আদিবাসী

ওরাওঁ বিয়ে(২):বর-কনের নামে দুটি বাতি ভাসানো হয় পুকুরে

বিয়ের আগে ওরাওঁরা ‘কুটমেত’ অনুষ্ঠানটি বেশ ঘটা করে পালন করে। ওই দিন উভয় পক্ষের সামনে একটি সাজানো থালা রাখা হয়। থালা সাজানোর উপকরণ হিসেবে থাকে তেল, সিঁদুর, হাড়িয়া ও পান। উভয় পক্ষের মুরুব্বিরা আনন্দের সঙ্গে ওই উপকরণগুলো নিজ নিজ গোত্রের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে এবং মুখে উচ্চারণ করে বলে, ‘লোহার শিকলের জোড়া ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের রক্ত-মাংসের সম্পর্কেও বাঁধন অক্ষুণ্ণ থাকবে।’ অতঃপর এরা একে অপরকে তেল মাখিয়ে আলিঙ্গন করে। এ সময় মেয়েরা নানা ধরনের গীত পরিবেশন করে।

কুটমেত-পরবর্তী অনুষ্ঠানের নাম বড়ি পড়া। এটি বিয়ের আগের দিন বরের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের আচার হিসেবে তিনজনের উদ্দেশে আতপ চালের সেদ্ধ আটা দিয়ে বড় আকৃতির তিনটি বড়ি তৈরি করা হয়। এর একটি কনের, একটি বরের ও অপরটি বরের ভগ্নিপতির। বড়ির মাথায় স্থাপন করা হয় একটি মরিচ ও দূর্বাঘাস। নাচ-গান, হাসি-তামাশার মধ্য দিয়ে এই দিনটি অতিবাহিত করা হয়। বড়ি পড়া’ অনুষ্ঠানটি একইভাবে কনেপক্ষের বাড়িতেও আয়োজন করা হয়ে থাকে।

ওরাওঁ বিয়ের তৃতীয় পর্ব হলো মাড়োয়া। এটি আদিবাসী বিয়ের ঐতিহ্যের প্রতীক। ওরাওঁ সমাজে মাড়োয়া তৈরি করার দায়িত্ব থাকে গ্রামপ্রধানের ওপর। আগে থেকেই এর জন্য উঠানের একটি নির্দিষ্ট স্থান লেপে পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়। অতঃপর সেখানে চার কোনায় চারটি কলাগাছ এবং এর মাঝখানে একটি বাঁশ পুঁতে সে বাঁশের মস্তকভাগে একগুচ্ছ পাট বেঁধে দেওয়া হয়। ওরাওঁরা বিশ্বাস করে, এতে নবদম্পতির সংসারে যদি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়, তবে তার চুল পাটের মতোই লম্বা হবে। কলাগাছ চারটি একটির সঙ্গে আরেকটিকে রঙিন কাগজ দিয়ে মোড়ানো দড়ি দিয়ে যুক্ত করে রাখা হয়। মাড়োয়ার বেদিতে মঙ্গলঘট হিসেবে থাকে কাঁড়সা ভাড়া। এতে রাখা হয় আতপ চাল, হলুদ, দাঁতন, তিনটি মুঠিয়া এবং তিন আঁটি ধানের গোছা। ঘটের মুখের ওপর স্থাপিত হয় একটি মাটির প্রদীপ। তার মধ্যে রাখা হয় সরিষার তেল ও পাঁচটি কাপড় মোড়ানো সলতে। অতঃপর হাড়িয়া পানের মধ্য নিয়ে শুরু হয় মাড়োয়া উৎসবের। মাড়োয়া সাজানোর সময় এরা দলবেঁধে নাচ-গান করে এবং প্রিয় পানীয় হাড়িয়া খায়। কী গান করেন? প্রশ্ন শুনেই পাশ থেকে মালতি গান ধরে :

‘মাড়োওয়া যে ছান্ডেলে বাবা মাড়োওয়া

মাড়োয়া সবে দসো মিলে নিকে সবাই

কাঞ্চা বাঁশকে মাড়োয়া ছান্দেলে…

ঢাউরাহী দাউরাহী লিয়ে চলরে বাবা

বাবা ঘারে ঝান্ডি গাড়ায়।

ভাবার্থ :

আমরা সবাই দলে মিলে বিয়ের কলাগাছ পুঁতেছি

কাঁচা বাঁশ কঞ্চি দিয়ে বিয়ের বেদি তৈরি করেছি।

চাল-ডাল নিয়ে চল বাবাবাড়িতে বিয়ের মাড়োয়া বানাই।

ওরাওঁ বিয়ের চতুর্থ পর্ব গায়ে হলুদ। বিয়েতে এদের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানটি হয় কনের বাড়িতে। গায়ে হলুদ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন শুধু বিবাহিত নারীরা। আবার বরের ক্ষেত্রে বরযাত্রার আগ পর্যন্ত তিনবার হলুদ মাখানো হয়। হলুদের অনুষ্ঠানে এরা নানা রকম নাচ-গান ও হাস্যরসাত্মক আড্ডার আয়োজন করে। তবে ওরাওঁ রীতিতে হলুদ মাখানোর দিন কনে ও বরের মা-বাবাকে অবশ্যই উপোস থাকতে হয়।

গায়ে হলুদ পর্বের পর বর ও কনের স্নানের ব্যবস্থা চলে নানা আনুষ্ঠানিকতায়। বাড়ির উঠানে একটি ছোট্ট পুকুরাকৃতির গর্ত খনন করা হয়। সেখানে আমগাছের একটি ডাল রাখা হয়। বরকে প্রথমে একটি পিঁড়িতে বসিয়ে কেটে দেওয়া হয় নখগুলো। অতঃপর সাবান, হলুদ ও সরিষার তেল মেখে বরকে স্নান করানো হয়। স্নানের জন্য পানি কলস দিয়ে আনা হয় পুকুর থেকে। পানি আনতে গিয়ে বরের দিদি-বৌদিরা সেখানে বাতি খেলার আয়োজন করে।

বর ও কনের নামে দুটি বাতি বা প্রদীপ জ্বালিয়ে পুকুরের পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বাতি দুটি যদি ভাসতে ভাসতে একত্রিত হয়ে যায়, তবে ধরে নেওয়া হয় নবদম্পতির জীবন সুখের হবে। আর যদি বাতি দুটি একত্রিত না হয়, তাহলে ওরাওঁরা বিশ্বাস করে নতুন জীবনে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকবে। তবে এ খেলার কারণে ওরাওঁ আদিবাসীদের বিয়েতে কোনো প্রতিবন্ধিকতা তৈরি হয় না। কনের বাড়িতেও একইভাবে স্নান ও বাতিখেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। এ সময় এরা গীত গায়। মুংলীর মুখে শোনা গীত :

‘একে গোটা বেটি

 কা কাওে দিয়ালো

মায়ো বেটি সুকৈ কান্দয়

দো আড়েনি লুগা

পনেকে টাকা

কেইসে ঘুরায়ো দেবোও।

ভাবার্থ : একমাত্র কনেকে বিয়ে দিতে হচ্ছে। স্নেহের কন্যার কান্নায় হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। দুখানি কাপড় পণ দেওয়া হয়েছে, কেমন করে এগুলো ফিরিয়ে দেবো?

আরেকটি গান :

‘এতো বড় বাঙেলা রাজা কাঁহা গেলা

নিঠুরি কুঠুরি রানী কাঁদায়;

শুখালা পাতাই পাতাই নুড়ি গেলা

তাইসানা রাজা নুড়ি গেলা।

আরে আইয়ো পুরুবে হোঁ দালান

পশ্চিমে হোঁ দালান;

দুইয়ো দালান সুমানে সুমান।

আরে আইয়ো দালান কা নু’পারে

রাণী যে কাঁদায়;

তিরিয়ো রিয়ো বাঁশী যে বাজায়।

আরে আইয়ো রাজা যে আওয়ায়

আশী বান্দুন খিড়িকাতে আওয়ায়

আরে আইয়ো হালে নব্বই হালে আশী

আশী বান্দুক খিড়িকাতে আওয়ায়

পাইক বান্দুক দিলিকাতে আওয়ায়।

ভাবার্থ :

এত বড় প্রাসাদ রাজা কোথায় গেলেন

নির্জন কুঠুরিতে বসে রানি একা কাঁদছেন।

শুকনো পাতা যেমন উড়ে যায়

রাজাও তেমনি চলে গেছেন।

পূব দেশে রাজার প্রাসাদ

পশ্চিমে রানির প্রাসাদ

দুই প্রাসাদের মাঝে বিরহের দূরত্ব।

রাজা তুমি ফিরে এসো

নির্জন কুঠুরিতে বসে রানি একা কাঁদছেন।

তোমার বিরহ বাজে বাঁশির সুরে সুরে।

রাজা তুমি ফিরে এসো, তুমি যত বুড়োই হও,

হোক না তোমার বয়স আশি, হোক না নব্বই

তুমি এলে বন্দুক ছোটানো হবে, বাজি পোড়ানো হবে

তোমাকে নিয়ে আনন্দের ধুম পড়বে।

মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার পূর্বে বরকে প্রথমে সাজিয়ে মাড়োয়ায় বসানো হয়। সেখানে তার সারা শরীরে ছিটিয়ে দেওয়া হয় ধান ও দূর্বাঘাস। অতঃপর শুরু হয় মায়ের কাছে বিদায় পর্ব। এ পর্বে মা বাড়ির দরজায় দুই পা মেলে বসে। বরও তখন মায়ের কোলে বসে। এ অবস্থায় তাকে দুধ পান করানো হয়। পেছনে মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে বাবা ও ভাই। কোলে বসে বর কুলাতে রাখা ধান থেকে কিছু অংশ পেছনের দিকে ছিটিয়ে দেয়। সেগুলো গিয়ে পড়ে আঁচলে। বাবা ও ভাই ধানগুলো হাত দিয়ে ধরার চেষ্টা করে এবং আঁচলের ওই ধানগুলো যত্ন করে রেখে পরে জমিতে রোপণ করা হয়। এ ছাড়া যাত্রার পূর্বে বর পূর্বপুরুষের স্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

ওরাওঁ সামজে নারী-পুরুষ উভয়েই বরযাত্রী হতে পারে। বরযাত্রীর সঙ্গে থাকে একটি ডালা ও কাঁড়সা ভাড়া। ডালায় রাখা হয় ধুতি বা মাইলুকা, আতপ চাল, ধান, দূর্বাঘাস, সিঁদুর, আয়না, চিরুনি, তেল, কাঁসার বাটি ও হাঁসুয়া প্রভৃতি।

ওরাওঁরা বিয়েতে বরযাত্রীকে সরাসরি কনের বাড়িতে আনা হয় না। তাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে কোনো গাছের নিচে বসানো হয়। এ সময় উভয় পক্ষ মঙ্গলঘট, আমের পাতাবিশিষ্ট পানিভর্তি ঘটি ও আগুন জ্বালানো হাঁসুয়া নিয়ে পরস্পরের মুখোমুখি হয় এবং একে অপরকে বরণ করে নেয়। কনেপক্ষের মেয়েরা বরের মুখে গুড় বা মিষ্টি তুলে দিয়ে মাথায় দূর্বাঘাস ছিটিয়ে আশীর্বাদ করে। অতঃপর থালায় রাখা দুটো পান দুহাতে নিয়ে প্রথমে মঙ্গলঘটে জ্বালিয়ে রাখা সলতের আগুনে কিছুটা গরম করে তা বরের দুই গালে চেপে ধরে পুনরায় ডালায় রেখে দেওয়া হয়। এ সময় ছিটানো হয় আম পাতায় ভেজানো পানি। এরপর উলুধ্বনি দিয়ে বরকে কনের দুলাভাই বা একজন কোলে করে প্রবেশ করায় কনের বাড়িতে। আর মঙ্গলঘট দুটো পাশাপাশি রাখা হয় মাড়োয়ার বেদিতে।

ওরাওঁ বিয়ের মূল অনুষ্ঠানের জন্য কনেবাড়িতে ব্যবহার করা হয় জোয়াল ও শিলপাটা। প্রথমে ঘরের ভেতর একটি জোয়াল, জোয়ালের ওপর সামান্য খড়, খড়ের ওপর পাটা এবং তার ওপর শিল রাখা হয়। বিয়ের সময় বর গিয়ে পাটার ওপর দাঁড়ায়, কনেও দাঁড়ায় একই পাটায় বরের সামনাসামনি। তাদের মুখোমুখি এমনভাবে দাঁড় করনো হয় যেন একে অপরের পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল স্পর্শ করে।

এখানে বর তার বাম হাতের কনিষ্ঠ অঙুলে সিঁদুর নিয়ে কনের সিঁথিতে তিনবার এবং একইভাবে কনেও বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে বরের কপালে তিনবার সিঁদুর পরিয়ে দেয়। অতঃপর বর-কনেকে কোলে করে আনা হয় মাড়োয়ায়। এ সময় বরের বামপার্শ্বে কনে এবং ডানপার্শ্বে থাকে ভগ্নিপতি। এখানে বর-কনেকে মাড়োয়ার চারপাশে তিন, পাঁচ বা সাত পাক দিয়ে পাশাপাশি বসানো হয়। এ সময় কনের মা বরের পা ধুয়ে আবারও বরণ করে নেয়।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে এনটিভিবিডি ডটকমে, প্রকাশকাল: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

© 2018, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button