ছেঁড়া লুঙ্গির যোদ্ধারাই মাথানত করিয়েছিল পাকিস্তানিদের

সাতক্ষীরা–বরিশাল–খুলনার ৪০ কিশোরের ‘বিচ্ছুবাহিনীর’ অশ্রুত গল্প।
বরিশাল শহরের সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ, ‘ক্যাপ্টেন বেগ’ নামেই তিনি বেশি পরিচিত। নয় নম্বর সেক্টরের অপারেশনাল কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধের শুরুর দিক থেকে তার দায়িত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে, পরে তাকে দেওয়া হয় শমশেরনগর সাব-সেক্টরের পূর্ণ দায়িত্ব।
সাতক্ষীরা অঞ্চলে গেরিলা, সম্মুখ ও নৌ-কমান্ডো যুদ্ধ পরিচালনা করেন মাহফুজ আলম। বরিশালের দোয়ারিকায় পাকিস্তানি সেনাদের একটি সম্পূর্ণ কোম্পানিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করানোর ঘটনাটিও তার নেতৃত্বের অন্যতম দৃষ্টান্ত।
মাহফুজ আলম বেগ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে করতে আবেগে ভেসে যান, কিন্তু স্বরের ভেতর থাকে দৃঢ়তার এক অনমনীয় রেখা। যুদ্ধের সেই দুঃসাহসিক দিনগুলো মনে করতে গিয়ে তিনি বলেন, “গেরিলা ইউনিটগুলোকে কমান্ড করতাম। গোয়েন্দা রিপোর্ট এলে আমরা আর্মির মুভমেন্ট ধরে ফেলতাম। রেইড, কোথাও অ্যাম্বুশ, কোথাও কোনো বিওপি দখল। এমন রাত ছিল না, যে রাতে অপারেশন করিনি।”
তিনি ছোটদের নিয়ে গড়া এক বিশেষ ইউনিটের কথাও জানান। বয়স ১১ থেকে ১৪। সাতক্ষীরা, খুলনা আর বরিশালের চল্লিশজন কিশোরের দল। নাম দেওয়া হয় ‘হার্ড কর্পস অব সার্জেন্টস’, যদিও বাস্তবে তারা ছিল ‘বিচ্ছুবাহিনী’। তাদের এসএমজি, রাইফেল, গ্রেনেডের ওপর ট্রেনিং দেওয়া হয়; সঙ্গে নৌকা চালনার বিশেষ প্রশিক্ষণও। তাদের প্রধান কাজ ছিল গোলাবারুদ বহন করা, গোয়েন্দাগিরি করা, আর পাকিস্তানি সেনাদের আস্থা অর্জন করে ক্যাম্পের ভেতরের খবর বের করে আনা।
এই শিশু যোদ্ধাদের নিয়ে মাহফুজ বেগ বলেন, “ওরা গল্প করত আর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কথা বলে পাকিস্তানিদের আস্থা নিত। পরে ক্যাম্পে ঢুকে ওদের ঠ্যাং টিপে দেখে আসত, কোথায় কী আছে। যেখানে অভিজ্ঞ যোদ্ধারা যেতেও চাইত না, সেখানে ওরা বলত- স্যার, আমি যাব।”
কণ্ঠে তখনো বিস্ময়ের সুর, যেন নিজেও বিশ্বাস করতে পারেন না ওদের সেই মৃত্যু-তুচ্ছ সাহস। সেক্টর কমান্ডার এম এ জলিল একসময় পরিকল্পনা করেন পাকিস্তানি গানবোটকে পাল্টা আঘাত দেওয়ার। পাকিস্তানি গানবোটে থাকত ৪০ মিলিমিটার বাফার গান। সেই সময়ে ইপিআরের স্টিল বডির লঞ্চ ছিল হাতে। ভারতীয় বাহিনীর চার্লি সেক্টরের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার সালেককে অনুরোধ করে আনা হয় হেভি মেশিনগান, যা লঞ্চে ফিট করে বানানো হয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব গানবোট ‘বঙ্গ বজ্র’। এই দুটি লঞ্চকে ব্যবহার করেই চলে নৌ অভিযানের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মাহফুজ বেগ জানান, প্রথম নৌ-অভিযানের সূচনা আসলে নয় নম্বর সেক্টর থেকেই। নৌ অপারেশন পরিচালনায় ছিলেন নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট গাজী ও লেফটেন্যান্ট আলম।
তারপর আসে দোয়ারিকার সেই ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের দৃশ্য। পাকিস্তানি সেনা ক্যাপ্টেন কাহারের নেতৃত্বে বেলুচ রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি অবস্থান করত সেখানে। মুক্তিযোদ্ধারা পুরো ব্যাটালিয়ন দিয়ে ক্যাম্প ঘিরে ফেলে। পাল্টাপাল্টি গুলি চলে। বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা সহজে আত্মসমর্পণ করবে না, এটাই ছিল ধারণা। কিন্তু দীর্ঘ প্রতিরোধের পর তারা অস্ত্র ফেলে মাহফুজ বেগের নিয়ন্ত্রণে আসে।
তাদের দোয়ারিকা থেকে নিয়ে আসা হয় ওয়াপদায়। তখনকার সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত তিনি বর্ণনা করেন, “পাকিস্তান আর্মি মাথা নিচু করে ওয়াপদার দিকে মার্চ করছিল। আর ছেঁড়া শার্ট, ছেঁড়া লুঙ্গি পরা মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র উঁচিয়ে তাদের নিয়ে যাচ্ছিল। এই দৃশ্যটা কোনোদিন ভুলতে পারব না।”
মুক্তিযুদ্ধ মাত্র নয় মাসে বিজয়ে শেষ হওয়ার অন্তর্নিহিত কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাহফুজ আলম বেগের কণ্ঠে ভর করে উঠে আদর্শের উচ্ছ্বাস। তিনি বলেন, “স্লোগান দিয়েই তো আমরা দেশ জয় করেছি। পাকিস্তানিরা অন্যের দেশে এসে জোর করে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। আর আমরা নিজের দেশে। নদীনালা, খালবিল, পাহাড়, সব আমাদের চেনা। এখানে তাদের বিরুদ্ধে আমরা লড়েছি। পৃথিবীর ইতিহাসে আছে, ৯০ হাজার ওয়েল-ইকুইপড সেনা আত্মসমর্পণ করেছে। যদি তারা কাপুরুষ না হতো, এটা সম্ভব ছিল না। গোলাবারুদ তাদের ফুরিয়ে যায়নি, তবুও সারেন্ডার করতে বাধ্য হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের কারণেই। কারণ আমরা ছিলাম আদর্শগত যোদ্ধা।”
তার কথার শেষে এসে থমকে যায় ঘর। তিনি ধীরে উচ্চারণ করেন, “আমি নামক কোনো শব্দ ছিল না মুক্তিযুদ্ধে। ছিল ‘আমরা’। এই দেশ আমার মায়ের দেশ। মাকে মুক্ত করাই তখন ছিল সবচেয়ে বড় কাজ। প্রতিটি যোদ্ধার বুকে তখন একটাই আগুন, মাতৃভূমিকে মুক্ত করা।”
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.




