আদিবাসী

হারিয়ে যাচ্ছে কড়া আদিবাসী

বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের মধ্যে কড়া একটি আদিবাসী গোষ্ঠী। নিজস্ব ধারার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য লালন করে এ গোষ্ঠী গড়ে তুলেছে বৈচিত্র্যময় জীবন প্রণালী। বর্তমানে জাতিটি এ দেশ থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
‘কড়া’ অর্থ মাটি খোঁড়া। আর এ আদিবাসীর এমন নামকরণ হওয়ার কারণ হলো কোনো এক সময় দিঘি খননের সঙ্গে যুক্ত ছিল তারা।
ইংরেজ আমলে সারা ভারত জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় বসেছে রেললাইন। পাহাড় কেটে, মাটি খুঁড়ে সেই রেললাইন বসানোর কাজে ঘাম ঝরিয়েছে এই আদিবাসীরাই। মূলত রেল লাইনের কাজের সূত্র ধরেই ভারতের ঝাড়খ- থেকে এদের আগমন ঘটে এ অঞ্চলে।
এদেশে কড়া আদিবাসীদের একমাত্র গ্রামটি দিনাজপুরের বিরল উপজেলার হালজায় মৌজায়। এখানে বাস করে ১৬টি পরিবার। এছাড়া বৈরাগীপাড়ায় একটি এবং সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙার খাড়িপাড়ায় রয়েছে আরো দু’টি কড়া পরিবার।
কড়াদের দেওয়া তথ্যমতে, এক সময় দিনাজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে কড়াদের একাধিক গ্রাম ছিল। নানা কারণে এরা পাড়ি জমায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। ভারতের ঝাড়খ- স্টেটের দুমকা, গোড্ডা,পাকুর, শাহীবগঞ্জ, হাজারিবাগ প্রভৃতি অঞ্চলে এখনো কড়াদের একাধিক গ্রাম রয়েছে। মোট ১৯ পরিবারে এদেশে কড়াদের মোট সংখ্যা মাত্র ৮৫জন। শিশুদের সংখ্যা ত্রিশের মতো।
কড়া আদিবাসীদের গ্রামগুলো পরিচালিত হয় ৩ সদস্যের গ্রাম পরিষদের মাধ্যমে। গ্রাম প্রধানকে এরা বলে মাহাতো। এছাড়াও রয়েছে গোড়াৎ ও পারামানি নামের দু’টি পদ। আগে কড়াদের কয়েকটি গ্রামের একজন প্রধান থাকত। তাকে বলা হতো ‘পাঁড়ে’। এরা গ্রামপরিষদের পদগুলো নির্বাচন করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সকলের মতামতের ভিত্তিতে। এ নিয়ে কড়াদের মধ্যে কোন মতপার্থক্য তৈরি হয় না।
এদেশে বসবাসরত কড়ারা কথা বলে খট্টা ভাষায়। তবে এ ভাষার লিখিত কোন বর্ণ নেই।কড়া ভাষায় মাকে এরা ‘মেয়া’, বাবাকে ‘বাপা’, বোনকে ‘বোহেইন’, তিরকে ‘বিজার’, ধনুককে ‘ধেনি’, সূর্যকে ‘বেড়া’, রাতকে ‘রাইত’, সকালকে ‘বিহান’, মাছকে ‘মাছরি’ ও নদীকে ‘নেদি’ বলে। তোমার নাম কি ? কড়া ভাষায় বলে, ‘তোর নাম কয়েন লাগলো’। আপনি কেমন আছেন? কড়া ভাষায়- তোহনি কুরাং কে হে। অন্য আদিবাসী শিশুদের মতো কড়া আদিবাসী শিশুরাও তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিত। ফলে বর্তমানে কড়া শিশুরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে বাংলা ভাষায় । এনজিও-নির্ভর শিশু শিক্ষা কেন্দ্রই এদের একমাত্র ভরসা। কড়া গ্রামে কোনো শিশুই এসএসসি উত্তীর্ণ হয়নি।
কড়া আদিবাসীদের প্রধান খাবার ভাত। পছন্দের খাবারের মধ্যে ঘংঘি (শামুক), মুসা (ইঁদুর), খোকরা (কাকড়া), কুচিয়া, দুরা (কচ্ছপ), ধারা, ঝিনুক, কুকুরী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। হাড়িয়া এদের প্রিয় পানীয়। এদের উৎসব ও পূজাপার্বনে হাড়িয়ার ব্যবহার রয়েছে।

সেড়তি কড়া
সেড়তি কড়া

কড়াদের বাড়িগুলো হয় মাটি আর ছনে ছাওয়া। তবে এদের ঘরগুলোতে কোনো জানালা থাকে না। অপদেবতার কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতেই এ ব্যবস্থা। এ আদিবাসী নারীদের এক সময় নিজস্ব পোশাক ছিল। কড়া ভাষায় এটি ‘পেনছি’। বর্তমানে শাড়ি সস্তা হওয়ায় অধিকাংশ নারীরাই পেনছি ব্যবহার করে না। এছাড়া অলংকার হিসেবে তারা গলার মালা, কানসি, ঝুমকা, ফুটকি (নাকের ফুল), ঘড়কে পেনজাল (পায়ের নুপূর) প্রভৃতি ব্যবহার করে।
কড়া আদিবাসীদের প্রধান পেশা কৃষি। ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক এ তিন মাস এদের অভাবের সময়। এ সময় তাদের কোনো কাজ না থাকায় মহাজনদের কাছে আগাম শ্রম বিক্রি করে এরা পরিবার চালায়।
কড়ারা নবজাতক জন্মানোর ৭ অথবা ৯ দিনের দিন নাপিত ডেকে গোত্রের সবার চুল দাড়ি কেটে শুদ্ধি করায়। ওইদিনই নবজাতকের নাম রাখা হয় এবং সবার জন্য ভোজের ব্যবস্থা করা হয়। কড়া ভাষায় এটি ‘ছেটি ’। কড়ারা বলে, ‘নাম রাখল হোতে, ছেটি কারল হতে’।
কড়াদের নিয়মে নবজাতকের নাম রাখেন গোত্রপ্রধান বা মাহাতো। ছোট বেলাতেই কড়াদের হাত কেটে ঘা করে ‘কাকড়া ও বিছা’র প্রতিকৃতি তৈরি করা হতো। কড়ারা এটিকে বলে খোদনা বা জাতির চিহ্ন। একসময় এই চিহ্ন দিয়েই চেনা যেত কড়াদের। কিন্তু এখন এর প্রচলন নাই বললেই চলে।
কড়াদের বিয়ের প্রথমে ঘটক বা ‘কারোয়া’ র সাথে কনেকে দেখতে আসে ছেলের বাবা। আপ্যায়নের পর মেয়ে পছন্দ হতেই পাকাপাকি হয় বিয়ের কথাবার্তা। সে আনন্দে চলে হাঁড়িয়া খাওয়া। এদের বিয়েতে এখনও মেয়েকে পণ হিসেবে দিতে হয় ২৫ টাকা। তাছাড়াও মেয়েপক্ষকে  ৭টি শাড়ি, ৩ সের খাবার তেল, ৩ পুরিয়া সিঁন্দুর আর ‘ডারিয়া ঝোপা’ (কোমরে সাজানোর এক ধরণের উপকরণ) দেয়ার বিধান চালু আছে।
কড়া আদিবাসীদের বিয়েতে বাড়ির উঠানে পাতা দিয়ে ‘মারোয়া’ সাজানো হয়। মাটি উঁচু করে চারদিকে ৪টি কলাগাছ, ৪টি তির, কাল সাট লিয়া (মাটির ঘটি বিশেষকে বলা হয়) রেখে সুতা দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়। বিয়ে বাড়ির উপরে বাঁশ দিয়ে উঁচু করে টানাতে হয় ‘বাদর’। খর দিয়ে মানুষের প্রতিকৃতি তৈরী করে তাতে তীর ধনুক লাগিয়ে তৈরী করা মুর্তি বিশেষকে কড়ারা ‘বাদর’ বলে। এরা মনে করে বাদর টানিয়ে সারা গ্রামে তাদের বিয়ের জানান দেয়া হয়।বিয়ের আগে হয় গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে গান গেয়ে গেয়ে বর-কনেকে হলুদ দেওয়াই নিয়ম। বিয়ের পূর্বে নাউয়া (নাপিত) এসে কনের হাতের কানি আঙ্গুল কেটে সামান্য রক্ত নিয়ে তার সঙ্গে আতপ চাল একত্র করে মহুয়া পাতা দিয়ে কন্যারই হাতে বেধে দেয়। কড়া ভাষায় এটি ‘নিউওয়ে’। বরকেও একইভাবে বাড়ি থেকে মহুয়া পাতা বেধে আসতে হয়।
কড়াদের বিয়েতে কনেকে গোসল করাতে লাগে ১০জন লোক। এদের মধ্যে ৫জন পুরুষ ও ৫জন মেয়ে হতে হয়। গোসলের পরই বিয়ের শাড়িতে সাজানো হয় কনেকে।
কড়াদের বিয়েতে প্রথমে বরপক্ষ কনের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করে। সেখানেই তাদের আপ্যায়ন করা হয়। কড়ারা একে বলে ‘জাতি মিলন’। অতঃপর বরকে বাড়িতে এনে প্রদীপ, ধান ও ঘাস দিয়ে বরণ করা হয়। একই সাথে তাকে রূপার আংটি পরিয়ে খাওয়ানো হয় গুড়। কড়া ভাষায় এটি ‘গুড় খিলা’।
বিয়ের মূল পর্বকে এরা বলে ‘সিমরেত হতে’ বা সিঁন্দুর পর্ব। এই পর্বটি বেশ নাটকীয়। কনের ভাইকে উঠতে হয় তার দুলাভাইয়ের কাঁধে আর বরকে গামছা নিয়ে উঠতে হয় তার দুলাভাইয়ের (বোহনে) কাঁধে। এ অবস্থায় বর তার কাছে থাকা গামছাটি কনের ভাই বা শালাকে দিয়ে দেয়। আর শালা ঐ অবস্থায় বরকে পান খাইয়ে দেয়। পান খাওয়ানোর পর শালা ঐ গামছাটি বরের কাঁধে পরিয়ে দেয়। গামছা পরানোর সাথে সাথেই বর কাঁধ থেকে নেমে চলে আসে সাজানো মারোয়ার দিকে।
এই আদিবাসী বিয়েতে বর-কনের সিঁদুর পর্ব হয় চাষাবাদের প্রতীক জোয়ালের উপর দাঁড়িয়ে গোপনীয়ভাবে। দুই পক্ষের মাহাতোর উপস্থিতিতে জোয়ালের দু’দিকে বর ও কনে দাঁড়ানোর পর পরই চারদিকে কাপড় দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয় আর ঐ অবস্থায় বর কনেকে সিঁদুর পরায়।
সিঁদুর পর্বের পর বর-কনেকে পালন করতে হয় ‘খান্দা’ বা দশের খাবার পর্ব। নতুন হাড়িতে বা যেটিতে খাবার রান্না হচ্ছে সেই হাড়িতে একটি কুলায় থাকা ঘাস, চাল ও ধান বর-কনেকে এক সাথে ঢেলে দিতে হয়। অতঃপর পরিচিত জনেরা ঘাস আর ধান ছিটিয়ে নব দম্পতিকে আর্শিবাদ করে আর কনের হাতে গুজে দেয় নানা উপহার।
কড়া আদিবাসীদের বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মত পার্থক্য তৈরী হলে বা বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে উভয়পক্ষের মাহাতো ও দশজনের উপস্থিতিতে পালন করতে বিশেষ ধরণের আচার। কড়ারা এটিকে বলে ‘পাতপানি’ বলে।
একটি কাসার বাটিতে পানি নিয়ে ৪/৫টি আমপাতাসহ একটি ভাঙা ডাল ডুবিয়ে রাখতে হয়। অতঃপর কাসার বাটির দুইদিকে দাঁড়িয়ে স্বামী ও স্ত্রী দু’টি পাতা ধরে এবং একই সাথে টেনে পাতা ছিড়ে ফেলে। প্রথা অনুসারে পাতা ছেড়ার সাথে সাথেই তাদের বিবাহের বিচ্ছেদ ঘটে।

কড়া আদিবাসীদের মৃত্যু হলে তার লাশ গোসল করিয়ে লম্বালম্বিভাবে সাদা কাপড় পরানো হয়। অতঃপর মাটির পাতিলে জ্বালানো আগুন রেখে পাতিলগুলো দেয়া হয় ১০ জনের হাতে। কোনো মন্ত্র পাঠ ছাড়াই লাশটিকে ১০ জনে নিয়ে যেতে থাকে কবরস্থানের দিকে। সবার সামনে থাকে গোত্রের মাহাতো। তার গলায় বাধা গামছায় থাকে খই আর সরিষা। বাড়ি থেকে লাশ নেয়ার সময় থেকেই মাহাতো খই আর সরিষা ছিটাতে থাকে।
কোনো বাঁশ ছাড়াই কড়ারা মৃত দেহ মাটিচাপা দেয়। কবরে মৃতের মাথা থাকে উত্তরে আর পা দক্ষিণে। এরা বিশ্বাস করে ৬ মাস পর্যন্ত মৃতের আত্মা চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। তাই মৃতের বাড়িতে তার স্বজনেরা বিধান অনুসারে ৩দিন রান্নায় হলুদ ও লবন ব্যবহার করে না। ৩দিন পরে বাড়িতে হয় ‘তেলখের’ অনুষ্ঠান। ওইদিন গ্রামে নাপিত এসে সবার চুল ও দাড়ি কামিয়ে দেয়। আর মেয়েদের কানি আঙ্গুলের নখ ব্লেড দিয়ে হালকা ভাবে ঘষে দেওয়া হয়। কড়াদের বিশ্বাস এতে গোটা গ্রামের শুদ্ধি ঘটে।কড়াদের মধ্যে দুজন আদিবাসী ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এরা হলেন থোপাল কড়া আর সাতান কড়া। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শিববাড়ী ইয়ুথ ক্যাম্পে ট্রেনিং নেন এরা। ট্রেনিং শেষে ৭নং সেক্টরের অধীনে কমান্ডার ইদ্রিস আলীর নেতৃত্বে হামজাপুর ক্যাম্প থেকে হিলিসহ নিকটবর্তী গ্রামগুলোকে শত্রুমুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করেন।
কড়াদের ধর্ম সনাতন। তবে এদের পূজাতে মূর্তির ব্যবহার নেই। অভাব মুক্তির জন্য এরা কারমা, দেবতাকে নানা কষ্টের কথা শোনাতে বিষহরি এবং গবাদিপশুর মঙ্গলের জন্য এরা ‘গট পূজা’ পালন করে থাকে।
কড়া আদিবাসীদের বড় উৎসব কারমা পূজা। এরা ভাদ্র মাসে এ পূজা পালন করে ধুমধামের সাথে। মূলত এটি গাছের পূজা। বিশেষ প্রজাতির ‘খিল কদম’ গাছের ডাল কেটে এনে পূজা করে এ আদিবাসীরা।
কারমা পূজায় বিবাহিতরা ‘খিল কদম’ গাছের ডাল কাটতে পারে না। গোত্রের মাহাতো পূর্ব থেকেই অবিবাহিত কোন যুবককে কয়েক বছরের জন্য ডাল কাটা ও  বির্সজনের জন্য মনোনিত করে দেন। ডাল কাটার দিন নদীতে স্নান করে গাছের গোড়ায় ধুপ জ্বালিয়ে, সিঁদুর দিয়ে ৩টি তেলের পিঠা  গাছের সাথে বেঁধে দেয়া হয়। অতঃপর ৩ চটে (৩ কোপে) ডাল কাটা হয়। ডালটি মাটিতে পড়ার পূর্বেই সেটি ঘাড়ে করে নিয়ে যাওয়া হয় পূজাস্থলে।
সেখানে গোত্রের সবাই ঢাক-ঢোল বাজিয়ে ডালটিকে মাটিতে গেড়ে দেয়। একই সাথে দু’টি লাল মুরগা (মোরগ) বলি দেয়ার মাধ্যমে শুরু হয় কারমা পূজার আনুষ্ঠানিকতা। সারা রাত চলে নাচ, গান আর হাড়িয়া খাওয়া।
ভোর বেলা দলের মাহাতো স্নান সেরে ভেজা শরীরেই প্রথমে এক বাটি দুধ ঢেলে দেয় খিল কদম গাছের ডালের মাথায়। অতঃপর তাকে ভক্তি করে ফিরে যায় নিজ বাড়িতে। মাহাতোর পরপরেই অন্যান্যরা একে একে দুধ ঢালতে থাকে। দুধ ঢালা শেষে যে যুবকটি ডাল কেটেছিল সে প্রথমে ডালটির চারদিকে ৩ পাক ঘুরে ডালটিকে টান দিয়ে কাঁধে তুলে নেয়। অতঃপর ঢাক-ঢোলের তালে তালে সেটিকে বির্সজন দেয় নিকটবর্তী নদী বা পুকুরে।
কারমা পূজায় কড়াদের ধর্মের পরীক্ষা দিতে হয়। বাঁশের ডালার মধ্যে কালাই বীজ রেখে বালু ও মাটি দিয়ে যেদিন ঢেকে দিতে হয়। সেদিন থেকেই শুরু হয় উপোস (উপাস)। উপোস সময়ে রসুন, পেঁয়াজ, গরমভাত, মাছ ও মাংস খাওয়ার নিয়ম নেই। খেতে হয়  শুধুই নিরামিষ। যে কয়জন উপোস থাকে সে কয়টি ছোট কাঠি ডালায় পুতে দেওয়া হয়। কড়াদের রীতি অনুসারে উপোসকারী পুরুষ হলে কাঠির মাথায় কাজল আর মহিলা হলে সিঁদুর লাগানো হয়।
চারদিন পর ডালায় নতুন চারা গজালে এরা উপোস ভাঙে। কড়াদের বিশ্বাস যাদের ধর্মে বিশ্বাস নেই ডালায় তাদের লাগানো কালাই বীজ থেকে চারা গজায় না। চারা গজালে বন থেকে কেটে আনা খিল কদম গাছের ডাল মাটিতে পুতে চারার ডালাটিও তার পাশে রাখা হয়। কড়া আদিবাসীরা আজো বিশ্বাস করে কারমা তাদের অভাবমুক্তি আর সৌভাগ্য লাভের পূজা।
কারমা ছাড়াও এ আদিবাসীরা পালন করে ‘বিষহরি পূজা’। তবে তা একেবারেই অন্যরকম। কড়ারা বিশ্বাস করে এ পূজায় তাদের অভাব ও কষ্টের কথা শুনতে তাদের ওপরই ভর করে নেমে আসে ৬টি ভূত (দেবতা)। ভূতগুলোর নাম- গাঁও রাখ ওয়াল, দানব, বিষহরি, চকর গুরু, কামরুক গুরু, বাংশিং গুরু। এ পূজায় মাটি দিয়ে উঠানে ৪ আঙুল উঁচু ডিবি তৈরি করে সেখানে ধূপ জ্বালিয়ে, সিঁদুর দিয়ে কবুতর বলি দেয়া হয়।
ভূত বা দেবতাকে শান্ত করার জন্য রাখা হয় বিশেষ ধরণের গাছের চাবুক। ভক্তি করে মাদল বাজিয়ে এরা নাচতে নাচতে দেবতাদের ডাকতে থাকে। কড়ারা বিশ্বাস করে এতে গোত্রের তুলা রাশির ব্যক্তিদের  ওপর দেবতা ভর করে। কখনো কখনো দেবতা আসতে দেরি হলে পুতার (মসলা বাটার) পাথরে ধূপের ধোঁয়া দিয়ে তার ওপর তুলারাশির লোক দাঁড় করালেই দ্রুত দেবতারা চলে আসে।
দেবতাদের প্রথমে চাবুক দিয়ে শান্ত করে বলা হয় ‘ মাহারাজ তয় শান্ত হওয়া’। দেবতারা শান্ত হলে গোত্রের সকলেই নানা রোগ-শোক ও সমস্যার কথা তাকে জানায় এবং সমাধানের মিনতি করে।
কারমা ও বিষহরি ছাড়াও গবাদিপশুর মঙ্গলের জন্য এরা পালন করে বিশেষ ধরণের পূজা । কড়া ভাষায় এটি ‘গট পূজা’। এ পূজায় কাদামাটির ওপর ডিম রেখে, সেখানে সিঁদুর দিয়ে, ধান আর দুর্বা ঘাসে ঢেকে দেয়া হয়। অতঃপর তার ওপর দিয়ে গোত্রের সকলের গরু একসাথে নিয়ে যাওয়া হয়। যার গরুর পায়ে লেগে ডিমটি ভেঙে যায় তাকে সকলে ঘাড়ে চড়িয়ে হৈহুল্লোর করে তার বাড়িতে নিয়ে আসে। সবাইকে তখন অন্যান্য খাবারের সাথে খাওয়ানো হয় হাঁড়িয়া।
নিয়মমতে ওইদিনই সূর্য ডোবার আগে ঐ ব্যক্তি তার গোয়াল ঘরটি পরিস্কার করে সেখানে একটি পিঁড়ি রাখে। পিঁড়ির চারপাশে গোল করে ঢেলে দেয়া হয় চালের আটা। অতঃপর পিঁড়ির ওপর ধান, দুর্বা ঘাস আর সিঁদুর দিয়ে ভক্তি দিয়ে গবাদিপশুর মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করা হয়।
ভূমি কেন্দ্রিক বৈষম্য, নানা অবহেলা আর অনটনের মধ্যেও নিজেদের টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে আদিবাসী কড়ারা। তারা কি পারবে নিজেদের জাত ধর্মটিকে টিকিয়ে রাখতে? কড়ারা হারিয়ে গেলে এদেশ থেকে হারিয়ে যাবে একটি জাতি, জাতির ভাষা ও তাদের সংস্কৃতিগুলো। এদের টিকিয়ে রাখতে তাই প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগের। অন্যথায় নিঃশব্দে ও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে এ জাতিটি।

লিখাটি প্রকাশিত হয়েছে বাংলানিউজ২৪.কমে,  ৩০ নভেম্বর ২০১৩

WARNING :
If anyone wants to share this content, please contact me. If any unauthorised use or reproduction of salekkhokon.me content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.

© 2014 – 2018, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button