আদিবাসী

নাচোলের রানী ও সাঁওতাল কৃষকদের বিদ্রোহ

নাচোল বিদ্রোহের কথা আসলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইলামিত্রের ছবিটি। কিন্তু কি ঘটেছিল সে বিদ্রোহে? সে বিদ্রোহে সাঁওতালদের ভূমিকা কি ছিল? নানা তথ্যউপাত্ত থেকে জানা যায় নাচোল বিদ্রোহ ও সাঁওতাল কৃষকদের সংগ্রামের নানা কথা।

দেশ ভাগের পর মালদহ জেলার ৫টি থানা পূর্ব বাংলার রাজশাহী জেলার সঙ্গে এসে যুক্ত হয়। যুক্ত হওয়া পাঁচটি থানা হলো নবাবগঞ্জ, ভোলাহাট, শিবগঞ্জ, নাচোল ও গোমস্তাপুর। এই অঞ্চলের আধিয়ার বর্গাচাষীদের মধ্যে যেই অভ্যুত্থান দেখা দিয়েছিল, ইতিহাসে তা নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ নামে খ্যাত।
নাচোল বিদ্রোহ জানার আগে একটু পেছন ফিরে তাকাতে হবে। কথা আসে সাঁওতাল বিদ্রোহের। যা দমন করতে ব্রিটিশ সরকার সাঁওতাল পরগনায় বিক্ষুব্ধ কৃষকদের রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দিয়েছিল। সে সময় বহু সাঁওতাল সরকারের অত্যাচারের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে প্রিয় জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে ছড়িয়ে পড়েছিল চারপাশে। ধারণা করা হয় সে সময় তারা বাংলাদেশের মালদহ, বীরভূম প্রভৃতি জেলায় এসে আশ্রয় নেয়। পালিয়ে বাঁচলেও সাঁওতালদের মন থেকে তখনও হারিয়ে যায়নি বিদ্রোহের স্মৃতি। বরং যে কোনো বিপদেই সেই স্মৃতি তাদের রক্তের মধ্যে ঝংকার দিয়ে তুলত।
এক সময় সাঁওতালরা তাদের নিজভূমিতে স্বাধীনভাবে আনন্দ-হাসিতে বসবাস করত। জন্মসূত্রে পাওয়া জমিকে তারা জানত নিজেদের জমি হিসেবে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জমিতে ফসল ফলাত। বাহীর থেকে কেউ সে ফসলে ভাগ বসাতে পারত না। তারপর এক সময় কোথা থেকে নেমে এলো সরকার, জমিদার, জোতদারÑ যাদের হাতে কাগজপত্র, তারাই নাকি জমির মালিক। সাঁওতালদের কাছে নেই কোনো কাগজ। তাই তাদের সবকিছু থেকেও নেই। যদি জমি চাষ করতে হয়, তবে তাদের কাছ থেকে জমি নিতে হবে, আর ফসল ফলালে

তার একটা মোটা ভাগ তাদের গোলায় পৌঁছে দিতে হবে। এটাই নাকি আইন। এই আইন না মানলে ঘরবাড়ি ভেঙে তাড়িয়ে দেয়া হয়, ধরে বেঁধে জেলাখানায় আটক করে রাখা হয়। এমনকি খুন করেও ফেলা হয়। এটাই ছিল আইন।
শুধু তাই নয়। যে সব জায়গা নিবিড় বন-জঙ্গলে পূর্ণ ছিল, যেখানে বাঘ-ভালুক আর সাপ খোপের ভয়ে কেউ প্রবেশ করতে সাহস করত না, জমিদার আর জোতদাররা সেই সমস্ত জায়গায় এদের মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে নিয়ে আসত। আর এই সরলপ্রাণ সাঁওতালরা অনেক আশা নিয়ে আসত, জীবনের মায়া বিসর্জন দিয়ে এই দুর্গম অঞ্চলকে আবাদ করে সোনার ফসল ফলাত। কিন্তু বছর কয়েক যেতেই তাদের জানিয়ে দেয়া হতো এই জমির ওপর তাদের কোনো স্বত্ব নাই। তাদের হাতে তৈরি জমি দিয়ে, তাদেরই মজুর খাটিয়ে জোতদারদের উপস্বত্ব দিন দিন বেড়ে চলল। আর এই হতভাগা সাঁওতালরা মজুরি খুঁজে খুঁজে বেড়াত। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে মাঝে মধ্যেই ঠোকাঠুকি হতো। কিন্তু জোতদারদের শক্তি ছিল বেশি। কিছুতেই তাদের সঙ্গে পেরে উঠত না সাঁওতালরা।
১৯৩০-১৯৩২ সাল। ভারতবর্ষে তখন স্বাধীনতার আন্দোলন চলছে। মালদহের সাঁওতাল কৃষকদের মাঝেও সে আন্দোলনের ছোঁয়া পড়ে। সাঁওতালরা স্বপ্ন দেখে, তাদের স্বাধীন রাজ্য হবে, সেই রাজ্যে তাদের জমির ক্ষুধা মিটাবে, তাদের জমির ওপর কারো স্বত্ব থাকবে না। কোনো জমিদার, জোতদার আর মহাজন তাদের ওপর কোনো জুলুম,নির্যাতন করতে পারবে না। জিতু সরদার ছিল তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা। তার ডাকে মালদহের সাঁওতাল কৃষকরা দলে দলে লড়াই করতে এগিয়ে আসে। তাদের হাতিয়ার ছিল লাঠি, বল্লম, তীর-ধনুক আর বুক ভরা সাহস। আর সরকারের পুলিশবাহিনীর হাতে ছিল রাইফেল। ফলে বহু সাঁওতাল মারা পড়ল। সাঁওতালদের স্বপ্নেরও সে যাত্রায় ইতি ঘটল।
ষোল বছর কেটে গিয়ে আসে ১৯৪৮ সাল। নাচোলের কৃষকদের আন্দোলন শুরু হয় এ বছর। এই বিদ্রোহ আর আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন জিতু সরকারের অন্যতম বিশিষ্ট সহকর্মী রামু সরকার।
নাচোল অঞ্চলে সে সময় ছিল ক্ষমতাধর জোতদাররা। তারা ছিল দু-চার হাজার বিঘা জমির মালিক। কৃষকরা সবাই ছিল ভাগচাষী। ফলে জোতদারদের অনুগ্রহের ওপর এদের নির্ভর করতে হতো। জোতদাররা খুশি হলে জমি দিত আবার যে কোনো সময় যে কোনো কারণে তাদের জমি ছুটিয়ে নিত। হিন্দু, মুসলমান, সাঁওতাল নির্বিশেষে সকল ভাগচাষীদের উপরেই এই শোষণ চলত।সে সময় মালদহ জেলার কৃষক সমিতির সম্পাদক ছিলেন কমরেড রমেন মিত্র। নবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুর গ্রামের এক জমিদার পরিবারের ছেলে তিনি। নাচোল বিদ্রোহের প্রধান সংগঠক ছিলেন তিনি। শুধু রমেন মিত্র নয়। এখানকার আন্দোলন পরিচালনার জন্য সে সময় গোপনে কাজ করতে রাজশাহী থেকে আসে অনিমেষ লাহিড়ী, ফনী,শিবু, কোড়ামুদি, বৃন্দাবন সাহা প্রমুখ।
আন্দোলনের মূল জায়গা ছিল নাচোল থানার চন্ডীপুর গ্রাম। এই গ্রামেই সাঁওতাল নেতা মাতলা সরদারের বাড়ি। নাচোল কৃষক বিদ্রোহে মাতলা সরদার এক উল্লেখযোগ্য নাম। প্রধানত তাঁকে অবলম্বন করেই এ অঞ্চলের সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এই অঞ্চলের সাঁওতাল কৃষকদের ওপর তাঁর যথেষ্ট প্রভাব ছিল। মাতলা সরদার অনেক বৈঠক ও সভা সমিতিতে উপস্থিত থাকতেন এবং সাঁওতালী ভাষায় বক্তৃতা দিতেন। তার বক্তৃতা সাঁওতাল কৃষকদের মধ্যে উম্মাদনা সৃষ্টি করত। তখন তার বয়স ছিল পঞ্চাশের মতো।
মাতলা সরদারের সঙ্গে রমেন মিত্রের ছিল বিশেষ সম্পর্ক। তাঁদের এই সম্পর্কের মধ্যে কোনদিনও চিড় ধরেনি। এ অঞ্চলের ভাগচাষীরা, বিশেষ করে সাঁওতাল কৃষকরা রমেন ও তার সহকর্মীদের একান্ত আপনজন হিসেবে ভাবত।
রমেন মিত্রের স্ত্রী ছিলেন ইলামিত্র। তিনি শুধু রমেন মিত্রের জীবনসঙ্গিণী ছিলেন না। ছিলেন একই আদর্শে দীক্ষিত, একই সংগ্রামের সাথী। এই আন্দোলন যখন শুরু হয় তখন তার বয়স ছিল ২৪। পাশাপাশি একটি শিশুপুত্রের জননী। জমিদার বাড়ির সংসার ও পুত্রের মায়া কাটিয়ে আন্দোলনের প্রয়োজনে তিনি চলে আসেন সরল প্রাণ সাঁওতাল চাষীদের মাঝে। ইলামিত্রকে পেয়ে সাঁওতাল কৃষকরা নতুন শক্তিতে শক্তিমান হয়ে ওঠে। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবাই তাকে ‘রাণী মা’ নামেই ডাকত। তিনি অল্প সময়ের মধ্যে সাঁওতালি ভাষাকে আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। সবার সঙ্গে তিনি মিশতেন সমানভাবে। সাঁওতাল কৃষকরা নিজের মাতৃভাষায় তার সঙ্গে মন খুলে কথা বলত। ফলে ইলামিত্র হয়ে ওঠে সাঁওতাল কৃষকদের নয়নমণি।
তেভাগার দাবি নিয়ে তখন আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলনের পিছনে ছিল ভূমিহারা চাষীদের বহুদিনের সঞ্চিত বিক্ষোভ এবং জমির জন্য অদম্য ক্ষুধা, যেই জমি তাদের হাত থেকে বিভিন্ন সময়ে ছলে, বলে, কৌশলে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। এক পর্যায়ে নাচোল ও নবাবগঞ্জ থানার বেশকিছু জায়গায় তেভাগার বিধান কার্যকরী হয় এবং কৃষক সমিতির আওতায় চলে আসে।
চন্ডীপুর ছিল কৃষক সমিতির মূল কেন্দ্র। সেখানে প্রতিদিন চার-পাঁচশ কৃষক পাহারারত ছিল। সেখানকার রিপোর্ট পেয়ে সরকারি মহল হতচকিত হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা জানত না কৃষকদের সংঘবদ্ধ শক্তির ক্ষিপ্রতা কতটুকু। সেখানকার অবস্থা সামাল দিতে একজন দারোগা ও পাঁচজন সশস্ত্র পুলিশকে পাঠানো হলো। তাদের প্রত্যেকের হাতে ছিল রাইফেল। এই সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীকে আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসতে দেখে সাঁওতাল কৃষকরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। কৌশলে প্রথমে কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে পথ করে দিল তারা। পুলিশের দল পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল তাদের চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে সাঁওতাল কৃষকরা। ফলে শুরু হয় সংঘর্ষ। পুলিশ মরিয়া হয়ে গুলি করতে লাগল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। সেই সংঘর্ষে পাঁচজন পুলিশ আর একজন দারোগা সবাই মারা পড়ল।
এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বতন সরকারি মহল তৎপর আর সক্রিয় হয়ে উঠল। বহু সশস্ত্র সৈন্য নাচোল থেকে আট মাইল দূরে আমনুরা স্টেশনে এসে পৌঁছায়। তারা দলে দলে বিভক্ত হয়ে গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিতে লাগল, যাকে সামনে পেল তাকেই মারল। সাঁওতাল কৃষকরা বর্শা, বল্লম ও তীর-ধনুক দিয়ে তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো।
সৈন্যদের আক্রমণটা ছিল বিশেষভাবে সাঁওতাল কৃষকদের উপরে। চ-ীপুর গ্রামের ওপর তাদের আক্রোশ ছিল সবচেয়ে বেশি। সৈন্যদের অতর্কিত আক্রমণে খুব কম লোকই সেখান থেকে পালিয়ে আসতে পারল।
সে সময় রমেন আর ইলা মিত্র বিভিন্ন এলাকায় ছিলেন। কয়েকশ জঙ্গি সাঁওতালসহ রমেন আর মাতলা সর্দার নিরাপদে বর্ডারের ওপাশে চলে আসল। কিন্তু ধরা পড়তে হলো ইলা মিত্রকে। ইলামিত্র তিন-চারশ সাঁওতালদের নিয়ে বর্ডার পার হয়ে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে পথ দেখিয়ে নেয়ার মতো লোক ছিল না। ফলে ভুল পথে চলতে চলতে রহনপুর স্টেশনের কাছে এসে ইলামিত্রকে ধরা পড়তে হলো। ইলা মিত্রের বিরুদ্ধে আগেই হুলিয়া জারি করা ছিল। ফলে তার ওপর চালানো হয় নিদারুণ অত্যাচার। অত্যাচার আর নির্যাতনের মধ্যেও আদর্শের প্রতি অবিচল ছিলেন ইলামিত্র।
এর পরের ইতিহাস হচ্ছে জেলজুলুম বিচারের প্রহসন। বহু সাঁওতাল ও অন্যান্য কৃষক বন্দি হন। অনেকেই পালিয়ে যান ভারতে।
নাচোল কৃষক বিদ্রোহ মূলত ছিল একটি আঞ্চলিক বিদ্রোহ। কিন্তু তাদের দাবি-দাওয়া ছিল জাতীয় ভিত্তিক। একথা ঠিক যে, নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছে- তেভাগা ও সাত আড়ি জিন এই মূল দাবি অর্জিত হয়নি। তবে কৃষক আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত জমিদারি প্রথাকে উচ্ছেদ করেছিল।

লিখাটি প্রকাশিত হয়েছে সাপ্তাহিকে ২৪ নভেম্বর ২০১১

© 2011 – 2018, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button