয়ে। পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ। খুব কাছেই শহীদ মিনার। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মিছিল, আন্দোলন ও প্রতিবাদ দেখেছেন খুব কাছ থেকে।

৭ই মার্চ, ১৯৭১। খবর ছড়িয়ে পড়ে বহু সৈন্য এনেছে পাকিস্তান সরকার। আর্টিলারিও ফিট করা। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই গান ফায়ার শুরু হবে। শুনে তৌফিকও ভয়ে বাংলা একাডেমির কাছে দাঁড়িয়ে শোনেন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি।

তার ভাষায়, “ভাষণের শেষে বঙ্গবন্ধু বললেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই কথাগুলো মনে দাগ কেটে যায়। ক্লিয়ার হয়ে যাই কী ঘটবে। ওটাই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। এ নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো দ্বিধা নেই আমার। এরপর বাসার সামনে দিয়ে বড় বড় মিছিল যেত। ২৫মে মার্চের দিন দেখলাম শহীদুল্লাহ হলের ছাত্ররা রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিচ্ছে। তখনও বুঝি নাই ওই রাতেই শুরু হবে গণহত্যা।”

রাতে কী ঘটলো?

“সারারাত গোলাগুলির শব্দ। ওরা যে গণহত্যা চালিয়েছে এটা ক্লিয়ার হই ভোরের দিকে। গেইটের বাইরে গিয়েই ‘থ’ বনে যাই। রাস্তা সুনসান। মনে হচ্ছে পাখিরাও নাই। আগে হরতাল, কারফিউ ও ধর্মঘট হতো। তবে ওইদিনের অবস্থা ছিল একেবারেই ভিন্ন। হঠাৎ কার্জন হলের দিক থেকে একটা আর্মিদের জিপ আসে। জিপে এলএমজি ফিট করা। ওরা ফায়ার করতে করতে আসছে। সে কি আওয়াজ!”

“স্যান্ডেল ফেলে দৌড়ে দেয়াল টপকে কোনোরকমে বাসায় চলে আসি। আম্মা দ্রুত জানালাগুলো বন্ধ করে দেন। বাসার সামনে টং দোকানে একটা ছেলে সিগারেট বিক্রি করত, বরিশাল বাড়ি তার। দোকানের ভেতর থেকে সে বের হতে গেলে তাকে গুলি করে হত্যা করে ওরা।”

“ভয়ে ভয়ে জগন্নাথ হলের দিকে যাই আমি। রাতে ওদিক থেকেই গুলির শব্দ হচ্ছিল। দূর থেকে দেখলাম গুলিবিদ্ধ মানুষের ‘ডেড বডি’ পড়ে আছে। কারও মাথায়, কারও বুকে, কারও পেটে লেগেছে গুলি। কয়েকজনকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়েছে। রক্তের গন্ধও তখন ছড়াচ্ছিল। রাতে ওরা ফুলবাড়িয়া রেললাইনের দুই পাশের বস্তিগুলোও পুড়িয়ে দেয়। তখন আর সহ্য করতে পারি না। মনে হয়েছে এ কোন দেশে বাস করছি !”

“এরপর থেকে রাস্তায় চলতে ভয় লাগত। কাঁঠালবাগানের বাসায় দাদী থাকতেন। সেখানে যাওয়ার পথে একবার সবাইকে চেক করে আর্মিরা। ওরা যা তা বলে ইনসাল্ট করত। খুব খারাপ লাগত তখন। মনে হতো আমাদের থেকে কুকুরগুলোও ভাল আছে। ইচ্ছে মতো চলাচল করতে পারছে। এভাবে বেঁচে থাকার তো মানে হয়না। নানা চিন্তা ঘুরপাক খায় মনে।”

এরপর কী করলেন?

“কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া যায় সেটা নিয়ে নাজমুল, নেহালসহ কয়েকজন বসে আলোচনা করি। খবরও নিতে থাকি। একজনের মুখে শুনলাম। রেজাউল করিম মানিক ভাই ইন্ডিয়া থেকে ঘুরে এসেছেন। তিনি থাকতেন পল্টনে। উনার সঙ্গে দেখা করলাম। আমাদের দেখে ভীষণ অবাক হয়ে তিনি বললেন- ‘তোমাদের তো যুদ্ধে যাওয়ার বয়সই হয় নাই!’

‘আমরা যুদ্ধ করবই। আপনি রাস্তা বলে দেন।’

প্রবল আগ্রহ দেখে তিনি না করলেন না। রুট বলে দিলেন।”

কোন তারিখে ও কোথায় গেলেন?

তৌফিক বলেন, “আমি, বেলাল, সেলিম, কামাল, নেহাল ও নাজমুল- এই ছয়জন প্ল্যান করি। কিছু জিনিসপত্র গোপনে বিক্রি করে প্রথমে কিছুু টাকা সংগ্রহ করি। এরপর একাত্তরের ১৫ই জুন বাড়ি থেকে পালাই। জিনিসপত্রের গাট্টি রাতে সিঁড়ি গোড়ায় রেখে দেই। কখন ফজরের আজান দিবে সে অপেক্ষায় সারারাত ঘুম হয় না। ভোরে লুকিয়ে পল্টনে চলে যাই।”

“ওখানেই সবাই একত্রিত হওয়ার কথা। নাজমুল আর নেহাল আসলো না। ফলে আমি, বেলাল, কামাল আর সেলিম বাসে করে চলে যাই নরসিংদী। ওখান থেকে নবীনগর হয়ে যাই ভারতে, আগরতলার সিপিএম অফিসে। সেখানে দেখা হয় রাশেদ খান মেননের সঙ্গে। উনি একটা চিঠি লিখে দিলে সেটা নিয়ে গেলাম মেলাঘরে। ১৭ জুন আমরা পৌঁছি সেখানে।”

তৌফিকরা এক মাস প্রশিক্ষণ নেন মেলাঘরে, ক্যাপ্টেন হায়দারের অধীনে। উনি কমান্ডো ছিলেন। আর্মিদের কমান্ডো ট্রেনিং ছিল ৬ মাসের। কিন্তু সেটা ছোট করে এক মাসে নিয়ে আসা হয়। বারো নম্বর প্লাটুনে ট্রেনিং করেন তৌফিক। প্লাটুন কমান্ডার সাদেক হোসনে খোকা আর টুয়াইসি ছিলেন জাকির হোসেন।

প্রথম অপারেশন কোনটি?

মুক্তিযোদ্ধা তৌফিকুর রহমানের উত্তর, “ট্রেইনিং শেষে আমাদের পাঠানো হয় মধ্যবাগে, ক্যাপ্টেন গাফফারের কাছে। ওখানে পাকিস্তানি আর্মিদের সঙ্গে সামনাসামনি যুদ্ধ চলে। ওদের ফোর্সের ওপর অ্যাটাক করি, বান্কারও উড়িয়ে দিই। সেখানে শহীদ হন জাকির ভাই। তার কবরটাও মধ্যবাগে। তখন আমরা কিছুটা ভেঙে পড়ি। ফলে আবার মেলাঘরে পাঠানো হয় আমাদের। সেখানেই নতুনভাবে গ্রুপ ভাগ করা হয়। সাদেক হোসেন খোকার দলে থাকার কথা আমার। কিন্তু হঠাৎ দেখা হয় মানিক ভাই ও বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে। ফলে আমি, মেজবাহ উদ্দিন সাবু আর টুনি, মানিক ভাইয়ের গ্রুপে চলে যাই। এভাবেই তার সঙ্গে চলে আসি ঢাকায়, রোহা গ্রামে।”

একাত্তরে ঢাকায় গেরিলাদের গ্রুপগুলো নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা তৌফিক অকপটে বলেন, “যত গ্রুপ তখন এসেছে সবগুলোর নাম তাদের দলনেতার নামে হয়েছে। মায়া গ্রুপ, মানিক গ্রুপ, লিয়াকত গ্রুপ, আজিজ গ্রুপ, খোকা গ্রুপ- এমন ১০/১৫টা গ্রুপ ঢাকায় অপারেশন করে। এখানে কোনো প্লাটুন হিসেবে আসেনি কেউ। প্লাটুন বলতেই ত্রিশ জনের একটা গ্রুপ। আবার কোন গ্রুপ কোথায় কাজ করছে তার একটা ডায়াগ্রামও মেলাঘরে ছিল। ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ নামে তখন কোনো গ্রুপ ছিল না। যত অপারেশন করেছি সেটা সিগন্যালের মাধ্যমে হেড কোয়ার্টারে যেত। ওই সিগন্যালে মায়া গ্রুপ, মানিক গ্রুপ, খোকা গ্রুপ প্রভৃতি লেখা হতো। তবে এটা ঠিক মায়া ভাইয়ের গ্রুপটা ঢাকায় প্রথম আসে। তারা দুর্ধর্ষ কিছু অপারেশনও করেছেন। শোনা যায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অপারেশনের পর তাদেরকে সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ বলেছিলেন ‘দে আর মাই ক্র্যাক বয়েজ’। ফলে স্বাধীনতার লাভের পর তারা ‘ক্রাক প্লাটুন’ নামেই পরিচিত হন। তবে এটা মেলাঘর থেকে দেওয়া হয়নি।”

“মুক্তিযোদ্ধা তৌফিকুর রহমান দুই নম্বর সেক্টরের অধীন গেরিলা অপারেশন করেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। তার নেতৃত্বেই কাকরাইল পেট্রোল পাম্প উড়িয়ে দেওয়া হয়।”

কীভাবে হয়েছিল ওই অপারেশনটি?

তার ভাষায়, “একদিন মানিক ভাইকে বললাম, আমদের যেহেতু এক্সপ্লোসিভ ট্রেনিং আছে, সঙ্গে আছে প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ ও ফসফরাস গ্রেনেডও। তাই ঢাকায় পাকিস্তান আর্মি বা পুলিশ থাকে এমন জায়গার আশেপাশে বড় বিস্ফোরণ ঘটাতে চাই।

তিনি বলেন, কেমনে করবা?

‘দুটো দিন সময় দিলে পুরো প্ল্যানটা করা যাবে।’ উনি সময় দিলেন।

আলতাফ হোসেন টুনিকে নিয়ে রেইকি করতে বের হই। কাকরাইল পেট্রল পাম্পটি ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের খুুব কাছাকাছি। ফলে সেটাই বেছে নিই। পাম্পের উল্টোদিকে চা খাওয়ার ছোট একটা টং দোকান ছিল। সেখানে চা খেতে খেতে কোথায় এক্সপ্লোসিভ লাগাবো, ওয়েট দেওয়ার মতো কী আছে, কয়জন ডিউটি করে সবকিছু দেখে আসি। ক্যাম্পে এসে মানিক ভাই ও বাচ্চু ভাইকে নিয়ে পুরো প্ল্যানটা করি।

চারজন লাগবে। আমি আর টুনি যাবো। সঙ্গে থাকবে আরও দুজন। কিন্তু বিস্ফোরণ ঘটলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে পুলিশ আসতে এক মিনিটও লাগবে না। পালাব কীভাবে? খন্দকার মাহাবুব উদ্দিনের ছেলে নেহাল ছিল বন্ধু। তার আছে গাড়ি চাইলাম। সে বলল, ‘রোজার মাস। আব্বা তো গাড়ি বের করতে দেয় না। শুধু ইফতারের সময় বের হই।’ তখনই মাথায় ক্লিক করে, ‘দ্যাট ইজ দ্য বেস্ট টাইম।’ তাকে রাজি করালাম।

“ক্যাম্পে ফিরে মানিক ভাইকে বললাম, ‘একটা স্টেনগান লাগবে দুটো ম্যাগজিন ফুল লোডেড।’ তিনি বললেন, ‘মহাখালী ওয়্যারলেস গেইট গেলে ফেরদৌস নামের একজন তোমাদের আর্মস দেবে। অপারেশন শেষে সেটা রাজারবাগের শেল্টারে রেখে যাবা।”

“একাত্তরের পয়লা নভেম্বর। মানিক ভাই দুটো ছেলে দিল। ওরা বাজারের ব্যাগে করে এক্সপ্লোসিভ নিয়ে আসে। আমি আর টুনি রিকশায় মহাখালী ওয়্যারলেস থেকে একটা কম্বলে মোড়ানো অবস্থায় স্টেনগান নিয়ে গন্তব্যে যাই। নেহাল গাড়ি নির্দিষ্ট জায়গায় পার্ক করে স্টার্ট দেওয়া অবস্থায় গাড়ির তিনটি দরজাও খোলা রাখে।”

“ইফতারের ঠিক আগে চোখের ইশারায় চারজন মুভ করলাম। আমি আর টুনি স্টেইনগান নিয়ে পাম্পের বাইরে যে দুইজন কাজ করছিল ওদের ভেতরে নিয়ে ঢুকালাম। পর্দা টেনে দিয়ে সবাইকে বললাম, ‘চুপ করে বসেন। আপনাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না। একটা বোমা লাগানো হচ্ছে এখানে। এরপর আপনারা দৌড়ে সরে যাবেন।”

“দুজন গেরিলা আমার নির্দেশে বাইরে এক্সপ্লোসিভ লাগাতে থাকে। বালি ভর্তি দুটি বালতি এক্সপ্লোসিভের ওপর চাপা দেয়। প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভের সাথে ডেটোনেটর সেট করে দুই মিনিটের ফিউজ লাগায়। ফিউজে আগুন দিয়েই ওরা ডাক দেয় আমাদের। তখন পাম্পের লোকদের বলি, ‘তোমরা শুধু দৌড়াতে থাকবা। এটা বিশাল বোমা। নাইলে মারা পড়বা’।”

“আমরাও দ্রুত গাড়িতে উঠে সরে গেলাম। একদম টাইম মতো সব হয়েছিল। রাজারবাগ এলাকায় ওমর নামে এক মুক্তিযোদ্ধার বাড়িটি ছিল শেল্টার। সেখানে আমাদের নামিয়ে দিয়ে নেহাল মাত্র গাড়িটি স্টার্ট দিয়েছে তখনই বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে। গোটা পেট্রোল পাম্পটি ওই বিস্ফোরণে উড়ে গিয়েছিল।”

“পুরো ঢাকাও কেঁপে ওঠে। আমরা আনন্দে একে অপরের মুখের দিকে তাকাই। টুনিকে আমি, টুনিও আমার হাত চেপে ধরে। মনে হচ্ছিল চিৎকার দিয়ে বলি ‘জয় বাংলা’। এরপর শেল্টারে অস্ত্র রেখে রিকশায় যে যার মতো সরে পড়ি। ‘ঢাকায় পেট্রল পাম্প উড়িয়ে দিয়েছে গেরিলারা’ এমন সংবাদ প্রচার করে বিবিসি। পরদিন ইত্তেফাকসহ জাতীয় দৈনিকগুলোতেও শিরোনাম হয় ‘ঢাকার কাকরাইলে বোম বিস্ফোরণ।’ ইত্তেফাকের ওই সংখ্যাটা এখনও সংগ্রহে আছে। ঢাকা যে শান্ত না, ঢাকায় গেরিলা ঢুকে পড়েছে- ওই অপারেশনের পর এটা আরও স্পষ্ট হয়ে যায়। সবদিক থেকেই অপারেশনটা সাকসেসফুল ছিল। মনে হলে এখনো শিহরিত হই।”

এছাড়া এই গেরিলা রামপুরা ডিআইটি টেলিভিশন ভবন, পল্টনে পাকিস্তানি কর্মাশিয়াল ব্যাংক, মানিকগঞ্জের কামালপুরে দাউটিয়া ব্রিজ, সাভারের ঘোষবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় অপারেশন করেন। দাউটিয়া ব্রিজ অপারেশনে শহীদ হন তাদের কমান্ডার রেজাউল করিম মানিক। আর ঘোষবাগে মারা যান সহযোদ্ধা টিটো। তাদের কথা মনে হলে এখনও বুকের ভেতরটা খামচে ধরে মুক্তিযোদ্ধা তৌফিকের।

স্বাধীনতা লাভের পরদিন সহযোদ্ধাদের নিয়ে ঢাকায় ফিরে জিপে করে আনন্দ উল্লাস করেন তারা। তখনকার ছবিগুলোর দিকে তাকালে আজও আনমনা হয়ে যান এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

দেশ স্বাধীনের পর লেখাপড়া শেষ করে মুক্তিযোদ্ধা তৌফিকুর রহমান যোগ দেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে, ১৯৭৬ সালে। সবশেষ তিনি কর্নেল হিসেবে অবসর নেন।

একাত্তরে সাধারণ মানুষের অবদানের কথা তুলে ধরে এই যোদ্ধা অকপটে বলেন, “একটা দেশে গেরিলা তখনই থাকতে পারে যখন সাধারণ মানুষের সমর্থন পাওয়া যায়। জনগণের সমর্থন ছাড়া গেরিলা অপারেশনও হয় না। সেই সমর্থন আমরা শতভাগ পেয়েছিলাম। এ কারণেই একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল একটি জনযুদ্ধ। যেটা না বললে কিন্তু ভুল হবে। আমি গেরিলা। একা যুদ্ধ করিনি। পথে আমাকে গ্রামবাসী খাইয়েছে। প্রতিটি ধাপে এরাই আমাদের হেল্প করেছে।”

উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “একাত্তরে সাভারের শিমুলিয়া ইউনিয়নের গাজী বাড়ি গ্রামে স্থানীয় যুবকদের ট্রেইনিং করাই। এসএলআর-এর উপর প্রশিক্ষণের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। সহযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম স্বপনের তোলা ওই সময়কার একটা ছবি এখনও আছে। ছবিতে বসে ক্লাস নিচ্ছি বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে শিমুলিয়ার তৎকালীন চেয়ারম্যান আহম্মেদ আলী আর ডান দিকে টিটো (পরে শহীদ হন)। আহম্মেদ আলী চেয়ারম্যান সবসময় খোঁজ নিতেন কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা। কোন বাড়িতে গিয়ে আমরা থাকতে পারবো। ঈদে একটু ভালো খেতে পারবো। সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। একাত্তরে এমন মানুষদের কন্ট্রিবিউশনও কম ছিল না।”

একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিনোদন প্রসঙ্গে এই বীর বলেন, “মেলাঘরে আমাদের সঙ্গে ছিল আজম খান। সে মজার মজার গান গাইত। সন্ধ্যা হলেই ব্যারাকের ভেতর মাটিতে গোল হয়ে বসে তার গান শুনতাম। পাতিল দিয়ে তবলা বাজাতাম। বাঁশিও বাজাতো কেউ কেউ। পেইন্টার শাহাবুদ্দিন ছিল। দিনের বেলায় সে সুন্দর সুন্দর স্কেচ আঁকতো। আবার মারামারিও হতো। এক রাতে ঢাকার গ্রুপের সঙ্গে নোয়াখালি গ্রুপের তুমুল হাতাহাতি হয়। ক্যাপ্টেন হায়দার এসে উপরে ফায়ার করে সবাইকে থামায়। আনন্দ-বেদনার ভেতর দিয়েই কেটেছে একাত্তরের দিনগুলো।”

স্বাধীনতার ৫০ বছর পর যদি প্রশ্ন করি যে, দেশের স্বপ্ন দেখে মুক্তিযুদ্ধে গেলেন, সে দেশ কতটুকু পেয়েছেন?

“দেশ তো পেয়েছি। স্বাধীনতাও পেয়েছি। অর্থনীতি এখন অনেক স্ট্রং। কিন্তু স্বপ্ন ছিল এখানে ধর্ম নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি থাকবে না। সেটা এখনও আমরা করতে পারিনি। পাকিস্তানিরা এমন দেশ রেখে গিয়েছিল যেন আমরা দাঁড়াতে না পারি। কিন্তু আমরা দাঁড়িয়েছি। ওরা কিন্তু হাল ছাড়েনি। যতদিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু মারা না গেছে ততদিন পর্যন্ত ষড়যন্ত্র চলেছে। সেটা এখনও আছে। বিশ্বাস করি আমরা যদি শক্ত থাকি, যদি নিরাশ না হই। আমরা এগিয়ে যাব।”

দেশ কেমন চলছে?

এ বীরের অকপট উত্তর, “খারাপ চলছে না। সরকারের সিনসিয়ারিটি আছে, পরিকল্পনাও ভালো। কিন্তু কমান্ড একেবারেই সেন্ট্রালাইজড। এটি ডিসেন্ট্রালাইজড না করলে হবে না। রাজনীতিতে যারাই ক্ষমতায় আসছে। তাদেরই খুব তাড়াতাড়ি টাকা হয়ে যায়। কীভাবে হয় এটা! সন্দেহ নেই বঙ্গবন্ধু কন্যা সৎ। তিনি সততার সঙ্গেই কাজ করছেন। কিন্তু তৃণমূলের নেতাকর্মীদেরও তেমন হতে হবে। বন্ধ করতে হবে দুর্নীতিও। তাহলেই দেশ আরও এগিয়ে যাবে।”

মেয়ের বিয়েতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা তৌফিকুর রহমান

স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে সহ্য করতে পারেন না এই যোদ্ধা। তিনি বলেন, “নতুন প্রজন্মকে বিশ্বাসী হিসেবে তৈরি করতে হলে নিজেদের আগে অনেস্ট হতে হবে। দেখাতে হবে যে আমরাও ভালো কাজ করছি।” তা না হলে প্রজন্মও তৈরি হবে না বলে মনে করেন এই সূর্যসন্তান।

শেষে প্রজন্মের উদ্দেশে মুক্তিযোদ্ধা তৌফিকুর রহমান বলেন, “বাবা আমরা খুব কষ্ট করেছি। একাত্তরে পাকিস্তানিরা আমাদের ওপর অনেক অত্যাচার করেছে। তোমরা আমাদেরই প্রজন্ম। একাত্তরের ত্যাগের ইতিহাসটুকু তোমরা জেনে নিয়ো। মনে রেখো, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই তোমাদের পথ দেখাবে।”

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল; ১৯ মার্চ ২০২২

© 2022, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button