কলাম

মনে আছে তারা একাত্তরে কী করেছিল

ইতিহাস যখন বর্তমানের মুখোমুখি! শান্তি কমিটি, রাজাকার আর আলবদরের নৃশংসতা কি কেবলই অতীতের গল্প, নাকি বর্তমান রাজনীতিরও এক বড় সতর্কবার্তা?

“মনে আছে তো একাত্তরে কী করেছিল?”

বুধবার বিকালে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না’ বলা দলের বিরুদ্ধে সজাগ থাকার অনুরোধ জানিয়ে এ কথা বলেছেন। এটি যে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলা সেটি বেশ স্পষ্ট। কেননা গত শনিবার চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে এক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির বিএনপিকে নিশানা করে বলেছিলেন, “বিএনপি সরকারকে বেশি দিন সুযোগ দেওয়া হবে না। সময় খুব সীমিত। সময় ফুরিয়ে আসছে। এই সময়ের মধ্যে পরিবর্তন না হলে পরিণতির জন্য প্রস্তুত হতে হবে।”

তাহলে কি প্রধানমন্ত্রী জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ওই কথারই জবাব দিলেন একাত্তর প্রসঙ্গ টেনে। মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কথাই কি তিনি মনে করতে বলছেন?

প্রাসঙ্গিক হওয়ায় চলুন একাত্তরের একটি ঘটনার দিকে দৃষ্টি ফেরাই।

যশোরের শার্শা উপজেলার নাভারণ রেল বাজার। একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে এই জনপদ সাক্ষী হয়েছিল এক মহৎ প্রাণের আত্মত্যাগ আর এক ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতার। সেই ইতিহাসের মহানায়ক শার্শা থানার প্রথম শহীদ ডা. আজিজুর রহমান। একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর কবীরের পিতা তিনি।

একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ছিলেন তিনি। তবে তার কাছে চিকিৎসা কেবল পেশা ছিল না, ছিল আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে সঁপে দেওয়ার ব্রত। এলাকায় তিনি একজন অজাতশত্রু, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্ত চেতনায় বিশ্বাসী রাজনীতিসচেতন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। চিকিৎসা সেবা দেওয়া ছাড়াও তার নিত্যদিনের প্রিয় কাজ ছিল স্থানীয় লাইব্রেরিগুলো থেকে বই ও পত্র-পত্রিকা সংগ্রহ করে পড়াশোনা করা।

একাত্তরে যখন দেশমাতৃকার মুক্তির ডাক এল, আজিজুর রহমানের বয়স তখন ৭২ বছর। জীবনের এই অপরাহ্ণে এসেও তিনি ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার। শুধু তাই নয়, তিনি প্রতিনিয়ত মুক্তিযোদ্ধাদের লড়ে যাওয়ার সাহস জোগাতেন।

সুচিকিৎসক আজিজুর রহমানের ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন–এই খবরটি স্থানীয় শান্তি কমিটির লোকজনের কাছে মোটেই স্বস্তিদায়ক ছিল না। এই শান্তি কমিটির সদস্যরাই পরে কুখ্যাত রাজাকার বাহিনীতে নাম লেখায় এবং তারাই পাকিস্তানি ঘাতক সেনাদের কাছে আজিজুর রহমানের বাড়িটি সুনির্দিষ্টভাবে চিনিয়ে দেয়।

৯ এপ্রিল ১৯৭১। নাভারণ রেল বাজার এলাকাটি পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে যায়। পরিবারের অন্য সদস্যরা তখন নিরাপত্তার খোঁজে সীমান্তবর্তী গ্রাম সালতায় আশ্রয় নেয়। কিন্তু বয়সের ভার এবং নিজের ভিটেমাটির প্রতি মমতার কারণে নাভারণের নিজ বাড়িতেই থেকে যান আজিজুর রহমান।

তৎকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনারা নাভারণ রেল বাজারে একটি বেস ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। রাজাকারদের সহযোগিতায় তারা নিয়মিতভাবে স্বাধীনতার পক্ষের নিরীহ ও প্রতিবাদী মানুষদের ধরে আনত।

একদিন তারা হানা দেয় আজিজুর রহমানের বাড়িতেও। ওই সময় আরেক পুত্র নাজমুল আহসান তার সঙ্গে ছিলেন। একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন যেভাবে, “১৪ এপ্রিল ১৯৭১। সেদিন রাতে আমি আর বাবা খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় প্রচণ্ড করাঘাতের শব্দ। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে একজন পাকিস্তানি সেনা অফিসার সাত-আটজন সশস্ত্র সৈন্যসহ হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই তারা ঘর তল্লাশি শুরু করে এবং চিৎকার করে ধমকাতে থাকে, ‘মুক্তি কাহা হ্যায়?’ প্রায় দশ-পনেরো মিনিট তাণ্ডব চালানোর পর তারা বাবাকে (আজিজুর রহমান) গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।”

নাজমুল আহসান আরও যোগ করেন, “আমি তাদের পিছু নিই। ঘরের বাইরে উঠানের কাছে আসতেই থমকে দাঁড়াই। দেখি, তোফাজ্জেল মুন্সির ছেলে কুখ্যাত রাজাকার আব্দুল কাদের শুকুরকে। সেই-ই খবর দিয়ে পাকিস্তানি আর্মিদের আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। শুকুর আমাকে দেখে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। তৎকালীন সেই কঠিন কারফিউর মধ্যে শুকুর কীভাবে সেখানে উপস্থিত হলো? আসলে বাবার গ্রেপ্তার ও হত্যায় এই রাজাকারের সরাসরি সহযোগিতা ছিল।”

বাবার লাশের হদিস কি মিলেছিল কোনোদিন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “ আমরা বাবার লাশ পাইনি। আমার বড় ভাই জুট মার্কেটিংয়ে চাকরি করতেন, তিনি পরিচিতজনদের মাধ্যমে বাবাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেছেন। এমনকি যশোর ক্যান্টনমেন্টেও গিয়েছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। কিন্তু তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছিল যে খুঁজে লাভ নেই, তিনি আর নেই। ঘাতকরা তাকে মেরেই ফেলেছিল। আমরা তার লাশটাও পাইনি। ফলে তার কোনো সুনির্দিষ্ট কবরও নেই। তবে স্বাধীন এই দেশের মাটির সঙ্গে মিশে আছে আমার বাবার রক্ত, তাই এই মাটি আমাদের কাছে পবিত্র!”

স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারদের সম্পর্কে শহীদ আজিজুর রহমানের সন্তানদের অনুভূতি স্পষ্ট। তারা বলেন, “একাত্তরের ঘাতকরা আজ যতই পাক-পবিত্র সাজুক না কেন, আমাদের কাছে তারা চিরকালই শহীদ পিতার হত্যাকারী হিসেবেই গণ্য হবে। মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রিয়জন হারাননি, যারা কাছ থেকে রাজাকার ও আলবদরদের নিষ্ঠুরতা দেখেননি, তারা এটি কোনোদিন উপলব্ধি করতে পারবেন না। যারা এই দেশের অভ্যুদয়ই চায়নি, তারা কীভাবে এ দেশের মঙ্গল চাইবে? মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা এই খুনিদের ঘৃণা করে যাব।”

আজিজুর রহমানের মতো অসংখ্য শহীদের রক্তে ভেজা এই মাটিই আমাদের পরম অস্তিত্ব ও অনুপ্রেরণা। কিন্তু এসব ইতিহাসে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উঠে আসে রাজাকার, আলবদর ও আলশামসদের নাম।

কিন্তু কারা ছিলেন এরা?

মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নস্যাৎ করার জন্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ঘোষণা করে নিরস্ত্র বাঙালিদের নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরও এ দেশেরই কিছু রাজনৈতিক দল তাদের সগযোগী হিসেবে অবতীর্ণ হয়। প্রথমেই আত্মপ্রকাশ করে শান্তি কমিটি। মুসলিম লীগের বিভিন্ন গ্রুপ, জামায়াতে ইসলামী, পিডিপি, নেজামে ইসলামসহ বেশ কিছু দল এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শান্তি কমিটি গঠনের সঙ্গে যেসকল রাজনৈতিক ব্যক্তি সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আযম এবং মুসলিম লীগ নেতা খাজা খয়েরউদ্দিন। পাকিস্তানি জেনারেল টিক্কা খানের পরামর্শ ও সহযোগিতায় তারা গঠন করেন শান্তি কমিটি। প্রাথমিক পর্যায়ে জামায়াত ও অন্যান্য দলের নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত হয় ১৪০ সদস্যের ‘ঢাকা নাগরিক শান্তি কমিটি’। পরে সারা দেশেই তারা কমিটি গঠনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিহত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল করার কাজে লিপ্ত থাকে।

১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। করাচীতে জামায়াত অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা দেওয়ার সময় পাকিস্তান রক্ষা ও মানুষের জীবনের নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে গোলাম আযম বলেন, “কোন ভাল মুসলমানই তথাকথিত ‘বাংলাদেশ আন্দোলনে’র সমর্থক হতে পারে না। তার ভাষায়, ‘পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নির্মূল করার জন্য একমনা ও দেশ প্রেমিক লোকেরা একত্রে কাজ করে যাচ্ছে। রাজাকাররা খুবই ভাল কাজ করছে।”(সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান, ২ সেপ্টেম্বর ১৯৭১)।

বিচ্ছিন্নতাবাদী বলতে গোলাম আযম যে মুক্তিযোদ্ধাদের বুঝিয়েছিলেন, বলার অপেক্ষা রাখে না।

একাত্তরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে সহযোগিতা করতে মূলত জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে একটি বাহিনীও গঠন করা হয়। এর নাম দেওয়া হয় রাজাকার বাহিনী৷ খুলনার খানজাহান আলী রোডের একটি আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন পাকিস্তানপন্থি ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত হয় এ বাহিনী। পরে অর্ডিন্যান্স জারি করে আনসার বাহিনীকে বিলুপ্ত করে রাজাকার বাহিনীতে রূপান্তর করে পাকিস্তান সরকার।

রাজাকার বাহিনী গঠনের পেছনে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন নেতা এ কে এম ইউসুফ। প্রথম দিকে এ বাহিনী ছিল শান্তি কমিটির অধীনে। বাহিনীতে প্রায় ৫০ হাজার সদস্য ছিল। তাদের প্রতি মাসে দেড়শ রুপির মতো ভাতাও দেয়া হতো। পরে রাজাকার বাহিনীকে আধাসামরিক বাহিনীর স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান সরকার৷ ফলে রাজাকারদের নামে ইস্যু করা হয় অস্ত্র৷ তাদের ভাতা ও পরিচয়পত্র দেওয়া হয় প্রতিটি মহকুমার এসডিও অফিস থেকে৷

পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় রাজাকারের পাশাপাশি আলবদর নামে আধাসামরিক আরেকটি সশস্ত্র বাহিনীও গড়ে তোলা হয়। ওই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৩ হাজার। ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্য ছাড়াও অবাঙালি ও পাকিস্তানপন্থি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অনেকেই যোগ দিয়েছিল আলবদর বাহিনীতে। আলবদররা মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হয়ে যুদ্ধও করেছে। পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলীর নির্দেশে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নও করেছে এ বাহিনীটি।

একাত্তরে বাঙালি নিধনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আলশামস নামে একটি প্যারামিলিটারি বাহিনীও গঠন করেছিল। ওই বাহিনীর সদস্য ছিল প্রায় তিন হাজারের মতো। জামায়াতে ইসলামীর সেই সময়কার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের বাছাই করা কর্মীদের নিয়ে গঠন করা হয় আলশামস বাহিনী। তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে গণহত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাও হত্যাযজ্ঞে অংশ নেয়। (তথ্যসূত্র: শান্তিকমিটি ১৯৭১, আলবদর ১৯৭১, জনতার ৭১-এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ: ডা. এম এ হাসান প্রভৃতি)

পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখাসহ মুক্তিকামী বাঙালি নিধনে উল্লেখিত বাহিনীগুলোর আলাদা আলাদা নাম থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছে তারা রাজাকার বাহিনী হিসেবেই পরিচিতি পায়৷ আবার এ বাহিনীগুলো ছাড়াও একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে কাজ করেছে এমন ব্যক্তিকেও সাধারণ অর্থে রাজাকার বলা হয়ে থাকে৷

একাত্তরে যুবক পেলেই বাধ্য করা হতো রাজাকার বাহিনীতে যেতে। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা জানা যায় গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমানের সঙ্গে আলাপচারিতায়। তার ভাষায় “ট্রেনিংয়ে যখন যাই, তখন অনেকেই সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। তাদের বয়স ছিল কম। ফলে রেখে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। নবম শ্রেণিতে পড়ত আব্দুস সালাম ও বাবুল। ওদের বাড়ি পিপড়াছিটে। যুদ্ধে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা তাদের। যাওয়ার সময় বুঝিয়ে বলেছিলাম, ফিরে এসেই তোদের ট্রেনিং দিমু। গ্রামে থেকেও ওরা গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কাজ করেছে।

শান্তি কমিটির লোকেরা ওই সময় গ্রামে গ্রামে হানা দিত। পরে অনেকে মিলে কালিয়াকৈরে রাজাকার বাহিনীও গড়ে তোলে। এরপর তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যুবক ও তরুণদের রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিতে বলে। রাজাকারে যারা যায়নি, তাদের ওরা তুলে দিত পাকিস্তানি আর্মির হাতে। মেরেও ফেলেছে অনেককে।

রাজাকার বাহিনীতে না যাওয়ায় সালাম ও বাবুলের ওপরও চড়াও হয় শান্তি কমিটির লোকেরা। চলাচলের জন্য তখন আর্মি ক্যাম্প থেকে কার্ড দেওয়া হতো। ওই কার্ড করতে একদিন তারা যায় কালিয়াকৈরে। ওখানে তাদের পেয়ে রাজাকাররা তুলে নেয়। নির্মমভাবে হত্যা করে। আমাদের সঙ্গে নিয়ে গেলে হয়তো তারা লাশ হতো না। এমন অপরাধবোধ আজও জাগে মনে।”

কিন্তু রাজাকাররা নিজের ছেলেমেয়েদের রাজাকার বানায়নি। এমন মত তুলে ধরেন ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন। তিনি বলেন, “একাত্তরের জুনের শেষ দিকে আমাদের গ্রুপগুলোর চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তখন অস্ত্র হাতে পথে পথে থাকত রাজাকাররা। ওরা পাকিস্তানি সেনাদের রসদ সরবরাহ করত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা কাজ করত, তাদের ইনফরমেশনগুলো পাকিস্তানি সেনাদের দিয়ে আসত। শান্তি কমিটির নেতারা নিজের ছেলেমেয়েদের কিন্তু রাজাকার বানায় নাই! তারা এলাকার গরিব ছেলেদের বেশি রিক্রুট করত। ট্রেনিংয়ের লোভ দেখিয়ে বলত, ‘লুটের মাল জায়েজ। সেটা তোমরা পাবা।’ওরা ব্রিজ পাহারা দিত। ফলে গেরিলাদের সঙ্গে রাজাকারদের যুদ্ধ হয়েছে বেশি। যদি শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর আর আলশামস না থাকত, তাহলে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনারা এত মানুষকে হত্যা করতে পারত না!”

একাত্তরে ৩০ লাখ শহীদ, আড়াই লাখ নির্যাতিত মা-বোন এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারসহ পাকিস্তানপন্থী সব বাহিনীর তালিকা চূড়ান্ত ও বিচার করা যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু সেটি করতে না পারার ব্যর্থতায় বাঙালি জাতিকে এখনো চরম মূল্য দিতে হচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একাত্তরে তাদের ভূমিকার কথা স্মরণ করতে বলেছেন। এটি যেন শুধু তার রাজনৈতিক বক্তব্য না হয়। বরং শিকড়ের ইতিহাসে একাত্তরের পাকিস্তানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোসহ রাজাকার, আলবদর ও আলশামসদের ঘৃণ্য ইতিহাস তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরা হোক নতুন প্রজন্মের কাছে।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ২১ জুন ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button