মুক্তিযুদ্ধ

আবদুল ওহাব: স্বীকৃতিহীন এক শহীদের রক্তঋণ

যে মাটির জন্য তিনি জীবন উৎসর্গ করলেন, সেই মাটিই আজ তাকে ভুলে যেতে চাইছে।

পাকিস্তান আমল। বাংলার আকাশ-বাতাসে তখন গুমোট অস্থিরতা। বগুড়ার মালতীনগর স্টাফ কোয়ার্টারের ঠিক পাশেই গড়ে উঠেছিল বিশাল এক বিহারি কলোনি। সেখানে দোর্দণ্ড প্রতাপ তাদের একাংশের। সেই উত্তাল সময়ে আবদুল ওহাব ছিলেন সরকারি চাকুরে, বগুড়া এসডিও অফিসের অধীনে মালতীনগর ভূমি অফিসের লোয়ার ডিভিশনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট (এলডিএ)।

কিন্তু ওহাবের আসল পরিচয় লুকিয়ে ছিল অকুতোভয় চরিত্রে। তার বড় মেয়ে নাছিমা খাতুন সীমার স্মৃতিতে সেই দিনগুলো আজও জীবন্ত জখম। সীমা মনে করতে পারেন, তার আব্বা প্রায়ই বিষণ্ন মুখে অফিস থেকে বাসায় ফিরতেন। ঘরে ঢুকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন, “কিছু বিহারি বাঙালিদের বাড়িতে আগুন দিচ্ছে, বাঙালি ছেলেদের ধরে অকারণে মারছে।”

সেই ভয়াল সময়ে ওহাব দমে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না। ভোরবেলায় যখন তিন মেয়েকে নিয়ে হাঁটতে বের হতেন, তখন তিনি শুধু বাবাই থাকতেন না, হয়ে উঠতেন এক স্বাধীনতার মন্ত্রদাতা। পথে দেখা হওয়া সহকর্মী ও স্থানীয় যুবকদের কানে কানে শোনাতেন প্রতিরোধের গল্প। কীভাবে পাকিস্তানি শাসক ও তাদের সহযোগী স্থানীয় কয়েকজন বিহারির আগ্রাসন থেকে নিজেদের ভূমি রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে চলত তার নিভৃত পরিকল্পনা।

বগুড়া পুলিশ লাইনসের ঠিক পাশেই ছিল সেই স্টাফ কোয়ার্টার। চার নম্বর বিল্ডিংয়ের প্রথম গেটের পশ্চিমে তৃতীয়তলায় আবদুল ওহাবের সাজানো সংসার। সেখানে তখন প্রায় ৮৫ থেকে ৯০টি পরিবারের বসবাস। ওহাবের কাছে একটি লাইসেন্স করা বন্দুক ছিল, আর ছিল অসম্ভব সাহসিকতা। মূলত তার উপস্থিতির কারণেই বিহারিরা ওই স্টাফ কোয়ার্টারের বাসিন্দাদের ওপর চড়াও হওয়ার সাহস পেত না।

কিন্তু সত্তরের নির্বাচনের পর যখন বাঙালির জয়ের সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, তখন থেকেই স্থানীয় কয়েকজন বিহারি নেতার ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন এই মানুষটি।

শহীদ আবদুল ওহাবের শেকড় ছিল রাজশাহীর গোদাগাড়ি উপজেলার হরিশঙ্করপুর গ্রামে। পিতা করিম বক্স ও মাতা ময়না বিবির সেই সন্তানটি বগুড়ার মাটিতে একদিন নিজের রক্ত দিয়ে মুক্তির ইতিহাস লিখবেন, তা কে জানত! স্ত্রী রহিমা খাতুন আর তিন মেয়ে সীমা, সেলিমা ও এলিমাকে নিয়ে তার সেই সুখের নীড়টি একাত্তরের মার্চে এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

২৫ মার্চ থেকে সবকিছু এক নিমেষে বদলে যেতে থাকে। সীমার কণ্ঠে সেই বিভীষিকার বর্ণনা যেন হাড়কাঁপানো এক সত্য, “একদিন দুপুরের পর বগুড়া পুলিশ লাইনসে হঠাৎ প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হলো। সেখানকার বাঙালি পুলিশ সদস্যরা অভাবনীয় এক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ওই সময় আব্বা বাসায় ছিলেন না। আম্মা আতঙ্কিত হয়ে আমাদের নিয়ে নিচতলায় আশ্রয় নিলেন। কোয়ার্টারের সব নারীরা সেখানে জড়ো হয়ে রুদ্ধশ্বাসে দোয়া পড়ছেন। সন্ধ্যার ঠিক আগে আব্বা ফিরলেন। ফিরেই তিনি দেরি করলেন না। কোয়ার্টারের গেটে পাড়ার সবাইকে নিয়ে ইট-কাঠ জড়ো করে বিশাল ব্যারিকেড দিলেন। অনেক বাঁশও কেটে আনা হলো। রাতে সেই বাঁশ ও সরঞ্জাম চার নম্বর ও তিন নম্বর বিল্ডিংয়ের ছাদে নিয়ে যাওয়া হলো।”

“এরপর শুরু হলো এক ঐতিহাসিক রাত। সারা রাত পালাক্রমে পাহারা চলল। নিজের সেই বন্দুকটি হাতে নিয়ে আব্বা নিজেই সেই পাহারার নেতৃত্ব দিলেন। তার সেই দৃঢ় অবস্থানের কারণেই ওই রাতে বিহারিরা স্টাফ কোয়ার্টারে হানা দিতে পারেনি।”

“আব্বা যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন ওই বিহারিরা স্টাফ কোয়ার্টারে পা রাখার সাহস পায়নি। তিনি ছিলেন আমাদের দেয়াল, আমাদের রক্ষাকর্তা”, নাছিমা খাতুন সীমা চোখ ছলছল করে বললেন।

পরিস্থিতি যখন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠল, ওহাব তার পরিবারকে নিরাপত্তার স্বার্থে পাঠিয়ে দিলেন সারিয়াকান্দি উপজেলার আওলাকান্দি গ্রামে। তার ঘনিষ্ঠজন ডাক্তার কোবাদ হোসেনের বাড়িতে তারা আশ্রয় নিলেন। সেটা ছিল ২০ এপ্রিলের পরের কথা। একদিন পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। দুপুরের পর গিয়ে পরদিন ভোরেই আবার ফিরে যান মালতীনগরের সেই কোয়ার্টারে। কে জানত, পরিবারের সঙ্গে ওটাই হবে তার শেষ দেখা!

সেই বিচ্ছেদের স্মৃতি আজও সীমার চোখে জল নিয়ে আসে। পুকুরে গোসল করার সময় বাবার আসার খবর পেয়ে দৌড়ে বাড়িতে ফিরেছিলেন ছোট্ট সীমা। মনে ভয় ছিল, পুকুরে বেশিক্ষণ ভেজার জন্য বাবা হয়তো বকা দেবেন। কিন্তু সেদিন ওহাব ছিলেন এক অন্য মানুষ। তার চোখে ছিল স্বাধীনতার দ্যুতি, যেন সন্তানদের দিকে তাকানোর চেয়েও বড় কোনো সত্য তাকে ডাকছে। তার মুখে তখন একটাই জপ, “বগুড়া স্টাফ কোয়ার্টার বাঁচাতেই হবে।”

শহীদ ওহাবের স্ত্রী রহিমা খাতুন, ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম।

সীমা সেই মুহূর্তটি বর্ণনা করতে গিয়ে শিউরে ওঠেন, “আজও জানি না ওইদিন আব্বার কীসের তাড়া ছিল। তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন তিনি আর ফিরবেন না? ফজরের নামাজের পর পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে একটি ছাতা হাতে আব্বা যখন বেরিয়ে গেলেন, তিনি একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকাননি। আমাদের দুই বোনের হাত ধরে মা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন। সেই যে আব্বা চলে গেলেন, দিগন্তের ওপারে বিলীন হয়ে গেল তার ছায়া। ফিরে আসবেন ভেবে আজও আমি আব্বার অপেক্ষায় থাকি।”

একাত্তরে বিহারিরা ঠিক কীভাবে তাকে হত্যা করেছিল, তার হাড়হিম করা বর্ণনা সীমা পেয়েছিলেন পরবর্তীকালে তার বাবার সহকর্মী আব্দুস সালামের কাছে। সালাম সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। ২৫ এপ্রিল, ১৯৭১। সকালের আলো তখনও ফোটেনি ভালো করে। ওহাব নিবিষ্ট মনে কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। ঠিক তখনই রসিক বিহারির নেতৃত্বে বিহারিরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পৈশাচিক উন্মত্ততায় স্টাফ কোয়ার্টারে আক্রমণ করে।

সালাম তাকে মিনতি করেছিলেন পালানোর জন্য। কিন্তু ওহাবের জবাব ছিল অবিচল, “বিহারিদের ভয়ে আমি পালাব না। আপনি পালান।” সালাম পাইপ বেয়ে নিচে নেমে আত্মরক্ষা করতে পারলেও ওহাব পারলেন না। ঘাতকরা তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে এলো কোয়ার্টারের মসজিদের সামনে।

সেই মসজিদের সামনেই ঘটে গেল ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ওহাব এবং তার বাসায় আশ্রয় নেওয়া এক হিন্দু পরিবারকেও সেখানে দাঁড় করানো হয়। রসিক বিহারির নির্দেশে প্রথমে তাদের ওপর চালানো হয় গুলি। কিন্তু রক্তপিপাসু ঘাতকদের তাতেও সাধ মেটেনি। গুলিবিদ্ধ দেহগুলোকে তারা নিষ্ঠুরভাবে জবাই করে। তারপর সেই নিথর শরীরগুলো ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় চার নম্বর বিল্ডিংয়ের পাশে বি-টাইপ বিল্ডিংয়ের অন্ধকার সেপটিক ট্যাংকের ভেতর। স্বাধীনতার পর সেই ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে যখন মানুষের মাথার খুলি বেরিয়ে এলো, কোয়ার্টারের সবাই তখন হাহাকার করে উঠেছিল, “এই তো সীমার আব্বার মাথা!” অথচ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও সেই বধ্যভূমিতে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে ওঠেনি। নেই তার আত্মত্যাগের কোনো স্বীকৃতি।

বগুড়ার তৎকালীন এসডিও স্বাক্ষরিত মৃত্যুসনদ এবং বগুড়া মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্রে আবদুল ওহাবের মৃত্যুর কারণ ‘শহীদ’ হিসেবে উল্লেখ থাকলেও, পরিবারটির দুই দুইবারের আবেদন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে। যে ভূমিকে তিনি ভালোবাসতেন, যে মাটির জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন, সেই মাটিই আজ তাকে ভুলে যেতে চাইছে।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button