মুক্তিযুদ্ধ

কোরআন বুকে জড়িয়ে ছিলেন মা, তবু মন গলেনি পাষণ্ডদের

আল্লাহর কালামও ওদের হাত থেকে বাঁচেনি, মায়ের রক্তমাখা কোরআন দেখিয়ে যা বললেন মুক্তিযোদ্ধা মুরাদ

মুক্তিযোদ্ধা মুরাদ হোসেন, তার সঙ্গে জীবদ্দশায় একাত্তরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে উঠে আসে এক মর্মস্পর্শী ও লোমহর্ষক ইতিহাস। মুরাদ হোসেনের বেড়ে ওঠা সৈয়দপুরের বিহারি অধ্যুষিত সমাজেই। তার বাবা আমজাদ হোসেন সিকদার রেলওয়ের অ্যাকাউন্টস অফিসার হওয়ার সুবাদে একাত্তরে তারা বসবাস করতেন সৈয়দপুর শহরের আতিয়ার কলোনির এল-৭৬-বি নম্বর কোয়ার্টারে।

একাত্তরের পঁচিশে মার্চের পর সৈয়দপুরের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায় এবং শহরটি ক্রমেই বিহারিদের দখলে চলে যেতে থাকে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে মুরাদ তার ছোট বোন ইভা জোহরাকে নীলফামারীতে মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু কলোনির কোয়ার্টারে তার মা সুফিয়া খাতুনের সঙ্গে থেকে যান দূরসম্পর্কের এক বোন, যার নাম ছিল জোবাইদা।

মুক্তিযুদ্ধে ও অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকায় মুরাদ আর কলোনিতে ফিরতে পারেননি। এদিকে বিহারিরা প্রকাশ্যে তার মাথার দাম ঘোষণা করে। কেবল মুরাদকে খুঁজেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, বরং তার বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে তার মাকে দ্বিখণ্ডিত করে হত্যা করে। ইতিহাসের সেই নির্মম অধ্যায়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবারই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন মুক্তিযোদ্ধা মুরাদ। বুকে জমে থাকা কষ্টের পাহাড় যেন অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ে। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে তিনি বর্ণনা করেন মা সুফিয়া খাতুনের আত্মত্যাগের করুণ ইতিহাস।

১৪ এপ্রিলের সেই কালরাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে মুরাদ হোসেন বলেন, “সৈয়দপুর শহরের সব বাঙালিকে ওরা আটকে রেখেছিল। আন্দোলনে যারা যুক্ত ছিল, তাদের পরিবারকেও ওরা বাঁচতে দেয়নি। ১৪ এপ্রিল রাতে আম্মাকে ওরা নির্মমভাবে হত্যা করে। কলোনিতে ওটাই ছিল ওদের প্রথম অ্যাটাক।”

ঘটনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, তাদের বাসাটি ছিল মূল রাস্তার পাশেই, ছাদ দেওয়া একতলা বাড়ি। মার্চের শুরুতেই তিনি ছাদের ওপর বিশাল আকারের বাংলাদেশের পতাকা ও একটি কালো পতাকা লম্বা বাঁশ দিয়ে টাঙিয়ে দিয়েছিলেন, যা বহু দূর থেকে দেখা যেত। ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকারী পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশের পতাকা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

মায়ের সাহসিকতার স্মৃতিচারণ করে মুরাদ বলেন, “বিহারিরা প্রথম এসে আম্মাকে বলে, ‘উসকো উতার দো’ (ওটা নামিয়ে ফেল)। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে টাঙিয়েছে। এটা আমি নামাতে পারব না।’ ওরা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তানি আর্মিদের ভয় দেখিয়ে আবারও পতাকা নামাতে বলে। এবারও আম্মা অস্বীকৃতি জানান। তাকে ধাক্কা দিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করে ওরা। কিন্তু আম্মার বাধার কারণে পারে না। ফলে হুমকি ও গালাগালি করে চলে যায়।”

এর কিছুক্ষণ পরেই নেমে আসে সেই ভয়াবহ মুহূর্ত। সেনাসহ বিহারিদের একটি সশস্ত্র দল এসে দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে। তখন সুফিয়া খাতুন রেহালে রেখে কোরআন শরিফ পড়ছিলেন। পেছনের দরজা দিয়ে তিনি সঙ্গে থাকা বোনটিকে পাশের বাড়িতে পাঠান বাবার বন্ধুকে ডেকে আনার জন্য। কিন্তু পথের মধ্যেই বিহারিরা মেয়েটিকে কুপিয়ে হত্যা করে।

মুরাদ হোসেনের কণ্ঠে সেই হত্যার বর্ণনা শুনলে গা শিউরে ওঠে। তিনি বলেন, “সামনের দরজা ভেঙে তারা ঘরের ভেতরে যখন ঢোকে, আম্মা তখন কোরআন শরিফ বুকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকেন। ওদের কাছে প্রাণভিক্ষাও চান। কিন্তু তাদের মন গলে না। কোরআন শরিফ ধরা অবস্থাতেই আম্মাকে ওরা কোপ দিয়ে দেহ থেকে মাথা আলাদা করে ফেলে। রক্তে ভেসে যায় পুরো ঘর। আল্লাহর কালাম কোরআন শরিফও মাটিতে পড়ে রক্তে ভিজে যায়।”

মুসলমান হয়েও পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া কয়েকজন বিহারি সেদিন এমন পৈশাচিক বর্বরতা চালিয়েছিল। পরে পাকিস্তানি সেনারা সুফিয়া খাতুনের লাশ ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়, যা আর কখনোই ফেরত পাওয়া যায়নি। এমনকি বোন জোবাইদার লাশও রাস্তায় পড়েছিল কয়েকদিন, পরে স্থানীয়রা দুর্গন্ধ এড়াতে তা মাটি চাপা দেয়।

আশপাশের পরিচিতজনদের মুখেই মায়ের এই করুণ মৃত্যুর বিস্তারিত শুনেছিলেন মুরাদ। বিহারিরা চলে যাওয়ার পর পাশের বাসার একজন ভদ্রলোক ঘর থেকে মায়ের রক্তমাখা কোরআন শরিফটি তুলে নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেটি সংগ্রহ করেন মুরাদ। পাতায় পাতায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগ লেগে থাকা সেই কোরআন শরিফটিই আজ তার মায়ের শেষ স্মৃতি।

মায়ের রক্তমাখা সেই কোরআন শরিফ হাতে নিলে আজও বুকের ভেতর ঝড় ওঠে এই মুক্তিযোদ্ধার। আক্ষেপ ও অপরাধবোধ নিয়ে তিনি বলেন, “পতাকা দুটি যদি না টাঙাতাম, তাহলে হয়তো ওরা আম্মাকে এভাবে হত্যা করত না। মাঝেমধ্যে নিজেকেও অপরাধী মনে হয়। স্বপ্নে আম্মার চিৎকার শুনে জেগে উঠি প্রায়ই। তখন খুব কষ্ট লাগে। এই দুঃখের কথা ঠিক বোঝাতে পারব না ভাই।”

“দেশ তো স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু আমরা তো মাকে ফিরে পাইনি, তার লাশও পাইনি। ফলে তার কবরও নেই। পুরো দেশের মাটিতেই মিশে আছে আমার মায়ের রক্ত। কিন্তু এ দেশ কি মনে রাখবে আমার শহীদ মাকে?”

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫

© 2025, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button