আদিবাসী

ভরত মাঝির আঙিনায় মালো জীবন

পথের আলাপন

রাঁচি থেকে আসলো ঘাসী, তারপর হলো আদিবাসী।

মেয়েটির মুঠোফোন বন্ধ। কারণটি অজ্ঞাত। অথচ একদিন আগেও তিনি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে কথা বলেছেন, জানিয়েছেন আদিবাসীদের নানা তথ্য। মূলত সেই তথ্যের ভিত্তিতেই দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। কিন্তু যাত্রাকালে তাকে ফোনে না পেয়ে কিছুটা ভাবনায় পড়ে যাই।

মেয়েটির নাম মারিয়া মালো। তিনি মালো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি। থাকেন দিনাজপুরে; স্নাতকোত্তর শেষ করে বর্তমানে কাজ করছেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। ঘোড়াঘাটের ‘শীতল গ্রাম’ মারিয়ার জন্মভিটা। সেখানে প্রায় দেড়শটি মালো পরিবারের বাস।

একসময় তাদের পূর্বপুরুষরা রংপুরের তাজহাটে বাস করত। ইতিহাস বলে, বহু বছর আগে মরণব্যাধি কলেরা ও ডায়রিয়া থেকে মুক্তি পেতে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এই শীতল গ্রামে এসে বসতি গড়ে তোলে। মুঠোফোনে মারিয়ার সঙ্গে এমন নানা বিষয়ে আলাপ হয়েছিল। শীতল গ্রামের ঠিকানাটি আগে থেকেই জানা ছিল, তাই মারিয়ার ফোনের আশা ছেড়ে দিয়ে একাই দিনাজপুর থেকে রওনা হই।

বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা এটি। মাসটি ছিল বৈশাখ। আগের রাতে কালবৈশাখী হয়ে যাওয়ায় প্রকৃতি সজীব ও স্নিগ্ধ। ধুলোবালি ধুয়ে চারপাশ যেন একদম ঝকঝকে। রোদের তীব্রতা নেই, বরং দমকা হাওয়ার ঝাপটায় মাঝেমধ্যেই মনটা দুলছিল। বাস থেকে নামলাম ঘোড়াঘাটের টিঅ্যান্ডটি মোড়ে।

রাস্তার পাশে বিশাল এক বটগাছ। সেই বটের সুশীতল ছায়ায় বাসস্ট্যান্ড। পাশে গুটিকয়েক চায়ের দোকান। দোকানে বসে জম্পেশ আড্ডা জমিয়েছে একদল মানুষ। ফাঁকে ফাঁকে চলছে ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক। সেই জটলায় বাঙালির পাশাপাশি দু-একজন আদিবাসী মানুষের মুখ দেখে বোঝা যায়, এখানে আদিবাসী ও বাঙালির সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান দীর্ঘদিনের।

দোকানের সামনে ৫-৬টি ভ্যানের জটলা। এ অঞ্চলে পথচলার একমাত্র ভরসা এই ভ্যান। শীতল গ্রামের কথা বলতেই আতর আলী নামের এক ভ্যানচালক এগিয়ে এলেন। ভাড়া দরদাম করে রওনা হলাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

ঘোড়াঘাট ডিগ্রি কলেজ পেরিয়ে ভ্যান এগোতে থাকে লালমাটির শক্ত পথ ধরে। রাস্তার পাশে নানা ভাষাভাষী মানুষের আনাগোনা। দূর থেকে আদিবাসী পাড়ার ছনে ছাওয়া ঘরগুলো এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করে। চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত, আর তার মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি তালগাছ। বিশালদেহী আদিবাসী পুরুষরা দল বেঁধে মাঠে কাজ করছেন। গ্রামের ভেতর থেকে ভেসে আসা ঢোল-মাদলের ছন্দ বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল এ অঞ্চলে আদিবাসীদের সরব উপস্থিতির কথা।

ভ্যানচালক আতর আলী জানালেন, ঘোড়াঘাটে নাকি একসময় কেবল আদিবাসীদেরই রাজত্ব ছিল। তখন পুরো এলাকা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। আদিবাসীরাই কঠোর পরিশ্রমে সেই জঙ্গল কেটে চাষাবাদের উপযোগী জমি তৈরি করে। বর্তমানে এখানে পাড়াভেদে সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহালী, মাহাতো ও পাহাড়ি প্রভৃতি জাতির আদিবাসীরা বাস করছে। তবে সময়ের বিবর্তনে এবং নানা প্রতিকূলতায় তাদের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে।

কথায় কথায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে গেলাম। রাস্তার ডানে বাঁক নিতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি ছিমছাম গ্রাম। ভ্যান থামিয়ে আতর আলী বললেন, “স্যার, এইডাই শীতল গ্রাম, মালোপাড়া।”

তখন ভরদুপুর। রাস্তার পাশে বসে গল্প করছিলেন কয়েকজন মধ্যবয়সি মানুষ। মারিয়া মালোর বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করতেই একজন গ্রামের শেষ প্রান্তের একটি বাড়ি দেখিয়ে দিলেন।

বাড়ির সদর দরজায় কড়া নাড়তেই বেরিয়ে এল মারিয়ার ছোট বোন বাসন্তী মালো। সে তখন নবম শ্রেণিতে পড়ে। কথা বলায় বেশ চটপটে, আর এক চিলতে অমলিন হাসি যেন তার মুখময় লেগে থাকে। অভ্যর্থনা জানিয়ে বাসন্তী আমাকে বাড়ির ভেতরে বসার ব্যবস্থা করে দিল। ভেতরে বড় একটি উঠোন, যার দুই পাশে ছনে ছাওয়া দুটি বড় ঘর এবং অন্য পাশে একটি ছোট রান্নাঘর। উঠোনের এক কোণে ফুটে থাকা ঘাসফুলের রাজ্য বাড়িটিতে বাড়তি সৌন্দর্য যোগ করেছে।

বাসন্তীর বাবা ভরত মালো। তিনি এই গ্রামের ‘মাঝিহারাম’ বা গ্রামপ্রধান। তার খোঁজ করতেই বাসন্তী আমাকে নিয়ে গেল বাড়ির পেছনের দিকে। বড় একটি পুকুর পেরিয়ে কিছুটা সামনেই একটি শালবাগান। তার ভেতর দিয়ে একটু এগোতেই চোখে পড়ে একটি উঁচু মাঠ। সেই মাঠের শক্ত মাটিতে কোদাল চালিয়ে হলুদ তুলছিলেন ভরত মালো।

বয়স সত্তরের কোঠায় হলেও তার সুঠাম দেহ তা প্রকাশ করে না। গায়ের রং কালচে এবং লম্বা গড়নের এই মানুষটি যেন আদিম মানুষের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তার সহধর্মিণী ভারতী মালোও তাকে হলুদ তোলায় সাহায্য করছিলেন। আমাদের দেখে কাজ থামিয়ে তারা খোলামনে আলাপে মজে উঠলেন।

মালো আদিবাসীরা মূলত ভারতের রাঁচি থেকে এ দেশে এসেছে। তাদের একটি প্রচলিত গানেও সেই সত্যতা পাওয়া যায়—“রাঁচি থেকে আসলো ঘাসী, তারপর হলো আদিবাসী।” জনশ্রুতি আছে, ব্রিটিশ আমলে রেলপথ নির্মাণের কাজের সূত্র ধরেই তারা এই অঞ্চলে পা রেখেছিল।

ভরত মালোর বাবার নাম প্রতাপ মালো। প্রতাপের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই অঞ্চলেই হলেও তার বাবা এসেছিলেন রাঁচি থেকে। রাঁচি ও জলপাইগুড়িতে ভরতদের অনেক আত্মীয়স্বজন এখনো বসবাস করছেন। ভরত মালো আমাদের শোনালেন তাদের জাতির নামকরণের ইতিহাস।

একসময় জমিদাররা মালোদের দিয়ে ঘোড়া, মহিষ ও গবাদি পশুর ঘাস কাটার কাজ করাতেন। সেই থেকে তাদের ‘ঘাসী’ বলেও ডাকা হতো। এছাড়া এদের অনেকে বংশপরম্পরায় জমিদারদের লাঠিয়াল ও বরকন্দাজ হিসেবে কাজ করতেন। স্থানীয় মানুষ এদের ‘বুনা’ বা ‘বুনো’ হিসেবেই চেনে। বিহারের মালভূমি ও মালই টিলার অধিবাসীদের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিল থাকায় তারা ‘মালো’ নামে পরিচিতি পান।

মালোদের প্রতিটি গ্রাম তিন সদস্যের একটি পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ‘মাঝিহারাম’ বা গ্রামপ্রধানের পদ ছাড়াও সেখানে রয়েছে ‘পারমানিক’ ও ‘গুরদিক’ নামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। গ্রামের সব খবর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পারমানিকের। আর মাঝিহারামের দেওয়া বিচারের রায় জনসমক্ষে পাঠ করে শোনান গুরদিক।

মালোদের গোত্র বিভাজন তাদের বংশীয় পরিচয় বহন করে। গোত্রগুলোর নাম জানতে চাইলে ভরত মালো গড়গড় করে বলে গেলেন—পরনদীয়া, এসলোকিয়া, কারচাহা, সরকার, নায়েক ইত্যাদি। তাদের সমাজে একই গোত্রে বিয়ে নিষিদ্ধ। মালোরা অঞ্চলভেদে নামের শেষে মালো ছাড়াও নায়েক, রাজ কিংবা সরকার পদবি ব্যবহার করে থাকেন।

ভাষাগত দিক থেকে মালোরা প্রোটো-অস্ট্রালয়েড জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তারা নিজেদের ভাষাকে বলে ‘মালো ভাষা’, ‘ঘাসী ভাষা’ কিংবা ‘বুনেরা ভাষা’। তবে বর্তমানে তারা বাংলা ভাষাতেই বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। ভারতী মালোর ভাষায়, “হামনি এ ভাষাটা সব সময় কিহে না” (আমরা এই ভাষাটা সবসময় বলি না)।

ভাষা নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে বাসন্তী জানাল তার শৈশবের বাংলা ভীতির কথা। তার পড়াশোনার হাতেখড়ি ছিল স্থানীয় একটি স্কুলে। সেখানে কোনো আদিবাসী শিক্ষক ছিলেন না। পাঠদান চলত সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায়। যে মাতৃভাষায় সে মায়ের কোলে বড় হয়েছে, বিদ্যালয়ে তার কোনো চিহ্ন ছিল না। ফলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা বুঝতে তার প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়েছে।

তবে অদম্য মেধার জোরে পরবর্তী সময়ে সে ক্লাসের অন্যতম মেধাবী ছাত্রী হয়ে ওঠে। বর্তমানে বিরামপুর পাইলট স্কুলের সব শিক্ষকের কাছে সে একজন অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় মুখ।

আমরা মুগ্ধ হয়ে বাসন্তী ও ভরত মালোর কথা শুনছিলাম। হঠাৎ পাশের একটি বাড়ি থেকে মাদল ও ঢোলের টুংটাং শব্দ ভেসে এল। সেদিকে কান পাততেই বাসন্তী মালো মুচকি হেসে জানাল, পাশের বাড়ির মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। তাই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার আগে থেকেই ঢোল-মাদলের ছন্দে চলছে আনন্দ আয়োজন।

সেই ছন্দের টানে আমরা ওই বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল বাসন্তী। ছনে ছাওয়া তিনটি ঘর নিয়ে সাজানো বাড়ি। উঠোনের এক কোণে একটি উঁচু জায়গায় তুলসী গাছ দাঁড়িয়ে আছে। তুলসীতলাটি সুন্দর করে লেপা-পোছা। গাছের পাশেই রয়েছে একটি প্রদীপ। গৃহকর্ত্রী গঙ্গা মালো জানালেন, এটি মালোদের ‘তুলসী গড়া’। ভগবানের সন্তুষ্টির আশায় এখানে সকাল-সন্ধ্যা তারা প্রার্থনা করেন। মালো ভাষায় একে বলা হয় ‘গরলাগি’।

আমাদের বসার জায়গা হলো ঘরের বারান্দায়। সেখানে এক কোণে বসে মাদলে তাল তুলছিলেন নিরমল মালো। তার সঙ্গে আলাপ জমল। মাদলে তালের ঝংকারের ফাঁকে ফাঁকে তিনি শুনিয়ে চললেন মালোদের বিয়ের রীতিনীতি ও আচারের গল্প। আমরা বিভোর হয়ে শুনতে লাগলাম সেই সুপ্রাচীন আদি সংস্কৃতির গদ্যকথা।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ১৬ আগস্ট ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button