মুক্তিযুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই পথ দেখাবে

সংসারটা বড় ছিল। সাত ভাই, এক বোন; তিন নম্বরে আমি। বাবার গৃহস্থীর টাকায় পরিবার চলত না। সংসারে ছিল অভাব। বড় ভাইরা মাইনসের বাড়িত কাম করত। আমিও রাখালি খাটতাম। মাসে পাইতাম পাঁচ টাকা। ছুটু বেলায় দুরন্ত আছিলাম। খেলার সাথী ছিল বন্ধু সিদ্দিক আলী, মঞ্জব আলী, রওশন আলী প্রমুখ। আমরা বল খেলতাম খুব। কিন্তু আসল বল কেনার টাকা ছিল না। জাম্মুরাই ছিল ভরসা।

“বয়স তহন ছয়। হঠাৎ মা মারা যান। লাশের পাশে বইসা বাবা ও ভাইরা অনেক কাদছে। ওই দৃশ্য মনে গাঁইথা আছে। এরপর বাবা আরেকটা বিয়া করেন। সৎ মা হইলেও উনি বালা আছিল। আমাগো আদর-যত্ন করত। বাবায় আমারে ভর্তি করায় ফকিরাবাদ প্রাইমারি স্কুলে। কয়েক ক্লাস পড়ার পর ঘটে একটা ঘটনা। স্কুলে একদিন পড়া পারি না। মাস্টার দিল মাইর। এমন ভয় পাইছি। এরপর আর স্কুলে যাই নাই। বড় ভাইরাও লেহাপড়া করত না। তাই স্কুলে যাইতে কেউ আর চাপ দেয় নাই। এইভাবে বন্ধ হয়ে যায় আমার লেহাপড়াডা।

“তহন করমু কী? কামও করি না। গান বাজনা শুনতে বন্ধুগো লগে এদিক-ওদিক যাই। পূজা আর দিবানীতে যাত্রা দেহি রাইত জাইগা। একদিন বাড়িত ফিরতেই ভাইরা গালাগালি করে। রাগে বাবায়ও দেয় মাইর। আমিও চেইতা যাই। এক কাপড়ে বের হই বাড়ি থাইকা। বাসে চাইপা সোজা চলে যাই ঢাকার জিগাতলায়। দূর সম্পর্কের এক চাচা সিরাজ আলীর বাসায়।”

বাড়ির ছাড়ার ঘটনার কথা বলছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. আচকির আহমেদ। তাঁর বাবার নাম আহছান উল্লাহ। মা জহুরা খাতুন।

আচকিরের বাড়ি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সোয়ারগাও গ্রামে। এক বিকেলে তাঁর বাড়িতে বসে চলে আমাদের আলাপচারিতা। জীবনসংগ্রাম ও যুদ্ধদিনের নানা ঘটনার কথা তুলে ধরেন তিনি।

গুলিবিদ্ধ হয় মুক্তিযোদ্ধা আচকির আহমেদের হাতের কব্জি
গুলিবিদ্ধ হয় মুক্তিযোদ্ধা আচকির আহমেদের হাতের কব্জি

ঢাকায় গিয়েও চাচা সিরাজ আলীর সঙ্গে দেখা হয় না তাঁর। তিনি ছিলেন রেঞ্জ অফিসার। পোস্টিং তখন সুন্দরবনে। ঠিকানা নিয়ে আচকিরও চলে যান তাঁর কাছে। বনের ভেতর করমজাল নামে একটা অফিসে খুঁজে পান তাঁকে। ডাংমারিতেও ছিল তাঁর আরেকটা অফিস।

বারো বছর বয়সেই আচকির মোজাহিদ ও আনসার ট্রেনিং নেন। ট্রেনিং হয় যথাক্রমে শ্রীমঙ্গল ও হবিগঞ্জে। ফলে রাইফেল চালানো তাঁর আগেই জানা। সুন্দরবনে চাচার একটি সরকারি বন্দুক ছিল। সেটা নিয়ে তিনি তাঁর সঙ্গে সঙ্গেই থাকতেন। মাঝেমধ্যে শিকারেও যেতেন। পরে চাচা বদলি হলে তাঁর সঙ্গে আচকিরও চলে যান চট্টগ্রামের করেরহাটে। সত্তরের দিকে তিনি বিয়ে করেন ফেনির সোনাগাজিতে।

 সে সময় দেশের অবস্থার কথা জানান এই যোদ্ধা। তাঁর ভাষায়–

“তহন পশ্চিমাদের লগে গেঞ্জাম শুরু হইছে। ওগো পক্ষে ছিল বিহারি আর মুসলিম লীগের লোকেরা। রাজনীতি কী জিনিস বুঝতাম না। মুজিবের কথা শুনতাম। মানুষ মিছিল করত, কথা কইত, সেখান থাইকাই জানি। করেরহাটে বাঙালি-বিহারি রায়ট হইছিল। তহন চট্টগ্রাম শহরে চইলা আসি। চকবাজারের কাছে দেখছি মাইনসের শত শত লাশ। একবার লালখা বাজারে আলমাস সিনেমা হলের কাছেও আওয়ামী লীগের লোকদের লগে সংঘর্ষ হয় বিহারি ও মুসলিম লীগের। এ দেশের মানুষরে এভাবে মারতাছে ওরা। এগুলো দেখতে বালা লাগত না। চিন্তা করতে থাকি। ভেতরে চেতনাও জাগতে থাকে।”

মুক্তিযুদ্ধ তখন শুরু হয়ে গেছে। পাকিস্তানি সেনাদের অস্ত্রবোঝাই একটা ট্রাক যাচ্ছে আন্দরকিল্লা দিয়ে। খবর পেয়ে আওয়ামী লীগের লোকেরা সেটা আটক করে। অস্ত্র লুটে নেয় যে যার মতো। বন্ধু মোস্তফার সঙ্গে আচকিরও একটা অস্ত্র নিজের কাছে রাখে। কিছুদিন পরেই চারপাশ থেকে পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করতে থাকে। তিনি তখন চলে যান ফেনিতে। খাজু মিয়ার নেতৃত্বে অংশ নেন প্রতিরোধ যুদ্ধে।

ইন্টারভি‘র ভিডিও দেখতে : https://www.youtube.com/watch?v=e-sLTqJwc74&feature=youtu.be

বাকি ইতিহাস শুনি আচকিরের জবানিতে–

“পাকিস্তানি সেনাদের কাছে আমরা টিকতে পারি না। পাঁচদিন পর চলে যাই সোনাগাজির শস্যনাপুর গ্রামে, শ্বশুরবাড়িতে। ওখানে সবাই ছিল আওয়ামী লীগার। মুসলিম লীগের কেউ নাই। কাদির ছিল ওই এলাকার নামকরা রাজাকার। বাড়ি বক্তারমুন্সী। ওরা যুবক ছেলেদের জোর ধরে নিয়ে রাজাকারের ট্রেনিং দিত। কেউ রাজি না হলেই তাঁকে মেরে ফেলত। সিলোটি বলে আমারে সবাই চিনত। আওয়ামী লীগের পক্ষের সেটাও জানত। বাড়িতে আসার দুদিন পরেই রাজাকাররা আমার খোঁজ করতে থাকে। এভাবে থাকলে তো মরতে হবে। সিদ্ধান্ত নেই যুদ্ধে যাওয়ার।

আচকির আহমেদের মাথায় গুলিরবিদ্ধ হওয়ার চিহ্ন
আচকির আহমেদের মাথায় গুলিরবিদ্ধ হওয়ার চিহ্ন

“স্ত্রী শরিফাও সাহস দিল। মায়া ভুলে আমারে একদিন বিদায় জানাইল। তহন ধুমঘাট নদী পাড় হয়ে চলে যাই প্রথমে ভারতের বগাপাড় এবং পরে বাগমারা ট্রেনিং ক্যাম্পে। আগে মোজাহিদ ও আনসার ট্রেনিং থাকায় আমাকে তারা ট্রেনিং করায় না। তিনদিন থাকি ওই ক্যাম্পে। অতঃপর একটা দলের সঙ্গে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ফিল্ডে।”

মুক্তিযোদ্ধা আচকির যুদ্ধ করেন ২ নং সেক্টরে। তিনটি গ্রুপ ছিল সেখানে। মোশারফ মিয়ার গ্রুপ, গোলাম রসুলের গ্রুপ আর কাইয়ুমের গ্রুপ। প্রতি গ্রুপে ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ছিলেন গোলাম রসুলের গ্রুপে। অপারেশনের সময় তিনটি গ্রুপ তিন দিক দিয়ে অ্যাটাক করত। তাদের কমান্ড করতেন ল্যাফটেনেন্ট কর্নেল মাইজুর রহমান। এভাবে তাঁরা অপারেশন করেন সোনাগাজির নবাবপুর, মতিগঞ্জ, থানা হাসপাতালসহ বিভিন্ন এলাকায়।

 এক দুঃসাহসিক অপারেশনের কথা জানান আচকির।

“রাইফেল চালাইতাম থ্রি নট থ্রি। গেরিলা ছিলাম। দিনের বেলা লুকিয়ে থাকতাম। রাতে চলত অপারেশন। চর এলাকায় আত্মগোপন করতাম বেশি। সাধারণ মানুষ সাহায্য না করলে বাঁচতে পারতাম না। নবাবপুরে ছিল জাইলা বাড়ি। ওটা পাকিস্তানি সেনারা জ্বালায়া দিছে। খবর পেয়ে আমরাও এগোই। হঠাৎ ওরা মুখোমুখি হয়ে যায়। গুলি ছুড়ে। আমরাও পজিশনে থেকে জবাব দেই। আমরা আইলের মধ্যে। ওরা উঁচুতে, গাছের আড়ালে। সারা দিন ফাইট চলে। গুলিও শেষের দিকে। কী করব ভাবছি। তখন দুমঘাট নদীর ওপার থেকে আরও তিনটা গ্রুপ এসে আমগো হেল্প করে।

“ওরা না এলে ওই যুদ্ধেই মারা যেতাম। তিনজন যোদ্ধাকে হারিয়েছি সেখানে। মাথায় গুলি লেগে ছটফট করতেছিল তাঁরা। একটু এগিয়েও যেতে পারি নাই। কাচা তিনটা লোক। সারা দিন একসাথে থাকতাম। মনের ভেতর ঝড় ওঠে। নিজের জীবনরে তহন জীবন মনে হত না। ওই ফাইটে গোল মোহাম্মদ নামের এক পাকিস্তানি সেনাকে আমরা ধরে ফেলি। ওর কল্লা কেটে লাশ পাঠায়া দেই ইন্ডিয়ায়।”

১৯৭১ সালে এক অপারেশনে গুলিবিদ্ধ হন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। পাকিস্তানি সেনাদের গুলি লাগে তাঁর বাম হাতের কব্জি ও মাথায়। বাম হাতে এখনও স্বাভাবিক কাজ করতে পারেন না। কীভাবে ও কখন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন সে খেয়ালও তাঁর ছিল না। মনের ভেতর তখন প্রতিশোধের আগুন। মানুষকে বাঁচাতে হবে। মুক্ত করতে হবে প্রিয় দেশকে।

কী ঘটেছিল রক্তাক্ত ওই দিনটিতে?

“অগ্রহায়ণ মাস শেষ হতে তখনও বাকি। সোনাগাজি থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে ফেনিতে। রাস্তার পুবদিকে আমরা। তিনটা গ্রুপ এক সাথে। যুক্ত হয়েছিল শাহজাহান ও মজিব আলী চৌধুরির গ্রুপ দুটিও। পাকিস্তানি সেনারা ক্যাম্প করে মতিগঞ্জের এক কলেজে ও সিও অফিসে।

“মানিক নামে এক রাজাকার দুইজন মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে পাকিস্তানি সেনাদের ওই ক্যাম্পে। এ খবর আসে আমাদের কাছে। রক্ত তখন টলমল করে ওঠে। যেভাবেই হোক মেয়ে দুটাকে উদ্ধার করতে হবে। এমনটাই ছিল আমাদের শপথ।

আচকির আহমেদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ
আচকির আহমেদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ

“রাত তখন আড়াইটা। তিনদিক থেকে আমরা আক্রমণ করি। ফায়ার ওপেন করতেই ওরা পাল্টা জবাব দেয়। প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছিল। মুুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের কাছে তারা টিকতে পারে না। ভোরের দিকে ওরা পিঁছু হটতে থাকে। আমরাও সিও অফিসে উঠে যাই। অফিসের পেছনে টিন দিয়ে ঘেরা একটা রুম তৈরি করা হয়েছিল। ওখানেই মেয়েদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চলত। কিন্তু আমরা ওখানে কাউকেই পেলাম না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর রেজেস্ট্রি অফিসের বাথরুম থেকে মেয়ে দুজনকে উদ্ধার করি।

  “তারা ছিল বিবসন অবস্থায়। শরীরে ছোপছোপ রক্ত। একজনের একটা স্তন কাটা। দুজনের সারা শরীর সিগারেটের আগুনে পোড়া। ওদের দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারি নাই। তখনও বুঝে নাই গুলি খেয়েছি। মেয়ে দুজনকে উদ্ধারের পর সবাই বলে, ‘তোর তো গুলি লাগছে।’ দেখি বাম হাত ও মাথা রক্তে ভিজে গেছে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার চেয়েও কষ্ট ছিল মেয়ে দুটিকে দেখা।

“পরে চিকিৎসা চলে সোনাপুর চরে, ডাক্তার হুদা মিয়ার কাছে। এক সপ্তাহ রেস্ট। অতঃপর ফিরে আসি রণাঙ্গনে। বৈরাগি বাজার থেকে রাজাকারদের ধরে এনে রাখছিলাম বক্তারমুন্সি বাজারের পাশের এক স্কুলে। ওই দিনই খবর আসে দেশ স্বাধীনের। মনে হয়েছে বুকের ভেতর থেকে যেন একটা কষ্টের পাহাড় নেমে গেছে। ওই আনন্দের কথা বুঝাতে পারমু না।”

স্বাধীনের পর আচকিররা অস্ত্র জমা দেন ছাগলনাইয়া মিলিশিয়া ক্যাম্পে। ভেবেছিলেন সরকার তাদের কাজের ব্যবস্থা করে দিবেন। কিন্তু সেটা আর হল না। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের টিকে থাকার আরেক যুদ্ধ। সে যুদ্ধের কাহিনি ছিল আরও কষ্টের। অভাবের তারণায় তিনি চলে আসেন ঢাকায়। কাজ নেন গাড়িতে।

তখন ১৮০৩ আর ২৭৪৫ নম্বরের দুইটা গাড়ি চলত ঢাকা থেকে রায়পুরে। সোবহান সাহেব ছিলেন মালিক। মুক্তিযোদ্ধা আচকির ওই গাড়িতেই কন্ট্রাকটারির কাজ করেছেন ১৭ বছর। কত মানুষের গালি শুনেছেন। রাজাকারদের টিটকারি আর অবজ্ঞার হাসিটাও সহ্য করেছেন মুখ বুঝে।

সে কথা বলতে গিয়ে কান্না জড়িয়ে যাচ্ছিল আচকির কণ্ঠ। বীর এই যোদ্ধা বলেন–

সপরিবারে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আচকির আহমেদ
সপরিবারে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আচকির আহমেদ

“অস্ত্র জমা দিছি। গ্রামে ফিরেছি খালি হাতে। তখন ভয় পাইতাম। যুদ্ধের সময় কারও ভাইরে মারছি। কারও বাবাকে। এহন যদি ওরা আক্রমণ করে। আশা ছিল সরকার কিছু করব। যুদ্ধ শেষে উদ্ধার করা সোনার একটা বস্তা গোলাম রসুল, আমি আর শাহাবুদ্দিন তুলে দিছিলাম জয়নাল হাজারি ও এসডিও সাহেবের হাতে। তখন সুযোগ ছিল। কিন্তু একটা সুতাও এদিক-ওদিক করি নাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় টাকার বস্তাও লাথি দিয়ে ফেলে দিছি। অন্যায় করতে শিখি নাই। বংশের ভেতরও লুটপাট নাই। তাই ভাঙা বাড়ি ভাঙাই আছে। কিন্তু পরিবার তো চালাতে হবে। হাত পাততে তো শিখি নাই। আমগো জীবনের যুদ্ধ তাই আজও শেষ হয় নাই।”

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রসঙ্গে আচকির বলেন, “একটা বিরাট চক্র মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা বাড়াইছে। যারা একাত্তরে বাড়িতে ঘুমায়া ছিল, মুক্তিযুদ্ধ কী জিনিস, জানে না, এহন হেরাও মুক্তিযোদ্ধা হইছে। দোষ শুধু সরকারের না, মুক্তিযোদ্ধাগোও। টাকা আর ক্ষমতার লোভে যারা ভুয়াদের শনাক্ত করেছে তারা কি মুক্তিযোদ্ধা? এহন যদি বলা হয় মুক্তিযোদ্ধারা কোনো সুবিধা পাইব না। তহন দেখবেন কয়জন নিজেরে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে।”

পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলেন এই সূর্যসন্তান। তাঁর ভাষায়–

“সোনাগাজিতে রেডিওতে শুনি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি…তোমাদের যার যা কিছু আছে…’– এই ভাষণই মানুষের বিবেকে নাড়া দেয়। ভাষণ শুনেই ওই দিন দেশের জন্য উন্মাদ হয়েছিলাম। আরেকবার উন্মাদ হই তাঁর হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে। পৃথিবীতে এমন নেতার জন্ম বার বার হয় না। বঙ্গবন্ধুর সব খুনির বিচার করা না গেলে তাঁর আত্মা কিন্তু শান্তি পাবে না।”

  “শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেই চলবে না, তাঁদের দল জামায়াত-শিবিরেরও বিচার করতে হবে। নিষিদ্ধ করতে হবে। তা না হলে এ দেশে তারা শান্তি আনতে দিবে না। যাদের গোড়া পাকিস্তানে তারা কি চাইব দেশে শান্তি থাককু? একাত্তরে ওরা কী করেছে সেটা মুক্তিযোদ্ধারা জানে। সব সহ্য হয় কিন্তু রাজাকারগো সহ্য করতে পারি না।”

স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাল লাগার অনুভূতি জানতে চাই আমরা। উত্তরে মুক্তিযোদ্ধা আচকির বলেন–

“দেশের চেহারাই তো বদলে গেছে আজ। সারা পৃথিবীতে আমাদের ছেলেমেয়েরা ভাল করছে। বিশ্ব ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এখন আর আমাদের ব্রিজ করতে হয় না। আমার দেশের খেলোয়াড়রা সারা বিশ্বে দেশের পাতাকাকে সম্মানিত করছে। এসব দেখলে মন ভরে যায় ভাই।”

খারাপ লাগে কখন?

“ঘুষ আর দুর্নীতি তো কমে নাই। টাকা ছাড়া চাকুরি হয় না। আগে ধনী ছিল হাতেগোনা। এখন গুইনা শেষ করা যায় না। গাড়ি হইত সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তির। এখন তো চোরচোট্টা, গুন্ডা, বদমাশেরই সবচেয়ে দামি গাড়ি। যে যত অনিয়ম আর অসৎ সে তত ধনী। এমনটা তো আমরা চাই নাই।”

কেমন দেশ দেখতে চান?

মুক্তিযোদ্ধা আচকির উত্তর, “বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা চাই। যেখানে ধনী-গরিবের ভেদাভেদ থাকবে না। মানবতা থাকবে সবার ওপরে। তেমন দেশের জন্য কাজ করতে হবে সবাইকে।”

নানা সমস্যা অতিক্রম করে দেশটা তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাবে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে। এমনটাই স্বপ্ন দেখেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. আচকির আহমেদ। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন–

“তোমরা লেখাপড়া শিখে বড় মানুষ হও। দেশের পাশে থেক। আমাদের গৌরব আর অর্জনের ইতিহাসটি ভুলে যেও না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই তোমাদের পথ দেখাবে।”

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ২১ নভেম্বর ২০১৬

© 2016 – 2018, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button