মুক্তিযুদ্ধ

যে যেখানেই থাকো, সৎ থেকো: মুক্তিযোদ্ধা দুলাল

ক্ষতচিহ্নের গদ্য: পর্ব ১৩

অবশ আঙুলের যন্ত্রণায় আজও একাত্তরের সেই ভয়াবহ স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান এই যোদ্ধা।

একাত্তরের উত্তাল মার্চ। ঝিনাইদহ কেসি কলেজের বিএসসি চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মো. সোহরাব গনি দুলাল তখন টগবগে তরুণ। দেশজুড়ে গণহত্যার খবর আসছে।

কুষ্টিয়ার মিরপুরের সুলতানপুর গ্রামে বসে তিনি আর তার বন্ধুরা তখন স্থির থাকতে পারলেন না। পাকিস্তানি সেনাদের গতিরোধ করতে দুলালরা শুরু করলেন অন্যরকম প্রতিরোধ। মিরপুরের রাস্তায় বড় বড় গাছ কেটে ফেলে রাখা আর কাঁচা রাস্তায় গভীর গর্ত করা- তদানীন্তন ছাত্রসমাজের এই সাহসিকতায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে পাকিস্তানি বাহিনী।

মিরপুর থানা কাউন্সিলে ক্যাম্প স্থাপন করেই পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে গ্রামে হানা দিতে শুরু করে। পুড়িয়ে দেয় সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি। সেই লেলিহান শিখা থেকে মুক্তি পায়নি দুলালদের বাড়িটিও। সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে আজও শিউরে ওঠেন তিনি।

বাড়ির পেছনে পাটখেতের আড়ালে বাবা আর ভাইয়ের সঙ্গে লুকিয়ে থেকে দেখেছিলেন নিজের বসতভিটার ধ্বংসযজ্ঞ। আগুনের দাউ দাউ শিখা যেন সেদিন তার বুকের ভেতরটা খামচে ধরেছিল। ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব পরিবারটিকে নিয়ে সোহরাব গনি দুলাল পাড়ি জমান ভারতে। দৌলতপুর ধর্মদাহ সীমান্ত পার হয়ে প্রথমে শিকারপুর এবং পরে করিমপুর।

গুলিতে বাঁ হাতের চারটি আঙুল রক্তাক্ত হয় মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব গনি দুলালের, ছবি: সালেক খোকন।

কিন্তু পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। নাম লেখান রিক্রুটিং ক্যাম্পে। সেখানে দায়িত্বে ছিলেন গোলাম কিবরিয়া, আনোয়ার আলী, বারী, জিকু ও দুদু প্রমুখ। এরপর প্রশিক্ষণের জন্য ডাক আসে বিহারের চাকুলিয়া থেকে। দীর্ঘ একুশ দিনের প্রশিক্ষণে তিনি রপ্ত করেন থ্রি নট থ্রি রাইফেল, টু-ইঞ্চ মর্টার, এসএলআর, এসএমজি ও গ্রেনেড থ্রো করার রণকৌশল।

চাকুলিয়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে অস্ত্র হাতে নিয়ে যখন নিজ এলাকায় ফিরলেন, তখন তিনি এক প্রশিক্ষিত গেরিলা। ১২-১৩ জনের একটি ছোট কিন্তু শক্তিশালী দলের কমান্ডারের দায়িত্ব তার কাঁধে। শুরু হয় গেরিলা অপারেশন।

দিনের বেলা সমমনা মানুষের বাড়িতে আত্মগোপন আর রাতে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া- এই ছিল রুটিন। সাধারণ মানুষই ছিল তাদের চোখ ও কান। খাবারের জোগান থেকে শুরু করে পথের খবর- সাধারণ মানুষের এই জীবনের ঝুঁকি নেওয়া সহযোগিতা না থাকলে গেরিলাদের জয় আসত না বলে মনে করেন দুলাল।

৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে দৌলতপুর, মিরপুর, আমলা সদরপুর, চিতলিয়া ও মশাল বলদিপাড়া এলাকায় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। হাতে থাকত ক্ষিপ্র এসএমজি। মিরপুর থানা থেকে শুরু করে রাজাকার ও মিলিশিয়াদের ছোট ছোট ক্যাম্পে ‘হিট অ্যান্ড রান’ পদ্ধতিতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে শত্রুর মনোবল গুঁড়িয়ে দিতেন তারা।

কিন্তু নভেম্বরের মাঝামাঝি এক বিকেলের অপারেশন বদলে দেয় তার জীবন। দৌলতপুর থানার তালবাড়িয়া গ্রামের মানুষের ওপর প্রায়ই অত্যাচার করত মিলিশিয়া ও রাজাকাররা। খবর পেয়ে দুলাল তার দল নিয়ে ওত পেতে থাকেন ক্ষেতের নিচু জায়গায়। শত্রু আসতেই শুরু হয় ভয়াবহ গোলাগুলি।

প্রায় ৩০ মিনিট যুদ্ধের পর পজিশন বদলানোর জন্য দুলাল এক অভিনব পদ্ধতি বেছে নেন। কথা ছিল রুমাল বা কাপড় উঁচিয়ে ইশারা করলেই সহযোদ্ধারা জায়গা পরিবর্তন করবে।

সন্ধ্যার ঠিক আগের সেই মুহূর্ত। হাতের বাঁ হাত দিয়ে রুমাল উঁচু করতেই ঘটে গেল অঘটন। পাকিস্তানি সেনাদের চোখে পড়ে যান তিনি। মুহূর্তের মধ্যে একঝাঁক গুলি এসে তার বাঁ হাতের চারটি আঙুল স্পর্শ করে চলে যায়।

মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে যায় চারপাশ। হাড়গুলো যেন ঝুরঝুরে হয়ে গিয়েছিল। সহযোদ্ধারা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান ভারতের করিমপুর হাসপাতালে। সেখানকার চিকিৎসকরা হাতের অবস্থা দেখে আঁতকে ওঠেন। সাফ জানিয়ে দেন, “আঙুলগুলো কেটে ফেলতে হবে।”

কিন্তু তরুণ যোদ্ধা দুলাল হার মানতে নারাজ। আঙুল কাটাতে তিনি রাজি হলেন না। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে পাঠানো হলো কৃষ্ণনগরের শক্তিনগর হাসপাতালে। সেখানে দীর্ঘ চিকিৎসায় আঙুল টিকে যায় ঠিকই, কিন্তু বাঁ হাতটি চিরদিনের জন্য কর্মক্ষমতা হারায়। আঙুলগুলো আর পুরোপুরি মুঠো করা যায় না। শীত এলে আজও সেই পুরনো জখমে তীব্র যন্ত্রণা হয়। এই আমৃত্যু কষ্টই যেন তার স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ স্মারক।

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব গনি দুলাল আজও স্বপ্ন দেখেন এক সুন্দর বাংলাদেশের। সেই প্রজন্মের উদ্দেশে তার উদাত্ত আহ্বান, “সোনার বাংলার সোনার মানুষ হবে তোমরা। যে যেখানে যে কর্মেই থাকো না কেন, তোমরা সৎ থেকো। দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালোবেসো। তবেই স্বাধীনতা পরিপূর্ণতা লাভ করবে।”

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১৩ মার্চ ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button