মুক্তিযুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধে নারী: কাঠের বন্দুক দিয়েই শুরু সশস্ত্র মহড়া

টিপ টিপ আলোয় হারিকেন জ্বলছে। পাশে একটা রেডিও

মুক্তিযোদ্ধা রোকাইয়া খাতুন ছাত্র ইউনিয়ন করতেন তখন। ইপসু-মতিয়া গ্রুপে ছিলেন। ১৯৬৯-এর জানুয়ারির দিকে শুরু হয় ১১ দফা আন্দোলন। তখন সর্বদলীয় পরিষদ করা হয়েছিল। বটতলায় মিটিং শেষে রোকাইয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল লালবাগ স্কুলের। মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে চোখ ছলছল করে উঠলো এই মুক্তিযোদ্ধার।

রোকাইয়া বলেন, “ওখানে গিয়ে টিফিন টাইমে ঢুকে শিক্ষার্থীদের এগারো দফা বোঝানোই ছিল কাজ। কেন ১১ দফা, ১১ দফা বলতে কী বোঝায়, ছাত্রদের দাবিগুলো বোঝাতাম। ওদের প্রশ্নের উত্তরও দিতাম। আমরা স্কুলে টিফিন টাইমে যেতাম। স্কুল টিচাররা দেখত, কিন্তু কখনও বাধা দিত না। শিক্ষকরা আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিলেন না। প্রতিদিন শহীদ মিনার থেকে মিছিল বের হতো। সেটা চানখারপুল হয়ে পুরান ঢাকার বাহাদুরশাহ পার্কে গিয়ে শেষ হতো। এভাবে সব আন্দোলনেই যুক্ত ছিলাম।”

একাত্তর-পূর্ববর্তী ঘটনার কথা এভাবেই তুলে ধরেন মুক্তিযোদ্ধা রোকাইয়া খাতুন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজে তিনি ছিলেন এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার সূর্যকান্তি গ্রামে।

৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের পর স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সশস্ত্র প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়। ছাত্র ইউনিয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে। ডামি রাইফেলে ১০ দিনের ট্রেনিং করান মুজিবুর রহমান। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি করতেন, ইউটিসি ট্রেইন্ড ছিলেন। রোকেয়া কবির, নেলী ও রাকাসহ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে রোকাইয়া খাতুনরাও সেখানে প্রশিক্ষণ নেন। পরে ঢাকার রাজপথে ডামি রাইফেল হাতে মার্চপাস্টও করেছিলেন।

সে সময়ের স্মৃতি হাতড়ে রোকাইয়া বলেন, “এর পরই বলা হলো পাড়ায় পাড়ায় নারীদেরও ট্রেনিং করাতে হবে। আমার দায়িত্ব পড়ে খিলগাঁও চৌধুরী পাড়া পলিমা সংসদের পাশের এলাকায়। সেখানে ট্রেনিংয়ের আয়োজন করি। ২৫-৩০ জন নারীকে একত্রিত করে ট্রেনিং করাই সংসদের মাঠে। বাবাও তখন এয়ারফোর্স থেকে সবেমাত্র রিটায়ার্ড করেছেন। স্থানীয়দের অনুরোধে তিনিও পশ্চিম মালিবাগ ডিআইটি মাঠে অনেক লোককেই ডামি রাইফেল দিয়ে ট্রেনিং করিয়েছেন।”

২৫ মার্চ ১৯৭১। রোকাইয়া খাতুন তখন ছিলেন মালিবাগে। সেই ভয়াল রাতের কথা রোকাইয়া বর্ণনা করেন এভাবে, “রাত ১২টার পর চারদিকে গুলির আওয়াজ। আমাদের মালিবাগের বাসাটা তখন টিনশেড। আব্বা বললেন টিন তো ফুটো হতে পারে। সবাই গিয়ে ডাইনিং টেবিলের নিচে জড়ো হও। আমরা তাই করি। সারা রাত গুলিবর্ষণ হয়। মনে হচ্ছিল বৃষ্টির মতো গুলি পড়ছে। বাতি জ্বালানো যাবে না। তাই টিপ টিপ আলোয় হারিকেন জ্বলছে। একটা রেডিও ছিল। হঠাৎ একটা ঘোষণা শুনলাম- লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম ইজ ডেড। হিজ বডি ইজ লাইং উইথ আস। এটা আসলে ওরা ওয়্যারলেসে ট্রান্সমিট করছিল, যা রেডিও মিডিয়ামে ধরা পড়েছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি ছিলেন মোয়াজ্জেম। খবরটি শুনে বঙ্গবন্ধুর অবস্থার কথা চিন্তা করে আতঙ্ক বোধ করি আমরা।”

সারা রাত কাটে নানা শঙ্কায়। সকালে মেইন রোডে টহলে ছিল পাকিস্তান আর্মি। দূরে আগুনের ধোঁয়া দেখা যাচ্ছিল। পরে খবর আসে, নয়াবাজারে কাঠের দোকান পুড়িয়ে দিয়েছে ওরা। ২৭ মার্চ সকালে ২ ঘণ্টার জন্য কারফিউ তুলে নেয় আর্মিরা। তখনই তারা চলে যান পুরান পল্টন, বড় মামা আব্দুল মান্নানের বাড়িতে।

মুক্তিযোদ্ধা রোকাইয়া খাতুন নানাভাবে সহযোগী হন মুক্তিযুদ্ধের কাজে। পুরান পল্টন মামার বাড়িতে থাকার সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজে তাদের দেখাশোনা করতেন ইপসুর নির্মল দা। তার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ হতো নিয়মিত। তিনিই বলতেন টাকা তুলতে, কাপড়-চোপড় পেলে রাখতে। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পরিচিতদের কাছ থেকে টাকা আর কাপড় সংগ্রহ করতেন তারা।

একদিনের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে রোকাইয়া বলেন, “ঢাকা মেডিকেলেও যাই একদিন। তখনই দুটো লাশ আসে সেখানে। দেখেই আঁতকে উঠি। ডা. কবির আর ডা. আজহারের লাশ। নটর ডেম কলেজের পাশে কাঠেরপুলের নিচে তাদের মেরে ফেলে রাখা হয়েছিল। মেডিকেলে তখন দুটো সংগঠন ছিল- ‘অভিযাত্রী’ আর ‘অগ্রগামী’। ‘অগ্রগামী’ থেকেই একটা গ্রুপ বের হয়ে ‘ইপসু’ গড়ে। এটা মতিয়া গ্রুপ। আর মেমন গ্রুপ থেকে যায় ‘অগ্রগামী’ নামেই।”

“কবির ভাই ছিলেন অগ্রগামীর প্রেসিডেন্ট। আমরা তাদের লাশ দেখলাম। বীভৎস সে চেহারা। জিহ্বা বের হওয়া। খুব খারাপ লাগছিল দেখে। বুকের ভেতর প্রতিশোধের আগুনও জ্বলে ওঠে।”

“ডিসেম্বর মাস। সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ইন্ডিয়ান আর্মিসহ মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকার কাছাকাছি চলে এসেছেন। নির্মল দা খবর পাঠালে ১৩ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেলে যান তিনি। ওইদিন দেখা হয় ক্লাসমেট সিরাজের সঙ্গে। সে অগ্রগামীর সেক্রেটারি ছিল। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা আহত হলে সিরাজের কাছে খবর আসত। সে তখন ডা. রাব্বী স্যারকে গোপনে পাঠিয়ে দিতেন চিকিৎসার জন্য। ওইদিন ডা. রাব্বী স্যারের সঙ্গেও শেষ দেখাটা হয়।”

রোকাইয়া খাতুন বলেন, “আমাকে দেখেই স্যার বললেন, তুমি হোস্টেলে চলে আসো। ওটা সেফ। আমিও চলে আসব সেখানে। কিন্তু সেটা তো আর হলো না। ১৫ ডিসেম্বর সিরাজ আর রাব্বী স্যারকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি আর্মি।”

ওইদিন রোকাইয়া খাতুনকে বলা হলো হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চলে যেতে। স্ট্রিট ফাইট হবে, ঢাকার অলিগলিতে লড়াই চলবে, অনেকে হতাহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই সেখানে প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর তিনি ছিলেন হলি ফ্যামিলিতে। ১৬ ডিসেম্বর গোটা ঢাকা শহর একেবারেই চুপচাপ। শব্দ নেই কোনো।

রোকাইয়া খাতুন বলেন, “সন্ধ্যার পর হঠাৎ প্রায় ৩০-৩৫ জন আহত আসে হাসপাতালে। সেখানে ইন্ডিয়ান আর্মির এক কর্নেল, কিছু সৈন্য আর সাধারণ মানুষ ছিল। এরা গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আমরা দৌড়ে গিয়ে পরিষ্কার করে স্টিচ করলাম। কর্নেল সাহেবকে ওটিতে নিয়ে অপারেশন করে গুলি বের করে আনা হয়। পাক সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে তারা গুলিবিদ্ধ হন। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের শেষ মুহূর্তে আমরা কিছু অবদান রাখতে পেরেছি।”

তারপর ঢাকার পরিস্থিতি কেমন দেখেছেন জানতে চাইলে রোকাইয়া বলেন, “১৭ ডিসেম্বর হলি ফ্যামিলি থেকে বের হয়ে রিকশায় রওনা হই ঢাকা মেডিকেলের দিকে। কাকরাইল মসজিদের কাছে এসে দেখলাম স্তূপ করে রাখা হয়েছে মানুষের মাথার অনেক খুলি। দেখে খুব খারাপ লাগছিল। হাইকোর্টের মাজারের পাশে যখন গেলাম, তখন দেখি মুক্তিযোদ্ধারা প্লাটুন-ওয়াইজ যাচ্ছে শহীদ মিনারের দিকে। রিকশা থেকে নেমে একটা প্লাটুনের সঙ্গে যুক্ত হলাম। শহীদ মিনারে গিয়ে পেলাম পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের। মাহবুব জামাল ও রফিক প্রমুখ শহীদ মিনারের ওপর উঠে ছবি তোলে। স্বাধীনতার আনন্দে মুক্তিযোদ্ধারা আকাশের দিকে ফাঁকা গুলিও করে!”

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ৮ ডিসেম্বর ২০২৫

© 2025, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button